“বাঙালী পরিচয়টি সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে হিন্দু-মুসলমানের সুসম্পর্কের ওপর। বাঙালীয়ানা বলতে আমরা সেই ঐক্য স্থাপনের মাধ্যমে আমাদের আবহমান কালের সংস্কৃতিকে লালন এবং তার বিকাশ বুঝি। এটাই আমাদের জাতিগত পরিচয়। এই পরিচয়কে আরো নিবিড় করতে হলে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষকে ঐক্যের আবহান, সাম্যের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে হবে। কৃষিভিত্তিক এ গ্রামপ্রধান দেশের সাধারণ মানুষ চাষাভুষো, জেলে, তাঁতি, কামার-কুমোর সবাইকে মহামিলনের রাখী পরাতে হবে। তবেই আমাদের বাঙালী হিসেবে গৌরবগাঁথা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে। আর এজন্য দেশের সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, চিত্রপরিচালক, রাজনীতিবিদ প্রত্যেকটি মানুষকে তার নিজ কর্মক্ষেত্রে সৃজনশীল চিন্তা ভাবনার স্বাক্ষর রাখতে হবে। সেটা করেছেন তরুণ এবং মেধাবী পরিচালক শ্রাবণ হায়দার। তাকে শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে এ বছর জাতীয় চলচিত্র পুরষ্কার দিতে পেরে আমরা গর্বিত। তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আগামী দিনে আমাদের মধ্যে এমনি প্রগতিশীল তরুণেরা এসে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হাল ধরবে এই প্রত্যাশা।”-
সংস্কৃতিমন্ত্রী বক্তব্য শেষে শ্রাবণ হায়দারের হাতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার তুলে দেন। কিন্তু তরুণ চিত্রনির্মাতার মুখখানা ভাবলেশহীন। যেন এতসবের দরকার কি! এমন প্রশ্নের আভাস তার দৃষ্টিতে। অনুষ্ঠান শেষে উঠতে যাবে এমন সময় এক বর্ষীয়ান সাংবাদিক কাছে এসে হঠাৎ প্রশ্ন করেÑ এই ছবিটির গল্পের প্লট পেলেন কিভাবে? আপনি তো শুনেছি নিজেই কাহিনি এবং সংলাপ নির্মাতা! এই ব্যাপারে যদি আমাদের কিছু বলতেন!
-বলতে পারেন এ ছবির কোন কাহিনী নেই। ইচ্ছে করলে এটাকে প্রামাণ্য চিত্রও বলা যায়। আর সত্যি বলতে আমি অতসব বুঝিও না ছবির ব্যাপারে। শুধু ইচ্ছে ছিল সভ্যতার ভিত্তিমূলে যে মানুষগুলো বাস করে, যারা সভ্যতার ধারক-বাহক তাদের নিয়ে সিনেমা তৈরি করব। দেশ-বিদেশের পরিচালকদের সাথে এ নিয়ে কথা বলেছি। পড়াশুনা করেছি। কিন্তু বাস্তবে কাজ করতে গিয়ে দেখি আমার স্বপ্ন এবং কল্পনার মতো ছবি তৈরি করা অসম্ভব। প্রযোজক খুঁজে পাওয়া যায় না, পেশাদার অভিনেতা কম বাজেটের ছবিতে কাজ করতে চায় না। একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে নৈরাশ্য যাপন করছিলাম। ভাবলাম পরিচালনায় কাজ নেই। তার চেয়ে আমাদের দেশের বিভিন্ন জনপদ ঘুরে মানুষের জীবন-যাপনের উপর চিত্রনাট্য লিখব। যদি কোনদিন পারি তাই দিয়ে ছবি করব। এই ভেবে একদিন দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলে গিয়ে ধান-নদী-খালের সান্নিধ্যে থাকতে শুরু করি।
