সন্তোষ কুমার শীল এর গল্প ‘প্রায়শ্চিত্ত’

Santosh Kumar Sheel's Story 'Prayashchitta'



সূর্য তার শেষ রশ্মিজাল গুছিয়ে নিয়ে পশ্চিমে ঢলে পড়ে। কিছুক্ষণের জন্য পশ্চিম আকাশটা আভামন্ডিত হয়ে ওঠে। শরৎ বিকেলের সূর্যাস্ত কী যে সম্মোহন ছড়ায় মনে! পার্কের বাহারী গাছগুলোয় পাতলা আঁধার নেমে আসতে শুরু করে। এক কোণের বেঞ্চিতে বসে বৃদ্ধ লোকটা গভীর মগ্নতায় এসব দেখছিল। হঠাৎ তার তন্ময়তা ভেঙ্গে যায়। দেখে সামনে চার-পাঁচজন লোক দাঁড়ানো। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে হয়তো এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। বৃদ্ধ কোলাহলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আকাশে তাকাতে দেখে সূর্যটা একেবারেই মিলিয়ে গেছে। সেখানে লেগে আছে একছোপ গেরুয়া রঙ। উঠবে বলে বৃদ্ধ ধীরে ধীরে লাঠিখানা হাতে নেয়।

কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সান্ধ্যভ্রমণকারী দলটা ঘাসের উপর তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে পড়ে। দলের সবচেয়ে দীর্ঘদেহী প্রৌঢ় সৌমিত্র সূতার বলে- বেশ ক’দিন হল আপনাকে বিকেল হলে একা একা বসে থাকতে দেখি। এখানে নতুন এসেছেন বুঝি? আমরা প্রতিদিন বিকেলে পার্কে হাঁটতে আসি। কাল থেকে আপনিও আমাদের সাথে চলুন না! 

বৃদ্ধ কোন কথা না বলে প্রত্যেকের মুখের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তারপর আবার আকাশের দিকে তাকায়। ধব্ধবে সাদা ট্রাউজার আর গেঞ্জী পরা মধুসূদন হালদার তার দামি ছড়িটা হাতে নিয়ে বলে- আমাকে তো উঠতে হচ্ছে সৌমিত্র! আমি না গেলে এতবড় আয়োজন ওরা সামলাতে পারবে! কোথায় কি গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলবে! 

বয়সে তুলনাম‚লক কনিষ্ঠ, মোটা লেন্সের চশমা পরা রঙ্গলাল বলে- আমারও ওঠা দরকার। রাজমিস্ত্রীদের আজ মজুরি দেবার কথা। আমি না গেলে তারা অপেক্ষা করে থাকবে। সন্ধ্যে তো হয়ে এলো! আবার ব্যাংকারবাবুর বাড়ি যেতে হবে না?

-হ্যা, তুমি তাড়াতাড়ি যাও। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই হাজির হবে কিন্তু! তোমরা হলে আমার আপনজন! আজ কাজের সময় তোমরাই তো আমার পাশে থাকবে!- অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মধুসূদন হালদার সবাইকে কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

রিটায়ার্ড সচিব সৌমিত্র সূতার হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রস্তাব করে- আপনিও চলুন না আমাদের সাথে! ব্যাংকারবাবুর বাড়িতে আজ বড় অনুষ্ঠান আছে। বুড়ো হয়ে গেলে তো আর আনন্দ-অনুষ্ঠানে বড় একটা যোগ দেয়ার সুযোগ হয় না! আজ আপনাকে যখন সামনে পেয়েছি তখন আর ছাড়ছি না।

প্রথমটায় সবাই একটু থতমত খেলেও মধুসূদনবাবুর আগ্রহ দেখে বাকি সবাইও অপরিচিত বৃদ্ধকে যাবার অনুরোধ করে। সবার কথা শেষ হলে বৃদ্ধ এতক্ষণে মুখ খোলেন- কি অনুষ্ঠান?

