‘রাঠোর এন্ড সন্স’এর শতাধিক কর্মচারীর ভেতর, গৌতম মালিকের
অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও প্রিয় একজন স্টাফ। প্রশান্তকে সাথে করে, ম্যানেজারের কাছ থেকে
অনুমতি নিয়ে গৌতম আজ একটু আগেভাগেই বেরিয়ে পড়েছে ফ্যাক্টরি থেকে। সেই জন্য
ম্যানেজার শিশির বাবুর কম জ্বলুনি হয়নি। কিন্তু কোন উপায় ছিল না তার, স্যারের
প্রিয় গৌতমকে ছেড়ে দিতে বাধ্য ছিল ম্যানেজার শিশির বাবু। ফ্যাক্ট্ররীর থেকে
বেরিয়েই বাস পেয়ে গেল। বাস ধরে শোভাবাজার মোড়ে নেমে পড়লো ওরা। হাঁটতে হাঁটতে
রাজবাড়ির ডান দিকের রাস্তায় ঢুকে এগুতে লাগলো। গন্তব্যে পৌঁছুতে আরও বেশ খানিকটা
দূর পথ হেঁটে যেতে হবে। এটাই উত্তর কলকাতার শোভাবাজার, যেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে
রয়েছে শহরের বিখ্যাত শিল্পপতি ভবানী রাঠোরের প্রাসাদ তুল্য বহু মঞ্জিল। বহু
পুরানো বৃহৎ অট্টালিকা। আজ এই বহু মঞ্জিলেই রাঠোর এন্ড সন্স এর প্রতিষ্ঠাতা, ভবানী
রাঠোরের বংশ-দীপের প্রথম শুভ জন্মদিনের বিশাল আয়োজন।
হাঁটতে হাঁটতে গন্তব্যে পৌঁছে ওরা লক্ষ্য করল বহু মঞ্জিলের নিচে শুরু গলিটার দুই
পাশে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে অডি, ভলভো, মার্সেডিজ, হামার, রেঞ্জ রোভার,
বি.এম.ডাবলু., জি.এম.সি., রোলস রয়েস, পর্ষীয়া, ফেরারি, ল্যাম্বরগিনি, বেন্টলি,
জীপ রাংলার এর মতো বহুমূল্য সব গাড়ি। মধ্যখানে প্রবেশ দ্বারে ফুটবলের মতো
রংবেরংয়ের বেলুনে বেলুনে ছয়লাপ। মাথার উপর রঙিন এল. ই. ডি. আলোয় "হ্যাপি
বার্থ ডে" লেখাটা জ্বল জ্বল করছে। ফ্যাক্ট্ররীর মালিকের ছেলের জন্মদিনে
ফ্যাক্টরীর সমস্ত স্টাফ আজ এখানে নিমন্ত্রিত। গৌতম প্রশান্তর বাসা কোলকাতা থেকে
দূর মফঃস্বলে থাকার কারণ, আগে আগেই আমন্ত্রণ সেরে যেতে পৌঁছেছে ওরা।
কিন্তু
জন্মদিনের উৎসবে পৌঁছে গৌতমের মনে হলো যেন, এমন বিত্তশালীদের উৎসব অনুষ্ঠান
পরিবেশে গৌতমদের মতো সামর্থ্যর মানুষের উপস্থিত হওয়াটা, নিজেকে না মানিয়ে নিতে
পারাটা মস্ত বড় এক অপরাধ। বাবুর বাড়ির পার্টি বলে কথা- অদেখা এক আশ্চর্য খুশি
বুকে বেঁধে গর্ববোধে ভর করে হই হই করতে করতে না এলেতো আর ওকে এমন অস্বস্তিকর
পরিবেশের মুখোমুখি হতে হত না...
- ‘যাই বল না কেন, অমন করে কিন্তু বলাটা ঠিক হয়নি তোর।’
- ‘কেন?’
- ‘আফ্টার অল্ আমাদের মালিক- ওঁনার বদৌলত কত গুলো পরিবারের
চুলো জ্বলছে বলতো!’ একরকম প্রবচনের মতোই গৌতম কে বোঝাতে চাইল প্রশান্ত।
- ‘অ্যাই, তুই ছাড় তো! কাজের থেকে ছাড়িয়ে দেবে , তাইতো?
পরোয়া করি না। তাই বলে উনি যা ইচ্ছা তাই বলতে পারে না। মাথা বিক্রি করিনি, আর
অ্যাই শোন্, তোর এতো ফাটছে কেন রে! আমাদের থোবড়া দেখে পয়সা দেয়না। আট ঘন্টার জা’গা
রীতিমত দশ-বারো ঘন্টা ঘাম ঝরিয়ে তবে দেয়। বোঝাগেল!’ তাচ্ছিল্য স্বরে বলল গৌতম।
- ‘আরে, মালিক বললই না হয় দুটো কথা, কি এসে যায় তাতে-’
প্রশান্তর মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয় ক্রোধিত গৌতম, ‘তুই তো আশ্চর্য ছেলে দেখছি। কি
হয়? দুটো কথা? কতগুলো লোকের মাঝে কিভাবে বলে গেল বলতো, আমাদের মান-সনমান নেই না
কি! ওঁনার ছেলের জন্মদিনেই তো ডেকেছে আমাদের, না কী! না করতো নেমোনতোন্, আসতাম না-’
-
‘আমি সে কথা বলতে চাইনি, মালিকের কাছে আমাদের সনমানের কি মূল্য আছে বল!’ শান্ত
স্বভাবের প্রশান্ত বোঝাতে চাইছিল কিন্তু গৌতমের ক্রোধ থামলো না।
- ‘তুই থাম চামচা। দ্যাখ, উনি যেভাবে কথাগুলো বলেছে না- তাতে ওঁর সনমানের চেয়ে
আমার মায়ের গুরুত্বটা অনেক বেশি।’ ভাববিহ্বল হয়ে মধ্যমা এবং বৃদ্ধাঙ্গুল চোখের
দুই কোলের মাঝে টিপে, চিবুক পর্যন্ত মুছতে মুছতে নজর তুলে খোলা আকাশের দিকে তাকালো
গৌতম।
ফ্যাক্ট্ররীর মালিকের ছেলে দুর্গেশের জন্মদিনের উৎসবে অন্যান্য
অতিথিদের মতো প্রশান্ত এবং গৌতম ও এসেছে বিশাল এই নৈশভোজে সামিল হতে। এখানে এসেই
গৌতমের আচরণের কারণ মালিকের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ে যত ঝামেলা সৃষ্টি হলো। অথচ
গৌতমের সময়ানুবর্তিতা এবং কাজের দক্ষতার জন্য মালিক রীতিমতো তোয়াজ করে ওকে। ছোট
বড় ঘটনা বা কাজকর্মের পাশে মালিক সবসময় দেখতে চায় গৌতমকে। বিনা শর্তে ছোট বড়
দাবিও মেনে নেয় ওর। কিন্তু আজ তাঁর ছেলের জন্মদিনের পার্টিতে এসে মালিকের কথায়,
মালিকের ব্যবহারে নিজের মায়ের প্রতি অপমান বোধ জেগে উঠলো যেন গৌতমের মনে। উলঙ্গ
আকাশের নিচে বিশাল প্রাসাদের রেলিংএ ঘেরা জ্যোৎস্না ছড়ানো খোলা ছাদে, নির্জনে বসে
মনকে হালকা করে স্বাভাবিক হতে চাইছে গৌতম। সহকর্মী প্রশান্ত একা ছেড়ে দেয়নি
তাকে। মুহূর্তের ঘটনাটা সে ও উপলব্ধি করেছে হৃদয় দিয়ে। গৌতমের সাথে গুটি গুটি
পায়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাদে উঠে আসতে আসতে বলে প্রশান্ত- ‘আমি সেটা বুঝি। আসলে উঁনি
হয়তো জানতেন না ওটা তোর মায়ের...’
