আমার নাম লাবণ্য নয়। জন্মসনদ, শিক্ষাসনদ কিংবা পরিবারের কোনো কাগজে এই নাম লেখা নেই। সবাই আমাকে আমার আসল নামেই চেনে। শুধু একজন আমাকে লাবণ্য বলত, সে হলো অনিমেষ।
তখন আমি অনার্সে প্রথম বর্ষের আইন বিভাগের ছাত্রী। সামনে পরীক্ষা ছিল। লাইব্রেরিতে বসে একগাদা বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতাম। চোখে চশমা, চুলে তেল, পরনে সাধারণ পোশাক। সাজগোজ করার সময় ছিল না, ইচ্ছেও ছিল না। পরীক্ষার চিন্তায় বইয়ের বাইরে কোনো দিকে তাকাতাম না।
অনিমেষ পড়ত অর্থনীতিতে। আমার ছোটবেলার বান্ধবী রিমার বন্ধু ছিল। অনেক দিন পর রিমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। রিমাই একদিন ওকে লাইব্রেরিতে নিয়ে এসেছিল।
রিমা আমাকে দেখে বলল, কিরে, তোকে তো চেনাই যাচ্ছে না! কী অবস্থা তোর, আয়নায় নিজেকে দেখিস না?
আমি বললাম, দোস্ত, সামনে পরীক্ষা। ভীষণ চাপের মধ্যে আছি রে। পাশ করতে না পারলে মান-ইজ্জত সব শেষ হয়ে যাবে।
রিমা বলল, কিসের মান-ইজ্জত?
আমি বললাম, আর বলিস না। বাড়ি থেকে বিয়ের কথাবার্তা চলছে। ফেল করলে পাত্রপক্ষের কাছে মান-ইজ্জত থাকবে বল?হুম হুমম বল বল?
রিমা হেসে ফেলল। বলল, তুই না একটা যা তা! সেই আগের মতোই আছিস। আচ্ছা শোন, ও অনিমেষ। আমার সঙ্গেই ইকোনমিক্সে পড়ে, আমার খুব ভালো বন্ধু।
আমি বই থেকে মুখ তুলে একবার তাকিয়েছিলাম।
হাই অনিমেষ
ও হাত নেড়ে উত্তর দিয়েছিল—ব্যস, এটুকুই
অনিমেষ আমাকে দেখেছিল, কিন্তু আমাকে দেখে ওর মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা গেল না। সৌজন্যের জন্য দু-একটি কথা বলেই রিমার সঙ্গে চলে গেল। ও আমাকে পাত্তা দেয়নি, এটা মনের ভেতর খট করে একটা আওয়াজ দিয়েছিল। কিন্তু আমিও ওকে নিয়ে ভাবার সময় পাইনি।
কয়েক মাস পর রিমার জন্মদিন। রিমা ফোন করে বলল, দোস্ত, আসবি কিন্তু। আমার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ছোট একটা আয়োজন করেছি। তুই মিস করবি না কিন্তু।
আমিও রাজি হয়ে গেলাম।
সেদিন আমি সাদা পোশাক পরেছিলাম। তখন সালমান খান আর কাজলের সুপারহিট সিনেমা পেয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়ার সময়। সেই সিনেমায় কাজলের পরা পোশাকের মতো করে ড্রেস বানিয়েছিলাম—ভেতরে কামিজ, ওপর লং কোটি, স্টোন দিয়ে অর্ধেকটা আটকানো, সঙ্গে চুড়িদার, গলার সঙ্গে ওড়না। চুল সুন্দর করে বাঁধা, চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে ডিপ মেরুন লিপস্টিক, হাতে ব্রেসলেট, শরীরে হ্যাভক পারফিউমের গন্ধ। পায়ে ছিল সুন্দর ম্যাচিং স্টোনের জুতো।
আমি সেখানে যেতেই অনিমেষ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। লাইব্রেরির চশমা পরা, চুলে তেল দেওয়া মেয়েটির সঙ্গে আমাকে বোধ হয় মেলাতে পারছিল না।
হঠাৎ বুক চেপে ধরে সবার সামনে বলে উঠল, ও মাই গড! আমার বুকের ভেতর চিনচিন করছে। হায়, ম্যায় মর গ্যায়া! এক লড়কি মুঝে মার ডালা!