তার কন্ঠস্বরে সবাই চম্কে ওঠে। মানুষের, বিশেষ করে এক বৃদ্ধের কন্ঠস্বর এত সম্মোহন ছড়াতে পারে! যেন জাদুমন্ত্র উচ্চারণ করছে। মাঝারি উচ্চতার, একটু স্থ‚লদেহী বৃদ্ধ উকিল সুরেশ মিস্ত্রী বলে- মধুসূদনবাবু শক্তির পূজারী তো! যৌবনে কালীমায়ের কাছে মানত করেছিল, ছেলে হলে জোড়া পাঠা বলি দিয়ে পুজো দেবে। তারপর ছেলে হল। সে বড় হয়ে চাকুরি পেল। এখন ছেলেকে বিয়ে দেবে বলে পুজোটা আগে সেরে নিতে চায় আর কি! 

মাথা ভর্তি বাবরিওয়ালা পাকা চুলের বৃদ্ধ হরিশঙ্কর বলে- চলুন না, সবাই মিলে একটু হৈ-হুলোড় করে আসি! 

-কিন্তু আমি যে কোন জীব হত্যা করা অনুষ্ঠানে যাই না!

হঠাৎ পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। সবার মুখ শুকিয়ে ওঠে। অপরিচিত বৃদ্ধকে বলেও তো একটা মুশকিল হয়ে গেল! এখন তাকে ফেলেও যাওয়া যায় না আর নিতে গেলে তার কথা সময় ব্যয় করে শুনতে হয়। কিন্তু বৃদ্ধের কথাটা হরিশঙ্করের মনে মনে ভাল লাগে। সে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করে- কেন যান না একটু বলবেন কি?

-অনিচ্ছেয় একটা জীবহত্যার মাশুল দিতেই জীবন গেল! তারপর তো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ছলে আরও জীবহত্যায় অংশ গ্রহণ করা! তারচেয়ে আপনারা যান। আমি অন্য কোন একদিন যাব।

কথাটা মধুসূদনবাবুর ভাল লাগে না। আজ পাড়ার সব লোকজন তাদের বাড়ির পুজোয় যোগ দিচ্ছে! আর কোথাকার এক অপরিচিত বৃদ্ধ তাকে শুধু ফিরিয়েই দিচ্ছে না। তার পূজার দিকে আঙ্গুল তুলছে। তার অহংবোধ খুব আহত হয়। কিছুটা ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলে- সহস্র বছর ধরে যে ধর্মীয় আচার-আচরণ চলে এসেছে আপনি তাকে মান্য করেন না? 

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব থেকে খুব মিষ্টিস্বরে বলে- আমি তা তো বলিনি! আমি শুধু জীবহত্যার বিষয়ে কথা বলেছি। ধর্ম হোক আর সামাজিক অন্য কোন অনুষ্ঠান হোক তার নামে জীবহত্যা করা আমার কাছে ভীষণ নিষ্ঠুরতা মনেহয়। ধর্ম তো মানুষের আশ্রয়! আর শুধু মানুষেরই বা কেন; ধর্ম সকল জীবের আশ্রয় এবং সুরক্ষা কবচ হওয়া উচিৎ। সেখানে একটা নিরীহ জীব হত্যার মত বীভৎস আচরণ বোধহয় সঙ্গত নয়। এটা একান্তভাবেই আমার মত। আপনি ক্ষুণ্ন হবেন না যেন।

সৌমিত্র দু’জনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে সমাধানের একটা উদ্যোগ নেয়। বৃদ্ধকে বলে- কিন্তু মধুসূদনবাবু তো দেবতার কাছে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ! তারই দয়ায় পুত্র সন্তান লাভ করেছে। আজ সমাজে সে সম্মানের আসনে আছে। আজ যদি সে তার প্রতিশ্রুতি পালন না করে তবে পাপের ভাগী হতে হবে যে!

