তাসের ঘর ~ অঞ্জন আচার্য’র গল্প

House of Cards ~ Story by Anjan Acharya



হাসলে দিতির বাম গালে সুন্দর একটা টোল পড়তো। এখন আর পড়ে না। পড়ে না বললে ভুল হবে, দিতি তো ইদানীং হাসেই না। শেষ কবে হেসেছিল সেও ভুলে গেছে সুবর্ণ। বছর সাত তো হবেই। বাবানের জন্মের সময়। সিজারের পর যখন দিতির জ্ঞান ফেরে, বেডের পাশে ছোট্ট বিছানায় ঘুমাচ্ছিল বাবান। সুবর্ণর মা নীলিমা কানের পাশে ফিসফিস করে বলেন, ছেলে হয়েছে গো— বলেই ফোকলা দাঁতে ফিক করে হেসে উঠেন। পাশেই দাঁড়ানো ছিল নার্স। সদ্যজাত সন্তানকে কোলে নিয়ে দিতির সামনে তুলে ধরে বলেন, এই দেখুন, কি সুন্দর ছেলে হয়েছে। একদম আপনার মতো দেখতে। এ কথায় নীলিমা কপট রেগে বলেন, মোটেই না, ও আমার মতো হয়েছে। না না, ওর দাদুর মতো। এইসব জলে ভেজা পুরোনো অ্যালবামের ফিকে হওয়া ফটো। সুবর্ণ তখন একটা মাঝারি ক্যাটাগরির পত্রিকা অফিসের সাব এডিটর হিসেবে কাজ করতো। দিতির সঙ্গে প্রেমও সেসময়ই। চারুকলায় আড্ডা

দিতে গিয়ে একদিন দেখা। সেই থেকে দেখা না হলে ভালো না লাগা শুরু। দিতির বাবা আছেন, মা নেই। মা-হীন মেয়ের দুর্গতিরও শেষ নেই। সুবর্ণর বাবা মারা গেছেন ক্লাস ফাইভে পড়াকালে। ছেলেকে মানুষ করতে নীলিমার নীল কবেই খয়েরি হয়ে গেছে। একসময় নীলিমার গায়ের বর্ণ যে ফর্সা ছিল, কে বলবে সে কথা? টিউশনি করে কোনো একরকম দিন পার করেন। একটু বড় হলে সুবর্ণও টিউশনি শুরু করে। নিজের পড়াশুনার খরচটা নিজেই চালিয়ে নেয়। মাস্টার্স শেষ না হতেই হুট করে বিয়েটা করে ফেলে দিতি ও সুবর্ণ। পড়াটা আর শেষ হয় না। তখন চোখে রঙিন চশমা। আকাশকে সবুজ মনে হয়। এ জীবন রেখে কী লাভ, যদি না দুজন দুজনার হলো?— এমনটাই ছিল দুজনের মনে।

