"বুকে নাচে জোড়া ময়ূর" থেকে পাঁচটি কবিতা #মাহফুজা অনন্যা

Buke Nache Jora Mayur" #Mahfuza Ananya




মহাজীবনের ভস্ম ওড়ে 


ঘুম ভেঙে দেখি,  মানুষ পায়ে ঠেলছে আলো 

হাতড়িয়ে বুকের কাছে ডেকে নিচ্ছে অন্ধকার! 


দাদুর কাছে শুনেছি, মানুষ যুদ্ধপ্রিয়, কিন্তু কতটা যুদ্ধপ্রিয়

তা কান চিলে নিলে তো জানা হতো না 

জানা হতো না বায়ান্ন, একাত্তর! 

আমার সোনার বাংলা বনাম পাকিস্তান,

অবশেষে আমরা শৃঙ্খলমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র! 

আজ দাদু নেই, আছে রাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন, আর কত নাম!


একই আকাশ তবে কেন পৃথিবী এক নয়

এক পৃথিবী তবে কেন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ? 


পৃথিবী যেন চর্বণ, চোষ্য 

চলে সনাতনী হোলি, রক্ত-রক্ত খেলা 

যেন সুপেয় মাতালি 

বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়, 

পৃথিবী এক রক্তদৃশ্য-পাকাটমেটোখেত!


ক্ষুধা, মৃত্যুর পৃথিবী, তবু রোজ রাতে দাম বাড়ে ডলারের! 

ধর্মের রঙে চলে যুদ্ধ!

বৃদ্ধ, শিশুর হাড়গোড়সহ মহাজীবনের ভস্ম ওড়ে তৃতীয় বিশ্বে…


শব্দহীনতায় ভোগা এই আমি গুগল-তারে লিখে দিই শেষ হোক; 

আমাদের, তোমাদের, না পৃথিবী, না মানুষ, তবুও চৌদিকে, চৌতারে লিখে দিই

যুদ্ধ শেষ হোক, শেষ হোক যুদ্ধ! 





অবলা বেনাপোল 


মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া সহজ

মানুষের নাকের ডগায় উড়ে বেড়ানোও সহজ 

মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারাও সহজ 

কিন্তু মানুষের ঘিলুতে লবণ ছিটানো এত কি সহজ?


অন্ধ যে আলো বন্ধ হলেও দেখে 

এ সত্য ক্ষমতাধরদের ঘিলুতে থাকে না কেন? 


ভদ্রতার ভেক ধরা ঘোড়ারোগীগুলো কবে যে বিলীন হবে, আর কত দেরি  


রাতে এনে দিনে খায়,

দুইদফা হিসাব ফেঁদে যাদের জীবন চলে 

তাদের জীবন কেন ওরা পকেটের টাকা দিয়ে কেনে, কিনতে চায়?


দেশের ভাগে দশ, মনুষ্যত্ব ঝুলি ক'জনের ঘাড়ে?


কেউ কি দেখেছো অগণতন্ত্র দেশ 

যে দেশে অসহায় মানুষের লড়াই, রোগ শোক, তাপ, অনুতাপে পুড়ে মরে রোজ, 

তারপর আরও একটি বেনাপোল কেন পোড়ে? 


ক’টাকায় বা দাম মানুষের জীবনের, 

কিংবা আদৌ কোনো দাম আছে কিনা তাতেও সন্দেহ 


সারাদিন যারা করে লালদিঘি চাষ, পেটে ক্ষুধা বুকে কঠিন অসুখ নিয়ে একটি মাছের রঙিন লেজের মতো দেশের মানচিত্রের এক কোণে উজ্জ্বল হয়ে থাকতে চাওয়া মুখগুলি কেন ওরা ঝলসে দেয়?


আর কত আগুন জ্বললে ওদের পেট শীতল হবে

লুটেরার বংশধর আর কতকাল মানুষকে জ্বালিয়ে মারবে?


একদল ক্ষমতায় থেকে মানুষের ভোটের অধিকার মারে,

আর একদল ক্ষমতার লোভে আগুন নিয়ে খেলে 

উভয়ই দোষী এই রক্তসূত্রের, রক্তপাতের 


আগুনের স্রোতে ভেসে যায় গোপীবাগ, 

লাশের উল্লাসে কমলাপুর ফেটে যায়, 

আহা অবর্ণনীয় কবিতায় শবের কলরব! 


