রক্তজবা || মাসুদুল হক

 

Blood-Red Hibiscus || Masudul Haque

আমার প্রথম প্রেম জবা। আমাদের প্রথম যৌবনের নব পল্লবিত দিনগুলো আজকের মতো এত তাড়াহুড়োর ছিল না। দুপুরেরও যেন একটা নিজস্ব অলসতা ছিল, বিকেলের ছিল আলাদা মায়ামুগ্ধ আলো। রোদ্দুর গাছের পাতায় এসে থেমে থাকত, পুকুরের পানিতে কাঁপত, তারপর ধীরে ধীরে কারও উঠোন পেরিয়ে চলে যেত পশ্চিম আকাশের দিকে। আর আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম দাদাবাড়ির সামনের ছোট্ট ফুলবাগানে, একটা রক্তজবা ফুলের দিকে তাকিয়ে।

কেন তাকিয়ে থাকতাম, জানতাম না।

সেই ফুলটার লাল রং আমার কাছে অপার বিস্ময়। মনে হতো, ওর শরীরে কেউ সিঁদুর মাখিয়ে দিয়ে গেছে। দুপুর যত গাঢ় হতো, ফুলটা তত উজ্জ্বল হয়ে উঠত। চারপাশে যখন ঝিম ধরা নীরবতা, দূরে কোথাও কাক ডাকছে, পুকুরঘাটে কলসি নামানোর শব্দ, আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে শুকনো মরিচ ভাজার গন্ধ—তখন ওই জবা ফুলটাই যেন আমার সমস্ত পৃথিবী হয়ে উঠত।

দাদাবাড়ি তখনও মফস্বল। হেরিংবোন রাস্তার দুপাশে ছোট ছোট টিনের বাড়ি, মাঝে মাঝে একতলা বিল্ডিং—উত্তর বরাবর বাড়লে আরও বাড়িঘর বাড়তে বাড়তে জলাশহরের দিকে চলে গেছে; দক্ষিণ দিক বাড়িঘর বাড়তে বাড়তে ধানের জমি, বাঁশঝাড়, তালগাছ, সুপারি গাছ। সেখানে বর্ষায় রাস্তা কাদায় ডুবে যেত। শীতের সকালে মাঠের ওপর কুয়াশা বসে থাকত সাদা চাদরের মতো। বৈশাখে কালবৈশাখী এলে টিনের চাল কাঁপত, আমগাছ থেকে কাঁচা আম পড়ত টুপটাপ। আর সন্ধ্যা নামলে দূরের কোনো বাড়ি থেকে হারমোনিয়ামের শব্দ আসত—কেউ হয়তো রবীন্দ্রসংগীত গাইছে, কেউ নজরুল, আবার কোনো বাড়ির উঠোনে রেডিওতে বাজছে আধুনিক বাংলা গান।

টেলিভিশন তখন অল্প কয়েকটি বাড়িতে। রেডিওই ছিল পৃথিবীর জানালা। সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে রেডিওটা কান ঘেঁষে ধরে সবাই খবর শুনতেন। দাদাবাড়িতে টেলিভিশন থাকায় দেখতাম, পাশের বিন্দুপাড়ার ছেলেমেয়েরা নাটক দেখতে আসত। 'সকাল-সন্ধ্যা' ধারাবাহিক নাটক দেখার তখন একটা ধুম ছিল। আবার মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চলে গেলে রেডিওর শব্দ আর কেরোসিনের বাতির আলোয় মনে হতো, পৃথিবীটা বুঝি এখানেই শেষ হয়ে গেছে।

সেই পৃথিবীতেই একদিন নূপুর এল। নূপুরের নামটা এখনো আমার ভেতরে একটা পুরোনো দুপুরের দরজা খুলে দেয়। ওদের বাড়ি ছিল দাদাবাড়ির সাথেই লাগানো। মাঝখানে একটা সরু রাস্তা, রাস্তার পাশে ঝোপঝাড়, আর বর্ষায় পানি জমে থাকা একটা নিচু জমি। নূপুর প্রতিদিন ওই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেত। সাদা-নীল পোশাক, দুই বেণি, বেণির মাথায় নীল ফিতা। হাতে বই। হাঁটার সময় পায়ের স্যান্ডেল থেকে এক ধরনের মৃদু শব্দ উঠত। সেই শব্দটাকে আমি তখন নাম দিতে পারতাম না। পরে বুঝেছি, কিছু শব্দ আসলে মানুষের নাম হয়ে যায়।

