আমাদের সেই সময়ে প্রেম বলে দুই অক্ষরের শব্দটার মাঝে এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করত। ভালোলাগা, ভালোবাসা, কিছু ভয়, পাওয়া না-পাওয়ার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে প্রেম যেন ছিল এক অনন্য অসাধারণ কোনো অনুভূতি।
তখন ফেসবুক ছিল না, ছিল না মেসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো আধুনিক রানার। মনের আবেগ প্রকাশে ওই কালি, কলম আর একটা চিরকুটই ছিল সম্বল। তাও আবার তাতে কী লিখব, না লিখব—সেটা নিয়ে কত কাটাকুটি। কতবার যে একটা চিঠি লিখে ছিঁড়ে ফেলেছি, কতবার যে মনের কথাগুলো লিখেও মনে হয়েছে—না, এভাবে বলা যাবে না! সে ঠিক মতো মনে করাও মুশকিল। ঘষামাজা শেষে শেষে যাও একটা খসরা দাঁড়াত তাতেও মনে হতো অপূর্ণতা রয়ে যেত৷ শেষ পর্যন্ত কিছু কথা থেকে যেত কাগজের ভাঁজে, আর কিছু কথা থেকে যেত বুকের ভেতর। অনেকটা ছোট গল্পের মতো, শেষ হইয়াও হইল না শেষ।
আমার সাথে মানুষটার পরিচয় আমাদের বাড়ির ছাদে। ঘুটঘুটে এক লোডশেডিং এর সাঁঝে। আঁধারের অপরপিঠে আলোর বন্যা থাকে শুনেছিলাম। জীবনে সেইদিন যেন তার সত্যতা খুঁজে পেলাম। নিকষ তমসার মাঝে আমি অবগাহন করতে শুরু করলাম জীবনের সবচাইতে আলোকিত ঝর্ণা ধারার স্রোতে৷ খরস্রোতা সেই জল ক্রমশ হৃদ পাথরে খোদাই করে নিল জীবনের সবচাইতে সুন্দর সেই অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের নাম কী, তা আজও ঠিক করতে পারিনি। তাই নাম দিয়ে তাকে আর যাচাই করতে চাইনি, ওটা অনুভূতিতেই সুন্দর৷
সময় গড়াবার সাথে সাথে আমাদের আলাপচারিতা বেড়ে চলে, কমে আসে দূরত্ব৷ রাতে লুকিয়ে টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলোর আভায় যখন রবীন্দ্রনাথের পরিণয়ের ছন্দে লেখা সব কবিতাকে নতুন করে পড়তে চাইতাম, তখন ওতে মিশে যেত খোলা জানালা গলে আসা চন্দ্রালোকের জোয়ার আর বাতাস থইথই করা কত ফুলের ঘ্রাণ। সেই রাতগুলো আজও মনে পড়লে কেমন যেন বুকের ভেতর একটা পুরোনো দরজা খুলে যায়। বন্ধ পাল্লার ওপারে ভিড় করে থাকা সব স্মৃতিরা হুরমুরিয়ে হৃদমাঝারে আঁছড়ে পড়তে চায়৷ বেসামাল লাগে। আজ এতটা বছর পর হঠাৎ মনেহয় সময় আমাকে সেই ঠিক আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়েছে৷ মনে হয়, এই তো সেদিন! অথচ সেই সেদিনের পথ পেরিয়ে জীবনে কতগুলো বছর এসে দাঁড়িয়ে গেছে।