এইসব আগুন, গলিত লাশের দেশে 

কোথায় অবশিষ্ট সেই সোনার বাংলা? 




কোন সে ইলেকট্রন 


কোন সে ইলেকট্রন

একই কক্ষপথে না হেঁটে কেমন সমকক্ষ! 


আলো পালানো মাঘ মাসের ঘোড়ানিম গাছ

মহৌষধী জেনেও মানুষ রচে না


বহুদূর এভারেস্ট 

কী করে উড়বে আয়নোস্ফিয়ার?


পথ হাঁটে যাকে 

পাথর গুড়ো বিয়ার বিশ্রামে 

দরজার ভিতরে ঘর কীভাবে খিঁড়কি আটে দেখো তা?


ফ্রকের সমান বয়স 

স্তনরেখায় আনকোট নেমড্রপিং 

নুনের বিস্কুট খেয়ে দেখেছো কখনও?


পাঁজরে বসে পাঁজর কুরে খায় পাঁজরের পোক 

কিছু নামে কুকুর পুষি করি না আর শোক৷ 





প্রোটন প্রনালীর নৌকা 


শব্দের নতুন বউ ঘোমটা খোলো


আমি গড়াপেটা করি কবিতার মন

দর্প আর দর্পনের অদ্বিতীয় পৃথিবীতে  

আকাশ একক অভিমান ভেঙে গড়ে তুলছে বাতানুকূলের নাগরিক লম্ফ

গড়ছে কেঁচো সংস্কৃতি, খেমটা নাচের ইতিব্যথা। 


হাওয়াদের মিটিং শেষ না হতেই শুরু হয়ে যাচ্ছে  কল বা তেলের পিছলানি

কন্ঠস্বরের অবয়বে বেহালা কাঠ অনবরত ঢেঁকি গিলছে


কলম থমকে থাকলে 

কী করে টানি অবাধ্য বৃত্ত 

যতবার কলম ধরি চেনা পথ সামনে এসে আকাশ হয়, 

তাই আমি বারবার উঁচু আকাশের নাম লিখি 'রাস্তা'...


যেভাবে প্রোটন প্রনালীর নৌকা শব্দ-বিদ্যুতে ভেজে! 





বেজে ওঠে অন্ধকার 


সন্ধ্যার স্বপ্নে দেখি উত্তরের জলকণা

কুয়াশা ঢেকে দেয় সমস্ত যুগল ছবি

ময়নাপাখির ছায়া দোদুল্যমান 

হস্তগত নদী মিথ্যেবাদী

নৌজীবিক মাছ আঁশ পাল্টায় 


ডিএনএ রেপ্লিকেশনের মতো খুলে পড়ে 

থ্রিলার-রহস্য অভিনাথ-রবির ক্ষেতে ছেঁড়া চিঠির লাশ 

বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডল বিধির বধির

সূযাস্তে সমুদ্র লালটিপ পরে হাসে

বায়োমেট্রিক পদ্ধতি মুছে দেয় আধুনিকার পরিচয়


দ্রব্যমূল্যের নিত্য উৎসব রেক্সিন ব্যাগে 

গভীর অপচয় বসন্ত শরীরে

কুয়াশার ফুল ডুবে যায় তুমুল চাঁদে

আর তখনি একটি শব্দে কেউ কেউ চিৎকার করে 

আলো চাই, আলো চাই, আলো চাই! 


শহরের তীরে মিছিলের ফেনা 

নাগরিক ঢেউয়ে সংস্কৃতি রামলুট 

কিংবদন্তি তারাদের আক্রোশে মুক্ত কুকুর 

ঘুমন্ত ফুলের গন্ধে দারুচিনি বনের ঢিলেঢালা পোজ 

তোতলা চাঁদের হাটে ডিজিটাল রিল 

আলো খাচ্ছে, আলো খাচ্ছে, আলো খাচ্ছে! 


জুম-কপি-পেস্ট করেও কোথাও তোমাকে বসাতে পারি না, আমাকেও না! 

শেষমেশ কর্পোরেট পকেট হাতড়াতে থাকি 

যেখানে আলো থাকার কথা 

সেখানে ঝনঝন করে বাজতে থাকে অন্ধকার!  



"বুকে নাচে জোড়া ময়ূর" থেকে পাঁচটি কবিতা #মাহফুজা অনন্যা





Post a Comment

0 Comments