শৈবালের জাবর কেটে সময় কাটে এখন। 1 জোরে জাবর কাটে, কখনোবা আস্তে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে জাবর কাটা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। যাপিত জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহের মধ্যে প্রেম অথবা প্রথম প্রেম মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা বা পর্যায়। বিচ্ছেদ ঘটলে যেমন দাগ পড়ে, মিলন হলেও তেমন দাগ পড়ে, হয়তো দাগটা নরোম থাকে।
শৈবালের এখন অবসর জীবন কাটছে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন ছ'বছর আগে। খুব দ্রুত বয়স পয়ষট্টি পেরিয়ে যাচ্ছে। বইপত্র ও ইণ্টারনেট ঘাটাঘাঁটি করা ছাড়া আর কোনো কাজ করছেন না তিনি। লেখালেখিটা ওঁর শখ, সেই ছেলেবেলা হতেই। শৈবাল ওঁর নিজের দেয়া নাম, শৈবাল সাগর। এই নামটাই থাক, পোশাকি নামটা জেনে তেমন কোনো লাভ হবে না পাঠক-পাঠিকাদের!
কৈশোর বয়স পেরোতেই ছেলে বা মেয়েদের মনে ফুটতে থাকে লাড্ডু এবং চোখে উড়তে থাকে রঙিন প্রজাপতি। সেকারণেই কখনো কখনো বিপরীত লিঙ্গের সবাইকে ভালো লাগে যায়- চলে আসে ভাবনায়, দেখা দিতে থাকে খোয়াবে এবং অনেক রাতে নষ্ট হয়ে যায় বিছানা।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ালেখা কালে কাউকে চোখে ধরেছিলো কিনা মনে করতে পারনে না শৈবাল সাগর কোনোমতেই। উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে একের পর এক! যাকে দেখতেন, তাকেই ভালো লেগে যেতো। ওদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লাগতো এক ক্লাশমেটকে; মেয়েটা হিন্দু ছিলো; কিন্তু মস্ত বাঁধাটা ছিলো ও এক শিক্ষকের ছোটো বোন। ঐ শিক্ষক খুব ভালো বাংলা পড়াতেন। শৈবালের মতো অনেক ছাত্রের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে চলছিলো মেয়েটা। তবে ভালোলাগাটা ছেলেদের মাঝে আলোচনাতেই ছিলো শুধু।
ঘটনা সত্তর দশকের। তখন মেয়েরা মুরগির ছানার মতো শ্রেনীশিক্ষকের পেছন পেছন এসে সারি ধরে ছেলেদের আসনের সাথে এল বানানো বেঞ্চিতে বসে ক্লাশ করতো এবং ক্লাশ শেষ হলে ঐ শিক্ষকের পেছনে মুরগির ছানার মতো কিচিরমিচির করতে করতে চলে যেতো কমনরুমে। কমনরুমে গিয়ে মেয়েদের সাথে কথা বা ভাব জমাতে হলে লাগতো বুকের পাটা! সেটা দুয়েকটা ছাত্রের থাকলেও শৈবালের ছিলো না কখ্খনো।
কিছুদিন পরে, সেটা বছরও হতে পারে- এক কিংবা দুই/তিন, একদিন বিদ্যালয়ের মাঠ দিয়ে কোণাকুণি একটা মেয়েকে বিদ্যালয়ে আসতে দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো শৈবসল সাগরের। বেশ তো মেয়েটা! এতোদিন তো দেখি নি! নতুন এসেছে বুঝি? কোন্ ক্লাশে পড়ে? বাড়ি কোন্ গ্রামে? ক্লাশে মনোযোগ শিকেয় তোলে মেয়েটাকে অনুসরণ করতে লাগলো ও। স্কুল ছুটি হয়ে গেলে শৈবাল দূর থেকে ওর পিছু নিলো। মেয়েটা ওর গ্রামের দিকে না গিয়ে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে। অগ্রহায়নের শেষ দিকে হওয়ায় মাঠের ফসল কাটা হয়ে যাওয়ায় ফাঁকা মাঠ। মেয়েটা রাস্তা থেকে নেমে ক্ষেতের কোণাকুণি হাঁটা ধরেছে। শৈবালও ওর পেছনে হাঁটছে। মাঠ পেরিয়ে রাউতি গ্রামে উঠে একটা বাড়িতে ঢুকে গেলে শৈবাল চলে এলো নিজ গ্রামে।
সেরাতটা ভালো কেটেছিলো শৈবাল সাগরের? শৈবালের আবছা আবছা মনে পড়ছে। একটা অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করছিলো ওর মনে। চেহারাটা বারবার ভাসছিলো চোখে। রাতের খাবার ভালোমতো খেতে পারে নি। মার জিজ্ঞাসার জবাবে 'শরীর ভালো আছে' বলে চলে গিয়েছিলো আধাখাবার রেখে। রাতে ঘুম হয় নি।
পরদিন সকালে বিদ্যালায়ের মাঠে ঢুকতেই কোথা থেকে ভূতের মতো একজন উদয় হয়ে শৈবালের সামনে এসে দাঁড়ালো। শৈবালের হৃদস্পন্দন বেড়ে ধুকপুক করতে লাগলো।
লোকটি বললো, আমাকে চিনো তুমি?
