৩৯৮ রানের দিনে সূর্যটা হেঁটে গিয়েছিল || সালেহ রনক

 

On a Day of 398 Runs, the Sun Walked Away | Saleh Ronok

বিকেলবেলাটা তখন সূর্যের মুখে। শামস মিঠু ভাই পাড়ার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে পদার্থ বিজ্ঞানের পাঠ দিচ্ছেন। তখনই সামনে দিয়ে যেন চলে গেল—আবছায়া কাজলের কাম! বরফের মতো তার হাঁটার ধরন, অথচ শরীরে তারার তরঙ্গ! আমি অপদার্থ বিজ্ঞানের পদার্থের কথা ভুলে তাকিয়ে রইলাম মোহগ্রস্ত পাখির চোখে। একসময় অদৃশ্য বেয়নেটে জব্দ হয়ে হারাই বিভোর। পরদিন কোচিংয়ে পদার্থ বিজ্ঞান টেস্টে করলাম ফেল।

৬ মার্চ, ১৯৯৬। ক্রিকেট বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা করল ৩৯৮! ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলীয় রানের রেকর্ড । অরবিন্দ ডি সিলভা ১১৫ বলে করলেন ১৪৫! প্রথম ইনিংস শেষে খুশিতে খাপছাড়া আমি পড়লাম বেরিয়ে, ভাবলাম একটু ঘুরে আসি।

কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়েছিল। এখন মেঘভাঙা রোদ। হঠাৎ দেখি সূর্যটা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আরে এই সুন্দরের ঘ্রাণ তো হারিয়ে ফেলেছিলাম দু’বছর আগে!

আমার পা জায়গাতেই আটকে রইল। দ্বিধাচাপা ইচ্ছে প্রকাশ্য হতেই দিলাম দৌড়। ততক্ষণে সে বাঁক পেরিয়ে গেছে। গিয়ে দেখি রাস্তা ফাঁকা; টাল খেলাম, উথলে উঠলাম আপন জোয়ারে। কোন বাসায় ঢুকল সূর্যটা? দৃষ্টিরিবনে ঝুলছে আকুতি, ভুলে গেলাম পরিণাম।

ওদিকে কেনিয়া রান চেজ করতে নেমেছে।

শেষে ফিরে এলাম ব্যর্থতা মেনে নিয়ে, মনে নিয়ে তাকে। নিঃশব্দে ভেতরে ভেতরে তুমুল কাণ্ড ঘটতে লাগল; আলো ঠিকরে ওঠা ওই মোমেন্টাম, আর অন্তে অমিলের রুমঝুম—হৃদবন্দি যেন!

বন্ধুদের দ্বারস্থ হলাম, করলাম বন্দনা। বর্ণনা শেষে তাদের চোখে কৌতুক; যেন এক অদ্ভূত ধাঁধা—ওই অপার্থিব এ পাড়াতেই থাকে!

ক’দিন পর চৌমাথার ভীড় ঠেলে হঠাৎ বন্ধু মাইনউদ্দীনের সঙ্গে দেখা। হাঁটছি পাশাপাশি, বলছি কথা। রাস্তা পেরুতে গিয়ে দৃষ্টি গেল থমকে। ওই চোখ, রক্ত জবা টিপ; ওই তো মর্মহরিণী, অনুসূয়া, প্রসূন—উল্টো দিক থেকেই আসছে! আজ তার হাতে ধরা ছোট আরেকটি নক্ষত্র। 

বন্ধু গড়গড় করে বলে দিলো সব—কী নাম, কোন বাড়ি, আগে থাকত কোথায়? হঠাৎ মা মারা যাওয়ায় ঢাকা থেকে চলে এসেছে। এখানকারই এক স্কুলে হয়েছে ভর্তি ।