-আমি আর একজনের বিষয়ে কথা বলতে পারি না। আমি শুধু আমার ভাবনার কথাই বলছিলাম। তবে তিনি যে প্রতিশ্রুতিই করে থাকুন না কেন দেবতা সেটা স্বীকার করেন কিনা তা আমরা জানতে পারি না। এক্ষেত্রে আমাদের ভক্তি-বিশ্বাসের উপর ভর করেই থাকতে হয়। বিশেষ করে এইসব প্রতিশ্রুতির ভিত্তি হচ্ছে আমাদের হীন স্বার্থ। তাই আমাদের এই ভক্তি বা বিশ্বাসের মূল্য দিতে গিয়ে একটা অমূল্য জীবন হরণ করা আমার কাছে ভয়ঙ্কর পাপকাজ বলে মনেহয়। আর আমরা এই কাজের পরিণাম কি তা বোধহয় কেউই জানি না। তবে আমার জীবনে এমন একটা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছি। সারাজীবনেও তা শেষ করতে পারলাম না।

তার কন্ঠস্বরের ইন্দ্রজাল, বলার অমায়িক ভঙ্গী সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। যার জন্য সবার এত তাড়া সেই মধুসূদন হালদার স্বয়ং চুপচাপ বসে থাকে বৃদ্ধের কথা শোনার অপেক্ষায়। বৃদ্ধ তার মোহনীয় কন্ঠে বলতে শুরু করে-

তখন আমার সদ্য যৌবন। পড়াশোনা শেষ করে ভাল চাকুরি পেয়েছি। একটা সাম্রাজ্যের সমান মূল্যমানের রূপসী স্ত্রী এসেছে ঘরে। জীবন নদী তখন প্রবল স্রোতে দু’কুল উপচে বইছে। চোখের সামনে যা কিছু আসত প্রচন্ড ভাল লাগত আর নিজের করে পেতে চাইত মন। 

সব কামনা-বাসনাই একসময় ফিকে হয়ে আসে। আমরও আকাঙ্খা কিছুটা স্তিমিত হলে মনে সাধ জাগে সুন্দর একটা মন্দির গড়ার। সাধু-সজ্জন, ভক্তবৃন্দের পদধুলি পড়বে। পূজা-পার্বনে মুখর হবে আমার অঙ্গন। কল্পনায় আমি দেখতে শুরু করি অসংখ্য মানুষের পদচারণায় মন্দির প্রাঙ্গন কলমুখর হয়ে উঠেছে। পরিবারের সবাইকে মনের ইচ্ছেটা জানালাম। তারা আমার চেয়েও ব্যাকুল আগ্রহ প্রকাশ করে। বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশি সবার প্রশংসা বচন, উচ্ছাস প্রকাশে আবেগের জোয়ারে আমি তখন শূন্যে ভাসছি। 

সবাইকে নিয়ে শুভ দিনক্ষণ দেখে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করি। প্রতিদনি একটু একটু করে তার ভিত উঁচু হয় আর আমার মনেও স্বপ্নের সৌধ জেগে ওঠে। অফিসের কাজে ফাঁকি দিয়ে, বন্ধুদের সঙ্গ এড়িয়ে সারাদিন শুধু মন্দিরটি কিভাবে একটু একটু করে আকাশের দিকে মাথা তোলে মগ্ন হয়ে তাই দেখতাম। যেন আমার স্বপ্ন ধীরে ধীরে পাখা মেলছে। দিনরাত আমি ঘোরের মধ্যে থাকি। জীবনটা যেন নতুন রূপমাধুরী নিয়ে আমায় ভরিয়ে তোলে। বছর না ঘুরতেই মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে আসে।

এই পর্যন্ত বলে বৃদ্ধ কয়েক মুহুর্ত থামে। গোটা পার্কজুড়ে অমাবস্যার ঘুটঘুটে আঁধার নেমেছে। দীর্ঘ জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পূর্ণ বর্ষীয়ান শ্রোতৃবৃন্দ মানস চোখে দেখতে পায় অচেনা লোকটি কোন ভয়ঙ্কর কথা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হরিশঙ্কর গাইন কৌতুহলী স্বরে জিজ্ঞেস করে- তারপর?

