বিচিত্রায় তাদের পরিচয়। আশির দশকে। ছিলো না মোবাইল, ছিলো না ম্যাসেন্জার। যা ছিলো খাকি রঙ্গের ডাকপিয়ন। নীল খাম।
মেয়েটি চিঠির অপেক্ষায় থাকতো চাতক পাখির মতো। ছেলেটিও।
পিওনকে জ্বালাতন করতো উভয়পক্ষ । মেয়েটি পিওনকে
ঘুষ দিতো যাতে হারিয়ে না যায় একটিও নীলকন্ঠ। মেয়েটি চট্টগ্রাম ভার্সিটির বুনো পথের কথা বলতো। ছেলেটি রাবির প্যারিস রোড, বোটানিক্যাল গার্ডেনের ছবি পাঠাতো।
ছেলেটি কবি। রাতদিন বিভোর থাকতো স্বনন শব্দায়নে। মেয়েটিও কবিতাভূক, কবিতা কুড়ানি। কুড়িয়ে বেড়াতো কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায়। ম্যাগাজিনে।
মেয়েটি বান্ধবীদের জ্বালাতনের কথা বলতো, লাক্কাতুরা চা বাগান, জাফলং এর কথা বলতো। ছেলেটি নিঃসঙ্গতা নির্জনতার বর্ণনা শোনাতো।
ক্লাশ করতে গিয়েও মেয়েটি ছেলেটির কথা ভাবতো, সিঁড়ি ডিঙ্গাতে বিভোর হতো। ছেলেটি লেকচারের ফাঁক ফোকড়ে কবিতা লিখতো। আলী আনোয়ার সদরুদ্দিন স্যারের ক্লাশে বসেও ফাঁকি দিতো।
বছর খানেক পরে ওরা আরো কাছে এলো পত্রে,আন্তরিকতায়, আস্হায়, সমঝোতায়।
এতো কাছে এলে নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়, নড়াচড়ার গায়ের গন্ধ পাওয়া যায়, উষ্ণতার সান্নিধ্য বুঝে নিতো দু'জনে, পত্রে, ধমনীতে, অলিন্দে।
ছেলেটি গভীর রাতে প্যারিস রোডে দাঁড়িয়ে প্রগাঢ় শব্দে মেয়েটির নাম ধরে ডাকতো, মেয়েটি যেনো ইথার থেকে কুড়িয়ে নিতো সেই গগনবিদারী হরিয়ালি ডাক।
মেয়েটি আকুল হয়ে মানা করতো, নির্ঝর, ওভাবে ডাকলে আমি স্হির থাকতে পারি না। হয় ছুটে আসবো নয়তো, পাহার থেকে লাফ দিবো।
ছেলেটি লেখে, যে বন্ধন আত্মায় প্রোথিত, একাকার, রক্তের স্রোতে কেউ তা বাঁধেনি, বেঁধেছে ঈশ্বরে।
মেয়েটি মুগ্ধ হয়, সৌম্য হয় এই কাব্যিকতায়। তার বান্ধবীরা দেখতে চায় এই উঠতি শব্দ খামারিকে।
ছেলেটি অনেকটাই অন্তর্মুখী, নেপথ্যচারী। নিজেকে আড়ালে রাখে বিমূর্ত কোলাহলের আড়ালে।
মেয়েটি সাহস যোগায় ছেলেটিকে।
মেয়েটি পাঠালো সেই মোহন মোলায়েম মুগ্ধ শব্দ। কাছে আসার, গাটছড়া বাঁধার। সেই বৈবাহিক উষ্ণতার , জানালো মেয়েটি সসংকোচে।
ছেলেটি শিহরিত হলো। উদ্বেলিত হলো। শংকা ভয়ে আড়ষ্ট। নিজেকে পরিমাপ করলো। কীভাবে সম্ভব?
কেবল সেকেন্ড ইয়ার! মেয়েটি থার্ড ইয়ার। মাস শেষে বাবার কাছে টাকার জন্য অপেক্ষা।
বিয়ে কীভাবে হয়,
বউ কেমন জিনিস,
বউকে কী দিতে হয়,
বউ কী খায়, কোথায় রাখে, হাজারো প্রশ্ন।
মুগ্ধ ছেলেটির মাথা খারাপ হয়। মেয়েটিকে হারানোর ভয় জেগে ওঠে। মেয়েদের এতো আগে কেনো বিয়ে হয়?
