কিছু বিকেল জীবনের সঙ্গে থেকে যায়।
বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়, চুলে রুপালি রং নামে, পরিচিত মুখগুলো একে একে দূরে সরে যায়-তবু সেই বিকেলটি কোথাও যায় না। চোখ বন্ধ করলেই ফিরে আসে। রোদ্দুরের গন্ধ নিয়ে, শুকনো পাতার শব্দ নিয়ে, আর এক অদ্ভুত অপেক্ষা নিয়ে।
সেই বিকেলটির কোনো নাম ছিল না। অথচ আজ মনে হয়, সেটিই হয়তো ছিল প্রথম প্রেমের শুরু।
তখন প্রেম শব্দটির অর্থ জানা ছিল না। ভালোবাসার সংজ্ঞাও নয়। মানুষের প্রতি মুগ্ধতা আর ভালোবাসার পার্থক্য বোঝার মতো বয়সও ছিল না। শুধু একজন মানুষ ছিল, যার উপস্থিতি অন্য সবার চেয়ে একটু বেশি চোখে পড়ত। তার কথা শুনলে মন ভালো হয়ে যেত, তার আসার খবর শুনলে অকারণে আনন্দ হতো, আর সে চলে গেলে চারপাশটা কেমন যেন ফাঁকা মনে হতো।
কোনো একদিন কেউ বলেনি-এটাই ভালোবাসা।
ভালোবাসা তখন এসেছিল নামহীন কোনো পাখির মতো। নিঃশব্দে এসে মনের কার্নিশে বসেছিল।সেই সময় ভবিষ্যৎ বলতে খুব বেশি কিছু বোঝা ছিল না। আগামীকাল মানে পরের দিন, আগামী বছর মানে আরও কিছুদিন পর। কিন্তু অদৃশ্যভাবে একটি বিশ্বাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল-কিছু মানুষ বুঝি সারাজীবন একই জায়গায় থাকে।
শৈশবের বিশ্বাসগুলো বড় সরল।তারা প্রশ্ন করতে জানে না।তাই সেই বিশ্বাসের ভেতর কোনো সন্দেহও ছিল না।তারপর একদিন জীবন তার প্রথম কঠিন পাঠটি পড়িয়ে দিল।যে মানুষটিকে ঘিরে অজান্তে একটি ভবিষ্যৎ তৈরি হয়েছিল, সে অন্য এক জীবনের পথে চলে গেল। কোনো নাটকীয় বিদায় ছিল না। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামেনি। পৃথিবী থেমে যায়নি।সেদিনও সন্ধ্যা নেমেছিল।ঘরের বাতি জ্বলেছিল।মানুষজন তাদের স্বাভাবিক কাজ করেছে।শুধু একটি মনের ভেতর নিঃশব্দে ভেঙে গিয়েছিল একটি স্বপ্ন।
সেদিন প্রথম বোঝা গিয়েছিল-বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় শব্দ আসলে নীরবতা।
তারপর অনেক বছর কেটে গেল।জীবনের নতুন মানুষ, নতুন সময়, নতুন ব্যস্ততা নিয়ে সামনে এগিয়ে চলল। কিন্তু প্রথম অনুভূতিটি কোথাও যেন রয়ে গেলস-পুরোনো বইয়ের পাতার মধ্যে চাপা পড়ে থাকা শুকনো ফুলের মতো। ছুঁলে গন্ধ নেই, তবু ফেলে দেওয়া যায় না।
এরপর একদিন আরেকটি ভালোবাসা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল।সে ভালোবাসা ছিল অনেক বেশি স্পষ্ট। সেখানে অপেক্ষা ছিল, যত্ন ছিল, কাছে থাকার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু হৃদয় তখনও অতীতের কোনো অদৃশ্য ঘরে বসে ছিল। তাই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির চোখের ভাষা পড়তে অনেক দেরি হয়ে গেল।কিছু ভালোবাসা আমরা হারাই ভালোবাসিনি বলে নয়-সময়মতো বুঝিনি বলে।সময় আবার এগিয়ে গেল।
পুরোনো একটি প্রতিশ্রুতি একদিন নতুন করে ফিরে এলো। বলা হলো, ভুল হয়েছিল; সবকিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সেই কথায় আবার বিশ্বাস জন্মাল। অপেক্ষা শুরু হলো।
অপেক্ষা মানুষের ভেতর অদ্ভুত পরিবর্তন আনে। প্রথমে সে- দিন গোনে, পরে বছর। তারপর একসময় সে বুঝতেই পারে না-সে একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে, নাকি নিজের বিশ্বাসটি সত্যি হওয়ার জন্য।
প্রায় এক দশক পর সত্যি যখন সামনে এলো, তখন বোঝা গেল-কিছু অপেক্ষার কোনো গন্তব্য থাকে না।তবু জীবন সেখানেই শেষ হয়নি।
কারণ দূরে কোথাও একজন মানুষ তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। যে একসময় ভালোবাসার কথা বলেছিল, কিন্তু বিনিময়ে কিছু পায়নি। যে অভিমান করতে পারত, চলে যেতে পারত, হিসাব চাইতে পারত-কিন্তু সে তা করেনি।
জীবনের কঠিন সময়ে সে পাশে দাঁড়িয়েছিল।
কোনো বড় ঘোষণা ছাড়া।কোনো পুরোনো হিসাব খুলে না বসে।শুধু একজন নীরব প্রহরীর মতো।
সেদিন হয়তো প্রথমবার বোঝা গিয়েছিল-প্রেমের ভাষা শুধু চিঠিতে লেখা থাকে না। কখনো তা লেখা থাকে বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো একটি মানুষের নীরবতায়।
প্রথম প্রেম হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়।কিন্তু জীবনের ভালোবাসা হৃদয়কে আশ্রয় দেয়।প্রথম প্রেম স্বপ্ন দেখায়।জীবনের ভালোবাসা- কোন স্বপ্ন ভেঙে গেলে পাশে বসে থাকে।
আজ বহু বছর পর সেই পুরোনো বিকেলটির দিকে ফিরে তাকালে আর কোনো অভিমান জাগে
না। বরং মনে হয়, সেই নামহীন অনুভূতিটিও দরকার ছিল। কারণ তার হাত ধরেই তো ভালোবাসাকে প্রথম চিনেছিল মন। তার ভাঙনের মধ্য দিয়েই শিখেছিল বিশ্বাসের মূল্য। আর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বুঝেছিল-কাউকে পাওয়া ভালোবাসার শেষ কথা নয়; কাউকে সত্যি করে পাশে পাওয়াই ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর অর্থ।
তাই প্রথম প্রেমের কোনো নাম আজ আর মনে রাখতে চাই না।
মনে রাখতে চাই শুধু সেই বিকেলটিকে।যে বিকেলে কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, অথচ ছিল অগাধ বিশ্বাস।যে বিকেল জানত না, তার পরেই আসবে বিচ্ছেদ।যে বিকেল জানত না, একদিন তার স্মৃতি এত বছর পরেও ফিরে আসবে।
আর সেই বিকেলটি আজও যেন দূরে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলে-“প্রথম প্রেমকে পেতে হয় না।
কখনো কখনো তাকে হারিয়েই জানতে হয়-কোন ভালোবাসা স্মৃতি, আর
কোন ভালোবাসা জীবন।”
লেখক,কলামিস্ট,প্রকাশক ও সমাজকর্মী

0 Comments