সকাল হলে ক্যামেরা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। নদীতীর, গ্রাম্য বাজার, লঞ্চঘাট, গাঁয়ের লোকজনদের সাথে দিনগুলো দিব্যি কেটে যেত। সেটা ছিল শরতের ঝলমলে একটা দিন। রোদে যেন সোনাঝুড়ি ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ছিল। আমি খেয়াঘাটে একটা টঙ ঘরে বসে চা খাচ্ছি। চোখে পড়ল খানিকটা দূরে নদীর পাড়ে এক বুড়ি খেয়া থেকে উঠে আসা লোকজনের কাছে মিনতি করে কি যেন বলছে। বেশীরভাগ লোকই বুড়ির কথা কানে তোলে না। কেউ কেউ হাসি-ঠাট্টা করে আবার কেউ বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে যায়। খেযার লোকজন সব চলে গেলে বৃদ্ধা পরের খেয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকে।
চা খাওয়া শেষ হলে বৃদ্ধার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু সমস্যা হলো আমায় দেখে বৃদ্ধা চুপ করে থাকে। ইতিমধ্যে আরেক একটা এসে ভিড়েছে। বুড়ি আবার উঠে দাঁড়ায়- তার বোঝাটা তুলে দেবার জন্য হাট থেকে ফেরা মানুষগুলোকে অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। একটা লোকের কথা শুনে থম্কে দাঁড়াই, বিরক্তিভরে দাম্ভিক সুরে বলে- এই বুড়ি, আবার ছুঁেয় দিওনা। অনেক কাজ বাকি আছে। এখনই স্নান করতে পারব না।
বুড়ি ফ্যালফ্যালিয়ে চেয়ে থাকে। তার মাথা নীচু করে থাকার মধ্যেই ভুল স্বীকার করার ভঙ্গীটি স্পষ্ট।
একে একে বুড়িকে অতিক্রম করে খেয়ার লোকগুলো চলে যায়। খেয়ার শেষ যাত্রী এক স্বাস্থ্যহীন যুবক। মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফে মুখখানা মলিন ও রোগা লাগছে। হাতে কতগুলো বস্তা আঁটি করে বাঁধা। ক্লান্ত পায়ে বৃদ্ধার কাছে আসতেই বৃদ্ধা আবার নাকি সুরে বলতে থাকে- দ্যাখ বাপ, তিনটি খেয়ার লোক সামনে দিয়ে চলে গেল। সবাইকে বললাম চাউলের ব্যাগটা তুলে আমার মাথায় দিতে। ছোট জাত বলে কেউ ব্যাগটা ছুঁল না। ত্ইু একটু মাথায় তুলে দিবি? সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। এখন মাথা ঘুরছে। ব্যাগটা মাথায় তুলে দিলে নিয়ে যেতে পারব।
যুবকটি বৃদ্ধার কাছে এসে সবেমাত্র ডালপালা ছড়িয়ে আকাশের দিকে বিপুল প্রাণশক্তি নিয়ে বিস্তার হওয়া বটগাছটার তলে বসে বস্তার আঁটিটা খোলে। ভিতর থেকে কাগজের ঠোঙ্গাঠা গড়িয়ে পড়ে, ঠোঙ্গাটা খুলে হাটে তৈরি পুরু করে ভাজা আটার রুটির অর্ধেক পরিমাণ আর খানিকটা আখের গুঁড় বের করে বলে- এইটুকু খেয়ে নাও। চাউল না হয় আমিই নিয়ে দেব।
বৃদ্ধা হয়তো এতখানি চায়নি, তাই কথাটা বিশ্বাস হয় না। সে সন্দেহ ভরা চোখে চেয়ে থাকে। কিন্তু যুবকটির নির্বিকার ভাব দেখে হয়তো তার বিশ্বাস ফিরে আসে। চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতা ফুটে ওঠে। লোকটাকে বলে- রুটি তো তুই খাবি বলেই কিনেছিলি। ওটা তুই খেয়ে নে ! আমি বাড়ি গিয়ে দুটো ফুটিয়ে নিয়ে খেলেই হয়ে যাবে।