নূপুরের পায়ে নূপুর ছিল না। তবু আমি মনে মনে ওর হাঁটার শব্দকে নূপুর বলেই ডাকতাম।

একদিন ভরদুপুরে আমি জবা গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কেন দাঁড়িয়ে ছিলাম, আজও জানি না। হয়তো ফুল দেখছিলাম, হয়তো দুপুরকে দেখছিলাম, হয়তো নিজের অজান্তেই কারও অপেক্ষা করছিলাম।

ঠিক তখনই নূপুর এসে দাঁড়াল বাগানের পাশে।

দুপুরের রোদ যেন হঠাৎ একটু থেমে গেল।

ওর মুখে তখন ঘামের চিকচিক। কপালের কাছে কয়েকটা চুল লেগে আছে। হাতে একটা বাংলা বই। ও আমাকে দেখে বলল, “এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।

ও আবার বলল, “জবা ফুল দেখছ?”

আমি মাথা নাড়লাম।

নূপুর হাসল। সেই হাসিটা আজও আমার সবচেয়ে পুরোনো বিকেল। আমি তখন বেভুলো হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে ঠিক কিসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি, বুঝতে পারছিলাম না। জবা ফুলের জন্য, নাকি নূপুরের জন্য। শুধু মনে হচ্ছিল, দুপুরটা একটু আগে শেষ হয়ে যাক। আবার মনে হচ্ছিল, এই দুপুর যেন কোনোদিন শেষ না হয়।

ওর সঙ্গে দুটো কথা বলার জন্যও বুকের ভেতর একটা ছোটখাটো ভূমিকম্প হয়ে যেত। চিঠি লিখলে সেটা পৌঁছাবে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন ছিল—কেউ দেখে ফেলবে কি না।

আমাদের অনুভূতিও তাই কথার চেয়ে অপেক্ষায় বেশি ছিল। নূপুর স্কুল থেকে ফেরার সময় আমি কখনো পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতাম, কখনো রাস্তার পাশে। হাতে থাকত একটা বই, কিন্তু বইয়ের কোনো অক্ষর চোখে ঢুকত না। দূর থেকে নূপুরকে দেখা যেত। ও কাছে আসত। আমি চোখ নামিয়ে ফেলতাম। ও পাশ দিয়ে চলে যেত। তারপর অনেক দূরে গিয়ে একবার ফিরে তাকাত কি না, সেই সন্দেহ নিয়ে আমি আরও দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতাম।

সেদিনগুলোতে প্রেম মানে ছিল একটা চিঠি লুকিয়ে রাখা। আমার লেখা প্রথম চিঠিটা ছিল খুব ছোট।

“তোমাকে দেখলে আমার ভালো লাগে।”

এর বেশি লিখতে পারিনি। চিঠিটা একটা কড়া রোদের দুপুরে ওর হাতে দিতে চেয়েছিলাম। আমার তখন মনে হতো, কড়া রোদ মানে অন্ধকার। সেই রোদে অন্য কেউ আমাদের দেখবে না। এর একটা কারণ ছিল দাদাবাড়ির পাড়ায় কড়া রোদের দুপুরে তখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত। চিঠিটা ওর হাতে দিতে পারিনি; একটা পুরোনো বাংলা বইয়ের ভাঁজে রেখে দিয়েছিলাম। নূপুর কীভাবে সেটা পেল, আজও জানি না। পরদিন ও আমাকে শুধু বলেছিল, “তুমি খুব বোকা।”

আমি হেসেছিলাম। নূপুরও হেসেছিল। সেই হাসির ভেতরেই আমাদের সমস্ত প্রেম লেখা হয়ে গিয়েছিল।