এরপর হাত কপালে দিয়ে বলল, এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লাগা , জ্যায়সে খিলতা গুলাব, জ্যায়সে শায়র কা খ্বাব, জ্যায়সে উজলি কিরণ, জ্যায়সে বন মে হিরণ, জ্যায়সে চান্দনি রাত, জ্যায়সে নরমী বাত, জ্যায়সে মন্দির মে হো এক জ্বলতা দিয়া,
ওর কাণ্ড দেখে সবাই হেসে উঠল। আমি লজ্জায় কোথায় তাকাব বুঝতে পারছিলাম না। প্রথম দিন যে ছেলে আমাকে ঠিকমতো দেখেইনি, সে-ই এখন এমন কাণ্ড করছে। মনে মনে রাগও হচ্ছিল খুব।
রিমা ওকে থামতে বলল, আরে থাম না, বেচারি লজ্জা পাচ্ছে তো।
অনিমেষ থামল না। আমার দিকে তাকিয়ে আরও কিছুক্ষণ অভিনয় করল। বন্ধুরা কেউ হাসছিল, কেউ ওকে আরও উসকে দিচ্ছিল। আমি ভেবেছিলাম, ছেলেটি শুধু মজা করছে। সবাইকে হাসাতে আমাকে নিয়ে একটু বাড়াবাড়িই করছে মনে হয়।
কিছুক্ষণ পর দেখি অনিমেষ একটি সাদা টিস্যু নিল। কলম দিয়ে তাতে কিছু লিখে সবার সামনেই আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, বাড়িতে গিয়ে দেখবে।
বাড়িতে এসে টিস্যু খুলে দেখি তাতে লেখা—
তুমি আমার লাবণ্য। তুমি অন্য কারো হতে পারো না। আর পরীক্ষায় ফেল করলেও আমার কাছে তোমার মান-ইজ্জত কিছু যাবে না। লাভ ইউ লাবণ্য, আমার লাবণ্য হয়েই থেকো।
তখন বুঝিনি, এই এক টুকরো টিস্যুতে লেখা নামটি বহু বছর আমার সঙ্গে থেকে যাবে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত আমাকে বহন করে বেড়াতে হবে।
শুরুতে ওর সব কথাই আমার কাছে ফান মনে হতো। অনিমেষ বন্ধুদের সঙ্গে খুব হাসাহাসি করত। আমাকে দেখলেই সিনেমার সংলাপ বলত, অভিনয়ের ছলে বারবার আমার হাত ধরত। প্রায় সময় একটা গানই করত—পেয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া, যাব পেয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া।
কখনো বলত, ইয়ে লড়কি মুঝে মার ডালা!
কখনো আমার দিকে তাকিয়ে সিনেমার নায়কের মতো বুকের ওপর হাত রেখে বলত, দিল তো পাগল হ্যায়!দিল দিওয়ানা হ্যায়..
আমি হাসতাম। বলতাম, তোমার মাথা ঠিক আছে?
ও বলত, তোমাকে দেখলে ঠিক থাকে না।
মোট কথা, ও সবাইকে নিয়ে মেতে থাকত। আমিও ওর কথার জবাব দিতাম। কখনো হাসতাম, কখনো পাত্তা না দেওয়ার ভান করতাম। আমাদের পরিচয়টাকে তখনও কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্ক বলে ভাবিনি। কোনো নামও দিতে পারিনি সেই সম্পর্কের।
লাইব্রেরিতে প্রথম পরিচয়ের পরও অনিমেষের সঙ্গে আমার অসংখ্যবার দেখা হয়েছিল। তবে সেই দেখাগুলো এক-দুই মিনিটের বেশি স্থায়ী হতো না। আমরা তখন শুধুই পরিচিত বন্ধু। কখনো ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়ার সময় সামনে পড়ে যেত, কখনো রিমার সঙ্গে কোথাও দাঁড়িয়ে থাকলে দু-একটি কথা হতো। ও আমাকে কিছুটা এড়িয়ে চলত, আমিও ওকে তেমন আলাদা করে গুরুত্ব দিতাম না।
কোনো দিন ওর সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া হয়নি। কখনো দেখতাম, রিমা আর ওর বন্ধুরা পুকুরপাড়ে বসে ফুচকা খাচ্ছে। আমি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রিমা ডেকে বলত, আয়, ফুচকা খেয়ে যা।
আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের সঙ্গে ফুচকা খেতাম। সবার সঙ্গে সাধারণ দু-একটি কথা বলে চলে যেতাম। অনিমেষও সেখানে থাকত, কিন্তু আমাদের মধ্যে আলাদা করে কিছু ঘটত না।
আমার মনে হয়েছিল, অনিমেষ আমাকে তেমন পছন্দ করে না। সম্ভবত ওরও ধারণা হয়েছিল, আমি তাকে পছন্দ করি না। দুজনেই দুজনকে সামান্য অবহেলা করে নিজের মতো থাকতাম।
এই জন্যই রিমার জন্মদিনে অনিমেষের আচরণ আমাকে এতটা অবাক করেছিল। যে ছেলে এতবার দেখা হওয়ার পরও আমাকে আলাদা গুরুত্ব দেয়নি, সেই ছেলেই সেদিন সবার সামনে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে টিস্যুতে লিখেছিল—তুমি আমার লাবণ্য।