প্রেমে পড়া বারণ- আমাদের সময়ে এই কথার স্তুতি ছিল খুব। তখন বাবা-মায়ের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কাউকে ভালোবাসি—এ কথা বলাটাই ছিল এক দুঃসাহসের বিষয়। আলেকজান্ডারের যুদ্ধ জয়ের চাইতে কম রোমাঞ্চকর নয়। তবে কথায় বলে, ভালোবাসায় সবই চলে। প্রচণ্ড ভীরু মানুষটাও ভালোবাসার জীয়নকাঠিতে আমূল পাল্টে যায়। কতটা ঠিক, কতটা বেঠিক তা জানি না, তবে জানি, আমার জীবনে কথাটা বেশ খাঁটি।
দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে, সিনেমার ওম পুরীর মতো বাবার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যেদিন বলেছিলাম, জীবনে কেউ রয়েছে। সেদিনই বুঝেছি, ভালোবাসার শক্তি হয় অসীম৷ মজা করছি না, বিশ্বাস করুন। একদম নিরেট সত্যি।
তবে জীবনে এই পরিণয় পর্ব এসেছিল খুব গোপনে, নিভৃতে, একান্তে আর নির্জনে। আচমকা রোদেলা দিনের এক দমকা হাওয়া বা এক পশলা বৃষ্টির মতোই৷ হ্যাঁ, যেদিন হতে বুঝতে পারলাম, জীবনে এই মানুষটা ছাড়া আমি বড় একা, কিংবা কম্পাসবিহীন কোনো জলযান—সেদিন থেকেই এই প্রেম শব্দের মানে একটু একটু করে বুঝতে আসতে লাগল।
বেশ মনে আছে, সেই সময়ের বাড়িতে পরিপাটি হয়ে থাকা অ্যানালগ ফোনগুলো ঝনঝন করে বেজে উঠলে হৃদয়ে কেমন সপ্তসুরের ঝংকার তুলত। একটা ফোনের রিং তখন কত যে অর্থ নিয়ে আসত! মনে হতো, ওপাশে বুঝি আমার জন্যই কেউ অপেক্ষা করছে। বলে বুঝাতে পারব না কারও জন্য প্রহর গোণাও এত সুন্দর হয়৷ নোকিয়া ২১০০ মডেলের সেই গর্বিত গ্রাহক আমি, যেদিন প্রিয় নম্বরটি ফোনে টুকে নিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল গোটা পৃথিবীর ঐশ্বরিক সুখ আমার মুঠোয় ধরা।
সাজগোজপ্রিয় কখনই তেমনটা ছিলাম না। কিন্তু কেন যেন মনের এই আলোড়ন ধীরে নিজেকেও বদলে দিতে লাগল অল্প অল্প করে। আয়নায় নিজেকে একটু বেশি করে দেখতে ইচ্ছে করত। ভাস্কো দা গামার মতোই মন সাগরে খুঁজে নিতে চাইতাম সেই অচেনা ভূখন্ড। নিজের অজান্তেই হয়তো ভাবতাম—ওর চোখে আমাকে কেমন লাগে? আমি যা ভাবছি, সেই ভাবনাটা তাকেও কি ভাবাচ্ছে? নাকি গোটাটাই শুভংকরের ফাঁকি। বৈকালি রোদের সোনা ঝরানো লগ্নে রাস্তা আলো করে রাখা কৃষ্ণচূড়ার আগুন রূপ কী দারুণ সুন্দর দেখাতো!
ভীষণ অদ্ভুত আমার ভালোবাসার গল্পটা। আমরা পরস্পরকে ভালো তো বেসেছিলাম। কথার বুননে সাজিয়েছিলাম কত কথা। চুপেচুপে মৃদু বাতাসে আলো্ড়িত সন্ধ্যায় আর রাতভর মোবাইলে ইথার তরঙ্গে বেঁধেছিলাম নিজেদের হৃৎস্পন্দন। কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কাউকে কখনও বলার সাহস হয়নি—ভালোবাসি।