প্রশান্তর কথায় জ্বলে উঠে ঘৃণা উগরায় গৌতম, ‘ওঁ কী বুঝবে রে! মা থাকতেও যাঁর মা
কে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে, আর বিয়ে করে এনেছে বেশ্যাপট্টি থেকে এক এঁটো
মাল, সালা বেশ্যাকে তুলে এনে। ছিঃ! তাঁর আবার সনমান! তুই থামতো-’
-
‘বলিস কি তুই! কেবল সনমানই না, বস্ কে রিতিমত ভয় করে চলে সবাই-’
-
‘হুম্, ভয়! তুই কি জানিস বল তো? ভয়-সনমান তোর বস্ কে কেউই করে না। সবাইতো সালা
পিঠ পিছে গালাগাল দেয়। যেটুকু যা করে, ওঁর দৌলত কে করে। সব ক্ষমতা তো মালু দিয়ে
কিনে রেখেছে সাল্লা।’ তাচ্ছিল্যর মতো অনায়াসে বলে গেল গৌতম।
-
‘সবই তো জানিস। বুঝিস। তবে পাঙ্গা কেন নিতে যাস! আচ্ছা, মাঝে মাঝে তোর হয় কি
বলতো?’ প্রাঞ্জল ভঙ্গিতে বলল প্রশান্ত।
-
‘ছাড়। বাড়িতে গিয়ে খাবো। এখানে খাবার-টাবার দরকার নেই। চ, বাড়ি চ।’ প্রশান্তর
কাঁধ চাপড়ায় গৌতম।
গৌতমের
এমন সিদ্ধান্তে প্রশান্তর মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। কারণ প্রশান্ত যথেষ্ট পেটুক
স্বভাবের। খেতে ভালোবাসে। আর যদি তাতে কিনা কোন পয়সা খরচ না হয়, তবে তো কথাই
নেই! সমস্ত কাজ ফেলে রেখে সেখানে নির্দ্বিধায় হাজির হয়ে যায়। সম্মান-টম্মানের
বালাই নেই। খাওয়া নিয়ে ফ্যাক্ট্রীতে ও প্রশান্ত র বেশ বদনাম রয়েছে। গৌতম হঠাৎ
রাগ করে যদি খাবার ছেড়ে চলে যায়, যে সব খাবার জীবনেও ও চোখে দেখে নি, যে সব
খাবারের কথা ভাবতেই পারেনা প্লশান্ত; তেমন সব মেনুর খাবারের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে
হবে ভেবে, কাঁধ থেকে গৌতমের হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘মাথা গরম করিস না বস্। এত
বড়ো খোলা ছাদে কত সুন্দর সুন্দর ছোট বড় সাজানো গোছানো গাছ গুলোর আড়াল আবডালে
কাপেলদের হরকতে দেখছিস! চ, আমরা বরং অই দিকটা গিয়ে বসি, চ।’ খালি চেয়ারের দিকে
এগিয়ে যায় প্রশান্ত।
- ‘থাকতে
হয় তুই থাক এখানে। তোর এই বসা আর খাবার চক্করে ট্রেনটাই মিস্ হয়ে যাবে।’ অনড়
যেন গৌতম।
-
‘একদমই না রে। এর থেকেও রাতে ওভারটাইম করে ফ্যাক্ট্রীর থেকে আমরা বাড়িতে ফিরেছি
ইয়ার। খবর নিয়ে দেখেছি ভি. আই. পি. ব্যাচ পাতলা হলেই, গেস্টরা ঢুকে পড়বে। আমরা
না হয় সেখানেই বসে পড়বো, আরতো মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যাপার; শোন ভাই, বুফের
চক্করে আর যাবনা। লাস্ট ট্রেনটা ধরতে হবে। ঠিক পয়ে যাব।’
পশ্চিম ভারতের রাজস্থানের এক প্রত্যন্ত গ্রামের গরিব কৃষিজীবী,
সমর বাহাদুর রাঠোরের অষ্টম সন্তানের তৃতীয় সন্তান ভবানী রাঠোর বিবাহের পর
পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণ, নববিবাহিতা স্ত্রী অজন্তাকে নিয়ে প্রায় চার সাড়ে চার
দশক আগেই চলে এসে ঘাঁটি গেড়েছিল উত্তর কলকাতায়। উত্তর কলকাতার এক ঘিঞ্জি
এলাকায়। একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া করে প্রথমে নিজের বাসস্থান ঠিক করে নেয়। পরে
জীবিকানির্বাহ করবার জন্য ধীরে ধীরে এলাকার দু’চারজনের সহায়তায় ছোটখাটো ব্যাবসা
শুরু করে। আজ যেটা শুধু কলকাতাই নয় সমগ্র পশ্চিম বঙ্গের এক সুপ্রসিদ্ধ উদ্যোগ
সংস্থা, ‘রাঠোর এন্ড সন্স’ নামে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠান খাড়া করতে প্রথম জীবনে
অপরিসীম পরিশ্রম এবং যথেষ্ট কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে ভবানী রাঠোরকে। কোলকাতার বুকে
নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে, রাঠোর এন্ড সন্স কে উন্নয়নশীল করে তুলতে শুরুতে
যেমন অমানুষিক পরিশ্রম এবং যথেষ্ট সংঘর্ষ করতে হয়েছে, তেমনই সময়ের সাথে সাথে
বিরামহীন পরিশ্রম, দীপ্ত বুদ্ধি, দৃপ্ত ব্যবসায়ীক কৌশল, ন্যায়পরায়ণতা এবং
সদ্ব্যবহার; ভবানী রাঠোরকে দেখতে ই দেখতে, পশ্চিমবঙ্গের ধনী ব্যবসায়ী ও উদ্যোগপতি
দের প্রথম সারিতে যায়গা করে দিয়েছে। সময় এগিয়ে চলে আর সময়ের সাথে সাথে ব্যবসা
ও ক্রমেই বাড়তে থাকে। সময়ের অমোঘ নিয়মে ভবানীর স্ত্রী অজন্তা দেবীর পা’ভারী
হয়। একদিকে রাঠোরের নাম, যশ আর কারোবার প্রসারিত হতে থাকে; অন্যদিকে ভবানী
রাঠোরের স্ত্রী অজন্তার গর্ভে বাড়তে থাকে তার জঠরস্থসন্তান। নাম-খ্যাতি, ধন দৌলত,
গৰ্ভসন্তান সুখে; খুশিতে বিভোর অজন্তা ও যেন শান্তি-সুখে আত্মহারা। সমগ্র
ব্যবসায়ী মহলে ছড়িয়ে পড়লো রাঠোরের পরিবারে শ্রী গনেশের আগমন বার্তা। সোনার
চামচ হাতে করে একটু একটু করে বড় হয়ে উঠেছে বর্তমানে ‘রাঠোর এন্ড সন্স’-এর
কর্ণধার সেই শ্রীগনেশ, ভবানী রাঠোর এর একমাত্র সন্তান অশনি রাঠোর। আজ ভবানী রাঠোর
এর পৌত্র, অর্থাৎ অশনি রাঠোরের একমাত্র সন্তান দুর্গেশের জন্মদিন। ঠিক এমন ভাবেই
অজন্তা দেবী আর ভবানী রাঠোর ও তাঁদের একমাত্র শ্রী গনেশ, তাঁদের একমাত্র পুত্র
অশনির জন্মদিন মহাসমারোহে পালন করে এসেছেন।
সময়ের পায়ে পায়ে সময় গড়িয়ে যায়। ভবানীর বয়স বাড়ে।
চুলে পাকধরে ভবানীর। নানান চিন্তা-দুশ্চিন্তায় ভবানী রাঠোর যেন হাঁপিয়ে ওঠে তাঁর
কর্মজীবন থেকে । অশনির কলেজের গণ্ডি শেষ হলে, পুত্রের সাথে তাঁর এই বৃহত কারোবার
সংক্রান্ত আলোচনা করবার জন্য ভবানী তাঁর মুন্সী তিনকড়ি মহাপাত্র কে দিয়ে, পুত্র
অশনিকে তাঁর চেম্বারে ডেকে পাঠান। অশনি উপেক্ষা না করতে পেরে, তার পিতার আদেশ মতো
ভবানীর চেম্বারে দেখা করতে পৌঁছে যায়। সামনে রাখা চেয়ারে র দিকে ইশারা করে অশনি
কে বসতে বলেন ভবানী, ‘বৈঠো বেটা।’
অশনি
টেবিলের সামনে রাখা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ে। কলেজের পড়া শেষ করে কি করতে চায়
তার ছেলে, জানতে চেয়ে জিজ্ঞাসা করে ভবানী বাবু, ‘কলেজ কা পড়্হাই তো খতম হুয়ে।
অব ক্য়া করনে কো শোচ্ রহে হো বেটা?’
- ‘কুছ শোচে নহী পাপা!’ মাথা ঝুঁকিয়ে ছোট্ট উত্তর করে অশনি।
- ‘অব
অপনি কারোবার সে জুড় যাও, অউর কারোবার কে তরফ ধ্যায়ন দো বেটা। আগে পড়না চহতে হো
তো পড়্হাই কো চালু রাক্ষো, পর বিজনেস কো লেকর। তাকি কারোবারকো আগে অউর কৈসে
বড়াহে যায়, ফৈলায়ে যায়। জঙ্গল কি তরহা ফৈলায়া বিখরয়া হুয়া কারোবারকো ভী তো,
তুম্হিকো দেখনা হোগা। জন্-না হোগা। সমঝনা হোগা। মেরা হাত বটাও বেটা। অউর কীতনা দিন
ম্যানেজারো পর ভরোসা করকে কারোবারকো চালাতে রহেংগে। মেরা ভী তো ঊমর হো রহা হ্যায়।
হম আঁখ বুঁন্দেংগে তো কিণারা বটর্তে রহগে বেটা। ফির সাদি–বিয়া ভী তো করনা হ্যায়
ন!’
চওড়াকাঁধ, লম্বা সু-সাস্থ্যবান নির্মল চেহারা। এক পরিপক্ক প্রাপ্ত পুরুষের মতো
দেখতে হলেও, ডিগ্রি হাসিল করলেও অশনির স্বভাব স্বল্পভাষী চাপা লাজুক প্রকৃতিরই
রয়ে গিয়েছে। টেবিলে রাখা বৃত্তাকারের পেপার ওয়েট টাকে মুঠিতে ভরে, টেবিলের
কাঁচের ওপর ঘুরাতে ঘুরাতে ভবানী বাবুর প্রস্তাবের প্রত্যুত্তরে হঠাৎ পেপার ওয়েটার
ঘূর্ণিপাক থামিয়ে মুঠির ভেতরে জাপটে ধরে বলল, ‘ঠিক হ্যায় পাপা, কারোবার কা জরুরী
কগজাদ কড়িচাচা সে হম্ সমঝনে কী কৌশিস করেংগে। পর পাপা, সাদি- বিয়া হমসে নহী
হোগী।’
- ‘পর
কাহে?’