তখনও আমি ওর কথাকে সত্যিকারের প্রেমের প্রস্তাব ভাবিনি। আমার মনে হয়েছিল, অনিমেষ আবারও ফান করছে। আমিও পুরো ব্যাপারটি মজা হিসেবেই নিয়েছিলাম।
কিন্তু সেই ফান আর খুনসুটি করতে করতেই আমরা কখন যে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলাম, শুরুতে কেউ বুঝতে পারিনি। একসময় দেখলাম, ওর সঙ্গে দেখা না হলে আমার দিনটাও আর আগের মতো কাটে না। বুকের কোনখানে জানি খচখচ করে। ওকে দেখলেই অন্যরকম আনন্দে মনটা ভরে যেত।
অনিমেষ তখন আর মজা করার জন্য আমার কাছে আসত না। ক্যাম্পাসে আমাকে না দেখলে খুঁজত। আমার পড়ার জায়গার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকত। আমি কোথায় আছি, কার সঙ্গে আছি, কখন ক্লাস শেষ হবে—খোঁজ নিত।
অনিমেষ রিমাকে ফান করে বউ বলে ডাকত। রিমাও সেটা উপভোগ করত। ওদের বন্ধুত্ব বেশি দিনের না। আমার সঙ্গে রিমার বন্ধুত্বও ছোটবেলার। অনিমেষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল রিমার হাত ধরেই।
শুরুর দিকে রিমাই আমাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি মজা করত। অনিমেষ আমাকে লাবণ্য বলে ডাকলে ও হেসে বলত, এই নামটা আবার কোথা থেকে এলো?
অনিমেষ বলত, আমিই দিয়েছি।
রিমা তখন বলত, ও তাই নাকি! বেশ তো, এখন আসল নাম রেখে নাম দেওয়া-নেওয়া চলছে। ভালো ভালো।
পরে একদিন পুকুরপাড়ে আমরা কয়েকজন ফুচকা খাচ্ছিলাম। অনিমেষ আমার প্লেট থেকে একটা ফুচকা তুলে নিয়ে বলল, এটা খেও না, অনেক ঝাল।
আমি বললাম, আমি ঝাল খেতে পারি।
সে ফুচকাটা নিজের মুখে দিয়ে দিল।
রিমা তখন কটাক্ষ করে বলল, বাহ, কী দারুণ! ও ঝাল খেতে পারবে, তারপরও তুই ওকে ঝাল খেতে দিবি না? লক্ষ্মণ তো মোটেও ভালো লাগছে না।
এরপর থেকে রিমা আমার সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দিল। ধীরে ধীরে আমাদের সঙ্গে বসাও কমে গেল। অনিমেষ এলে অন্যদিকে চলে যেত। আমরা সবাই মিলে কোথাও গেলে মাঝপথে বলত, তোরা যা, আমি আসছি—তারপর আর আসত না।
একদিন আমি একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, রিমা, তুই কি আমার ওপর রাগ করেছিস?
সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, না।
তাহলে?
কী তাহলে?
আমি হেসে বললাম, তুই আগের মতো নেই।
রিমা ব্যাগের চেইন টানতে টানতে বলল, মানুষ কি সবসময় একই রকম থাকে?
আমি বললাম, রিমা, তুই কি অনিমেষকে ভালোবাসিস?
সে মাথা নেড়ে বলল, না। অনিমেষ আমার ভালো বন্ধু। এর বেশি কিছু না।
আমি আর কিছু বললাম না।
পরে বুঝেছিলাম, রিমা অনিমেষকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখত না। ওকে অনেক বেশি কিছু ভেবেছিল বলেই হয়তো আমাদের দুজনের কাছ থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়েছিল।
অনিমেষের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল যে মেয়েটি, একসময় সেই মেয়েটিই আমাদের দুজনের মাঝখান থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়েছিল।
আমি তখন শুধু ভেবেছিলাম, রিমা বদলে গেছে। অনেক পরে বুঝেছিলাম, বদলটা শুধু তার ছিল না—আমাদের তিনজনের সম্পর্কটাই বদলে গিয়েছিল।
অনিমেষের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা তখন ধীরে ধীরে অন্য রকম হয়ে উঠছিল। আগে যেখানে দু-এক মিনিটের দেখা হতো, এখন ও আমাকে না দেখলে খুঁজত। আমার পড়ার জায়গার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। কখন ক্লাস শেষ হবে, কোথায় আছি, কার সঙ্গে আছি—এসব জানার একটা অদ্ভুত আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ওর মধ্যে।
পুকুরপাড়ে আমাদের আড্ডাও নিয়মিত হয়ে উঠেছিল। অনিমেষ ছিল সবচেয়ে বেশি কথা বলা মানুষ। গল্প করতে করতে হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে থেমে যেত।
আমি জিজ্ঞেস করতাম, কী হলো?