অপেক্ষার দীর্ঘ হামাগুড়ি শেষ। নাওয়া খাওয়া শিকেয় উঠল, উলটপালট জীবনের লক্ষ্য। নজর কাড়তে, মন টানতে একগুঁয়ে আমি আর আমার আমি দিনের বেশিরভাগই দিতে থাকি রাস্তায়। বৃন্তহীন সত্তার দৃষ্টি ঝুলিয়ে রাখাতেই যেন শান্তি দুজনের । আমরা র‌ইলাম ঠিকঠাক, কিন্তু হাসপাতাল পুকুরপাড়ের কদমগাছ আর জলেরা হলো ধৈর্যহারা। আমি আর আমার আমিকে আশ্রয় না- দিতে পারলেই যেন তার বাঁচে।

দিনের চাকায় মাস গড়ায়, তার কাছে পৌঁছানো হয় না- আর। একদিন মাইন‌উদ্দিন এলো ডাকহরকরা হয়ে; খবর দিলো—যার পিঠে তুষ ও তুফান, ইশারাপ্রবণ তিলে খেলা করে বজ্রফোঁটা, তার এক বান্ধবী ঝর্ণা—নিজের ছোট ভাইয়ের জন্য টিচার খুঁজছে। আনন্দের ফুঁয়ে আমিই রাজি হয়ে গেলাম পড়াতে। ছাত্রের বাবা-মা যদিও অবাক হলেন, আমি র‌ইলাম যথারীতি সবাক—পড়াচ্ছি, আর সুযোগ খুঁজছি উতল হাওয়ার প্ররোচনায়। সময় মুখ তুলে তাকাল—টেবিলে ঝর্ণার‌ও হলো নিজের একটি চেয়ার। নানা বিষয়ে আমার কেয়ার পেয়ে, সে-ই একদিন জানাল—কাল তার জন্মদিন! 

যদিও জেলাসদর, ফুলের বেচাকেনা তেমন একটা নেই। কিন্তু ফুলের জন্য ফুল তো লাগবেই। রাতে ঢুকে পড়ি সিভিল সার্জনের প্রাচীরঘেরা বাড়িতে, আমিসহ চারজন। সেখানে গোলাপের মেলা। প্রত্যেকের জন্য ছোট্ট টার্গেট—ত্রিশ ফুল। চুরি প্রায় শেষের পথে—তখনই বাড়ির পোষা কুকুরটা টের পেয়ে গেল। কাঁটার ফলায় ছেঁড়া হাত-পা নিয়ে দেয়াল টপকাই ঠিকই কিন্তু ফুল ছেড়ে আসিনি একটিও। 

পরদিন একশ এক গোলাপের তোড়া স্কুলে গেল। সিনেমাটিক ব্যাপার ঘটাতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিলাম বিপদের গন্ধ। ভিলেন হয়ে স্বয়ং হাজির হলেন প্রধান শিক্ষক। স্কুলসুদ্ধ জানল, পড়শির মুখ খুলল, শেষে হলো রাষ্ট্র! আবেগের জুয়া পড়ল কারফিউর মুখে—দৃশ্য থেকে উধাও সে!

ফুল পাঠানোর ভুলে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, বিশ্বাস তখন‌ও আকাশ ছোঁয়ার অপেক্ষায়। পাগল হলেই তাকে প্রেমিক বলা চলে, কাগজ-কলম‌ও তখন তার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলে। শূন্য পাতায় প্রথম ছুঁড়ে দিই ‘মৃন্ময়ী’, তারপর শব্দে শব্দে দু’বছরের গল্প— কলম থেকে ঝরে পড়তে লাগল—লঘু শোক, শত শত অসহ্য দুপুর, অনুতাপ, বিদ্রোহীবিষাদ আর রঙের পর রঙ; মূলত ফেলে আসা সকল দিন, পরবর্তী সমস্ত জীবন। শব্দেরা এমনভাবে ডালপালা ছড়াল, তাদের জন্য দরকার পড়ল চৌষট্টি পৃষ্ঠা! নিজের বাহাদুরিতে নিজেই দিই হাততালি।