লক্ষ টাকার প্রশ্ন।
ছেলেটি জানতে চায়। কোথাও উত্তর নেই। ছেলেটি চষে বেড়ায় মতিহার, প্যারিস রোড, বোটানিক্যাল গার্ডেন, কোথাও মেলে না সদুত্তর।
ইচ্ছে করে কোনো জুটিকে থামিয়ে বলে, কোন পথে সমাধান,প্রিয় স্যারকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,স্যার আমার বুকে কাঁদছে ওফেলিয়া, ডেসডিমোনা।
সমাধান দিন।
অনেক চিন্তা করে সময় চায় ছেলেটি। গুছিয়ে নেয়ার, সাহস সঞ্চয় করার। মেয়েদের জীবন অন্যরকম। তাড়া থাকে, চাপ থাকে। পারিবারিক, সামাজিক। থাকে লোকচক্ষু, বখাটে, অদৃশ্য শীস
হুমকি, কত কি ! থাকে ভাগ্যের লিখনও । মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়।
যা হয়, তাই হয়। মেয়েদের পিছনে ফেরার সময় থাকে না, মেয়েটি হারিয়ে যায় নিজস্ব বলয়ে। শেষ হয় চিঠি লেখা, শেষ হয় ডাক পিওনের দৌড়ঝাঁপ। অদেখা প্রণয়ের কাব্য ইতি টানে এক অসমাপ্ত সড়কের মোড়ে।
জীবন ভয়াবহ নৈর্ব্যক্তিক। একজনের ব্যথা আরেক জনকে কদাচিৎ স্পর্শ করে যখন ভেঙ্গে যায় হৃদ্যতার বন্ধন। ওরা জীবন নামক বহতা নদীর স্রোতে হারিয়ে যায়।
মনে আঁচড় কাটলেও সংসারের ঔচিত্যবোধে ওরা হয়ে যায় নিশ্চুপ, স্হবির, দ্বিখণ্ডিত। কারো সীমানায় পড়ে না কারো ভাবনার ছায়া। ঠিক করে কখনো যেনো না হয় ঘুণাক্ষরেও সাক্ষাৎ।কিন্তু কিছু কিছু চিত্রনাট্য স্বয়ং বিধাতা লেখে। সে যে বিরাট নাট্যকার কে না জানে!
ওদের দেখা হলো ৪০ বছর পর, প্রখম বার। যখন ছেলেটি সাদা চুল দাড়িতে ভরপুর। প্রেমে পড়লে নাম বদলে যায়। মেয়েটি ছেলেটিকে নির্ঝর ডাকলেও মেয়েটির নাম ছিলো বহতা, ছেলেটির দেয়া। বদলে গেছে সময়। স্বপ্ন। অবয়ব। কিন্তু রয়ে গেছে তৃষ্ণা হাহাকার, কৌতুহল। কেউ কাউকে চেনে না। বহতা চিনতে পারে না নতুন বন্ধুটিকে। ছেলেটি নিজেকে আড়াল করে বলে, আমি নির্ঝরের বন্ধু। মেয়েটি সচকিত হয়ে ওঠে, তৎপর, ব্যকুল হয়ে ওঠে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে ছেলেটিকে।
মেয়েটি অনেক আগের সেই দুর্বলতার কথা জানায়। সে বলে, এতকিছু হলো অথচ আমরা কেউ কাউকে দেখিনি। কেবল এটুকু জানি, সে মীন রাশির জাতক। তার কবিতাগুলো এখনো আমার সযত্নে আছে।
তার সাথে আর যোগাযোগ হয়নি ? ছেলেটি প্রশ্ন করে।
নাহ।
কোনদিন ইচ্ছে হয়নি?
নাহ।
কেনো?
সে চায়নি।
এখন যদি দেখা হয় ! ব্যাকুলতা ছেলেটির কণ্ঠ।
সে নিশ্চুপ হয়ে যায়। কোনো কথা বলে না। নীরবতা। অখন্ড নীরবতায় তাকিয়ে থাকে উদ্দেশ্যহীন।
এখন যদি দেখা হয় !
মৌণতা ভেঙ্গে বলে, হলেই বা কী ! দু'জনার দুটি পথ...
সে এখনো বিয়ে করেনি ! ছেলেটি বলে।
কী, কী বলছেন !!!
হ্যাঁ, অবিবাহিতই রয়ে গেছে । সে বিয়ে করেনি।
কেনো, কেনো, কেনো!!! চিৎকার করে ওঠে।
মেয়েটি হু হু করে কাঁদছে। কাঁদতে থাকে। এ কান্না নীরবে, নিভৃতে, অন্তর্লীন, অসীম!
মৌসুম মনজুর
কাঁচকুড়া, উত্তরা, ঢাকা।

0 Comments