কেন-র উত্তর খুজে পাননি ভবানী বাবুর
স্ত্রী অজন্তা দেবীও। মায়ের সাথে বন্ধু সুলভতা থাকা সত্ত্বে ও বারংবার বিয়ের
প্রস্তাব রেখেও রাজি করাতে পারেন নি অজন্তা দেবী। যতবার বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে
বলেছেন, ‘ম্যায় অউর কিতনে দিন ঘর সাম্ভালুংগী! ঘর কা কাম কাজ দেখ-ভাল কে লিয়ে,
অব তো এক বহু লা দে বেটা।’
তত বারই
মায়ের মুখে হাত চেপে, মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছে, ‘উসকি কা জরুরী হ্যায় মম্মী! হম্
হ্যায় ন। কা করনা হ্যায় বোলো, হম্ সারে কাম কর দেংগে।’
তারপর অজন্তা দেবী আর কোন কথাই বলতে
পারেন না।
মৃদু
ভাষী অশনির লাজুকতা এবং চাপা আচরণের গভীরে, ধীরে ধীরে যে একটা গোপন সম্পর্কের বীজ
অঙ্কুরিত হয়ে ডালপালা মেলে দিয়েছে; এটা আর কেউ না বুঝতে পারলেও ভবানী বাবুর
মুন্সী তিনকড়ি মহাপাত্র সেটা কিছুটা অনুমান করতে পেরেছিল। মাস দুয়েক আগে
তিনকড়ির কাছে অশনি সমস্ত হিসাবের খতিয়ান জানতে চেয়ে, যখন তিনকড়িকে একটা লাল
ডায়েরি দিতে গিয়ে অশনির অজান্তেই, ডায়েরির ভেতর থেকে একটা কাগজ লুটিয়ে পড়েছিল
তিনকড়ি র পায়ের কাছে। কাগজটা পড়ে যেতে দেখে ও তখন নীরব থেকেছে তিনকড়ি।
লম্বা
দোহারা চেহারা। মাথায় এক ঝুড়ি সাদা ধবধবে চুল। পাঁকানো সাদা গোঁফ। লম্বা নাক।
নাকের ডগায় গান্ধী চশমা। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়েছে যেন। তবু নবীন অন্বেষণের
উৎসুকতায় তার ঘাটতি পড়েনি এতটুকু। এখনোও বেশ শক্ত সামর্থ্য তিনকড়ি। অশনি চলে
যেতে তিনকড়ি ঝুকে, ধুতির কুঁচি উচিয়ে কাগজ টা তুলে নেয়। শক্ত কাগজটা উঠিয়ে
উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দ্যাখে হতবাক হয়ে কয়েক মুহূর্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে থেকেছে
তিনকড়ি। সে তো আজও অশনির কড়িচাচা আর অশনি তার ‘অনিপুত্তুর’। শিশু বয়সে কড়ি
চাচার কোলে চড়ে কাঁধে মাথা না রাখলে ঘুম আসতো না তার। ছেলে বেলায় কড়ি চাচাকে
ঘোড়া বানিয়ে পিঠে চড়ে, ‘হট্-চল্ ঘোড়া - টগ্-বগ্ টগ্-বগ্’ না করলে শান্ত করা
যেত না তাকে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে কি শীত, কি গ্রীষ্ম; কড়ি চাচার আঙ্গুল ধরে
ভোরে গঙ্গার হাওয়া শরীরে না লাগিয়ে, পাড়ার পার্কে সবুজ ঘাসের উপর দৌড়-ঝাঁপ না
করে দিন শুরু হত না তার। সেই ছোট্ট অনিপুত্তুর যে আজ অশনি রূপে জওয়ান হয়ে
গিয়েছে , অর্থের নেশায় কারো খেয়ালই হয়নি।
উল্টিয়ে দ্যাখে, এটা তো কোন সাধারণ
কাগজ নয়। এ যে এক সদ্য স্নানশিক্তা সুন্দরী তন্বী তরুণীর অর্ধনগ্ন ছবি। নাম
গঙ্গা। গঙ্গা নামটা জেনেছে ফটোর নীচে বাংলা অক্ষরে ‘গঙ্গা’ লেখা রয়েছে দেখে। তবে
নামের পাশে একটা বোঁটা কাটা পান এবং পানের পাশে ঘোড়ার পায়ের খুরের ছবি আঁকা
দেখে, ‘আই লাভ ইউ’ বুঝে উঠতে না পারলে ও; মাথা নাড়িয়ে মনে মনেই বলে উঠলো মুন্সী,
‘মাইয়ার এই ন্যাংটো ছবির ভেতরে কোনো না কোনো রহস্য তো অবশ্যই আসে...’
রহস্যের দ্বারভঙ্গ করবার নেশা যেন চেপে বসলো মুন্সী তিনকড়ির
মাথায়। কাউকে বলতে না পারবার এবং ছবিটি কাউকে দেখাতে না পারবার যন্ত্রণা তাড়িয়ে
ফিরছে মুন্সী তিনকড়িকে। দিনের পর দিন গুপ্তচরের মতো খোঁজ করতে করতে, অবশেষে মধ্য
কোলকাতা র হাড়কাটা গলির নিষিদ্ধ পল্লীর এক একটা গলিতে; গলির খানাখন্দে ঘুরে ফিরছে
মুন্সী। সাতসকালে এক দিন হাড়কাটা গলির নিষিদ্ধ পল্লীতে একটা গলির মুখে, অশনির
গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে নজরে পড়ল তিন কড়ির। মনই মনে বিড়বিড় করল মুন্সী, ‘ছ্যা –
ছ্যা – ছ্যা! এত সমৃদ্ধশালী, এমন ঐশ্বর্যশালী উদ্যোগপতির একমাত্র পোলার মঞ্জিল
কিনা- ছ্যা...’
ভর্ৎসনার যেন কোন ভাষাই খুঁজে পেল না সে। এই আশে পাশেই কোথাও হবে ভেবে, মুন্সি
তিনকড়ি একটা পান গুমটির আড়ালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো। ঘন্টাখানেক
অপেক্ষার পর লক্ষ্য করল, অশনি এক ঘিঞ্জি গলি থেকে বেরিয়ে, ঠোঁটে একটা লম্বা
সিগারেট গুজে, গাড়িতে বসে; বেশ যত্ন করে সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে হর্ন বাজাতে
বাজাতে গলি থেকে বেরিয়ে গেল। পান গুমটি থেকে বেরিয়ে এ গলি সে গলি ঘুরে ঘুরে,
গঙ্গার ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করতে করতে তিনকড়ি পৌঁছে গেলো তার রহস্যময় দ্বারে।
দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ভেতরে বাথরুমের শাওয়ার থেকে নাগাড়ে জল পড়বার শব্দ শোনা
গেল। কয়েকবার দরজার শিকল খট্ খটাতে ভেতর থেকে ভাসা আওয়াজ ভেসে এলো, ‘কে গা?’
— ‘আমি।’
ভেতর থেকে আবার আওয়াজ ভেসে এল, ‘একটা
নাম তো আসে, না কি বেওয়ারিশ? তা, কি চাই?’
ভীত
সন্ত্রস্ত স্বরে জবাব দিল তিনকড়ি, ‘না - না, আমি তিনকড়ি। কড়ি চাচা–’
— ‘চাচা!’ উচ্চস্বরে হাসি ভেসে এল
ভেতর থেকে।
— ‘আপনার লগে একটু দ্যাখ্যা করনের
বাসনা লইয়া আসছেলাম।’
ধীরে
ধীরে হাসিটা মিলিয়ে গেল। বাথরুমের শাওয়ারের জলের শব্দ ছাড়া, আর কোন শব্দ বা
আওয়াজ ভেতর থেকে শোনা গেল না। এত দূর থেকে যখন এসেছে, তখন রহস্য উন্মোচন না করে
আর ফিরছেনা তিনকড়ি। দরজা খোলবার অপেক্ষায় লম্বা বারান্দায় দরজার পাশে ঠায়
দাঁড়িয়ে রইলো মুন্সী। শুরু লম্বা বারান্দায় মানুষের আনাগোনা যেন লেগেই রয়েছে।
বারান্দায় দেওয়ালে ঠেস লগিয়ে সামন্য দূরিতে দূরিতে খরিদ্দারের অপেক্ষায়
দাঁড়িয়ে বিভিন্ন সাজে, নানান বয়সের তরুণীরা, কেউ শাড়ির আঁচলে র খুঁট তর্জনীতে
প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে কাউকে নিজের দিকে আকৃষ্ট হতে ইশারা করছে, কেউ আবার ঠোঁট
কামড়ে বুকের কাপড় আলগা করে, ব্লাউজের বাইরে বেরিয়ে থাকা স্ফীত স্তনের নগ্ন
বেরিয়ে থাকা অংশ টুকুর দিকে ইশারা করে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে চাইছে। শালোয়ার
কামিজ পরিহিতা কেউ বা কামিজে র উপর থেকে নিজের স্তনের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে,
ঠোঁটের কোণে দাঁত চাবিয়ে খরিদ্দারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে। দীর্ঘ সময় থেকে
বারান্দার একটি পিলারে ঠেস লাগিয়ে তিনকড়িকে এরকম দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখে,
দু’জন তরুণী গলা ধরাধরি করে পান চিবুতে চিবুতে এগিয়ে এলো। তিন কড়ির একেবারে শরীর
ঘেষে চেহারার দিকে মুখ বাড়িয়ে আঙ্গুল নাচিয়ে বলল, ‘এই বয়েসে ও সাতসকালে বেশ্যা
কোঠে মু-মারতি চলি এইচো খুড়ো!’
দ্বিতীয় জন বলল, ‘এ দ্বরজা আর খুলবে
নি কো। দাঁড়ায়ে সময় না গুনে চলো না, আমরা তো রইয়েচি। মজার ঘাটতি হবে নি-
গ্যারানটি। হ্যাঁ।’
— ‘ছ্যা-
ছ্যা - ছ্যা! কি কথা কও, তোমাগো কি মনে হয়, ঐ সব কু-কাম করনের বয়স বা বাসনা
কোনোডা অখনও আমার আসে?’ দুই কানের লতি ধরে জিভে দাঁত চেপে বলল তিনকড়ি।
প্রথম তরুণী তিন কড়ির হাত, তার বুকে
চেপে ধরে নিয়ে বলল, ‘আ~ হা~হা~ ছাড়তো খুড়ো, এ সব নট্যাঙ্কি কথা। সবার চাদারের
নিচে শুয়ে দেইখিচি, কার লোহা কত শক্ত আর কত বড়; আমার বলতি হবে নি কো - চলো
দিকি... চলো...’
চরম
লজ্জায় সঙ্কোচ ভরে হেঁচকা টানে বুকের থেকে হাত সরিয়ে নেয় মুন্সী তিনকড়ি, ‘ছ্যা-
ছ্যা - ছ্যা!’