আমার ভালোবাসার নাবিক মানুষটি বিশাল প্রশান্ত সাগরে জলযান ভাসিয়ে নেয় নির্দ্বিধায়। আর আমি দূরদেশের সেই মানুষটির কণ্ঠে শুনি উত্তাল সমুদ্রের গল্প। শুনেছি, জাহাজীদের নাকি অনেক সাহস হয়, তা এই মহাশয়ের কী মনের কথা জানিয়ে নিতে সাহসের স্রোতে ভাটা পড়ছে? কথাটা মনে হতেই, কপট রাগ হতো খুব আবার হাওয়াই মিঠের মতো মিলিয়েও যেত৷ অজান্তেই ভ্রুর মাঝে কুঞ্চন জাগত৷ ভাবতাম, তবে কী আমাকে এই অস্থিরতায় রেখে সে মজা নিচ্ছে? সময় আসুক। পাইপাই করে এর হিসেব ঠিক বুঝে নিব৷ ওয়াদা আমার। সরল এই প্রেম আবেগে আকাশে ভেসে বেরানো মেঘখন্ডরা ছোঁয়াছুঁয়ি খেলত। জনালার গ্রীলের কোল ঘেঁসে বচসা জুড়ে দিত চড়ুই দম্পতি।
দিন কাটত আমার ওর সেই জাদুকরি কন্ঠে চেপে। সেই জাহাজি জীবন, উত্তাল সাগরের গল্প, সমুদ্রের জল ছুঁয়ে যাওয়া অ্যালবেট্রসের পাখার খাঁজে ঝিলিক দেওয়া রবি কিরণের ঔজ্জ্বল্য, সাগরবক্ষে নেমে আসা রাত। নিশিতে আসমানভরা নেমে আসা নক্ষত্রে সাজানো হার, আমার গলে কতবার যে কল্পনায় ও নিজ হাতে পড়িয়েছে, তা বুঝেছি কতবার, কিন্তু আমার এই অনুভব ওকে বুঝতে দেইনি কখনও। কেমন আড়ষ্ট লাগত আজব ধরনের। ওর গল্পে থাকা বাস্তব সমুদ্রটা তখন আমার কাছে শুধু সমুদ্র ছিল না। ওর সঙ্গে আমার মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা এক বিশাল নোনা দূরত্বও ছিল।
ওদিকে সে, আর এদিকে আমি। মাঝখানে অগণিত ঢেউ। ওদের সর্পিল ফণার আগায় ঘাপটি মেরে বসত আমার অন্তহীন প্রতীক্ষা৷ আমার বলছি কারণ, তখনও আমার প্রতি ওর আবেগটা আমার অজানা ছিল৷ মাঝেমাঝে মনেহত জানবার দরকার নেই। এই রহস্যই ভালো। এতে এক অতিজাগতিক আনন্দ লুকোন। বালুকাবেলায় ঝিনুক হয়ে পড়ে থাকা এই হর্ষনুড়িগুলো কুড়াবার আনন্দ সবার হয়ে ওঠে না। তাই অচেনা জলরাশি আমাকে এক দুর্নিবার আকর্ষণে বেঁধেছিল শক্ত করে। কিন্তু আশ্চর্য, সেই বিশাল সমুদ্রও আমাদের কথাগুলোকে আলাদা করে রাখতে পারেনি।
কিন্তু বলার সাহস হয়নি। কেন হয়নি, কে জানে? সেই কেন র জবাব খুঁজে সময় নষ্ট করিনি৷ কেবল দুজনার কল্পনায় দুজনে চড়ে বেরিয়েছি যখন তখন। হাতে হাত রেখে পার করেছি কত তেপান্তর।
জানি না কেন, কথা বলার সেই প্রহরগুলোতে সময় যেন থমকে যেত। থেমে যেত জগতের সমস্ত কিছু। এক মধুর নিস্তব্ধতায় ভর করে কেবল অনুরণন বেজে যেত দুটো হৃদয়ের মাঝে। হাসছেন? তা মজা নিতেই পারেন। বলতে পারেন, পাগলামি। পাগলামি তো বটেই৷ প্রেম মানেই তো পাগলামির ষোল আনা কাব্য। কিন্তু হ্যাঁ, সেই পাগলামিতে কী আকর্ষণ ছিল, কী এক দুর্বার ভালো লাগা ছিল, তা সত্যি বলে বুঝানো অসম্ভব।
আনমনে, আপনমনে যখন নিজেদের গল্প সাজাতাম, ঠোঁটের কোণে কেমন অজান্তেই হাসি ফুটে উঠত। চোখে হয়তো ঝিলিকও জাগত। বাড়ির কোনো মুরুব্বির চোখে হঠাৎ পড়ে গেলে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন তুলত—
—হাসছিস যে?