বিয়ের পর একরকম ভালোই চলছিল সব কিছু। নীলিমার মৃত্যু সব কিছু কেমন ভাসিয়ে দিয়ে গেল। তলে তলে এত রোগ নিয়ে এতকাল চলেছে নীলিমা, কেউ টেরই পায়নি। অভারের সংসারে ডাক্তার দেখানো, চিকিৎসা করানো একরকম বিলাসিতা হবে ভেবেই নীলিমাও এসব পাত্তা দেননি। কিন্তু জীবাণু কি তা মানে? নাকি মেনেছে কোনো দিন? হঠাৎ একদিন বিছানায় পড়ে গেলেন। তারপর টানা দেড় বছর বানের জলের মতো সুরঙ্গ কেটে চলে গেল তলানির সহায়-সম্বলটুকু। তারপরেও শেষ রক্ষা হলো না, নীলিমায় লীন হলেন নীলিমা। কথা হচ্ছিল দিতির গালের টোল পড়া নিয়ে। এর মধ্যে কতশত কথা এসে গেল। এখন দিতির গালে নয়, দুই ভ্রূর মাঝ বরাবর ভাঁজ পড়ে গেছে। দারিদ্র্যরেখা সম্ভবত একেই বলে। অভাবে অভাবে স্বভাবটাও কেমন খিটমিটে হয়ে গেছে তার। কথায় কথায় হুট করে ফুঁসে ওঠে। এই এখন যেমন বাবানকে খাওয়াতে বসে পাড়া-মহল্লা এক করছে। সারাদিন শেষে বাসায় ফিরে জ্বলন্ত চুল্লি দেখতে কার ভালো লাগে? করোনা অনেককে ধসিয়ে দিয়ে গেছে। যদিও এখন সব কিছু আগের মতোই ঠিকঠাক। কিন্তু সুবর্ণ আর দাঁড়াতে পারেনি। পত্রিকার অফিস সেই যে তাকে ছুটিতে পাঠালো, তারপর তিন বছর হয়ে গেল, সেই ছুটি আর কাটলো না। এখানে ওখানে কত কত চেনা, আধা চেনা মানুষকে ধরেছে একটা চাকরির জন্য। সব আশা ও আশ্বাস কপূর্রের মতো বাতাসে মিলিয়ে যায়। এখন সুবর্ণ বাংলাবাজারে দু-তিনটা কাশনীর প্রুফ দেখে। অনেকটা দিনমজুরের মতো। ফর্মা হিসেবে টাকা। দিনরাত এক করে খাটে। চোখ ঘোলা হয়ে

আসে। মাথা ভার হয়ে যায়। তারপরেও শব্দের ওপর লাল দাগ কেটে যায় সুবর্ণ। কোনো একরকম টিকে তো থাকতে হবে। 

রায়েরবাজারে আগে যে বাসাটিতে ভাড়া থাকতো সেটা ছেড়ে সুবর্ণরা এখন উঠেছে এক আধা-পাকা বস্তিতে। কী আর করা? সংগতি কোথায়? ক্ষুধার কাছে সকল মান-লজ্জা-ভয় নিতান্ত তুচ্ছ বিষয়। সে কারণেই হয়তো, প্রতিদিন কাজে যাওয়ার পথে রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের পাশ দিয়ে গেলে একটু দাঁড়িয়ে থাকে সুবর্ণ। প্রতিদিনই সেখানে কোনো না কোনো অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। তা সে দুপুরই হোক কিংবা রাত। সুগন্ধি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কত দিন একটু ভালো-মন্দ খাওয়া হয় না! ভাবে, আর মনেমনে দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলে। সেই যে বছর তিনেক আগে বাই মিলে গিয়েছিল সাংবাদিক ইউনিয়নের পিকনিকে, সেটাই শেষ। পিকনিকে বাবান পেট ভরে মাংস খেয়েছিল। আজও সেই কথা ভাবলে মনটা হু হু করে সুবর্ণর।


২.

—খা বলছি, গ্যাল, গ্যাল বলছি। খিটমিটিয়ে বাবানকে ধমক দিতে থাকে দিতি। তারস্বরে কান্না করতে থাকে বাবান। মুখের মধ্যে ভাত নিয়ে বলে— শুকনা, শুকনা। রোজ রোজ আলু সিদ্ধ দিয়ে খেতে ভাল্লাগে না।

—তোর বাপের যেদিন ডাল কেনার মুরোদ হবে, সেদিন কবজি ডুবিয়ে ডাল খাস। এখন এটা খেয়ে নে

বলছি। একদম ভাত ফেলা যাবে না। কথাগুলো সুবর্ণকে শুনিয়ে শুনিয়েই বলা। সে এসব দেখে যায়, শুনে যায়। না দেখে, না শুনে উপায়ও তো নেই। একটাই ঘর। সেই ঘরেই সব কিছু। শুধু টয়লেটটা ঘরের বাইরে। সবার জন্য উন্মুক্ত। হাতে সবুজ রঙের র‌্যাপিং পেপারে মোড়া একটা প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢোকে সুবর্ণ। দিতি খেয়াল করেনি।

রাতের আলোয় ঝিলমিল দেখে বাবান চেচিয়ে ওঠে— বাবা, এটা কী?