ডাকপিওনের দায়িত্ব ঝর্ণাই কাঁধে তুলে নিলো। কিন্তু ভাগ্য যার বিপক্ষে ঝরে, তার নিজের বলে থাকে কেবল বুকচাপা সমুদ্র গর্জন। সমস্ত মায়াশব্দ, আকুলিবিকুলি অগ্রাহ্য হলো। 

আগে বাইরে ন্যাংটা হয়ে পড়েছিলাম এবার ভেতরেও। তবুও সমস্ত নিষেধ ভেঙে একদিন নির্জলা দুপুরে তার পথ দাঁড়াই আগলে, কথার আগল খুলব বলে। দেখি ফুলের মধ্যে এক চুল্লি আগুন, ব্যক্তিত্বে এমন‌ই ধার—হোঁচট খাই, শেষে যাই ছিটকে!

দীর্ঘ নিষ্ফলতা উদ্যমে মিশিয়ে দিলো উদোম ক্লান্তি, সিগারেটের ছাইয়ে অমীমাংসিত ব্যথা। সামনে আর কোনো পথ নেই, অথচ আমিও পথিক। কেবল অনিঃশেষ ঘোরটাই এখনও আমার পক্ষে। ওদিকে পড়ালেখা নিয়ে নয়-ছয় আর কিছুতেই মানছেন না- বাবা, করলেন সমন জারি; হয় ঢাকা ফিরে যাও, নয় বাসা ছাড়।  

বন্ধুর পথেই প্রেম অন্ধ ভিখারি—ঠায় বসে থাকে। তাই প্রেমিকের একটু বেহায়া না হলে চলে? যাতে শেষবারের মতো তার যেন একটু দেখা পাই, আবারও ঝর্ণাকে পাঠালাম খবর দিয়ে।

লঞ্চ ছাড়ার বাকি আর মাত্র ঘণ্টা দুয়েক। আর আমি ঈগলের চোখ নিয়ে তাদের বাড়ির রাস্তায় একের পর এক চক্কর কেটে কেটে হয়রান; নিজের রক্ত নিজেকেই কামাড়াচ্ছে তখন। শেষে নিজের তৈরি খাঁচায় নিজেকে ঢুকিয়ে নিই এ ভেবে—কারো কারো জন্য ভালোবাসা কেবলই বেহালার সুর। কিন্তু আমার স্তব্ধতার গায়ে একের পর এক পেরেক ঠুকে যাচ্ছে বেহায়া মন। শেষবারের মতো আবার গেলাম—যদি একবার, একবার দেখা পাই। 

তখনই শুনতে পাই, বাসার পেছনের সিঁড়িতে বসে সে গাইছে—কেউ কখনো খুঁজে কি পায় স্বপ্নলোকের চাবি…

ঘুমের মত শান্ত হয়ে এলো পোড়ামন: সব মনস্তাপ লীন। মুহূর্তেই ‘হুররে’ বলে হৃদপিণ্ডে ছুটতে লাগল রক্তের সব গতিপথ! তারা কোরাস গাইছে—এ গান আমার জন্যই। শ্বাসেরা সাক্ষ্য দিতে লাগল—হুম, এখানেই আছে ইঙ্গিত। গানের গলাটা এতই মিষ্টি যে, আমার আমি আবার হাজির হলো দৃশ্যপটে—একে ছেড়ে যাচ্ছিস কোন্ চুলোয়? 

আমার লঞ্চঘাটে যাওয়া হয় না আর, ফিরে গেলাম বাসায়। এরপর আমার কী হাল হয়েছিল, সে কথা থাক।

গুনে গুনে ঠিক দুদিন পর, খবর এলো—সেই চিঠিটা তার হস্তগত হয়েছে। তারপর যা কিছুই দেখি—সব‌ই যেন নেশা করে ফূর্তির হাওয়ায় উড়ছে! চিঠির উত্তর পেলাম… না.. না… না, চিরকুট বলা ভালো, আরও তিন দিন পর; মাত্র দুই টুকরো কাগজের এপিট-ওপিঠ। তাতে নেই কোনো সম্মতি, শুধু কিছু কিছু ভাসা ভাসা ইশারা।

Post a Comment

0 Comments