দ্বিতীয়
জন দুই ঠোঁটের মাঝে তর্জনী আর মধ্যমা ফাঁকা করে চেপে, আঙ্গুলের ফাঁকা থেকে পানের
পিক ছুড়ে বিরক্ত স্বরে বলল, ‘যদি কষ্ ঝরাতি না ই এইচো; তো কোন কম্মে এই সাতসকাল
বেশ্যা মাগীর কোঠে ঢু মারতি চলি এইচো- শুনি!’
মুন্সী
তিনকড়ি সামান্য ঘাবড়ে গিয়ে মনে মনে ভাবলো, জোয়ান বয়সে সিনেমায় এমনটা দেখেছে
সে, লোকের মুখে মুখে ও শুনেছে। আজ মৃত্যু দশকে দাঁড়িয়ে সমাজের এই পরিত্যক্ত
পল্লীতে এসে, নিজেকে সুরক্ষিত রাখবার পরীক্ষার অভিজ্ঞতাটা ও যেন কম নয়। ভোলাবার
নয়। দ্বিতীয় তরুণীর প্রশ্নের জবাবে উল্টো কৌতুহলী স্বরে প্রশ্ন করে বসলো মুন্সী,
আচ্ছা মনা, ‘ওই ঘরের ভিতর থিকা জন্ রমনী মোর লগে কথা কইলো, অর নাম কি বলতে পারো?’
— ‘নামে কি কাম, বলো দিকি খুড়ো?’
মুন্সীর চিবুক ধরে ঝাঁকিয়ে, ঠোঁট ছুঁচলো করে মাথা দুলিয়ে বলল প্রথমা।
— ‘ছ্যা-! ই তো ভারী জ্বালায় পড়সি-’
-- ‘কি কও?’
-- ‘কোনো না, কোনো না; ব্যাস নামটুক্
কইলেই হইবো –’ থুতনি থেকে তরুণীর হাত সরিয়ে নিয়ে বলল মুন্সী তিনকড়ি।
প্রথম
তরুণী বড় ব্যাঞ্জনাত্মক মুখভঙ্গিতে উত্তরে বলল, ‘ঐ রূপসী মাগীরে লোকে গঙ্গা কয়।’
গঙ্গা
নাম শোনা মাত্র মুন্সী তিনকড়ির মনে যেন এক সাফল্যের ঘন্টা বেজে উঠলো, ‘হ - হ, আর
কইতে হইব না - কইতে হইব না; সঠিক স্থানেই পৌসাইসি। ব্যাস রহস্য খোলসা করতে পারলেই
ভবানী বাবুর ধারে একটা বড় সত্য তুইল্লা ধরা যাইবো।’ নিজের মনেই যেন বলল সে।
বেলা বাড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করে মুন্সী তিন কড়ি আবার
একবার দরজার কড়া খট্ খটায়। এবার ভিতর থেকে যেন দরজা খুলে গেল। অনেক অপেক্ষার পর
অবশেষে সেই বাসনাও মিটল মুন্সী তিনকড়ির। দরজা হাট করে খুলে গেল।
শ্যামবর্ণা।
তিখি নাক। নাকে নথ না থাকায় নাকের ছিদ্রটা প্রায় বুঝে গিয়ে অস্পষ্ট হয়ে
গিয়েছে। কানের ছিদ্র দুটোও গহনা শূন্য। হরিণী চোখে মায়াবী দৃষ্টি। টাওয়ালে
জড়ানো ভিজে চুল খোঁপা করে মাথার উপর পিছন দিকে তুলে মোড়াতে মোড়াতে, পায়ের
নূপুরের ঝন্ ঝন্ শব্দে সামনে এসে দাঁড়ালো সদ্য স্নানশিক্তা গঙ্গা। পরনে সোনালী
জরির কাজ করা হাঁটু পর্যন্ত ভিজে শাড়ি উরুর সাথে লিপ্টে রয়েছে। প্রায় উন্মুক্ত
উন্নত শুভ্র স্তনের জেগে থাকা বাদামি স্তনাগ্রে ভরকরে শাড়ির একটা অংশ ভিজে সেঁটে
রয়েছে। গলায় সোনালী সরু চেন স্ফীত স্তনের সাথে ভিজে লেগে আছে। গালে, নাভিগর্ভে
এবং উন্মুক্ত স্তনের শুভ্রাংশে বিন্দু বিন্দু জলচ্ছটা শিশির কণার মতো উজ্জ্বল। এমন
তরতাজা রূপ ই তো মুন্সী তিনকড়ি পায়ের কাছ থেকে কুড়িয়ে, তুলে নিয়ে ছবিতে
দেখেছিল সেই দিন। দরজা খুলে হঠাৎ মুন্সি তিনকড়িকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অপ্রতিভ
স্বরে বললো, ‘কে গা তুমি! তো, তুমিই ঘন্টোভর দরজা পিটায় চলিছো, আর কোন খোলি
দেখনাই না কী?’
- ‘আমি যে তোমার লগেই দ্যাখ করতে আইসি।’
- ‘আমার সাথে? কী কাম?’
- ‘বড়ো পাও দুখাইতেয়াসে, ভিতরে আইয়া বসতে পারি!’
হাতের
ইশারায় ভেতরে গিয়ে বসবার অনুমতি দেয় গঙ্গা, ‘আসো বসো। আমি চেঞ্জ হয়ে আসি।’
- ‘ও! বেশ!’
খুশি
খুশি ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে মুন্সী। দুএকটা দামী আসবাবে সাজানো গুছানো সুন্দর
ছোট্ট একটি ঘর। একদিকে সিঙ্গেল পালঙ্কে মখমল বেড কভারে ঢাকা পালঙ্কের গদি, দুটি
তাকিয়া এবং দুটি পাশবালিশ; উল্টো দিকে দামী মখমল কভারে মোড়া দুটি চেয়ার রাখা
রয়েছে। ঘরের পূর্ব দিকে সুন্দর কারুকার্য করা ড্রেসিং টেবিলে সাজানো রয়েছে নানান
প্রসাধনী। বার্নিশ করা দেওয়ালে একদিকে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণর দীর্ঘ বাঁধানো ছবি
ঝুলছে, অন্য দিকে লম্বা বিশালকায় গঙ্গার অর্ধনগ্ন ছবি। উপর দিকে ছাদের ঠিক
মধ্যখানে ছোট্ট একটি ঝাড়বাতি ঝুলছে। ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে একটি চেয়ারে বসে
পড়ে তিন কড়ি। অপেক্ষায় কৌতুহল যেন বেড়েই চলেছে মুন্সি তিনকড়ির। কিছু সময়
পরেই এক ভিন্ন রূপে, ভিন্ন বেশে ফিরে এলো গঙ্গা। মাখন রং এর লালপেড়ে গরদের শাড়ি
পোরিহিতা, আঁচল কাঁধের উপর থেকে ঘুরিয়ে শরীর ঢাকা। কপালে শ্বেতচন্দন তিলক, হাতে
সুগন্ধি ধূপ। নিতম্ব পর্যন্ত খোলা ঘন কালো কেশ। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণর ফটোর সামনে
দাঁড়িয়ে ধূপ জ্বেলে, করজোড়ে প্রনাম নিবেদন করছে গঙ্গা। দেখে মনে হয় -এ যেন
সাক্ষাৎ দেবীর প্রতিরূপ। মুহূর্তের মধ্যে কেবল চেহারার বা পোশাকের ই নয়,
ব্যাবহারের ও আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করল মুন্সী। এই পরিত্যক্ত গলির আর দশটা মেয়ের
থেকে যেন ভিন্ন। ভবানী রাঠোরের মুন্সী তিনকড়ি মহাপাত্র নিজের পরিচয় দিতে, আঁচলের
খুঁট গলায় টেনে ঝুঁকে মুন্সী তিনকড়ি মহাপাত্রর চরণ স্পর্শ করলো। মুন্সী ও
স্নেহভরে গঙ্গার মাথায় হাত রাখলো, থুতনি স্পর্শ করলো, ‘ভালো থাকো। - সুখী হও’!
‘সুখ’ শব্দটি শুনে যেন গঙ্গা
বিদ্রূপাত্মক হাসি হাসলো।
গঙ্গার সাথে আলাপ করে মুন্সী জেনেছে
অশনি গঙ্গাকে ভালোবাসে। ভালোবাসে গঙ্গাও। উভয়ে একে অপরকে বিবাহও করতে চায়।
গঙ্গার মুখ থেকে শুনে আরও জেনেছে মুন্সী, এই নষ্ট পল্লীর বদনাম পাড়ায় অশনি পা
রাখবার আগে দূর দুরান্ত থেকে, শহর-শহরতলী থেকে কত যে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব এই
রূপবতীর উষ্ণ-স্ফীতদেহ রগড়ে, চটকে; কলকলায়িত গঙ্গার উচ্ছল যৌবনের ঢেউ এ স্নান
সেরে নিজেদের পাপ ধুয়ে গিয়েছে, তার হিসাব গঙ্গা নিজেও জানেনা। কিন্তু অশনি
তেমনটি করেনি। এই নষ্ট পল্লীতে এসে বসেও নিজের এবং পরিবারের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ
রেখেছে সে। অশনি গঙ্গাকে স্পর্শ পর্যন্ত করেনি কোন দিন। কেবল ই ভালোবেসেছে সে।
অশনির উপস্থিতির পর গঙ্গাকে স্পর্শ করবার স্পর্ধাও কাউকে দেখাতে দেয়নি পল্লীর
মৌসি। মুমাঙ্গি রকম দিয়ে অশনি তার ভালোবাসাকে বন্ধকী সম্পত্তির মতো এই পাড়ারই
মাসির হেফাজতে রেখে গিয়েছে।
মুন্সী তিনকড়ির মুখে ভবানী বাবু তাঁর একমাত্র সন্তান
অশনির এমন কর্মকাণ্ডর কথা শুনে, কয়েক মুহুর্ত
মুন্সীর চেহারার দিকে নিথর তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখ মুখ শরীরের
দিকে তাকিয়ে মনে হল যেন বিদ্যুত এর নগ্ন তার তাঁর শরীরকে স্পর্শ করে রয়েছে।
মুন্সীর সাথে কখনই হিন্দিতে কথা বলেননি ভবানী। অথচ আজ কি হয়েছে, ‘মুন্সীজী, কই
ঝুঠা খোয়াব দেখে হোঙগে, অওর ওহ্ কাহানি তো নহী শুনা রহে হ্যায় মুঝে?’ সমস্ত কথা
শুনবার পর, উদাসীন চেহারার আনমনা স্বরে ভবানীর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো কথা গুলি।
-- ‘নাই,
মালিক! আপনার সেবা যতন করতে করতে জওয়ান থিকা বুড়া হইয়া গেলাম আমি। আর আজ কিনা
আমি... না মালিক না, আমি আপন কানে শুইন্যা, এই দুই চক্ষুদিয়া দেইখ্যা, সব জাইন্যা
শুইন্যাই সকলডা আপনারে কৈতেয়াসি মালিক।’ নিজের সাফাই দিল যেন তিনকড়ি।
ভবানী মুন্সীকে সতর্ক করে বললেন, ‘শুনিয়ে
মুন্সীজী, ই বাতকো আপ আপনা সীনেমে দফ্না দিজিয়ে, কিসিকো কানো কান খবর ন চলে।
সমঝে?’