থতমত খেতাম।
কখনও মাথা নেড়ে, তো কখনও কথা ঘুরিয়ে প্রসঙ্গ বদলে নিতাম। বেশ বুঝতে পারতাম পাঁজরের বাম পাশের কম্পনটা। আশ্চর্য এসবের অর্থ কী? এক অবাক করা অনুভূতি! কেমন সেই ভালোলাগা, কেমন এক বন্ধনের টান! কই, আর কারও জন্য তো এমন হয় না? এই অনুভূতিকে কী বলে? কী এর সংজ্ঞা? এ কি নিছক ভালোলাগা, নাকি আরও বেশি কিছু?
নিজেকে নিজে কতশত প্রশ্ন করে যেতাম আনমনে। আর মনেমনে অপেক্ষায় থাকতাম সেই কাঙ্ক্ষিত কথাটা শোনার জন্য। দিন যায়, মাস গড়ায়। কুপি হাতে আমি কৌতুহল নিবৃত্তে ছুটে বেরানো ইতিহাসের কোন এক রহস্যময়ী চরিত্রের মতো পুস্তকের পাতার খাঁজে খাঁজে হেঁটে চলি। চরণের নূপূরের সিঞ্চন কি তার কাছে পৌঁছে কিনা জানি না! উত্তাল সাগরে তরী ভাসানো নাবিকের ঠোঁটে ছোঁয়ানো বাঁশির গুঞ্জন একমুঠো সাগরের শীতল হাওয়ায় চেপে আমার ঘরের জানালায় জল ঝরায়। আপ্লুত হই৷ হই শিহরিত৷ সলজ্জ বৃষ্টির তানে কান পেতে শুনতে চাই সেই প্রিয় ছন্দটি।
নাবিক গল্প বলে চলে। কত কথা! বলি সিন্দাবাদের গল্প কি এর চাইতেও রোমাঞ্চকর? সাগরের বুকের ওপরে শূন্যে ঝুলে থাকা চাঁদের রঙটা কতটা ভিন্ন ওখানে? দূর জাহাজের আলোকবর্তিকা কেমন করে একাকীত্ব কাতর করে তোলে? রাতের কালো নিকষ জলে জলের নূপুর পায়ে কী করে হেঁটে বেরায় বিরহ? আমার জীবনে আসা আগন্তুক জবাব দেয় না কেবল প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় আমার প্রতি। ওর গতিতেই তাই একবার প্রশ্ন করি—
বিরহ তোমায় ভাবায়?
জবাব আসে না।
খানিক মৌনতার পরে এক ছোট্ট বাক্য কেবল—
—পরে কথা বলছি।
আমি চুপ। যেন মাঝে এটাই বিরাম চিহ্ন। আবারও অপেক্ষা। কী অসহনীয় যন্ত্রণায় কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত। ফোনটা নিশ্চুপ পড়ে থাকে, অথচ আমার ভেতরে যেন ওর কণ্ঠস্বর বেজেই চলে। কখন ফোনটা আবার বাজবে, কখন ওপাশ থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠটার উপস্থিতি টের পাব? অদ্ভুত সেই অপেক্ষা।কষ্টের সঙ্গে তাতে এক অন্যরকম ভালোলাগাও মিশে থাকত। কিন্তু কী সেটা? মুশকিল। তাই তো বুঝি না!
এ কি কেবলই মোহ, নাকি বাস্তবে জেগে ওঠা পরাবাস্তব কোনো অনুভূতি? এ কি কেবলই আমারও হচ্ছে? একতরফা? বিপরীতের ঝংকারটাও কি ঠিক এমনই, না নেহাতই সময় পার? কত কথা ক্ষুধার্ত শালিকের মতো মন-আঙিনায় শঙ্কার খুঁদ খুঁটে নেয় ঠোঁটে। আমি অপেক্ষা করি। সময়ের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হই। দেখি কে কতটা ছুটতে পারে? অপেক্ষাই তো! করলাম না হয়। লগ্ন সাঁতরে নিতে আমি নাহয় জেদী সাঁতারু হতে নেমেই পড়লাম জলে। ক্ষতি নেই তো কোন। বেলাশেষে মৎসকন্যার নীল আঁচলে রত্ন কুড়িয়ে আনব, শতভাগ নিশ্চিত। এক অন্তহীন অপেক্ষা। অপূর্ব তার আমেজ। অদ্ভুত সুন্দর তার অনুরণন।
দিন যায়৷ রাত মুখ লুকোয়৷ আর এমনি করেই এক জোৎস্নাভেজা রাতে দূরদেশের সেই নাবিক তার প্রশ্ন সাজায়।
—বড্ড ভালোবাসি তোমায়। আমার তরীর সঙ্গী হবে? পাড়ি দিবে এই বিশাল সমুদ্র?