ও বলত, তোমার দিকে তাকালে কী বলছিলাম ভুলে যাই।
কথাটা শুনে আমি হাসতাম। ওর এমন কথা তখন আমার কাছে খুব স্বাভাবিকই লাগত।
অনিমেষের বাড়ি ছিল কুষ্টিয়া থেকে দুই স্টেশন দূরে কুমারখালীতে। ওর বাবা সরকারি ভেটেরিনারি হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন। তিন বোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে অনিমেষই একমাত্র ছেলে। বাড়ির সবার খুব আদরের ছিল।
আমার আব্বু ছিলেন কুষ্টিয়া কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী। আমাদের পরিবারেও নিয়মকানুন ছিল বেশ কড়া। কোথাও যেতে হলে অনেক কিছু ভেবে যেতে হতো। অনিমেষের সঙ্গে আমার এই সহজ মেলামেশার কথাও বাড়িতে কেউ জানত না।
একদিন আব্বু আমাকে ক্যাম্পাসে দিয়ে গিয়েছিলেন। গেটের কাছে রাসেল, চপল আর অনিমেষ দাঁড়িয়ে ছিল। আব্বুকে দেখে আমি দূর থেকেই অনিমেষকে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, যেন কাছে না আসে।
কিন্তু সে আমার ইশারা বুঝেও না বোঝার ভান করল। সোজা আব্বুর কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করল, যেন অনেক দিনের পরিচয়।
চাচা, কেমন আছেন? অনেক দিন তো আসেন না। আমার মা আপনার কথা জিজ্ঞেস করেন।
আব্বু কিছুটা অবাক হয়ে আমার কাছে জানতে চাইলেন, ছেলেটা কে।
আমি তখন এমন ভাব করলাম, যেন ছেলেটাকে চিনিই না।
বললাম, হয়তো কারও সঙ্গে ভুল করেছে।
ক্যাম্পাসে ঢোকার পর অনিমেষকে পেয়ে আমি রাগে অস্থির। আব্বুকে কেন এসব বলেছে, সেটা জানতে চাইলাম। সে খুব স্বাভাবিকভাবে জানাল, কোনো দিন আসেননি বলেই তো অনেক দিন হয়ে গেছে।
ওর সেই নির্বিকার মুখ দেখে রাগে আমি ওকে একটা চড় মেরে দিয়েছিলাম।
এরপর প্রায় এক সপ্তাহ ওর সঙ্গে কথা বলিনি।
তখন মোবাইল ফোনের সময় ছিল না। আমাদের বাসার বসার ঘরে একটা ল্যান্ডফোন ছিল। একদিন আব্বু এসে বললেন, তোর ফোন।
ফোন ধরতেই ওপাশে অনিমেষ। আগের রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করছিল। শনিবার ক্লাসে আসব কি না, সেটাও জানতে চাইল। আমি বেশি কথা বলিনি। ও বুঝেছিল, আমার রাগ এখনও কাটেনি।
অনিমেষ মাঝে মাঝে বাসায় ফোন করত। আমাকে না পেলে খবর নিত। আমি ফোন ধরলে খুব আস্তে করে লাবণ্য বলে ডাকত। এরপর জানতে চাইত, সেদিন ক্যাম্পাসে কেন যাইনি। আমি অসুস্থতার কথা বললে অভিযোগ করত, ওকে জানাইনি কেন।
আমার রাগের ব্যাপারটাও ছিল মজার। একদিন খুব সামান্য একটা বিষয়ে অনিমেষের ওপর রাগ করেছিলাম। ঠিক করেছিলাম, সেদিন ওর সঙ্গে কোনো কথাই বলব না। ও কয়েকবার এসে সামনে দাঁড়াল, আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
একসময় ও বলল, লাবণ্য, আমার সঙ্গে কথা বলবে না?
আমি চুপ করে থাকলাম।
ও আবার বলল, অন্তত একবার আমার দিকে তাকাও।
আমি তাকালাম না।
কিছুক্ষণ পর ও চুপ করে আমার সামনে বসে রইল। তারপর খুব আস্তে করে বলল, তুমি সত্যিই আমাকে এতটা রাগ করে থাকতে পারো?