—
‘এ আপনি কি কৈতেয়াসেন মালিক, আজ নাইতো কাল পুরা মহল্লা জানবো, এই খবর কোনো কালের
চাপা থাকনের! আর মালকিন? মালকিন রে কি কৈয়া বুঝাইবেন –’
— ‘ইয়ে
হরগিজ নহী হো সকতি। খোকা নে হামীনকর সাথ বিশ্বোয়াসঘাৎ কিয়া, অউর আপ ইহা খামোশ
বৈঠে বৈঠে শুন রহে হ্যায়? ইতনা বড়া বাতকো আপ ছুপানা চহতে হ্যায়?’ মুন্সী
তিনকড়ির কথা শেষ না হতেই, পর্দার আড়েলে দাঁড়িয়ে আশনির কর্মকান্ডে র কথা শুনে
থাকতে না পেরে প্রকাশ্যে এসে ফুঁসে উঠলো অজন্তা দেবী।
মুন্সী তিনকড়ি আর ভবানী হঠাৎ এরকম
অফিসে অজন্তার আগমনে আশ্চর্য হয়ে অজন্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— ‘আঃ
হাঃ!’ স্ত্রী অজন্তা দেবীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে উপস্থিত পরিস্থিতি সামাল দিতে
ভবানী বাবু উঠে এসে বলল, ‘আঃ হাঃ, ঊ বাত নইখে রানী, আপ অন্দর যাইয়ে।’
– ‘কিউ, ম্যায় অন্দর কিউ যাউ! ম্যায়
অন্দর চলি যাউ, তাকি আপ ফির সে এক গলত ফয়সলা কর বৈঠে; অউর খোকা নে খানদানকে
মুহ্পে কালি পোতকর এক গন্ধি নলিকে কিড়ে কো ঘর উঠা লায়!’
–
‘ওহ্, রানী! এই সী কৈ বাত হী নহী, আপ শান্ত হো যাইয়ে ন।’
– ‘মালকিন তো ঠিকই কৈতেয়াসেন মালিক।’
দীর্ঘকাল যাবত এই পরিবারে থেকেছে মুন্সী। অনি পুত্তুরকে শিশু কাল থেকে বড় করেছে
সে। ঘরোয়া সদস্যের মতো মতামত ব্যক্ত করবার অধিকার তো তার ও রয়েছে। তাই সে অধিকার
জাতিয়েই অজন্তা দেবীর সাথ দিতে নিজের মনোভাবটা প্রকাশ করে ফেলল মুন্সী তিনকড়ি।
ভবানী
বাবু পরিস্থিতি বিগড়াতে দেখে কোন নির্ণয় নেবার সময় চেয়ে নিয়ে বললেন, ‘ঠিক
হ্যায়। পর জওয়ান লইকা কে সাথ লড়াই ঝগড়া করনা আচ্ছা বাত নহী হোগা। উস পর কৈ
বাত কা দাবাও ডালনে সে বাত বিগড় সকতি হ্যায়। উসে ঘরপর আনে দো, সমঝা বুঝাকর সারে
বাত জান লেতে হ্যায়। ফির সে কৈ ফয়সলা করেংগে। ঠিক হ্যায় নু! অনি কে মম্মি, অব
আপ অন্দর যাইয়ে’
ভবানী বাবুর কথা শেষ হতে না হতে
অজন্তা দেবী উত্তেজিত স্বরে বলল, ‘কান খোল কর শুন লিজিয়ে, ম্যায় কিসি ভী কিমত পর
এক রেন্ডীকো রাঠোর পরিবারকা বহু হরগিজ স্বীউকার নহী করুংগি, ই বাত সমঝা দেনা আপনে
লাডলে কো। হুঁম্!’
– ‘মালকিন
তো নিজের অটল সিদ্ধান্ত শুনাইয়া গেল গিয়া মালিক। অখন?’ কৌতুহলি স্বরে ভবানী
বাবুর দিকে তাকিয়ে রইল মুন্সী।
দু’দিন
পর অশনিকে নিজের চেম্বারে ডেকে নিয়ে বন্ধ দরজার ভেতর অশনির কাছে সমস্থ সত্যতা
প্রচ্ছন্ন ভাবে জানতে চাইলেন ভবানী বাবু। অশনির মনে প্রথমে ভয় এবং সঙ্কোচ থাকলেও,
যখন সবকিছু ভবানী বাবুর কান পর্যন্ত পৌঁছেই গিয়েছে; এমন ভেবে অশনি মনে করল, তখন
সত্যতা প্রকাশে আর বাঁধা কোথায়! মনে মনে অদম্য সাহস যুগিয়ে শ্রী গনেশকে স্মরণ
করে, অশনির জীবনে গঙ্গা বিনা সমাজ সংসার এর সমস্ত কিছুই যে নিরর্থক, তারকাছে
মূল্যহীন; তা ভবানী বাবুকে প্রচ্ছন্ন ভাবে বুঝিয়ে দিলো। ভবানী বাবুর সামনে দুটি
পথ তুলে ধরলো অশনি। এক : যদি ভাবনীবাবু গঙ্গাকে অশনির স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ না করেন
, তবে অশনি পরিবার, স্বজন, ধন-দৌলত সমস্থ কিছু ত্যাগ করে; পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন
হয়ে গঙ্গাকে সাথে করে নিয়ে সকলের অলক্ষে চলে যাবে। ভবানী বাবুর জন্য রেখে যাবে
জ্ঞাতি-স্বজন, সমাজের গঞ্জনা। যেখানেই ভবানী যাবেন, সেখানেই সমস্ত জীবন তাঁকে শুনতে
হবে – ‘এত বড় পরিবারের, এমন প্রভাবশালী উদ্যোগ পতির একমাত্র সন্তান কিনা এক
বেশ্যাকে নিয়ে পালিয়েছে? ছিঃ... ছি ছি।’
-- ‘আরে বড় বড় পরিবারে এই সবই ই তো হয়, সামনে না এলে কি আর আমরা জানতে পারি ...
’
মানসম্মানের সাথে সাথে ব্যবসার উপরও যে অশুভ প্রভাব পড়বে না, তার কি নিশ্চয়তা
আছে? দ্বিতীয়ত : যদি গঙ্গাকে অশনির স্ত্রী হিসাবে মেনেও নেন ভবানী রাঠোর, তবুও তো
স্বজন সমাজকে বলতে শোনা যাবে, ‘দিন-কাল যা পড়েছে, আজকালকার জেনারেশনের ভবিষ্যৎ যে
কোথায় গিয়ে থামবে কেউ জানে না। তা ভাবনীবাবুই বা কি করতেন, সন্তানের মুখের দিকে
চেয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন!...’
তবে দ্বিতীয় কলঙ্কর যন্ত্রণা সমাজের
দৈনন্দিনতা র সাথে সাথে বিলিন হয়ে যাবে একদিন।
পরিস্থিতির সামনে যেন
কিংকর্তব্য-বিমূঢ় ভবানী রাঠোরকে নানান চিন্তা ভাবনায় অস্থির করে তুললো। রাতের পর
রাত ঘুম কেড়ে নিলো। তার একমাত্র সন্তানের এমন অসামাজিক সিদ্ধান্তের চরম আঘাতে,
ভিতরে ভিতরে চুর-চুর হয়ে গেলেও অজন্তা দেবীর কথা ভেবে প্রকাশ্যে কাউকে বুঝতে দিতে
চাইলেন না ভবানী। কিন্তু চঞ্চল সদা হাসিমুখ মানুষটাকে শান্ত নিস্পন্দিত নীরব হয়ে
যেতে দেখে, মুন্সী তিনকড়ি’কে চিন্তায় ভাবিয়ে তুললো। সহানুভূতি জড়ানো উদাস
স্বরে বলল তিনকড়ি, ‘শরীরের দিকে খেয়াল রাখ্যেন। এই রকম কৈরা ভাইঙা পড়লে, রাতের
পর রাত না ঘুমাইয়া চিন্তায় ডুইব্বা থাকলে আপনি অসুস্থ হইয়া পড়বেন মালিক। চিন্তা
কইরেন না, মেলা চিন্তা কইরা কি হইব? সময়ের লগে লগে সব ঠিক হইয়া যাইব...’