—গিফট। কাল দুপুরে একটা বিয়ের দাওয়াত আছে। দিতির কুঞ্চিত ভ্রূ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।

—বিয়ে? কার বিয়ে? কোথায় দাওয়াত?

—রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারে। আমাদের আগের বাসার পাশের ঘরের মফিজ ভাই ছিলেন না, তার মেয়ের বিয়ে। আজ সকালে কাজে যাওয়ার পথে হঠাৎ দেখা। মফিজ ভাইকে দিতি চেনে। কিন্তু তার বিয়ে না হওয়া মেয়ের কথা মনে করতে পারে না সে। তারপরেও ভাবে, হয়তো কেউ ছিল।

—শুনো, আলমারিতে তোমার সেই নতুন শাড়িটা আছে না?

—আছে। তো?

—ওটা কাল পরবে। আর বাবানকে কোন জামাটি পরাবে বলতো? সুবর্ণ জানতে চায়।

—সে আমি দেখে নেবো। তুমি আগে ফ্রেশ হও। দিতির কণ্ঠ ভৈরবী রাগের মতো শোনায়। তীব্র দাবদাহের পর এক পশলা বৃষ্টি হলে যেমন হয়, তেমন সিক্ত বাতাস বয়ে যায় ঘরময়। বাবানের চোখ-মুখ চকচক করে ওঠে।

—বাবা, ওরা কী আমাদের খেতে দেবে?

—হ্যাঁ, অবশ্যই।

—কী খাওয়াবে?

—বিয়েতে যা খাওয়ায়। পোলাও-মাংস।

—পোলাও-মাংস? সত্যি? কিসের মাংস? মুরগি?

—মুরগি, খাসি।

—আর, আর কী দেবে?

—প্রথমে মনে হয় বেগুনি দেবে। সঙ্গে বুটের ডাল। তারপর হয়তো রুই মাছ। তারপর...

—তারপর মুরগি, তাই না বাবা?

—হুম। এরপর মুরগির রোস্ট, খাসি, চাটনি। শেষে দই-মিষ্টিও দিতে পারে।

—আর কোকাকোলা?

—হুম, সেটাও দেবে হয়তো। যা গরম পড়েছে। ওটা না দিয়ে পারেই না।

—হুররে! কি মজা! কি মজা! পোলাও-মাংস খাবো, পোলাও-মাংস খাবো— এই বলে নাচতে থাকে বাবান। কে বলবে, এই ছেলেটিই কিছুক্ষণ আগে খাওয়া নিয়ে এতক্ষণ প্যানপ্যান করছিল। ছেলের মুখে আনন্দ দেখে সুবর্ণ জড়িয়ে ধরে। দিতিও চোখ মোছে শাড়ির আঁচলে। বহুদিন পর দিতি আজ আনন্দে কাঁদে। আলুসেদ্ধ ভাত গবগব করে খেয়ে নেয় বাবান। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় যায়। কখন সকাল হবে, এই নিয়ে তার যেন চিন্তার শেষ নেই।


৩.

সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস দিতির। আজ সেটার ব্যত্যয় ঘটে। উঠতে উঠতে আটটা বেজে যায়। স্বপ্নহীন গাঢ় ঘুম। উঠে চা করে। সঙ্গে শুকনো চোস্ট বিস্কুট। অন্যদিনের মতো আজ আর চুলা জ্বালাতে হয়নি। দুপুরে দাওয়াত। খাসির মাংস দিতির পছন্দ। তবে শেষ কবে খেয়েছে, মনেই পড়ে না। সকালে স্নান সেরে নেয় দিতি। শুক্রবার। বাবানেরও স্কুল বন্ধ। আজ সব অন্যরকম। উৎসব উৎসব ঘ্রাণ। কেউ না জানুক, সুবর্ণ তো জানে, দিতি এমনটা ছিল না, দারিদ্র্য তাকে এমনটা করেছে। দিতির কপালে আজ ভাঁজ নেই।

সময় যেন গড়াতেই চায় না। আটটা থেকে দশটা বাজতে যেন দশ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। বাবানকেও আজ ঘুম থেকে ডাকতে হয়নি। এমনি এমনি উঠে যায়।

—মা, স্নান করিয়ে দাও।

—একটু পর কর। এত সকাল সকাল স্নান করার তো কিছু নেই। যাবি তো সেই দুপুরে।

—আরে করিয়ে দাও তো। রেডি হতে কত সময় লাগবে জানো?