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
হঠাৎ দেখি ওর চোখে পানি।
প্রথমে ভেবেছিলাম, আবার অভিনয় করছে। কিন্তু একটু পর সত্যিই ওর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
আমার সমস্ত রাগ এক মুহূর্তে কোথায় যেন চলে গেল। হেসে ফেললাম।
আমার হাসি দেখে ও চোখ মুছে অভিমান করে বলল, তুমি খুব পাষাণ।
আমি বললাম, ছেলেরা আবার এভাবে কাঁদে নাকি?
ও বলল, তোমার কাছে কাঁদলে ক্ষতি কী?
সেদিনের পর বুঝেছিলাম, অনিমেষের সঙ্গে রাগ করে থাকা আমার পক্ষে খুব কঠিন। ওর চোখে পানি দেখলেই আমার সমস্ত রাগ কোথায় যেন গলে যেত।
এই সময়েই অনিমেষকে চিঠি লেখা শুরু করেছিলাম। আমি চিঠি লিখতে খুব ভালোবাসতাম। ওকে লিখতে বসলে নিজের অজান্তেই ভাষাটা একটু অন্য রকম হয়ে যেত। পুকুরপাড়ের বিকেল, ট্রেনের হুইসেল, কুমারখালীর দূরত্ব, দেখা না হওয়ার কষ্ট—এসব চলে আসত চিঠির পাতায়।
অনিমেষ আমার লেখা চিঠি নিজের বন্ধুদের পড়ে শোনাত। রাসেল, চপলরা আমার কাছে মজা করে নিজেদের প্রেমের চিঠি লিখে দিতে বলত। কারও প্রেমিকার সঙ্গে রাগারাগি, কারও মান ভাঙানো, কারও আবার কী বলতে হবে বুঝতে না পারা—সব শুনে আমি তাদের হয়ে চিঠি লিখে দিতাম। সেই বয়সে বিষয়টা আমার কাছে বেশ মজারই ছিল।
অনিমেষ নিজে চিঠি লিখতে পারত না। ওর লেখা বলতে দু-চারটি বাক্যের বেশি এগোত না। কখনো একটা পুরো পাতায় শুধু আমার নাম লিখে ভরিয়ে ফেলত।
আমি মজা করে বলতাম, এতবার লাবণ্য লিখলেই তো আর চিঠি হয়ে যায় না।
ও বলত, আমার যা বলার, এই নামের মধ্যেই আছে।
ওর এই অল্প কথার চিঠিগুলো নিয়ে আমি হাসতাম। তখন বুঝিনি, যে ছেলে নিজের মনের কথা কয়েকটি বাক্যের বেশি লিখে বলতে পারত না, সে-ই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে থাকবে।
একদিন অনিমেষ আশ্চর্য একটা কাজ করল। সাদা কাগজে রক্ত দিয়ে লিখে আনল—লাভ ইউ লাবণ্য।
লেখাটি দেখে আমি মুগ্ধ হওয়ার বদলে বললাম, ছিঃ! কী এটা?
অনিমেষ আমার প্রতিক্রিয়া দেখে হতাশ হয়ে গেল।
আমি কাগজটি উল্টেপাল্টে দেখে বললাম, সত্যি করে বলো তো, শেভ করতে গিয়ে গাল কেটেছিল, সেই রক্ত দিয়ে লিখেছ? নাকি মশা মেরে তার রক্ত দিয়ে?
কী যে বলো না তুমি! তুমি এমন আনরোমান্টিক কেন, লাবণ্য?
আমি আনরোমান্টিক? তোমার মাথা ঠিক আছে?
দাঁড়াও, আমি সত্যিটা বের করবই।
বলেই ওর গাল ধরে কাটা দাগ খুঁজতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত আমার সন্দেহই ঠিক হলো। শেভ করতে গিয়ে ওর গাল কেটেছিল। সেই রক্ত দিয়ে কথাটি লিখেছে।
আমি বললাম, গাল কাটার রক্ত দিয়ে প্রেমপত্র লিখে এখন আমাকে মুগ্ধ করতে এসেছ?