তিনকড়ির
কথা যেন শুনতেই পেল না ভবানী বাবু, অন্য মনস্ক বড় অসহায় স্বরে বললেন, মুন্সিজী, ‘ভাবছি
বিয়ের তারিখটা পাকা করেই ফেলি।’
— ‘এ কী কৈতেয়াসেন মালিক!’ হঠাৎ তার মালিকের এইরকম সিদ্ধান্তে মুন্সীর মাথায় যেন
আকাশ ভেঙ্গে পড়ল- ‘শেষ পর্যন্ত বেশ্যা মাগীর লগে বিয়া’, মনেই মনে ভেবে বলল, ‘কিন্তু
মালিক, মালকিন যে –’
— ‘মালকিনকে বুঝিয়ে নেওয়া যাবে।’
স্বাভাবিক ভাবেই বললেন ভবানী।
তিনকড়ি আবারও বলল, ‘আমার মনে হয় না
মালকিন এই বিয়া মাইন্না লইবো বইল্লা! আর তা ছাড়া বন্ধু-বান্ধব, স্বজন-সমাজেরে কি
কইবেন, আপনার সম্মান ক্ষুণ্ন হইব না! তারা কি মন থিকা অনি পুত্তুরের বরাবর সম্মান
স্নেহ-যতন ঐ মাইয়াটারে করতে চাইব মালিক?’
— ‘চাইবে।
চাইবে মুন্সী জী, চাইবে। বর্তমান এই সমাজটা যে বড় অজীব। অদ্ভূত। আচ্ছা মুন্সী জী,
অপনি কি কখনো পথের ধারে পড়ে থাকা, পাথরের নুড়ীর কাহানি শুনেছেন?’ মুন্সীর
প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করলেন ভবানী।
তিনকড়ি
কৌতুহলিত মনে ভবানীর মনোভাব অনুভব করবার প্রয়াশ করল, ‘নুড়ীর গল্প! না, শুনি নাই
তো মালিক।’
ভবানী রাঠোর গল্পের ছলে তাঁর মুন্সী
তিনকড়ি কে অনায়াসে ব্যাখ্যা করে শোনালেন, পথের ধারে পড়ে থাকা এক পরিত্যক্ত
পাথরের টুকরোর সেই আত্মকথা । প্রতি দিন আসতে যেতে পথের ধারে অনেক ছড়িয়ে ছিটিয়ে
থাকা পাথরের ভেতরে, একটা সুন্দর পাথরের নুড়িকে প্রতিদিনই লক্ষ্য করতেন ভবানী
রাঠোর। প্রতিনিয়ত ঐ নুড়িটার দিকেই নজর থাকত তাঁর। লক্ষ্য করতেন- পথ চলতে খেয়ালে
বেখেয়ালে পথচারি কেউ পান চিবিয়ে পিক্ ছুড়লো, গিয়ে পড়লো নুড়িটার ওপর। কেউ বা
পথ চলতে থুথু ফেলল, গিয়ে পড়লো নুড়িটার ওপর। কেউ বা বেখায়েলে পাথরটাকে লাথি
মেরে চলে গেল। নিরিহ বেজান পাথরটা গড়িয়ে গড়িয়ে কিছুটা আগে গিয়ে, থেমে থাকল।
কত না পথের আওয়ারা সারমেয় ডান ঠ্যাং উঁচিয়ে পাথরের ঐ নুড়িটার উপরই প্রসাব সেরে
দৌড়ে পালিয়ে যায়। দিনে দিনে নুড়িটার চেহারাই পাল্টে গেল। নোংরায় ঢেকে গেল
নুড়িটি। ভবানীর মনে হলো, অত সুন্দর পাথরটার শেষে কিনা এরকম পরিণতি? ভবানী রাঠোর এ’রকমই
ভেবে একদিন গাড়ি থামিয়ে, গাড়ি থেকে নেমে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে পকেট থেকে রুমাল
বার করে, নির্জন পথের সেই নোংরা নুড়ি পাথরটা কে তুলে রুমালে বেঁধে, সাথে করে
নিয়ে গেলেন। তাঁরই অনুগত এক কর্মীকে ঐ পাথরের নুড়িটিকে পরিস্কার করে লাল রঙের
একটা টিপ পরিয়ে দিতে আদেশ করলেন।
সেই
রকমই একদিন নির্জন পথ দেখে, গোড়া বাঁধানো এক বট বৃক্ষের নিচে তিলক লাগানো ঐ
পরিস্কার পাথরের নুড়িটিকে সযত্নে রেখে, কিছু দিন ঐ পথে যাবার সময় হাত জোড় করে
প্রণাম করতেন ভবানী। সাহেবের এরকম অদ্ভুত আচরন দেখে তাঁর ড্রাইভারও কম আশ্চর্য
হয়নি। ভবানী বাবুকে গাড়ি থেকে নেমে প্রতিনিয়ত এরকম এক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে
ভক্তিভরে প্রণাম করতে দেখে, গুটি গুটি পায়ে বেশ কয়েক জন একাট্টা হয়ে গেল একদিন;
ভবানী তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনারা কেউ লক্ষ করেছেন, এই পবিত্র বট বৃক্ষের নীচে
বাবা মহাদেব যেন স্বয়ং জাগ্রত হয়েছেন।’
ধীরে
ধীরে লক্ষ করা গেল, সেই থেকে প্রতিদিন মানুষ সেখানে কেউ ফুল বেলপাতা, কেউ বা
ফল-ফুল প্রসাদ চড়িয়ে পূজো করে চলেছে। একদিন এ ও লক্ষ করা গেল, কোন ভক্ত সাধক ঐ
পাথরের নুড়ি টির পাশে একটা ত্রিশুল পুতে দিয়ে গিয়েছে। সেখানে মানুষ ফুল অর্পণ
করে, সিঁদুর চড়িয়ে মনোকামনার ধাঁগা বেঁধে চলেছে।
গল্পের ছলে ভবানী রাঠোর সামাজিক
জীবনের এক চরম বাস্তব অনুভূতির ব্যাখ্যান করে তাঁর মুন্সী তিনকড়ি কে বুঝাতে
চাইলেন, ‘মনুষ্য জীব কেবল বহিঃসুদর্শন প্রিয় মুন্সী জী। অন্তঃকঙ্কালে তার কোন
মতলব নেই।’ মুন্সী তিনকড়ি অবাক হয়ে তার মালিকে র দিকে তাকিয়ে রইলো। বুকে অসীম
যন্ত্রণা চেপে রেখে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি মাখিয়ে আবারও বললেন ভবানী, ‘মুন্সীজী,
আমার পুত্তুর তো মহানতার পরিচয় দিয়েছে। এক পরিত্যক্তা কে তার পরিপূর্ণ রূপ দিতে
চেয়েছে। তাকে তার অধিকার দিতে চেয়েছে। এক স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চেয়েছে মুন্সী
জী। যখন অনি পুত্তূরের সাথে সে কোথাও বের হবে অথবা গাড়ি থেকে নেমে অনি পুত্তুরের
পাশে দাঁড়াবে, তখন মানুষ সব কিছু ভুলে অনি পুত্তুরের মতো তাকে ও সম মর্যাদা দেবে
মুন্সী জী। বাকি আপনার মালকিন? মুন্সী জী, একজন ক্রোধিত নারীর ক্রোধকে শান্ত করতে
দুটো জিনিসেরই প্রয়োজন, এক : তার নারীত্ব- স্ত্রীত্ব অনুভব করানো। দুই : তার মনে
শিশু সন্তানের মোহ-মমতা মাতৃত্বের অনুভবকে জাগিয়ে তোলা। ধীরে ধীরে তার ক্রোধ ও
শীথিল হয়ে যাবে মুন্সী জী। আপনি বরং ব্রাহ্মন মহাল্লা গিয়ে রাজেন বাড়ুজ্যে
পুরহিত মশাইকে পাঁজী নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে বলে আসুন।
মা অজন্তা দেবীর ঘোর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও, তার ইচ্ছার
বিরুদ্ধে একমোটা টাকার রকম দহেজ হিসাবে দান করে, মধ্য কোলকাতার হাড়কাটা গলির
নিষিদ্ধ পল্লীর এক ঘিঞ্জি গলি থেকে গঙ্গা’কে বিবাহ করে ঘরে নিয়ে এলো, ভবানী
রাঠোরের একমাত্র সন্তান অশনি রাঠোর।
নিয়তির পাশা চালে বছর ঘুরতে না
ঘুরতে, অন্তর দংশনে ভবানী বাবু অসুস্থ হয়ে পড়েন। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে, একদিন
অজন্তা দেবী’র শাঁখা- সিঁদুর কেড়ে নিয়ে সাদা থান পরিয়ে চলে গেলেন ভবানী রাঠোর।
অজন্তা দেবী তার স্বামীর মৃত্যুর জন্য ‘মনহুষ-অপয়া’ বলে গঙ্গাকে ই দোষারোপ করতে
লাগল। গঙ্গা মানাতে চাইলেও পুরানো খেয়ালের নারী অজন্তা দেবী কোন অবস্থাতেই বহু
হিসেবে মানতে চাইলো না গঙ্গা’ কে।
- ‘মনহুষ, কালমুহী, কুলটি ঘরমে আতে ন
আতে হী মেরি সুহাগকো নিঘল গয়ী? মুঝে তেরা ইয়ে মনহুষ সক্ল তক নহী দেখনা।’
দিনের পর দিন, প্রতিদিন অশান্তি
বাড়তে থাকল । অশান্তিতে জর্জরিত হয়ে অশনি ও নিজের বিচার বুদ্ধি হারিয়ে ফেলল।
একদিন ঘরে ফিরে গঙ্গাকে কাঁদতে দেখে চিৎকার করে উঠল অশনি, ‘মম্মি, ইধর আইয়ে। যব
আপ মেরি পত্নি কো বরদাস্ত হী নহী কর সকতি, উসকী সক্ল দিখনা নহী চহতি, ইতনা দিন বীত
গয়া- তো ভী গঙ্গাকো যব আপ আপনি বহু মান হী নহী সকতি- তো ইস ঘরমে আপ কী ক্য়্যা
কাম? চলি যাইয়ে ন ইস ঘর ছোড় কর...’