—বাব্বা! ছেলে মুখের কথা শোনো। তুই কি পার্লারে গিয়ে সাজবি নাকি?

—আরে ধুর! স্নান করিয়ে দাও না। আজ সাবান মাখবো।

যেই ছেলে সাবান তো দূর, স্নানের কথা শুনলেই কান্না জুড়ে দেয়, আজ তার কথা শুনে দিতির গালে টোল পড়ে। দূর থেকে সেটা দেখতে পেয়ে আপ্লুত হয় সুবর্ণ। আহা! কত দিন পর...

—কী কত দিন পর? সুবর্ণর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে দিতি।

—না, মানে কত দিন পর ঘরে মনে হয় একটু আলো-বাতাস ঢুকলো। এত দিন কেমন গুমোট লাগছিল।

—হয়েছে। তুমি স্নানে যাও।

—যাবো, আগে বাবানকে করাও।

—করাতে হবে না। সে নিজেই বাথরুমে ঢুকে গেছে।

—বলো কি! একা একাই?

—সে আর বলতে?


৪.

দুপুর একটা বাজতে না বাজতেই ঘরে তালা লাগায় সুবর্ণ। দিতির পাট করা একটাই শাড়ি। মেরুন রঙে দিতির আগের সেই লাবণ্য যেন ফিরে এসেছে। তার ওপর চুলে শ্যাম্পু করেছে। বাকিতে নয়, বরং নগদ দুই টাকা দিয়ে নিয়ে এসেছে ইমামের দোকান থেকে। হলুদ রঙের টি-শার্ট ও কালো হাফ প্যান্টে বাবানকে লাগছে রাজপুত্তুরের মতো। পায়ে স্কুলের জুতা। সুবর্ণর হাতে গিফটের প্যাকেট। দিতি জিগ্যেস করে, কী আছে ওতে?

—মেলামাইনের সেট।

—মেলামাইন? সে তো অনেক দাম। কাচের কিছু কিনতে পারতে। একটু কম পড়তো।

—আরে ও নিয়ে তুমি ভেবো না তো।

—কত নিলো?

—পাঁচশ।

—পাঁচশ? বলে চোখ রসগোল্লা করে ফেলে দিতি। এই দেখে বাবানের চোখও যেন কপালে উঠে যায়।

—এই বাজারে পাঁচশ টাকা কিছুই না দিতি। কিচ্ছু পাওয়া যায় না। সেদিনের সেই গুড়ের বাতাসা পিঁপড়ায় খেয়েছে গো। আগে দুশো টাকায় ব্যাগ ভরে কাঁচাবাজার করা যেত। এখন আলুর কেজি চল্লিশ টাকায় ঠেকেছে। এসব বাজার-সংবাদ কথা শুনতে বাবানের মোটেও ভালো লাগে না। মা-বাবার কথার মাঝে বলে ওঠে, আচ্ছা বাবা, আমাকে কিন্তু তুমি মুরগির রান দেবে। ঠিক আছে?

—ঠিক আছে বাবু সোনা।

—আর নল দেওয়া খাসির মাংস দেবে কিন্তু। চুষে চুষে খাওয়া খাবো। ওই যে, সেইবার দিয়েছিলে। ঝাল হলে জল দিয়ে ধুয়ে দেবে, ঠিক আছে?