আমার মনে হলো, কোন ঘোরে চলে গিয়েছিলাম। কী শুনলাম আমি? ওটা কেবল প্রশ্ন ছিল না বরং পৃথিবীতে সবচাইতে সুন্দর করে সাজানো কোনো উপন্যাস। যা দুটো বাক্য ভর করে আমার খোলা চোখে বর্ষা নামিয়েছিল। আমি নীরবে কেঁদেছি৷ ভালোবাসা পাবার আনন্দে সিক্ত হয়েছি৷ অপেক্ষার অবসান ঘটেছে সত্যি? বিশ্বাস হয়েও হচ্ছিল না। তবে ওটা ছিল জীবনের সবচাইতে সত্য সুন্দর বাস্তবতা। তবে কি…
—কী হলো? চুপ যে…
চমক কাটে। নিশ্চুপের এক তিরতির বাতাসে আমার অস্তিত্ব কাঁপছিল বুঝি। মনে হচ্ছিল, আজ আমার চাওয়া-পাওয়ার মাঝের বাকি বলে কিছু নেই।
চোখ তুলে আকাশ দেখি। রঙ পাল্টেছে কি অন্তরীক্ষে? সেই দিনটায় স্পষ্ট মনে আছে, মস্ত বড় চাঁদ উঠেছিল আকাশে। হলুদাভ আভা চাঁপা ফুলের মতো অপার্থিব সৌন্দর্য বিলোচ্ছিল চারিদিকে।
- কিছু বলছ না
দাঁড়াও না। এত তাড়া কিসের। এই আকুলতায় নিজেও তো মজেছি কতটা সময়৷ একটু সবুর না হয় তুমিও কর৷ ওর প্রশ্নে তাই পাল্টা প্রশ্ন তুলি—
— এ্যাই, তোমার ওখানে কি চাঁদ…
কথা শেষ না হতেই পাঁকড়ে নিল। যেন আমার এই জিজ্ঞেসা ওর জানাই ছিল। ঝলমলে কন্ঠে ও বলতে থাকে
— কী আশ্চর্য! তোমার ওখানেও এমন৷ আরে হ্যাঁ। এখানে মস্তবড় চাঁদ উঠেছে। দূরে জলহাঁসের মতো কতগুলো জাহাজ সাঁতরাচ্ছে। আর এই বেচারা নাবিক নিজ তরীতে একা বসে আছে। পাশে কেউ…
—আমায় নেবে পাশে?
মাথামুণ্ডু কিছু না ভেবে কথাটা বলে ফেলি।
এক অজানা অস্বস্তি, ভালোলাগা, লজ্জা—সব কেমন এলোমেলো করে দিচ্ছিল আমায়। নাবিক হাসে। কী অদ্ভুত সুন্দর! চন্দ্রালোকে উত্তাল সাগরের শরীর ছুঁয়ে আসা বাতাসে ওকে নিশ্চয়ই এলোমেলো লাগছে। চোখ বুঁজে তাই ভাবছিলাম।
—নেবার জন্য তো কবে থেকেই অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা কেবল…
এবার আর কিছুই বলি না। হাসি শুধু। একই প্রতিক্রিয়া জাগে ওপাড়েও। আর বুঝি কিছু বলার প্রয়োজন নেই৷ একদমই নেই। কখনও কখনও নীরবতা শব্দের চাইতেও শক্তিশালী হয়। কী অদ্ভুত! এতদিনের সেই কথাটা বলার জন্য এই হাসিটুকুই যথেষ্ট ছিল? কই, এতদিন তো বুঝিনি!
