একটা জানলা বন্ধ করার পর এমনিতেই অর্ধেক আঁধারে ডুবে গিয়েছিলো, আরেকটা বন্ধ করতেই কালো চাদরে ছেয়ে গেলো ঘরটা। বিকেলবেলায় বুনো মোষের মতো একদল কালো মেঘ কোত্থেকে ছুটে এসে ঘিরে ফেললো মাথার ওপরের অনেকটা আকাশ। প্রকাণ্ড ঝড়টা যখন এসেছে আমি তখন রান্নাঘরে। বাড়িতে আজ কেউ নেই।কোনো এক আত্মীয়র মেয়ের বিয়ে। আমারও নিমন্ত্রণ ছিল। কিন্তু গতকাল থেকে কী যে এক বেহায়া জ্বর শুরু হোলো!সারাদিন সুস্থবোধ হলেও সন্ধ্যের পর থেকে বিশেষত রাতের দিকে গা কাঁপিয়ে জ্বর আর তার সাথে সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা! আমাদের গ্রামে এই জ্বরটাকে ভাল্লুক জ্বর বলতো। কেনো বলতো সেসব খবর রাখিনি!এত প্রাণী থাকতে থেকে থেকে ভাল্লুক বাবাজিকেই বা মনে করার কারণ কী…সে প্রশ্ন আমার মাথায় কখনো আসেনি!
এক কাপ চা খেয়ে ঘরে বসেছিলাম চুপ করে। বাইরে ঝড়ের পরই বৃষ্টি শুরু হয়েছে।ঝিরঝিরে নয় দামাল বৃষ্টি।মাঝখানে একটুখানি জানলা খুলে দেখেছিলাম ঝড়ে ভুলু দের শেড উড়ে গেছে। তবে আমার মতো কিছু মানুষ যাদের ফ্ল্যাটের মাথায় আরো একটা দুটো ফ্লোর বসানো, তাদের এই সময়টা উপভোগ করেই কাটে।
কিন্তু কথা হচ্ছে জানলা বন্ধ করে তো আর ঝড় বৃষ্টি উপভোগ করা যায়না!
পশ্চিমে ঝাপ্টা। বিছানার কোলে জানলা। খুললেই সব ভিজে জবজবে হয়ে যাবে। এদিকে মনটা প্রাণোচ্ছল কিশোরীর মতো ছটফট করছে।
অতঃপর ব্যালকনির দরজাটা একটু ফাঁক করে ঝড়বৃষ্টির গতিবিধি লক্ষ্য করতে শুরু করলাম।হালকা বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে পুরোদস্তুর।
চোখ কান নাক একসাথে কাজে লাগিয়ে দিলাম। গ্রীষ্ম-দুপুরের প্রচন্ড দাবদাহের পর এমন বৃষ্টি হলে একরকম ভেজা ভেজা গন্ধ নাকে এসে ঠেকে।পাশের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টির গান শুনতে শুনতে মনটা হারিয়ে গেলো।হারানোর পথটা এখন আর আমার নয়।কিন্তু মন কি আর বাঁধ মানে?
“The sixth sense is at the core of our experiences. It is what makes experiences out of events” -হেনরি রিডের এই কথাটা পড়েছিলাম ফেসবুকে। একটা পেজ আছে ‘The power of sixth sense’ নামের, ওখানেই।
চৈতি প্রায়ই বলতো,‘কথার ইনটিউশন পাওয়ার নাকি দুর্দান্ত? দুর্দান্ত না ছাই!আসলে ওসব বক্কেলবাজি!এটেনশন সিকার।’
আমি অবিশ্যি গায়ে মাখিনি কথাটা । পরদিন কলেজে গিয়ে চৈতির গলা জড়িয়ে বলেছিলাম ,’ব্রাভো ডিয়ার, সমালোচক না পেলে জীবন বৃথা। তুই আমার জীবন দামী করে দিলি। চল এই খুশিতে দশ টাকার ফুচকা পার্টি আমার তরফ থেকে।’
কথাটা বলতে বলতে সামনে এগোতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়েছিলাম সেদিন। সৌম্যকান্তি চেহারার যে ছেলেটি আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলো, ওর নাম অপরূপ।ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট, ফাইনাল ইয়ার।নামের সাথে চেহারার এমন অভূতপূর্ব মিল খুঁজে পেয়ে চমকে উঠেছিলাম! সচরাচর কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন গোছের ঘটনা চোখে পড়ে কিনা!