-মন্দিরের দরজা-জানালার কাজ তখন পর্যন্ত শুরু হয়নি। সবেমাত্র মেঝেয় টাইল্স বসিয়ে গেছে মিস্ত্রীরা। বাইরে থেকে আসা অবাধ আলো যেন পিছলে পড়ে নতুন ঝক্ঝকে মেঝের উপর। বেদীর চারপাশ বিভিন্ন দেবদেবীর শৈল্পিক চিত্র আঁকা টাইলসে মোড়ানো হয়েছে। 

দুপুর গড়ালে ঘন ঘন ঘড়ির দিকে চোখ যেত- কখন বিকেল হবে, কখন ছুটি পাব! বাড়ি গিয়ে মন্দিরের সামনে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ঘরে ঢুকতাম। সেদিন বাড়ি ফিরে উঠোনে পা রাখতেই দেখি কয়েকটা মুরগি মন্দিরের মধ্যে ঘোরাঘুরি করছে। বেদীর উপর উঠে দুটোয় যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছে।

মাথায় হঠাৎ রক্ত চড়ে যায়। ক্রোধে অন্ধ হয়ে উঠি। আমার এত সাধের মন্দির ইতর জীবগুলোয় যে নোংরা করে ফেলেছে! বুদ্ধি-বিবেচনা মুহুর্তে সব লোপ পায়। আর সেই ভীষণ ক্রোধে অন্তর্লোক অন্ধকারে ঢেকে যায়। ভিতরে জেগে ওঠে এক শ্বাপদতুল্য হন্তারক। 

লম্বা একটা লাঠি তুলে প্রচন্ড আক্রোশে মন্দিরের মধ্যে ছুঁড়ে মারি। সাঁই সাঁই করে লাঠিটা ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে একটা মুরগির মাথায় লাগে বোধহয়। তাড়া খাওয়া বাকি মুরগিগুলো একটা শোরগোল তুলে পাখা ঝাপ্টে উড়ে পালায়। শব্দ শুনে ঘরের সবাই বেড়িয়ে আসে। ততক্ষণে লাঠির আঘাতে মুরগিটা কোন শব্দ না করে একপাক ঘোরার চেষ্টা করে ঢলে পড়ে যায়। আর ওঠে না। 

বৃদ্ধ বাবা বলে ওঠেন- কী কাজটা করলি? মুরগিটাকে মেরে ফেললি?

কথাটা কানে যেতেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। আমি তো মুরগিটাকে মেরে ফেলতে চাইনি! সে কথা আমার মনেও আসেনি! ওই মুহুর্তে সে কথা কাকে বোঝাব? মুরগিটার শেষ মুহুর্তগুলো আমার চোখের সামনে ভাসতে থাকে। কি নির্মম মুত্যু! কিন্তু তখন আমার আর পিছু ফেরার পথ নেই। পাপ কাজটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমি উল্টে তাদেরকে তিরস্কার করি- বাড়িতে এতগুলো মানুষ, অথচ কেউ দেখছো না মন্দিরটাকে নোংরা করে ফেলছে মুরগিগুলো! মরে গেছে ভাল হয়েছে! সবগুলোকে মারব।

স্ত্রীর দিকে চেয়ে ভিতরের পাপবোধ আরও বেড়ে যায়। তার চোখে জল। ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলি- এবার ওটাকে নিয়ে কেটে রান্না করো। খেয়ে ফেললেই ঝামেলা সব শেষ।

প্রায় বছরকাল এক শয্যায় ঘুমানো মানুষটি নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বরফ-শীতল গলায় বলে- তুমি একজন নিষ্ঠুর খুনী! নির্মমভাবে মুরগিটাকে হত্যা করেছো। জানিনা এরপর তোমার সাথে জীবন কাটাব কিভাবে!