কোনো কিছু না বলেও তবে সব বলে নেওয়া যায়—এটাই কি তবে প্রেম? তবে সত্যি আমরা প্রেমে পড়েছি? কী আশ্চর্য! আমরা তখনও হাসছি। হেসেই চলেছিলাম। তারপর পার হয়ে গেছে কতটা সময়৷ সেই হাসির কলতান পায়ে পায়ে তার পথ পাড়ি দিয়েছে আজ কতগুলো বছর।
আজ এত বছর পর কখনও কখনও পাশে থাকা মানুষটার দিকে তাকালে সেই দূরদেশের নাবিকটাকেই যেন খুঁজে পাই। যে একদিন বিশাল সমুদ্রের ওপার থেকে আমাকে তার তরীর সঙ্গী হতে বলেছিল। তখন কি জানতাম, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একদিন সত্যিই তার জীবনের তরীর সঙ্গী হয়ে যাব? জানতাম না।
জানতাম না, সেই রাতের জোৎস্না, সেই দূর সমুদ্র, সেই অপেক্ষা, সেই লজ্জা আর সেই ছোট্ট হাসিটুকু একদিন আমাদের জীবনের এত বড় একটি গল্প হয়ে থাকবে।
আজ বুঝি, সে সেদিন শুধু তার তরীতে ওঠার জন্য আমাকে ডাকেনি। অজান্তেই ডেকেছিল তার পুরো জীবনের পথচলার সঙ্গী হতে। আর আলহামদুলিল্লাহ, সেই ডাকে আমিও যে সাড়া দিয়েছিলাম। সেদিনের মতো আজও প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি ক্ষণে অনুভূতিগুলো যেন জীবনে নতুন গতি নিয়ে আসে। লিখে দেয় নতুন কোনো গল্প।
সেই গল্পে থাকে কত খুনসুটি, আবেগ, অভিমান। কখনও মেঘ, কখনও রোদ। কখনও কাছে আসা, কখনও দূরে সরে থাকা। তবুও কোথাও একটা অদৃশ্য টান—যে টান প্রথম সেই দিনটির মতোই আজও আমাদের বেঁধে রাখে। কী দারুণ সৌষ্ঠব এই বাঁধন৷ কী মধুর এই পথচলা। পথের ধারের এক কাপ চায়ের উষ্ণতা থেকে দূরান্তে ছুটে চলা রেলগাড়ীর কামরায় বসে হাতে হাত আর চোখে চোখ রেখে আজও ঠিক একই ভাবে রোমাঞ্চিত হই৷ সেই থেকে আজ।আজ থেকে আগামীতে…
কখনও কখনও মনে হয়, প্রেম আসলে কোনো একটি দিনের ঘটনা নয়। প্রেম হয়তো সেই দীর্ঘ পথ, যেখানে দুজন মানুষ একে অন্যকে বারবার নতুন করে খুঁজে পায়। আমার সেই পথের শুরুটা হয়েছিল এক দূরদেশের জাহাজে বসে থাকা এক নাবিকের প্রশ্নে। আর আজ, এতগুলো বছর পরও মন তাই একটাই কথা বলে—আমরা ভালোবেসেছি। কেবলই ভালোবেসেছি। এই অনুভূতি, এই গল্পের কী নাম দিব তা আজও জানা হয়নি। সত্যিই বলছি জানবার প্রয়োজনও বোধ করিনি৷ কারণ কিছু গল্প, কিছু অনুভূতি শিরোনাম ছাড়াই সুন্দর।
একদিন লোডশেডিংয়ের আঁধারে যার শুরু, আজও তার আলো বিকশিত। সেই নাবিক আমার পাশে আজ আরও নিবিড় ভাবে৷ আর আজও আমি মনেমনে বলে চলি- হ্যাঁ, আমি তোমার তরীর সঙ্গী৷ সেদিন ছিলাম। আজও আছি৷ সেই থেকে আজ। আজ থেকে আগামীতে৷ চিরদিন। অনন্তকাল।

0 Comments