শৈবাল বললো, চিনি। আপনি আমার এক ব্যাচ সিনিয়র। নাম আবুল হাসেম।
গুড! তুমি গতকাল স্কুল ছুটির পরে যে মেয়েটির পিছু নিয়া ওর বাড়ি পর্যন্ত গেছিলা, ও আমাদের ক্লাশে ভর্তি হইছে। ওর নাম সাঈদা। ডাক্তার আজিজের শালি। ডাক্তার আজিজ ভাইয়ের বাড়ির পাশে আমারও বাড়ি। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো আমি কী বুঝাতে চাইছি।
আবুল হাসেম শৈবালের পিঠ চাপড়ে দিয়ে চলে গেলো একদিকে। আর শৈবালের মনটা হয়ে গেলো ফুটো বেলুনের মতো!
প্রেমে আর পড়া হলো না শৈবাল সাগরের তখন! দিন যায় প্রেমের কবিতা পাঠ করে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস উপন্যাস পড়ে। শ্রীকান্ত ভালো লাগে, দত্তা পড়ে তো কেঁদেই ফেলে!
দশম শ্রেণীতে উঠার পরে এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে পরিচয় ঘটলো শৈবালের। টেস্টে অকৃতকার্য হয়ে সামিল হয়েছে ওদের সাথে। ওর৷ নাম সাহেদুল ইসলাম। আস্তে ধীরে ওর সাথে বাড়তে থাকলো ঘনিষ্ঠতা। সাহেদুল ইসলামের বাড়ি স্কুল থেকে এক গ্রাম পরে। একদিন এক ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে সাহেদুল ইসলামের সাথে ও ওর বাড়ি গেলো। শৈবালকে বাংলোঘরের বারান্দায় বসিয়ে সাহেদুল ইসলাম ভেতরে গেলো। শৈবাল একটা কাঠের চেয়ারে বসে পা দুলাচ্ছে, তখন বই বুকে চেপে একটা মেয়েকে এই বাড়ির দিকে আসতে দেখলো। মেয়েটা কাছাকাছি এলে চোখ আটকে গেলো ওর; সাথে ফের লাড্ডু ফুটতে শুরু করলো ওর মনে। তখন সাহেদুল ইসলাম এসে বসলো শৈবালের পাশের চেয়ারে। মেয়েটা সাহেদুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চলে গেলো বাড়ির ভেতরে।
সাহেদুল ইসলাম বললো, আমার ছোট বোন রুকিয়া। এইবার ক্লাশ সিক্সে ভর্তি হইছে। মুড়ি মাখায়া আনছি। খাইবা আসো।
বিদ্যালয়ে কমনরুম থেকে ক্লাশে আসা-যাওয়ার সময় মাঝেমধ্যে এক ঝলক দেখা মিলে। বন্ধুর বাসায় আসা-যাওয়া বাড়িয়ে দিলেও তৃপ্তি নিয়ে দেখার সুযোগ তেমন মিলে না। প্রেমের প্রস্তাব দেবার সুযোগ-ই পেলো না শৈবাল! এভাবেই এসএসসি পাস করে শৈবাল ভর্তি হয়ে গেলো মহাবিদ্যালয়ে। সাথে সাহেদুল ইসলামও। দূরত্ব বেড়ে গেলো পছন্দের মেয়েটির সাথে। ওদিকে মহাবিদ্যালয়ে প্রথম দিন ক্লাশে এক সহপাঠীনিকে দেখে শিফ্ট হয়ে গেলো পছন্দ! কিন্তু এক্ষেত্রেও পানি জমে বরফ হলো না; কিংবা অন্যভাবে দুধ-চাল রান্না হয়ে হলো না ক্ষীর! এইচএসসি গেলো, বিএসসি গেলো! এই চার বছরে কত শত বার যে দেখেছে মেয়েটিকে এবং অন্যান্য স্থানেও কদাচিত; কিন্তু কথাই বলতে পারে নি! একসময় শৈবাল বুঝতে পারলো এই ভালোলাগা ভালোবাসায় পরিনত হবে না কখনো এবং একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বুকে চেপে রেখে ভুলে যেতে থাকলো ওকে। বিএসসি পরীক্ষা দেবার পরে ভুলেই গেলো একেবারে।
কাহিনীর ট্যুইস্ট শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। শৈবাল সাগর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলো স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে। একইসাথে ভর্তি হলো ওর দূর সম্পর্কের এক মামা আনোয়ার। ওরা দু'জন ক্লাশমেটও ছিলো স্নাতকে। প্রথমদিন ক্লাসরুমে ঢুকে হার্টবিট বন্ধ হবার উপক্রম হলো শৈবালের- সেই আরাধ্য নারী বসে হাসছে আশেপাশে বসা ক্লাশমেটদের সাথে কথা বলার সময়। এবার নামটা বলা দরকার ওর। সেই মেয়েটি তথা এই নারীটির নাম রুখসার।