অনিমেষের রক্ত দিয়ে চিঠি লেখার ঘটনা আর গোপন থাকল না। ওর বন্ধুরা জেনে গেল। সবাই হাসাহাসি করতে লাগল, ওকে ক্ষ্যাপাতে শুরু করল।
আমি রক্তের চিঠির চেয়ে ওর গাল কাটা নিয়ে বেশি চিন্তা করেছিলাম। পরে ওকে একটি দামি ইলেকট্রনিক শেভার কিনে দিয়েছিলাম।
প্যাকেটটি হাতে দিয়ে বলেছিলাম, এবার থেকে এটি দিয়ে শেভ করবে। গাল কাটবে না। আর রক্ত দিয়ে চিঠিও লিখতে হবে না।
শেভারটি পেয়ে অনিমেষ খুব খুশি হয়েছিল।
অনিমেষ যখন সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া নিয়ে খেলা করত, তখন আমার দারুণ লাগত। কোনো ছেলে সিগারেট খেলে তাকে যে এত সুন্দর লাগে, সেটা ওকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না।
আমি ওকে একটি লাইটারও দিয়েছিলাম। সেটি খুলে আগুন জ্বালালে সঙ্গে টুংটাং মিউজিক বাজত। অনিমেষ বারবার লাইটারটি জ্বালিয়ে মিউজিক শুনত। জিনিসটি ওর খুব পছন্দ হয়েছিল।
আমি বলেছিলাম, যখন তুমি একা থাকবে, এটা জ্বালাবে। এর মিউজিক শুনলে তোমার মনে হবে আমি তোমার পাশেই আছি।
ও যে আমাকে কিছু দেয়নি, তা নয়। ও আমাকে একটি সোনার আংটি আর রুপার নূপুর দিয়েছিল। আংটিটি প্রকাশ্যে পরার সাহস আমার হয়নি। বাড়ির সবাই দেখলে কী বলব? নূপুরটিও সবার চোখের আড়ালে রাখতাম।
একবার কোনো একটি কারণে ক্যাম্পাস একুশ দিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। ঠিক কী কারণে বন্ধ হয়েছিল, এত বছর পর সেটি আর মনে নেই। শুধু একুশ দিনের কথা মনে আছে।
একুশ দিন অনিমেষের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।
তখন মোবাইল ফোনের সময় ছিল না। দোকানের ফোন আর বাড়ির ল্যান্ডফোনই ভরসা ছিল। কথা হলেও পাশে পরিবারের কেউ শুনছে কি না, সেই ভয় থাকত। অনেক কথা মনে জমত, বলা হতো অল্প।
একুশ দিন পর ক্যাম্পাস খুলল।
আমি পুকুরপাড়ে বসেছিলাম। দূর থেকে অনিমেষকে আসতে দেখে প্রথমে ঠিক চিনতে পারিনি। ও মুখভর্তি দাড়ি রেখেছে।
কাছে আসার পর জিজ্ঞেস করলাম, এ কী অবস্থা তোমার? দাড়ি কাটোনি কেন?
অনিমেষ বলল, পণ করেছিলাম, যতদিন তোমার সঙ্গে দেখা হবে না, ততদিন দাড়ি কাটব না।
আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, আবার দুষ্টুমি করছে।
বললাম, যদি ক্যাম্পাস আরও দুই মাস বন্ধ থাকত?
দুই মাসই দাড়ি কাটতাম না।
এক বছর বন্ধ থাকলে?
তুমি দেখা না করা পর্যন্ত কাটতাম না।
ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম, কথাটি মজা করে বলছে না।
প্রথম দিনের অনিমেষকে মনে পড়েছিল। যে আমাকে দেখে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। আবার রিমার জন্মদিনের সেই অনিমেষকেও মনে পড়েছিল, যে বুক চেপে সবার সামনে সিনেমার সংলাপ বলেছিল।
সেই ছেলেটিই একুশ দিন আমাকে দেখতে না পেয়ে দাড়ি কাটেনি।
ওর সঙ্গে সম্পর্কটিকে শুরুতে আমি ফান হিসেবে নিয়েছিলাম। মনে করেছিলাম, অনিমেষ কিছুদিন দুষ্টুমি করবে, আমিও হাসব, এখানেই শেষ। কিন্তু একুশ দিন পর ওকে দেখে বুঝেছিলাম, অনিমেষের কাছে বিষয়টি কোনো দিনের জন্যই শুধু ফান ছিল না। আমাকে না দেখার দিনগুলো সে গুনেছে।
একবার পয়লা বৈশাখের একটি দিনও আমার স্পষ্ট মনে আছে।
সেদিন শাড়ি পরে বের হয়েছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করেছিলাম। অনিমেষও ছিল। একসময় ঝুম বৃষ্টি নামল। ফিরতে হবে, অথচ বৃষ্টি থামছিল না।
শেষ পর্যন্ত অনিমেষ আর আমি একটি রিকশায় উঠলাম। রিকশার হুড তোলা ছিল। অনিমেষ হঠাৎ হুডটি নামিয়ে দিল।
আমি বললাম, কী করছ? ভিজে যাব তো!