স্ত্রী চোখের সামনে সশব্দে দরজা এঁটে দেয়। আমি ক্রমশ পাপবোধে আক্রান্ত হয়ে অস্বাভাবিক হয়ে উঠছিলাম। নিজের জেদ বজায় রাখতে নিজ হাতে মুরগিটাকে কেটে রান্না করতে বলি। সে রাতে আর কারো খাওয়া হলো না। সবাই নীরব। তাদের চোখের সামনে দিয়ে সদর্পে ঘুমানোর জন্য বিছানায় যাই।

কিন্তু স্ত্রীর কান্না আমাকে ঘুমুতে দেয় না। তার চোখের দৃষ্টিতে অবিশ্বাস, ঘৃণা ঝরে পড়ছিল। আমিও সারাটা বিকেল একদিকে আত্মগ্লানি, দহন অন্যদিকে সবার চোখে নিষ্ঠুর মানুষ হয়ে ওঠার ভার বইতে পারছিলাম না। বিনিদ্র চোখে মুরগিটার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া দেখতে থাকি।

রাত পোহালে সবার মুখের দিকে চেয়ে দেখি যেন এক বিভিষীকাময় রাত পার করে এসেছে সবাই। কেউ সহজভাবে আমার দিকে চাইতে পারছিল না। নতুন প্রভাতে আমি কোন শান্তি খুঁজে পেলাম না। বরং ভয়ঙ্কর পাপবোধ আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। নিজেকে সত্যিই খুনী বলে মনে হতে থাকে। আমি এই সুন্দর মন্দিরে যাকে যাঁকে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছি সকল প্রাণি তো তাঁরই সৃষ্টি! তার সৃষ্টিকে যে স্থানে বসে হত্যা করেছি সেখানে স্রষ্টার প্রতিষ্ঠা হবে কী করে! আমার ভুবন হতাশার অন্ধকারে ভরে ওঠে। 

অনেক চেষ্টা করেছি নিজেকে পাপের গাঢ় অন্ধকার থেকে বাইরে বের করতে। কিন্তু একেবারেই ব্যর্থ হলাম। সেই মুহুর্তে আর কোন পথ খুঁজে পেলাম না। হঠাৎ মনেহল- সবার কাছে থেকে আমাকে পালাতে হবে। নইলে আমার দিকে আপনজনেরা যেভাবে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে এদের সামনে থাকলে আমি পাপমুক্ত হবার সুযোগ পাব না। দূরে কোথাও গিয়ে পাপমুক্তির জন্য আমায় প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। শুদ্ধ হয়ে আবার এদের সামনে আসব। ততদিন আমার অজ্ঞাতবাস!

মধুসূদন হালদার যেন উঠতে ভুলে গেছে! হতাশ গলায় জিজ্ঞেস করে- তারপর কী করলেন?

-পালিয়ে এলাম। ঘর-সংসার, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে পিছনে ফেলে দু’চোখ যেদিকে যায় পালিয়ে গেলাম। দেখলাম, আমার স্বপ্ন-অহঙ্কার দিয়ে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে আমি যাঁর প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি আমার দৃষ্টির সামনে এবং অদৃশ্য সবখানে তিনি প্রতিষ্ঠিত আছেন। নানা জায়গায় ঘরতে ঘুরতে একসময় গ্লানিবোধ মুছে যেতে থাকে। মনেহল তাঁকে অন্তরে খুঁজে পেয়েছি। মনে শান্তি জেগে উঠেছে। চোখের সামনে যা কিছু দেখছি সবকিছুর প্রতি ভালবাসা জেগে উঠেছে। আমার অন্তর শান্তিময় হয়ে ওঠে। 