শুরু বলতে তেমন কিছুই ছিলোনা কোনোকালে। আমি দেখতে আহামরি নই, তবু রোজ রোজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতাম।
আজ কেমন লাগছে? ঠোঁটটা ফ্যাকাসে দেখালে ন্যুড লিপস্টিক টা আরেকটু ছুঁইয়ে নিতাম ঠোঁটের ওপর, কপালের মধ্যিখানে সঠিক মাপের কালো টিপ, চুলটা বিনুনি করে কাঁধের একপাশ দিয়ে সামনে ফেলা।
নতুন হাত ঘড়ি কিনেছিলাম দুটো, কম দামী, বেল্টের…. ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরবো বলে। টিউশন এর টাকা জমিয়ে একজোড়া নতুন সুতির কূর্তি কিনে নিয়েছিলাম মাস খানেকের মধ্যে।
সময় ঘন হচ্ছিলো। আমি জানতাম জীবনটা আমায় কোথায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নৌকা তখন মাঝগঙ্গায়!স্রোতের টান যেদিকে, সেদিকেই নিয়তি খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম আমি।
অপরূপের দুটো গুণ ছিল চমৎকার। দুর্দান্ত গিটার বাজাতো ছেলেটা, শুধু তাই নয়!দারুণ কণ্ঠস্বর ছিল ওর। ফ্রেশার্স হোক বা কলেজ ফেস্ট…ওর নামে একটা ঘন্টা অনিবার্য ছিল। আমি গান ভালোবাসতাম। তাই হয়তো অপরূপকেও….
তবে ‘ভালোবাসা’ বলে বিস্তীর্ণ যে জমিটা আছে, তার বিশালতা টের পাইনি তখন। মানুষ বলে,দূরে গেলে ভালোবাসা বাড়ে!আবার একই মুদ্রার উল্টোপিঠেই লেখা আছে, ‘out of sight, out of mind’...
আসলে কথাটা তা নয়, দূরত্ব বাড়লে উপলব্ধি বাড়ে।
এই উপলব্ধির গভীরতাই নির্দেশ করে স্রোতের টান শেষের দিকে নাকি শুরুর…!
ক্লাস অফ চলছিল। কালকে ফেস্ট তাই আজ মাত্র দুটো ক্লাস করিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। তবে পুরোপুরি ছাড় নেই। ডিপার্টমেন্টাল হেড বেশ কড়া ছিলেন আমাদের। টিচার্স রা মিটিং রুমে গেলেও আমাদের দিয়ে গেছেন প্র্যাক্টিকাল খাতা কমপ্লিট করতে। আমরাও ভাবলাম,যাক দিনটা ইউটিলাইজড হবে!প্রত্যেক ব্যাচে একটা দুটো ফাঁকিবাজ স্টুডেন্ট থাকে। যাদের চোখটাই থাকে টিচার্স রুমের দিকে। কোনো স্যার ম্যাম কালেভদ্রে কামাই করলেই সে হৈ হৈ করতে করতে খবরটা চাওর করে। আমাদের ইয়ারেও একটা ছেলে ছিল অমন।নাম অয়ন। আমরা বলতাম, ‘যা…, এই খুশিতে বামাচরণ থেকে মিষ্টি নিয়ে আয়!’
ছেলেটা সত্যিই পরের দিন আনতো। আমরা হাসতে হাসতে ওর পিঠ চাপড়ে বলতাম, ‘মানুষ হলিনা!’
সে মানুষ হবে বলে স্ট্রিমটাই ছেড়ে দিল। শখের আর্ট কলেজে ভর্তি হয়ে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো আমাদের থেকে।যাক সে কথা!
তবে এই অয়নই ছিল আমার অনুভূতির গোড়ায় বাতাস লাগানোর একমাত্র কারিগর।
ক্যাম্পাসে ঢু মেরে এসে আমার পাশে বসতে বসতে অয়ন বললো,
-তোর জানেমন ছবি আঁকছে গাছপাতার….তু্ই আজ নেই বলে!হায় জিন্দেগী!
আমি হেসে ফেলেছি। বুকের ভেতর সুখপাখি উড়ে যাচ্ছিলো ডানা ঝাপ্টিয়ে। ওকে আটকাইনি।
দিন যত গড়াচ্ছিলো অপরূপের বিভিন্ন দিকের সাথে পরিচিত হচ্ছিলাম। ছেলেটা দুর্দান্ত গান গাইতো, গিটার বাজাতো। এমনকি দারুণ ছবি আঁকতো ছেলেটা। মাঝেসাঝে দোতলায় ফেলে রাখা বেঞ্চগুলোর কোনো একটায় চুপ করে বসে থাকতো ও। আকাশ দেখতো। অথচ তখন সন্ধ্যে নয়।দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ!কলেজর উল্টোদিকের বিশাল এক বটবৃক্ষ ছিল।অসংখ্য সরু -মোটা হাত বাড়িয়ে মাটি ছুঁয়ে থাকতো গাছটা । আহামরি নয়…তাও সে অপরূপের দৃষ্টি কাড়তো।
তারপর বোর্ড, আর্টপেপার আর রঙের খেলা।সেও এক মহীরুহ!