ও বলল, বৃষ্টিতে ভেজার জন্যই তো হুড নামিয়েছি।
প্রায় চল্লিশ মিনিট আমরা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রিকশায় ঘুরেছিলাম। শাড়ি ভিজে গিয়েছিল। চুল, কাজল, সাজ—কোনোটির অবস্থা নিয়ে তখন আর ভাবিনি।
সেই চল্লিশ মিনিট আমরা খুব বেশি কথা বলিনি। শুধু হাত ধরে বসেছিলাম। রিকশা চলছিল তার আপন গতিতে।
বৃষ্টির মধ্যে রিকশাটি চলছিল, আর আমরা মনে মনে নিজেদের মতো করে আগামী দিনের কথা ঠিক করছিলাম। তখন আমাদের বিশ্বাস ছিল, দুজন মানুষ সত্যি করে চাইলে তাদের আলাদা করা যায় না।
বয়স কম থাকলে প্রতিশ্রুতির ওপর সন্দেহ আসে না। মনে হয়, আজ যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি সারাজীবন একই রকম থাকবে।
পরে অনিমেষের কথা বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেলো মাস্টার্স করার জন্য আমাকে ঢাকায় ঢাকায় চাচার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
অনিমেষের বাবার বদলি হলো অন্য শহরে। ওদেরও কুমারখালী ছেড়ে যেতে হলো। কুষ্টিয়া থেকে দুই স্টেশন পেরোলেই যে ছেলেটির কাছে পৌঁছানো যেত, সে আরও দূরে চলে গেল।
প্রথম দিকে আমাদের চিঠি চলেছিল। নতুন ঠিকানায় চিঠি পৌঁছাতে দেরি হতো। কখনো যোগাযোগ হতো, কখনো দীর্ঘ সময় কোনো খবর পাওয়া যেত না।
ল্যান্ডফোনের নম্বর বদলে গেল। পরিচিত দোকানটি আর আমাদের কথার জায়গা হয়ে রইল না। পুকুরপাড়ে গিয়ে বসলেও অনিমেষ এসে সামনে দাঁড়াত না।
আমরা কেউ কাউকে বলে আলাদা হইনি।
শেষবার কথা বলার সময়ও জানতাম না, সেটি শেষ কথা হয়ে থাকবে। শেষ চিঠিটি লেখার সময়ও লিখিনি—এটাই তোমাকে লেখা আমার শেষ চিঠি।
দুজন মানুষ অনেক ভবিষ্যতের কথা বলেছিল। অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবু একদিন তাদের জীবন আলাদা হয়ে গেল।
অনেক বছর পর অনিমেষের সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল। তখন আমরা আর অনার্স পড়ুয়া সেই দুজন মানুষ ছিলাম না। দুজনের জীবনেই অনেক কিছু ঘটে গেছে।
ওকে সামনে দেখে প্রথম কয়েক সেকেন্ড আমি যেন ঠিক বুঝতেই পারছিলাম না, এই মানুষটিই সেই অনিমেষ। মুখ বদলে গেছে, চোখের পাশে বয়সের রেখা পড়েছে, চুলের মধ্যে সময়ের ছাপ। তবু চোখ দুটো চিনতে আমার একটুও ভুল হয়নি।
একসময় যে চোখ আমার দিকে তাকিয়ে বলত, তোমার দিকে তাকালে কী বলছিলাম ভুলে যাই—সেই চোখই সেদিন আমার সামনে বসে ছিল।
আমরা পাশাপাশি বসেছিলাম। অথচ মাঝখানে যেন কত বছরের একটা জীবন এসে বসে ছিল।
অনিমেষ খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ?
বললাম, ভালো আছি। তুমি?
আমিও ভালো আছি।
তারপর পরিবারের কথা হলো। কে কোথায় আছে, কার কী খবর—খুব সাধারণ কিছু কথা। এমন কথা, যা বহু বছর পর দেখা হওয়া যেকোনো দুজন পরিচিত মানুষ বলতে পারে।
কিন্তু আমার ভেতরে তখন একসঙ্গে কতগুলো পুরোনো দিনের স্মৃতি খুলে যাচ্ছিল। মনে পড়ছিল রিমার জন্মদিনের সেই সাদা পোশাক। অনিমেষের বুক চেপে ধরে অভিনয় করা। সাদা টিস্যুতে লেখা আমার নাম। ল্যান্ডফোনের ওপাশ থেকে আসা আস্তে করে বলা লাবণ্য। রাগ ভাঙাতে গিয়ে চোখের পানি। রক্ত দিয়ে লেখা চিঠি। আমার দেওয়া মিউজিক বাজানো লাইটার। একুশ দিনের দাড়ি। পয়লা বৈশাখের বৃষ্টি। চল্লিশ মিনিটের সেই রিকশা।
আমার ইচ্ছে করছিল ওকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি সত্যিই এত বছর পরও সেই লাবণ্যকে মনে রেখেছিলে? ইচ্ছে করছিল বলি, তোমার সেই সাদা টিস্যুটার কথা আমার এখনও মনে আছে। বলতে ইচ্ছে করছিল, রক্ত দিয়ে লেখা সেই চিঠির কথা ভুলিনি। এমনকি ইচ্ছে করছিল, একবার শুধু জিজ্ঞেস করি—সেদিন রাগ করে থাকা মেয়েটির জন্য সত্যিই কেঁদেছিলে?