-তারপর আবার ঘরে ফিরে গেলেন না?- রঙ্গলাল জিজ্ঞেস করে।

-নাহ্, আর ফেরা হলো না! কেন যেন ঘরে ফিরতে ইচ্ছে জাগল না। মনেহল, এই বেশ আছি। বিরাট পৃথিবীতে আমি মুক্ত, অবাধ। ছোট্ট ঘরে ফিরে আর কি হবে! সেখানে চাইলেই আমি আমার মত থাকতে পারব না। এই বিশালতা কি সেখানে পাব? তারচেয়ে সব রকমের বৈচিত্র্য উপভোগ করে ছোট্ট জীবনটা কাটিয়ে দিই। এমনি করে পথে-প্রান্তরে বছরগুলো কেটে গেল।

-হরিশঙ্করবাবু বিস্ময়ে ‘থ’ হয়ে শুনছিল। এতক্ষণে চমক ভেঙ্গে জেগে ওঠে। বলে- একটা তুচ্ছ পাপে নিজেকে এতবড় গুরুদন্ড দিলেন!

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধ বলে- পাপ কখনো তুচ্ছ হয় নাকি? ওটা আমরা নিজেকে বলে প্রবোধ দিই মাত্র। সংসারে কোন পাপই তুচ্ছ নয়। ধরুন, ওই মুরগিটার পরিবর্তে যদি একটা মানুষ হত! তাহলে আপনি কি তুচ্ছ পাপ বলতে সাহস পেতেন? এখানেই মানুষ স্বার্থপর। নিজেকে আমরা বড় করে দেখি। গর্ব করে নিজেকে প্রচার করে বেড়াই, মহৎ মনেকরি! আর সব তুচ্ছ ভাবি। কিন্তু যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন তাঁর কাছে বোধহয় ছোট-বড় নেই। 

সৌমিত্র সূতার বৃদ্ধের সাথে সুর মিলিয়ে বলে- আমারও তাই মনেহয়। আর উনি যেটা সারা জীবন নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝেছেন তাকে ভুল বা মিথ্যে বলার স্পর্ধা আমার নেই। কারণ, আমি তো জীবনে এমনটা কখনো ভাবতেই পারিনি।

মধুসূদন যেন উঠে দাঁড়াবার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। নিতান্ত অনিচ্ছায় বলে- এখন তো আর অনুষ্ঠান বন্ধ করে সরে আসার উপায় নেই! এতক্ষণে লোকজন এসে গেছে। আমায় না দেখে হয়তো সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। তোমরা সবাই না হয় একটু পরে এসো। আমি এগোচ্ছি।

-একটা কাজ করলে কেমন হয়- আমরা তো সবাই বুড়ো মানুষ! এই রাতে আর কষ্ট করে যাব কি! কাল খাবার সময় না হয় সবাই যাব। আজ যে যার ঘরে যাই! বলে, হরিশঙ্কর অপেক্ষায় থাকে মধুসূদনের উত্তরের।

এটা বোধহয় কেউ আশাও করেনি! মধুসূদনবাবু সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে বলে- আমিও যদি তোমাদের সাথে যেতে পারতাম!

বৃদ্ধ তার ঐন্দ্রজালিক কন্ঠে সবার উদ্দেশ্যে বলে- আজ তো সবকিছু আয়োজন হয়েই গেছে। আপনারা কেউ না গেলেও জীবহত্যা বন্ধ হবে না। তাই শেষবারের মত না হয় আজকে সবাই যান। তবে আমার জীবনের কথা যদি আপনাদের মনে দাগ কেটে থাকে তাহলে এই জীবহত্যা না করার কথা কাছের মানুষদের বলুন। কারণ, আমরা যখন কোন জীব হত্যা করি তখন নিজের আত্মাকেই হনন করি।

আর কোন শব্দ উচ্চারণ করে না। সবাইকে পিছনে রেখে অন্ধকারে দৃপ্ত পদক্ষেপে বৃদ্ধ মিলিয়ে যায়।




সন্তোষ কুমার শীলের আরও গল্প পড়ুন...

ব্রাত্য জীবন


Post a Comment

0 Comments