রুখসার শৈবালকে দেখে মুচকি হাসলে শৈবালের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলেও এগিয়ে গেলো ওর দিকে। কুশলাদি বিনিময়ের পরে রুখসার বললো যে বিভিন্ন বিষয়ে ওকে নোট তৈরি করে দিতে হবে। না চাইতেই মুষলধারে বৃষ্টি কিংবা অমাবস্যায় পূর্ণিমা পেয়ে গেলো যেনো শৈবাল। শৈবাল ইরেজিতে পড়লেও প্রথমে ইরেজিতে নোট করে তা বঙ্গানুবাদ করে দিতে থাকলো রুখসারকে। দু'জনের মাঝখানে ভিলেন কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাঁড়ালো শৈবালের মামা আনোয়ার। রুখসারকে নিয়ে শৈবাল ও আনোয়ারের মাঝে কোনো আলোচনা বা মনোমালিন্য না হলেও আনোয়ার বুঝতে পারলো রুখসার শৈবালের প্রতি ইন্টারেস্টেড। আনোয়ার দু'জনের মাঝে খলনায়ক হিসেবে না থেকে শাহানা নামে সিলেটের এক ক্লাশমেটের সাথে সখ্যতা গড়ে তুললো, যদিও তা বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় নি।
ওদিকে শৈবাল সাহস করে একদিন রুখসারকে মনের কথা বলে দিলে রুখসার বললো যে ও এনগেজড এবং একজনের নামও বলে দিলো। ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেলো শৈবাল। শুরু করলো উল্টাপাল্টা আচরণ। তবে একেবারে ভেঙে না পড়ে ও রুখসারকে অনুসরণ করতে লাগলো। দেখতে পেলো রুখসার বিকেলে এক বড় ভাই ছাড়া আর কারো সাথে হলের বাইরে সাক্ষাৎ করে নি এবং যে নামটি বলেছিলো, ঐটা শুধুই একটা নাম- ঐ নামের কোনো পুরুষের অস্তিত্ব রুখসারের জীবনে নেই।
অসীম স্বস্তি নিয়ে একদিন ক্লাশ শেষে অনুসন্ধানের তথ্য রুখসারকে বললে রুখসার স্মিত হেসে বললো, তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম!
সেই মূহুর্তে শৈবাল নিজকে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ও সুখী ব্যক্তি মনে করলো এবং সেদিন হতে ওর জীবনও বদলে গেলো। চার বছর ধরে যাকে মনে মনে ভালোবেসে আসছিলো, তার সাড়া পাওয়ার মতো প্রশান্তি আর কী হতে পারে। ওদের দেখা যেতে থাকলো বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের পেছনের বারান্দায় মুখোমুখি বসে থাকতে, কোনোদিন রোকেয়া হলের বাইরে ফুটপাতে।
এভাবে চলতে থাকাবস্থায় রুখসারের একটি কথায় শৈবালের জীবন চলার পথটাকেই পাল্টে দিলো;কিন্তু...। কিন্তুটা এখনই বলছি না। গল্পই বলে দিবে কিন্তুটা কী। রুখসার যা বলেছিলো, তা এরূপ: ওর বাবা ডাক্তার; বড় ভাই একটা মামুলি চাকরি করলেও বড় বোনের বিয়ে হয়েছে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে; মা-বাবা ওকে ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া বিয়ে দিতে রাজি হবে না। এটা ওরও খায়েশ ছিলো কিনা, তা অবশ্য বলে নি।
শৈবাল এই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করে প্রথমবারেই ১৯৮৪ খৃস্টাব্দে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করে ১৯৮৬ খৃস্টাব্দে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ঢাকায় যোগদান করলো। চার মাস পরে ওকে চট্টগ্রামে চলে আসতে হলো এবং শুরুও হলো দূরত্ব সৃষ্টি ওর ও রুখসারের মাঝে। চাকরি করে শৈবাল প্রথম শ্রেনীও পাস করলো; কিন্তু রুখসার ওর সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিলো।
শৈবালের সাথে রুখসারের আর দেখা হয় নি এবং কী কারণে রুখসার শৈবালকে এড়িয়ে গেলো তা শৈবাল জানতে পারে নি।

0 Comments