-ধুর, তুমি যে কি বলো ! বাড়ি থেকে সকালে পোড়া মরিচ আর পিঁয়াজ দিয়ে একথালা পান্তা খেলাম, বাজারে বসে এতবড় রুটিটার অর্ধেক খেলাম, এখনও পেটে ক্ষুধা ! আর তুমি এই দুপুর পর্যন্ত না খেয়ে আছো, তারপরও বলছো বাড়ি গিয়ে রান্না করে খাবে। শীগ্গির ধরো। যদি না খাও তবে আমি নেই। এই চললাম।
বৃদ্ধাকে হয়তো এত যত্ন করে খাওয়াবার লোক নেই, তার চোখ ছল্ছল্ করে ওঠে। আর কথা না বাড়িয়ে সে রুটির অংশটুকু নিয়ে বটগাছটার তলে বসে। যুবকটি এদিক ওদিক তাকিয়ে দোকানের পাশে ফেলানো একটা কোকাকোলার খালি বোতল কুড়িয়ে নিয়ে নদী থেকে জল ভরতে শুরু করে।
এ পর্যন্ত আমি নীরব দর্শক হয়ে ছিলাম। এবার আর পারলাম না। যুবকটির হাড় জিরজিরে শরীর দেখেই বোঝা যায় তার ঘরের অবস্থা কি। সে নিজের জন্য কেনা খাবার অনায়াসে আরেক জনের হাতে তুলে দিতে পারে আর আমি যদি চুপ করে থাকি! দোকান থেকে কয়েকটা পাউরুটি, কলা আর দুই বোতল মিনারেল ওয়াটার নিয়ে বৃদ্ধার হাতে দিতে চাইলে সে সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। সভ্যতার মানচিত্রে শোষিত হিসেবে যুবকটিকে হয়তো সে স্বগোত্র মনে করে। আর আমার পোষাক-পরিচ্ছদ, গলায় ঝুলানো দামী ক্যামেরায় আমাকে শোষক শ্রেণীর লোক বলেই মনে করেছে। তাই আমার দেয়া খাবার গ্রহণে এই অস্বীকৃতি।
ছেলেটাকে ডেকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে কোনমতে রাজি করি। কিন্তু তার শর্ত হল, তাদের সাথে আমাকেও খেতে হবে। আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাচ্ছিলাম- দেশের শিক্ষিত, পদবীধারী লোকগুলো অর্থলোভে কত পাপবোধহীন, বিবেকহীন! এমন কোন অনিয়ম, দুর্নীতি নেই যা তারা করতে পিছপা হয়। অথচ এই ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর সৌজন্যবোধ কত উন্নত- ক্ষুধা পেটেও দামের খাবার খেতে এরা বিমুখ। এই জন্যই এরা দরিদ্র কিনা কে জানে ! ধনী হবার সাথে হয়তো কেড়ে আনার, লুণ্ঠন করার সম্পর্ক রয়েছে।
খেতে খেতে দু’জনের পরিচয় জানার চেষ্টা করি। যুবকটির নাম রফিকুল ইসলাম। পাশের গাঁয়ের বর্গাচাষী। একমাত্র ছেলের ক’দিন যাবৎ জ্বরের চিকিৎসা করা ও হালের গরুর জন্য আউশ ধানের তুষ বিক্রি করে খৈল কিনতে হাটে এসেছিল। আর বৃদ্ধা হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। ইউনিয়ন পরিষদের ওপাশে সরকারি জমিতে তাদের একটা কলোনী আছে। সেখানে থাকে। একমাত্র মেয়ে আর জামাই ছাড়া কেউ নেই। কিন্তু তারা বৃদ্ধাকে খেতে-পড়তে দেয় না বলে একা একটা ঘরে থাকে। সরকারি যা ভাতা পায় তাতে কষ্টেসৃষ্টে দিন চলে যায়। এই হতদরিদ্র জীবন যাপনে কারো মুখমন্ডলে কোন ক্ষোভ আছে বলে মনে হয় না।
ইতোমধ্যে আমার গাইড চলে এসেছে। ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে নদী থেকে একটা খাল উঠে এসেছে। খালের পাড়ে মেঠোপথ আর দুই তীরে কাশফুলের অপূর্ব সমাহার দেখতে যাবার কথা সেদিন।