ও কখনো কাউকে নিজের আঁকা দেখাতোনা। বন্ধুরাও জানতো, তাই ওকে একলা ছেড়ে দিতো সেসময়।
কলেজ ফেস্টের দুদিন কেটে গেছে। একটু একটু করে ছন্দে ফিরছে সবটা।আমাদের ডিপার্টমেন্টের ছন্দ কোনোদিনও কাটতোনা, তাই ফেরাফেরির প্রশ্নই ওঠে না। সেদিন কোনো একটা ক্লাস অফ ছিল। সবাই ভেতরে থাকলেও আমি বেরিয়ে এলাম বাইরেটায়।অভ্যেসবশত দোতলার দিকে তাকালাম।কেউ নেই।ফেস্টের দিন থেকেই মনটা ভারী হয়ে আছে। অপরূপ এবারে গান গায়নি। এমনকি সেদিন ওকে কোথাও দেখতেও পাওয়া যায়নি।মাঝে একদিন ছুটি গেছে। আজ এসেছে কিনা সেটাই ভাবছিলাম…তখনি চোখ গিয়ে পড়লো সামনের দিকে। উল্টোদিকের ব্লকের দিক থেকে অপরূপ এগিয়ে আসছে এদিকেই।আমার ইনটিউশন কখনো ভুল হয়নি আজ অবধি। ওর দ্বিধাহীন দৃষ্টি, দৃঢ় চলনভঙ্গি…অনায়াসেই বুঝিয়ে দিচ্ছে গন্তব্য কোথায়!
আমি ভীতু নই । কিন্তু এখন কেনো জানি ভয় হতে শুরু করলো। ধরা পড়ে যাবার ভয়! চোখ সরিয়ে নিয়ে চলে যাবো এমন সময় পেছন থেকে দরাজ কণ্ঠে ডেকে উঠলো অপরূপ।
-রূপকথা…দাঁড়াও!
সর্বনাশ!ও আমার নাম জানে? সেকি!কিন্তু কেনো? আমি তো ভীড়ের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা একটা গড়পড়তা মানুষ!
দাঁড়িয়ে রইলাম। আমাদের মধ্যেকার অদৃশ্য সুতোটা আস্তে আস্তে ছোটো হচ্ছিলো। একটা সময় সেটার দৈর্ঘ্য বড্ডো কমে এলো। অপরূপ আমার মুখোমুখি। আমার চোখদুটো আনত। অপরূপের নয়। রোল করে রাখা একটা আর্টপেপার আমার হাতে তুলে দিলো ও। হাতটা বাড়িয়ে আমার ডান হাতের ওপর রেখে দিলো কাগজটা। শ্বাস ঘন হচ্ছিলো ক্রমশ। মনে হচ্ছিলো শরীরের যাবতীয় শক্তি ফুরিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে চোখ তুললাম আমি। অপরূপের হাতজোড়া জিন্সের পকেটে। দৃষ্টি আমাতেই স্থির।অমন শান্ত, সব পড়ে ফেলা দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে যে কেউ ভেঙে যেতে পারে। আমিও কখন যে চূর্ণ হয়ে গেছি বুঝতে পারিনি।
-বাবার ট্রান্সফার অর্ডার এসেছে।আমাকেও যেতে হবে।
চারিপাশে এমন মৃত্যুর নিস্তব্ধতা কেনো ছেয়েছিল বুঝতে পারছিলাম না!এই অপার নৈঃশব্দ্যের মাঝেও কাঁচ ভাঙার আওয়াজ ভেসে আসছিলো অনেক দূর থেকে।
-কিছু বলার নেই তোমার? আমার আজই লাস্ট ডে…
আমি ঢোক গিললাম। ঘন বাষ্প গলার কাছে আটকে আছে। কী আশ্চর্য!আমি বোবা হয়ে গেলাম নাকি?
নির্বাক দৃষ্টিটা পড়ে ফেলতে সবাই পারেনা। অপরূপ বোধহয় পেরেছিলো।
যাওয়ার আগে শুধু বলে গিয়েছিলো,
-এই ছবিটা তোমায় দিয়ে গেলাম। রাখলে রেখো, নইলে ছিঁড়ে ফেলো।
তারপর আর কোনোদিনও ছেলেটাকে কলেজের দোতলায় দেখা যায়নি।
বৃষ্টি থেমে গেছে। তবে মেঘ এখনো চাপা গর্জন করে চলেছে। ল্যামপোস্টের মাথা ছুঁয়ে আশ্চর্য এক সন্ধ্যা নেমে এসেছে কখন যেন! আমি পায়ে পায়ে ঘরে এলাম।সারা ঘর কোকাপ অন্ধকার। জানলা খুলে দিলাম। গুমোটভাব টা যদি কাটে!সন্ধ্যে দেওয়া বাকি, ঘর গোছানো হয়নি, নিজের জন্য এক কাপ চা করে বসা হয়নি…. আমার বর্তমানের এক টুকরো সময় অতীত কেড়ে নিয়ে গেছে। আমি বিছানায় শুলাম। আলোহীন ঘরে উল্টোদিকের দেওয়ালের দিকে চোখ তাক করে রেখেছি। পাশের বাড়ির ছাদে আলো জ্বলে উঠতেই খোলা জানলা দিয়ে হুড়মুড় করে সাদা আলো এসে ভীড় করলো কাঁচ দিয়ে বাঁধানো ফটোফ্রেম টার ওপর।চোখ
বেয়ে জল নেমে আসে তিরতির করে। সুপ্ত অনুভূতিরা যদি কথা বলতে পারতো, তবে তার ভাষা বোধহয় এটাই হোতো!

0 Comments