—আচ্ছা বাবা, আচ্ছা। দেবো, দেবো। এত চিন্তা করো না। কথা বলতে বলতে তারা চলে এলো কমিউনিটি সেন্টারের সামনে। ঢুকতেই রিসিপশন। সেখানে গিফট বক্সটা রেখে ভেতরে ঢুকলো সুবর্ণ। থরে থরে টেবিল সাজানো। চারপাশ খাবারের ম ম গন্ধ। বাবা-মায়ের মাঝে বাসা বাবানের চোখে খুশির ঝিলিক। এক এক করে টেবিলে লোক বসতে শুরু করে। সেখানে আগে থেকেই প্লেট উল্টো করে রাখা, সঙ্গে গ্লাস। এক এক করে প্রতিটি টেবিল ভরতে থাকে। প্রতিটি টেবিলে খাবার সার্ভ করার জন্য একজন পুরোদস্তুর সাদা পোশাকের বয়। সবগুলো টেবিল ভরে গেলেই শুরু হবে খাবার দেওয়া। বিশাল হল রুম। ফ্লোরের এক পাশে লম্বা টেবিলে বাটি ভর্তি খাবার সাজানো। এখন কেবল মনিবের হুকুমের অপেক্ষা। বাবানের যেন তর সয় না। কিছুক্ষণ আগে প্রতি টেবিলে জল দিয়ে গেল বয়। প্লেট উল্টে তাতে জল ঢাললো সুবর্ণ। বাবান ও দিতিকেও দিলো। সবাই হাত ধুয়ে নেয়। বড় একটা প্লেটে করে পোলাও এনে রাখে। সেখান থেকে ধোঁয়া ওঠে। আহ! কি সুবাস। চামচ দিয়ে প্রথমে বাবানের প্লেটে পোলাও তুলে দেয় সুবর্ণ। এরপর দিতির প্লেট বাড়াতে বলে।

—আরে তুমি নাও না। দিতি আপত্তি করে বলে।

—একটু সেবা করতে দাও। সারাদিন যে খাটাখাটনি করো, তোমাকে একটু যত্মআত্তি করবো, সেই সুযোগ কোথায় বলো? রসিকতার স্বরে বলে সুবর্ণ।


৫.

রিসিপশনের পাশে একটা জটলার ফিসফিস শোনা যায়। হয়তো খাবার দিতে দেরি হচ্ছে বলেই এমন কাণ্ড! এতক্ষণ যে বয়টি সুবর্ণদের এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছিল, সে এসে সুবর্ণর কানের কাছে বলে, স্যার আপনাকে ডাকছে।

—স্যার? কোন স্যার?

হাত ইশারায় বয়টি দূরে জটলায় দাঁড়িয়ে থাকা তার স্যারকে দেখায়।

সুবর্ণ অবাক হয়ে বলে, আমাকে? কেন?

—তা তো জানি না।

দিতির চোখে বিস্ময়। বাবান একমনে কুটকুট করে পোলাও চিবিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। তার সেই দিকে মন দেওয়ার সময় কোথায়? সুবর্ণ উঠে দাঁড়ায়। দিতিও উঠতে যাচ্ছিল, হাত ইশারায় তাকে বসতে বলে সুবর্ণ। রিসিপশনের একপাশে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা কয়েকজন মধ্যবয়স্ক লোক নিজেদের মধ্যে কী নিয়ে যেন আলোচনা করছে। সুবর্ণ সেখানে দিয়ে দাঁড়াতেই কালো করে রোগা মতো লোকটি প্রশ্নটি করেন, ভাই, আপনারে তো ঠিক চিনবার পাল্লাম না।

—আমি সুবর্ণ। রায়েরবাজারেই থাকি।

—সে না অয় বুঝবার পাল্লাম। কিন্তু আপনারে ক্যাঠায় দাওয়াত দিচে, কন তো?

—আমি আসলে...