খেয়াঘাট থেকে নদীর তীর ধরে এঁকেবেঁকে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে গাঁয়ের দিকে। দুই পাশে যতদূর চোখ যায় নবীন ধানক্ষেতে সবুজের সমারোহ। খানিকটা পথ যেতেই সামনে দেখি বৃদ্ধার চালের ব্যাগটা মাথায় নিয়ে রফিকুল হাঁটছে আর হাত নেড়ে বৃদ্ধা কি যেন বলছে তার সাথে। কৌতুহল দমন করতে একটু সামনে এগিয়ে এমন দুরত্বে হাঁটতে থাকি যেন ওদের কথা শোনা যায়। বৃদ্ধা তখন কৃতজ্ঞতায় উদার এবং মহান হয়ে উঠেছে। তার কথাবার্তায় এমনটাই মনে হচ্ছিল। আগের কথাগুলো শুনতে পাইনি। রফিকুলের উদ্দেশ্যে বৃদ্ধা এক দার্শনিক উক্তি করে- আমরা যারে ভগবান বলি, তোরা তারেই বল আল্লাহ। মানুষ তারে নিয়া ভাগাভাগি করে। কিন্তু সে একজনই। রফিকুল তার কথায় সায় দিয়ে বলে- মানুষও তো এক। এই যে তোমার ক্ষুধা লাগে, আমারও লাগে। তাহলে আলাদা কোথায়! আলাদা করে গ্রামের মাতব্বররা। আসলে জাত দুইটা- ধনী আর গরীব। উত্তরে বৃদ্ধা কি বলেছিল শুনতে পাইনি। তার আগের কথায় আমার মনের দুয়ারে মনীষী কার্ল মার্কস কড়া নেড়ে উঠেছিল- “ধর্ম শোষণের হাতিয়ার।” আর গোটা সভ্যতা জুড়ে শোষক এবং শোষিতের যে শ্রেণি বিভাজন করেছিলেন তাই যেন রফিকুলের মুখে ফুটে ওঠে।
আমার সেদিনের কাশফুল, ধানক্ষেত,খালের পাড়ে শিকারী মাছরাঙার ধ্যানস্থ দৃষ্টি কিছুই আর মনে ধরেনি। ওই হরিজন সম্প্রদায়ের বৃদ্ধা যে সমাজের অবজ্ঞা, অসম্মান, ঘৃণা নিয়ে জীবন কাটায় তার ঈশ্বরবোধ এত বৈষম্যহীন, উদার এবং মহৎ হতে পারে এ যে সভ্য মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য! আর বর্গাচাষী রফিকুলের মনে সাম্যবোধের এত উৎকৃষ্ট ধারণা কোথা থেকে এল! অন্ত্যজবর্গীয় দু’জন মানুষের একান্ত আলাপ শুনে আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।
যাদের পেটে ভাত নেই, পরনে লজ্জা নিবারণের বস্ত্র মাত্র, চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই তারা এতখানি উদার! তাদের জীবনবোধ কত সরল, কত মানবিক! তাহলে আমাদের জন্মভূমি, এই পৃথিবীটাকে কারা বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে! এই যে বর্গাচাষী রফিকুল ক্ষুধাক্লীষ্ট শরীরে অন্য একজন অক্ষমের বোঝা অবলীলায় বহন করে চলছে, ক্ষুধাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে আর এক অনাহারীর মুখে নিজের খাবারটুকু তুলে দিচ্ছে এদের নিষ্পাপ হাতেই তো সভ্যতার নির্মাণ সম্ভব! আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এমনি করে তাদের আত্ম-পরিচয় দেয়, তাহলে কেন এত বৈষম্যের বিষবাষ্প!
আমরা যারা সভ্য, ভদ্র বলে দাবী করি তারাই তো ওই নারীকে ‘হরিজন’ আখ্যা দিয়ে সমাজের মূল স্রোতধারা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছি। অথচ আমাদের প্রাত্যহিক জীবন যাপনের পূর্বশর্ত এরাই। আমাদের কাজটা হয়তো এরা করতে পারে। কিন্তু এদের কাজগুলো কি তথাকথিত ভদ্রলোকেরা কখনো করতে পারবে? আর ওই রফিকুল আমৃত্যু শ্রম দিয়ে এই সভ্যতার ভিত রচনা করে যার উপর আমরা বিলাসী জীবন যাপন করি সভ্যতার ভিত্তিমূলে বাস করা দুই সভ্যতার কারিগর মানুষকে, মানুষের ঈশ্বরোপলব্ধিকে কত বৈষম্যহীন, সহজ দৃষ্টিতে দেখছে!