গঙ্গা অশনির কথার প্রতিবাদ করে রুদিত
স্বরে আতঙ্কে চেচিয়ে উঠলো, ‘না! এ’ আপনি কি বলছেন? মা তো! মা আমাকে বলতেই পারেন,
আমাদের মাঝে আপনি কেন আসছেন–’
অজন্তা
গঙ্গার চেহারার দিকে হাতেলি উচিয়ে বলল, ‘বাস্ বহত হুয়া। অব্ হমদর্দী যতানে কা
কৈ দরকার নহী। মেরা লাদলা উসকি মা কা দুধ কা প্রতিদান দিয়া হ্যায়। ঠিক হী তো কহা
হ্যায়, মেরা পতিয়ে নহী রহা তো ইস ঘরমে মেরা ক্য়্যা কাম? সুবা হতে হী ম্যায় চলি
জাউঙ্গী...’
সারাটা রাত ঘুমাতে পারেনি অজন্তা
দেবী। আদরের খোকার ধিক্কার যেন প্রতিধ্বনীত হতে থেকেছে তাঁর সমস্ত ধমনীতে। দুই
কানে হাত চেপে ধরে চোখ বন্ধ করতেই, চোখের সামনে ভীড় করেছে, কিভাবে নিজের বুকে
জড়িয়ে ছোট বয়স থেকে বড় করে তুলেছে খোকা কে। বন্ধ চোখের সামনে ভেসে ওঠেছে-
কিভাবে হামাগুড়ি দিয়ে এসে বসে, কেমন করে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাত তুলে হেসে
দাঁড়িয়ে দুপা এগিয়ে পড়ে গেল। অজন্তা ছুটে গিয়ে কোলে তুলে নিলো। আর তখনই সারা
ঘরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে- ‘ইস ঘরমে আপ কী ক্য়্যা কাম... ক্য়্যা কাম... ক্য়্যা
কাম? চলি যাইয়ে ইস ঘর ছোড় কর... চলি যাইয়ে ইস ঘর ছোড় কর ...ইস ঘর ছোড় কর...ইস
ঘর ছোড় কর...’
যেমন
কথা তেমনি কাজ। স্বামী হারাবার শোক, সন্তানের অবমানোনা, অবহেলার স্মৃতি আর একরাশ
যন্ত্রণার পাহাড় বুকে বয়ে, সূর্যদয়ের আগেই কখন যে নিজের মহল ত্যাগ করে; এক চরম
দুর্গতির নিয়তি সাথে করে, অজন্তা দেবী মহল থেকে বেরিয়ে গিয়েছে তা কেউ ই জানে
না। ভবানী বাবুর মৃত্যুর পর মালকিন কে নিয়ে বড় চিন্তা ছিলো মুন্সী তিনকড়ি
মহাপাত্রর। অজন্তা দেবী চলে যাবার পর, একদিন তিনকড়ি ও দীর্ঘ দিনের চাকুরি ছেড়ে
চলে গিয়েছে।
অজন্তা
দেবী চলে যাবার পর বেশ কিছুদিন যাবৎ বিভিন্ন সমালোচনার জালে জড়িয়ে পড়লেও, অশনির
আর্থিক সংগতি এবং ক্ষমতার দম্ভর সামনে মাথা তুলতে পারেনি কেউ ই। নিজের লোকসানের
আশঙ্কায় মুখ খোলেনি কেউই, কোনদিন। দেখতে দেখতে সাত টা বছর কেটে গিয়েছে।
ব্যাবসায় বেশ পরিপক্ক হয়ে উঠেছে অশনি। ভবানী রাঠোরের উত্তরাধিকার হিসাবে তার
সন্মানের ঘাটতি হয়নি এতটুকু। শিকড়ের মত ছড়িয়ে থাকা কারোবার সামলে নিয়েছে
অশনি। আগলে রেখেছে নিজেই। স্ত্রী গঙ্গা আর শিশু পুত্র দুর্গেশকে নিয়ে
স্বচ্ছন্দ্যে শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করছে সে। কখনই মায়ের অভাব অনুভব করেনি অশনি।
তার কড়িচাচার কথা ও মনে পড়েনি কখনো ও। কিন্তু আজ এত বছর পর তার শিশু পুত্র
দুর্গেশের জন্ম দিনের পার্টিতে এসে, তারই অনুগত এক মামুলী কর্মচারী তার সমস্ত
দম্ভকে চুর চুর করে দিয়েছে। স্নায়ু তে ঝড় তুলে দিয়ে তাকে দীন-দরিদ্র প্রমান
করতে চেয়েছে।
পার্টির শেষ লগ্নে ঘরোয়া কিছু মানুষ জনের সাথে খেয়ে নিয়ে,
গৌতম আর প্রশান্ত লাস্ট ট্রেনটা ধরবার তাড়ায় বেরিয়ে পড়েছে। নিমন্ত্রিত অতিথির
সকলেই চলে গিয়েছে। ক্যাটারারের ছেলেরা, ইলেকট্রিক মিস্ত্রী রা এবং এঁটো কুড়াবার
দু-চারজন কর্মী তাদের নিজেদের জিনিসপত্র গুলো গুছিয়ে নেবার যোগাড়ে ব্যস্ত। নিত্য
গৃহকর্মীরাও যে যার জাগায় ডিউটি ধরে নিয়েছে। কয়েক মুহুর্ত আগে ও যেখানে মানুষের
ঢল ছিল, মানুষের আনাগোনায় কোলাহল শোর-গোলের মাঝে পুরো মানুষের ভিড়ে ভরে উঠেছিলো।
পুরো এলাকা জুড়ে চাঁদের হাট বসেছিল; যেখানে অসংখ্য মানুষ এক খুশীর আনন্দে মেতে
উঠেছিল, সেই বিশাল প্রাসাদ তুল্য বাড়িটা মুহুর্তে যেন জনশূন্য শান্ত নিথর
নিস্তব্ধতায় থুবড়ে পড়েছে।
গ্রাউন্ড
থেকে টপ্ ফ্লোর পর্যন্ত সমস্ত জায়গায় ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে গঙ্গা।
কিন্তু অশনিকে কোথাও দেখতে পেল না সে। ফোন করলে অশনির ফোনে কম্পুটারাইজড ভয়েসে নো
রেসপন্স এর কথা শুনিয়ে চলেছে। সব যায়গায় গুরে থার্ড ফ্লোরে যখন অশনির পার্সোনল
চেম্বারের পাশ থেকে ফিরছে, তখন এক দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগের অনুভুতিতে দরজার পাশে
দাঁড়িয়ে পড়ল গঙ্গা। ছেলের জন্মদিনের উৎসব মুখর পরিবেশ ছেড়ে, সকলের অগোচরে কখন
যে অশনি তার পার্সোনল চেম্বারে এসে, চেম্বার অন্ধকার করে বসে রয়েছে, কেউ ই
জানেনা। যার অধীনে গৌতম প্রশান্তর মতো শতাধিক কর্মী তার শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ
করে চলেছে, তাঁকে ই কিনা আজ শহরের প্রভাবশালী বিশিষ্ট জনেদের উপস্থিতির মাঝে; তারই
অনুগত এক মামুলি কর্মচারীর কাছে অপমান কেবল নয়, তার বলা কথা গুলো, অশনির
অন্তরাত্মাকে কেঁপিয়ে তুলেছে। তোলপাড় করে দিয়েছে। স্নায়ুতে ঝড় তুলে দিয়ে
গেছে। সমস্থ শিরা উপশিরা ধমনিতে আশ্চর্য এক হাল-চাল মাতিয়ে তুলেছে। নিজের সাথে
নিজেই অন্তঃবাক্ যুদ্ধ করে চলেছে অশনি।
কি
প্রয়োজন ছিল গৌতমের মনে ঠেস পৌঁছানোর ? অশনি কি তার নিজের স্ট্যানডার্ড ভুলে
গিয়েছিলো যে, সামান্য দু’পয়সার ছেলেটাকে নিজের পরিবেশের সাথে মিলাতে চেয়েছিলো!
বেশতো টী স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে চায়ের সাথে পকোড়া খাচ্ছিল গৌতম। খারাপ তো তখন
লেগেছে যখন গৌতম পকেট থেকে সাফির মতো একটা ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো বার করে, নিজের
মুখ পরিষ্কার করছিল আর সেটা অদূরে অশনির এক ব্যবসায়ী বন্ধু ঈশারা করে দেখিয়ে তার
দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছিলো। কি দরকার ছিল নিজের সামনে ডেকে এনে গৌতমের কাঁধে হাত
রেখে ড্রিঙ্কে চুমুক দিতে দিতে অনায়াসে বলবার, ‘তুমি একটা এ্যারিস্টোক্র্যাট
পার্টি এটেন্ড করতে এসেছো গৌতম। সবস্টলে ই যাবে, কোন মানা নেই। ঘুরে ফিরে যা মন
চায় খাও, কেউ মানা করবার নেই। সব স্টলেই টিসু পেপার রাখা থাকে সেগুলি ব্যবহার কর।
তা না হলে পকেটে অন্ততঃ একটা ভালো রুমাল রাখতে পোরো তো; তা নয় তুমি কোথার না
কোথাকার সামান্য একটা নোংরা ছেঁড়া সাফি কাপড় বারকরে ব্যবহার করছো। সবাই তোমার
দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে গৌতম। সবাই কি ভাবছে বলতো ! রাঠোর এন্ড সন্স এর একজন
স্টাফ্ তুমি, সেটা ভুলে গিয়েছ?’