কিছুই জিজ্ঞেস করিনি
অনিমেষও কিছু বলল না
ও কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, সময়টা আসলে এতটা চলে যায়নি। তুমি সেই আগের মতই আছো।
কথাটা শুনে বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠেছিল
কারণ সময়টা চলে গিয়েছিল। অনেক দূর চলে গিয়েছিল। শুধু কিছু স্মৃতি কিছু কথা সেই একই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে আমরা তাদের রেখে এসেছিলাম।
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এই মানুষটির সঙ্গে একসময় আমার কত কথা হতো। একটা দিন দেখা না হলে কত কথা জমে থাকত। অথচ এত বছর পর সামনে বসে থাকা মানুষটির কাছে বলার মতো একটি কথাও খুঁজে পাচ্ছি না।
বিদায়ের সময়ও খুব স্বাভাবিক ভাবে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। কেউ কাউকে থামাইনি।কেউ বলেনি, আরেকটু বসো, কেউ বলিনি আবার দেখা হবে তো?
অনিমেষ কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে একবার পেছনে তাকাল।
আমিও তাকিয়ে ছিলাম। আমি আমার সেই অনিমেষ কে দেখতে পাচ্ছিলাম।
সেই এক মুহূর্তে মনে হলো, এত বছর পর আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি হঠাৎ আবার সেই তরুণ অনিমেষ হয়ে গেছে। মনে হলো, এখনই হয়তো বুক চেপে সিনেমার কোনো সংলাপ বলবে, হাতে একটা সাদা টিস্যু বাড়িয়ে দেবে, অথবা খুব আস্তে করে লাবণ্য বলে ডাকবে।
কিন্তু কিছুই হলো না। শুধু ও দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো আমার দিকে।
চোখের সামনে বয়স হয়ে যাওয়া একজন মানুষ। অথচ আমার চোখে তখনও সেই ছেলেটিই—যে আমাকে না দেখে একুশ দিন দাড়ি কাটেনি, যে আমার রাগ ভাঙাতে কেঁদেছিল, যে বৃষ্টির মধ্যে রিকশার হুড নামিয়ে দিয়েছিল।
অনিমেষ চলে গেল। আমি অনেকক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।
মনে হচ্ছিল, মানুষ চলে গেলে শুধু মানুষটিই চলে যায় না। তার সঙ্গে জীবনের কিছু ভালোবাসা কিছু মুহূর্ত কিছু গল্পো চলে যায়। যে বয়সে কেউ এক টুকরো টিস্যুতে লিখে বলতে পারে—তুমি আমার লাবণ্য।
সেদিন অনিমেষকে হারানোর কষ্টটা নতুন করে হয়নি। বরং বুঝেছিলাম, কিছু মানুষকে হারানোর কষ্ট কখনো পুরোনো হয় না। শুধু মানুষটি আমাদের জীবন থেকে সরে যায়, স্মৃতিটা থেকে যায় ঠিক আগের জায়গায়।
অনেক বছর কেটে গেছে। জীবনে কত নাম, কত সম্বোধন, কত পরিচয় যুক্ত হয়েছে। তবু আমার ভেতরে অনার্স পড়ুয়া একটি মেয়ে আজও ক্যাম্পাসের পুকুরপাড়ে বসে থাকে। তার চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে ডিপ মেরুন লিপস্টিক। একটু দূর থেকে মুখভর্তি দাড়ি নিয়ে
অনিমেষ তার দিকে এগিয়ে আসে। হাতে সাদা একটি টিস্যু। তাতে লেখা—“তুমি আমার লাবণ্য।”
পৃথিবীর সবাই আমাকে আমার আসল নামে চিনেছে।
শুধু অনিমেষের কাছে আমি ছিলাম—
অনিমেষের লাবণ্য।

0 Comments