কিন্তু সভ্য সমাজের মগডালে বাস করা রাজনীতিবিদ, ধর্মযাজক, বুদ্ধিজীবী এমনকি কবি-সাহিত্যিকগণ পর্যন্ত ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় স্বার্থে বৈষম্য, হানাহানি লালন-পালন করছে। কার্যক্ষেত্রে তো করছেই, হয়তো তারা মননেও করছে। তাই দেশের মানুষ কেউ সংখ্যালঘু হয়ে যায়, কেউ অন্ত্যজ হয়ে যায়, কখনো বা স্থান বিশেষে হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। রফিকুল আর ওই বৃদ্ধার মত অতি সাধারণ মানুষ যারা শ্রমদাস হিসেবে জীবন যাপন করে তারা কখনো সভ্যতাকে কলুষিত করে না, যুদ্ধের আহ্বান জানায় না। হয়তো সে জন্যেই এরা যে বেঁচে আছে তা কেউ জানতে পায় না। আর এটা সভ্য মানুষের অকৃতজ্ঞতাজনিত পাপ।
অবশ্য সেই পাপমোচনের গুরুভার নিতে নয়, আমার মধ্যে ওই দুই অতি সাধারণ নর-নারীর সরলতা ভর করে আর সেই মুহুর্তে এই সিনেমা-কাহিনীর ভ্রুণ নিষিক্ত হয়।
একজন বৃদ্ধ সাংবাদিক সবিনয়ে প্রশ্ন করেন- এইটুকুমাত্র সময় দু’জন মানুষের কথাবার্তা শুনে এমন একটা চলচ্চিত্র সৃষ্টি সম্ভবপর হল কী করে?
-না, ওইটুকু সময় নয়। রফিকুল আর সেই বৃদ্ধার জীবন যাপন কাছে থেকে দেখার জন্য তাদের অনুমতি নিয়ে আতিথ্য গ্রহণ করি। প্রায় মাসখানের ছিলাম সেই অখ্যাত পল্লীগাঁয়ে। শৈশব থেকে এই শহরে বড় হয়ে শুধু নিজেকেই দেখতে শিখেছিলাম। কিন্তু সভ্যতার আলো না পৌঁছানো সেই অজপাড়াগাঁয়ে গিয়ে প্রথমবার মানুষ চেনার, কাছে থেকে তাদের জানার সুযোগ হয়। শুধু মানুষ চেনারই নয়, তাদের তীব্র দুঃখ-দহন দেখারও দুর্ভাগ্য হয়েছিল।
সপ্তাহখানেক বেশ ভালই কেটে যায়। রফিকুল মুসলমান পাড়ায় গরিব চাষী, দিন মজুর বলে অপাংক্তেয়। আর খানিকটা দুরে অস্পৃশ্য বলে ঘৃণিত ‘হরিজন পাড়া’। আমাকে এসব জায়গায় ঘুরতে, তাদের সাথে মেলামেশা করতে দেখে নিজেদের যারা ভদ্রলোক বলে অহংকার করে তারা আমায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত। প্রথমদিকে অনেকে আলাপ জমানোর চেষ্টা করে যা দু’দিনের মধ্যে উপদেশে গিয়ে ঠেকে। যখন বুঝতে পারে আমি একটু বেপরোয়া, তাদের উপদেশ মানছি না, ছোট জাতের লোকজন নিয়ে ঘোরাঘুরি করি, তাদের হাতে কাশফুল দিয়ে ভদ্র পাড়ায় দাঁড়িয়ে ফটোগ্রাফ তুলি তখন আমাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা শুরু হয়, অশ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকিয়ে অশোভন মন্তব্য করে। এসব আমাকে যতটা বিচলিত করত তার চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞতা দান করত। জানিনা এই শহরের মানুষ জানে কিনা- এদেশের মানুষগুলোর মধ্যে এমন হাজারো সম্প্রদায়, বর্ণ আর গোত্র রয়েছে। তারা পারস্পরিক বিভেদ, বিদ্বেষ, বৈষম্যের মধ্যে জীবন কাটায়। এ থেকে মুক্তির কোন পথ আছে বলে জানা নেই। কোন সমাজ সংস্কারক এগিয়ে এসে এদের ‘মানুষ’ পরিচয়টিকে সামনে তুলে ধরে আলোয় নিয়ে আসার চেষ্টা করেনা। একমাত্র দু’টি দল যায় যারা উভয়েই পুঁজিপতি, শোষক শ্রেণির- একজন রাজনীতিবিদ, ভোটের ময়দানে ওদের নিয়ে প্রহসনের খেলা খেলতে যায়। আর অপরজন ধর্ম-ব্যবসায়ী যে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস পুঁজি করে তাদের ফাঁদে ফেলে আরো অন্ধ, অমানুষ করে তোলার চেষ্টা করে। এক এক গোত্রের এক একজন ধর্মগুরু। তারা নিজেদের জাহির করার জন্য গোত্র বিশেষের সবাইকে ডেকে অপর গোত্রের উদ্দেশ্যে ধর্মের নামে প্রকাশ্যে বিদ্বেষমূলক, হিংসাত্মক বয়ান দেয়। ফলস্বরূপ মানুষগুলো দলান্ধ এবং মতান্ধ হয়ে দুর্গতির দিকে এগোতে থাকে।