কাপড়ের
টুকরোটা মুঠির ভেতর শক্ত করে চেপে ধরল গৌতম। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল গৌতমের। অশনির
বলা এক একটা শব্দ থেকে গৌতমের মনে ক্রোধ জমে উঠতে লাগলো। রক্ত প্রবাহের তীব্রতা
যেন মুহুর্তেই শরীরের সমস্ত ধমনীতে ছড়িয়ে পড়ে ক্রোধ পুঞ্জিভুত হলো। কাঁধের উপর
রাখা অশনির হাতটা, বা হাতের মুঠিতে শক্ত করে চেঁপে ধরে সরিয়ে, মুহুর্তের জন্য
অশনির দিকে রক্তাভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নজর সরিয়ে নিলো গৌতম। যেন চোখ থেকে ঝরে
বেরিয়ে আসতে চাইছে রক্তচ্ছটা। ক্রোধিত গৌতমের মুখ থেকে ধিক্কার জড়ানো অগ্নিবাক্য
বেরিয়ে পড়লো, ‘স্যার, আপনার যায়গায় যদি অন্য কেউ এই কথা গুলো বলে, এই মুহুর্তে
আমার সামনে দাঁড়িয়ে হতো —’
— ‘মানে?’
— ‘ছোট
মুখে - বড় কথা, আপনি বুঝবেন না স্যার। আর বুঝবেন বা ও বা কি করে, আপনার যে মা
থেকে ও নেই! আপনি তাঁরই বাড়ীতে থেকে তাড়িয়ে ভিটে ছাড়া করে দিয়েছেন মা’কে। তাই
মায়ের অভাব, মায়ের ত্যাগ, মায়ের মমতার কথা আপনি বুঝবেন কোথ্থেকে স্যার?’
অপমানে
যেন ফেটে পড়ল অশনি। চিৎকার করে উঠে বলল, ‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’
— ‘নো
মিন স্যার। আপনার তো মা থাকতে ও, মা নেই আর আমার মা কে যে হারিয়েছি; অথচ দেখুন
আপনার কথায়, এই ‘ সাধারণ নোংরা ছেড়া সাফি কাপড়ের টুকরো’টা হয়ে, আমার মা সব
সময় আমার পাশে আমার সাথে থাকছে। এই কাপড়টায় আমি আমার মায়ের স্পর্শ পাই। মায়ের
শরীরের গন্ধ পাই। এটা যখন আমার চেহারায় ছুঁয়াই, আমার সমস্ত দুঃখ যন্ত্রণা আমি
ভুলে যাই স্যার। আমার সমস্ত ক্লান্তি দুর হয়ে যায় স্যার। মনে হয় ছোটবেলার মত,
আজো মা আঁচল দিয়ে আমার মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে। আমায় স্নেহাদর করছে। আপনি এতো কিছু
বুঝবেন না স্যার। বুঝবার ক্ষমতা আপনি হারিয়ে ফেলেছেন স্যার। তবে এটুকু জানুন, এটা
কোন মামুলি নোংরা সাফি কাপড়ের টুকরো না, এটা আমার মায়ের এক টুকরো আঁচল – স্মৃতির
আঁচল এটা। মায়ের আশীর্বাদ হয়ে সবসময় আমার সঙ্গে থাকে স্যার।’
বজ্রকণ্ঠে কথাগুলি বলে আঁচলের টুকরোটা ভাঁজ করতে করতে এগিয়ে গেল গৌতম। প্রশান্ত ও
শঙ্কাকুল হয়ে পিছু ধরলো গৌতমের। পার্টির শুরুতেই যে ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল গৌতম,
মালিকের অ্যাটিচুড দ্যাখে মোটেও ভালো বলে মনে হয়নি প্রশান্তর, আসন্ন কোন
বড়োরকমের অমঙ্গল ধেয়ে আসছে গৌতমের দিকে, আশঙ্কায় প্রশান্ত বোঝাতে চেয়ে বলল, ‘যাই
বল না কেন, অমন করে কিন্তু বলাটা ঠিক হয়নি তোর।’
- ‘কেন?’
- ‘আফ্টার অল্ আমাদের মালিক- ওঁনার বদৌলত কত গুলো পরিবারের
চুলো জ্বলছে বলতো!’ ... গৌতম কে নিয়ে প্রশান্ত সিঁড়ি চড়ে উপর বেলকনির দিকে
এগিয়ে গেল। ধীরে ধীরে কথোপকথন মন্থর হতে হতে অশনির দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল
প্রশান্ত এবং গৌতম।
মায়ের
অপমান যে গৌতম কোন ভাবেই কোন অবস্থাতেই বরদাস্ত করে না, কেবল তার মালিক বলে যে এ’
যাত্রা পার পেয়ে গিয়েছে; গৌতমের কঠিন রক্তাভ চেহারা আর ক্রোধাগ্নিত আচরণে বুঝে
নিতে ভুল হয় নি অশনির। আজ হঠাৎ গৌতমের মুখে এরকম গুছানো এত সুন্দর ভাষা কি করে
ফুটলো! এমন ধৃষ্টতা, এত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করবার সাহস ওর কোথা থেকে এলো; যার আগে
অশনি কোন কথাই বলতে পারেনি? এমন অপ্রত্যাশিত অসম্ভাব্য আচরণে আচম্বিত অশনি নীরব
হতবাক্ হয়ে কেবল গৌতমের চলে যাবার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। মনে হয়েছে পায়ের নিচে
মাটি সরে গিয়েছে অশনির। শরীরের ওজন হালকা হয়ে প্রাণটাই যেন বেরিয়ে যেতে চাইছে।
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চেহারা গুলি ঝাপসা হয়ে আসছে। অশনির সাথে
গৌতমের আচমকা এমন আচরণে, উপস্থিত অতিথিরা ও তো বিস্মিত হয়ে বাকরুদ্ধ তাকিয়ে
দেখছিল। গৌতম সরে যেতেই অশনির পাশে গিয়ে, পিঠ চাপড়ে গম্ভীর কন্ঠে কেবল ‘রিল্যাক্স!’
‘রিল্যাক্স ডিয়ার!’, বলে তাঁরা সকলে ই সরে গিয়েছিল।
গভীর
রাতের শান্ত নিথর পরিবেশে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে গঙ্গা শব্দটা অনুভব করার চেষ্টা
করলো। গঙ্গা জানে- মন অশান্ত হলে, কোন বিপদ অনুভব করলে অথবা কোন গভীর সিদ্ধান্ত
নিতে হলে তার পার্সোনল চেম্বারে, দীর্ঘক্ষণ শান্ত ভাবে কাটিয়ে দেয় অশনি। আজও
অশনি নিজের পার্সোনল চেম্বারে অন্ধকারে বসে। আজ যেন তার কাছে এই পার্সোনাল
চেম্বারটা ক্রোধাগার হয়ে উঠেছে। তবে গঙ্গার মাথায় আসছে না উৎসবের মাঝে কী এমন
ঘটতে পারে তাঁকে পার্সোনাল চেম্বার এসে বসতে হবে? কোথাও তার অলক্ষে কোন অঘটন তো
ঘটেনি! কোন উদ্যোগ পতির সাথে কোন বিবাদ! কোন টেন্ডার ঝামেলা! মুহূর্তেই নানান কথা
ভাবতে ভাবতে, বন্ধ দরজায় হাত লাগাতেই দরজার কপাট খুলে গেল। ভেতরটা নিঃশ্ছিদ্র
অন্ধকার। ভেতরে পা রেখে ডান দিকের দেওয়ালের দিকে হাত বাড়াতেই, সুইচ বোর্ডে চাপ
লেগে নীল লাইটটা জ্বলে গিয়ে, ছোট্ট ঘরটায় স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দিলো।
- ‘তুমি এখানে বসে! উদভ্ৰান্তর মত
কোথায় কোথায় না তোমাকে খুঁজেছি। তোমার সেল কোথায়, নো রেসপন্স পাচ্ছি!’ কৌতূহলী
প্রশ্ন করল গঙ্গা।
-
‘মা আ~ !’ দীর্ঘ নিঃস্বাসের সাথে অশনির মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো।
-
‘মা! কি হয়েছে মায়ের? কী হয়েছে, কিছু খুলে বলবে!’ আশ্চর্যাম্বিত স্বর গঙ্গার।
শিক্ত
স্বরে অশনি বলল, ‘তুমি সমস্ত ড্রাইভারকে এখনি বলে দাও গঙ্গা, সমস্ত কোলকাতা
তোলপাড় করে, ঘুরে ঘুরে, যেখান থেকে পারে আমার মাকে খুঁজে বার করে, ঘরে ফিরিয়ে
আনবে। তার আগে যেন কেউ না ফেরে--’
অশনির
কথা শেষ না হতেই গঙ্গা অশনির একেবারেই কাছে গিয়ে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘তুমি
কাঁদছো! আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না গো। কি হয়েছে, আমাক খুলে বলনা গো। তোমাকে এর
আগে তো কখনো এভাবে দেখিনি। কী হয়েছে আমাকে খুলে বলো না গো প্লিজ!’ গঙ্গার তর্জনী
মধ্যমা এবং অনামিকার স্পর্শে অশনির চোখের কোল মুছে দিতে দিতে বলল, ‘বলো অনি- বলো-’
গঙ্গার
স্পর্শ পেতেই অশনি শিশু পুত্রের মতো কেঁদে উঠলো। অশ্রুশিক্ত কম্পন স্বরে গঙ্গার
হাত দুটো ধরে বলল, ‘আমার মাকে এনে দাও গঙ্গা। আমার মাকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো
প্লিজ! মা কত যুগ মায়ের আঁচল দিয়ে আমার মুখ মুছিয়ে... আমাকে আদর করে, ঘুম
পাড়িয়ে দেয় না। আমি বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি গঙ্গা - বড় ক্লান্ত হয়ে...’
শিশুর মতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো অশিন।
– ‘শান্ত হও! শান্ত হও! যেখান থেকে পারি মা কে ফিরিয়ে আনবো। আমি ফিরিয়ে আনব
মাকে, ব্যাস্ তুমি শান্ত হয়ে যাও অনি...শান্ত হও...’
অশনির মাথার পিছন দিকে বা’হাত চেপে ধরে, ঘন কালো চুলের গভীরে
আঙুল বুলাতে ফিরাতে-ফিরাতে অশনির মুখটা, বুকে দুই স্তনের খাঁজে আলতো করে চেপে ধরলো
গঙ্গা।
- সমাপ্ত -

0 Comments