—গিফট বাস্কে নাম না দেইখাই খটকা লাগচিল। মন কইচিল, নিশচিৎ কুনো গরবর আচে। অন্য একজন বলে। রিসিপশনের দায়িত্বে থাকা ছেলেটির দিকে আঙুল উঁচিয়ে অন্য আরেকজন বললো, ওই ছ্যালিম্যা, ওর গিফট বক্সটা খুল তো। সেলিম নামের ছেলেটি ফটাফট ছিড়ে ফেলে র‌্যাপিং পেপার। বাক্সটাও টেনে ফার করে দেয়। ভেতরে পত্রিকার কাগজ। সেটায় মোড়ানো মস্ত বড় একটা ইটের টুকরো। এমন দৃশ্য দেখে একজন বলে, আব্বে হালায় ফাউ খাইবার আইচে? দিবো নাক্কি ইট দিয়া একটা ছেচা?

—না। মানে... সুবর্ণ ইতস্তত করতে থাকে। লজ্জা ও ভয়— দুই-ই পেয়ে বসে।

—আব্বে, মানে মানে মারাইবার লাগছেন ক্যালা? কান-চাপায় একখান চটকনা দিবো নাকি? কি কন সুরুজ ভাই? কালো লোকটিই সুরুজ, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না সুবর্ণর। মাথা নিচু করে রাখে। ধীরে চোখ তুলে তাকায়। আবার চোখ নামিয়ে নেয়।

—থাক, হুদাই চিল্লাচিল্লি করবার দরকার নাইক্যা। মাইয়্যার বাড়ির লোকজন এক্কনি আইয়্যা পড়বো গিয়া। প্রকাশ্যে হাতেনাতে অপরাধ ধরা পড়ে গেলে মানুষ কী করে— সেই অভিজ্ঞতা সুবর্ণর কোনোকালেই হয়নি। তাই সে কেবল আকুতি করতে থাকে। বলে, দেখুন, আমি বরং চলে যাচ্ছি। কিন্তু আমার স্ত্রী-সন্তানটিকে একটু খেতে দিন প্লিজ। ছেলেটা অনেক দিন ভালো কিছু খেতে পায়নি। অন্তত তাকে...

পাশে দাঁড়ানো চুলে স্পাইক করা চ্যাংড়া মতো ছেলেটি তেড়ে বলে, এই হালায় কয় কী? ফকির-মিসকিন খাওয়াইবার লাগবার আচি নাকি? এইডা কি কাঙালি ভোজ পাইবার লাগচো নাকি মিয়া? আব্বে, বালায় বালায় ফুটো। নইলে...

হাত উঁচু করে ছেলেটিকে থামিয়ে সুরুজ আলী এবার বলে, দেহেন ভাই, আপনারে দেইখ্যা তো ভদ্দর লোকই মনে অয়। তয়, এই কাম করবার লাগাইচেন ক্যালা? আমরা কুনো কাবজাব করবার পারমু না। মানে মানে কাইট্যা ড়েন। আমি কুনো সিন কিরিয়েট করবার চাই না। তবুও ক্ষমা ভিক্ষা চেয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে সুবর্ণ। মিনতি করতে থাকে নাছোড়বান্দা ভিখারির মতো। এত দিনের শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, বিবেকের স্তম্ভগুলো এক এক করে ধসে পড়তে থাকে— মিশে যেতে থাকে ধুলোয়। সুবর্ণর ব্যক্তিত্ব এখন কেঁচোর থেকে খুব উন্নত দেখায় না। তার পরেও ভগ্ন দেহে দাঁড়িয়ে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায়। পেছনে কখন দিতি এসে কাঠ হয়ে এতক্ষণ সব শুনতে থাকে— একদমই টের পায়নি। পাশে বাবানের চোখে ভয় মেশানো অশ্রু। তেলচিটে হাতে তার দুই-তিনটা পোলাওয়ের দানা লেগে আছে। সকলের চোখ দিতি ও বাবানের দিকে গেলে সুবর্ণ পেছন ফেরে তাকায়। বাবানের হাত পিছলে একটি  না মাটিতে খসে পড়ে।


অঞ্জন আচার্য

কবি ও গল্পকার, ঢাকা, বাংলাদেশ


বামিহাল সাহিত্য পুরস্কার-২০২২ এর খবর

Post a Comment

0 Comments