যখন নিজেরা নিজেদের মধ্যে মগ্ন থাকে তখন এদের মত মানবিক, উদার, ভাল মানুষ আর হয়না। তার প্রমাণ পেলাম রফিকুলের ছেলেটি মারা যাবার সময়। প্রায় বছরখানেক জন্ডিসে ভুগে এক সময় লিভার সিরোসিসে মারা যায়। সেদিন হরিজন পাড়ার লোকেরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিন-রাত রফিকুলের সাথে থেকেছে। দুঃখ মানুষকে কেমন মানবিক করে তোলে, এক করে তোলে তা দেখে সেদিন দুঃখের মধ্যেও আমি অভিভূত হয়েছি। এই ঐক্য, এই মানবিকতার যদি বাহ্যিক কারণে স্খলন না ঘটে তবে সত্যিই আমাদের দেশটা স্বর্গভূমি হয়ে উঠতে পারে। এদেশের প্রধান দুটো ধর্ম সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমান। স্বাধীনতার আগে থেকেই তাদের মধ্যে একটা অনৈক্যের কাঁটা ফুটে আছে। ধর্ম বা রাজনীতি সেই কাঁটা তুলে ক্ষতস্থান সারাতে পারেনি। আর পারবে বলে আমার মনেও হয়না। একমাত্র সংস্কৃতিই ভরসা। চলচ্চিত্র সেখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। আর সেই বিশ্বাস থেকেই এই চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস করেছি। আগামী দিনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালী পরিচয়ে সবাই যাতে গর্ব করতে পারে সেই আশা নিয়েই আমার প্রথম ছবি সৃষ্টি।
-আপনার সৃষ্টি স্বার্থকতা লাভ করেছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। এবার বলুন- একটা মাত্র চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই এই পুরস্কার প্রাপ্তি আপনার কেমন লাগছে?
-যদিও সাফল্য বা পুরস্কার প্রাপ্তির একটা মাদকতা থাকে। কিন্তু সত্যি বলতে আমার খুব একটা ভাল লাগেনি।
বিস্ময়ে প্রশ্নকর্তা সাংবাদিকের মুখ হা হয়ে যায়- সে কী! আপনি তাহলে কীসে খুশি হতেন? মানে এর চেয়ে আর কোন বড় প্রাপ্তিতে?
-প্রথম ছবি নির্মাণেই শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রাপ্তি আমার গতি থামিয়ে দিতে পারে- এমন একটা শঙ্কা তো আছেই। দ্বিতীয়তঃ এই পুরস্কার দাতা কর্তৃপক্ষ, আপনাদের মত স্বনামধন্য সাংবাদিকগণ যদি আমার ছবির চরিত্র হিসেবে যারা সারা দেশে ছড়িয়ে আছে, অবহেলা-অপমানভার নিয়ে ধুকে ধুকে জীবন কাটাচ্ছে তাদের কাছে যেতেন, তাদের মধ্যে আশাবাদ-উদারতার কথা ছড়িয়ে দিতেন, সমাজে ঐক্য স্থাপনের জন্য তাদের পুরস্কৃত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেন তাহলে আমি সবচেয়ে খুশি হতাম। বরং চলুন না একদিন চাষী রফিকুল আর হরিজন বৃদ্ধাকে দেখতে! তবেই আমার সৃষ্টি স্বার্থক বলে মানব।
উপস্থিত সুধিজনের মনে সেই মুহুর্তে এক বৈষম্যহীন সমাজ-সভ্যতা নির্মানের দৃঢ় প্রত্যয় ভর করে তাদের মুখমন্ডল আলোয় উদ্ভাসিত করে তোলে।

0 Comments