তখন সন্ধ্যা নামত খুব দ্রুত। মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসত। হিন্দু বাড়িগুলোতে শঙ্খ বাজত। কারও উঠোনে ধূপের গন্ধ, কারও রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজ-রসুন ভাজার গন্ধ। পাড়ার ছেলেরা মাঠে ফুটবল খেলত। একটু দূরে কোনো বাড়িতে বিয়ে হলে মাইক বাজত রাতভর। “তুমি যে আমার”—এই ধরনের গান বাতাসে ভাসত, আর আমি জানালার পাশে বসে ভাবতাম, পৃথিবীতে বুঝি আমার চেয়ে সুখী আর কেউ নেই।

নূপুরের সঙ্গে আমার কোনো সিনেমার মতো প্রেম ছিল না। ছিল না হাত ধরে হাঁটা, রিকশায় পাশাপাশি বসা, কিংবা শহরের কোনো রেস্টুরেন্টে দেখা করা। আমাদের দেখা হতো মানুষের ভিড়ের মধ্যেও লুকিয়ে। কথা হতো অন্য কথার আড়ালে।

আমি ঢাকায় থাকতাম। শুধু নূপুরের জন্য ছুটে ছুটে দাদাবাড়িতে যেতাম; আর ছোট্ট বাগানের পাশে দুপুরের অপেক্ষায় থাকতাম। সবাই নিঝুম দুপুরে ঘুমিয়ে পড়লে নূপুর আসত। আমাদের আলাপ ছিল এরকম:

“পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?”

“ভালো।”

“পরীক্ষা কবে?”

“আগামী মাসে।”

তারপর নীরবতা।

এই নীরবতাটুকুই ছিল আমাদের আসল কথা।

কখনো পূর্ণিমার রাতে দাদাবাড়ির ছাদে উঠে আকাশ দেখতাম। দূরে কোথাও বাঁশির শব্দ। পুকুরের পানিতে চাঁদের আলো। নূপুরও একই চাঁদ দেখত। আমাদের কথা থাকত, চাঁদ উঠে এলে দুজন দু'বাড়ি থেকে চাঁদ দেখব। তখন পৃথিবীটা খুব বড় মনে হতো, আবার আশ্চর্যভাবে খুব ছোটও। মনে হতো, আকাশের নিচে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।

কিন্তু ধীরে ধীরে শহরে নতুন নতুন জিনিস আসতে লাগল। রঙিন টেলিভিশন এলো। ভিডিও ক্যাসেটের দোকান হলো। বাজারে নতুন গান বাজত। ছেলেদের পোশাকে বদল এল, মেয়েদের চুলের কাটে বদল এল। মফস্বলেও ধীরে ধীরে শহরের হাওয়া ঢুকতে লাগল। কাঁচা রাস্তার পাশে ইট বিছানো হলো। মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ল। কেউ কেউ বিদেশে যেতে শুরু করল।

আমাদের ভেতরেও অদৃশ্য কোনো পরিবর্তন হচ্ছিল।

নূপুর একদিন বলল, “তুমি বড় হয়ে কী হবে?”

আমি বললাম, “জানি না।”

ও বলল, “আমি শিক্ষক হব।”

আমি বললাম, “তখন আমি তোমার ক্লাসে ভর্তি হব।”

ও হেসে ওঠে।

আমি আবুল হাসানের কবিতা শোনাই:

"প্লাস্টিক ক্লিপের মত সহস্র কোকিল যেই বনভূমি গেঁথে নেয়

সবুজ খোঁপায় ভোরবেলা-ময়ূরের পেখমের মতো খোলা রোদে বসে

ব্লাউসের বোতাম লাগিয়ে মিস্ট্রেস আসে ইশকুলে আর

কয় ঝাঁক বালকের নির্দোষ নিখিল ভরা ক্লাসরুমে এসেও সে শোনে

বনখোঁপা বাঁধা কোকিলের কূজন তার চুলে, চমৎকার

চিরোল গ্রীবায়, শেষে গৌর লাজুক শিয়রে শিহরিত শুধু

পেতে গিয়ে এক হারানো প্রেমের ঘ্রাণ, বয়ে নেয় সে তখন

কী যে এক আর্দ্র পরাজয় তার আত্মব্যস্ত অতীতের অথই সীমায়!"

২.

কয়েক বছর পর নূপুরের বিয়ে হয়ে গেল।

খবরটা যখন পেলাম, তখন বর্ষা। সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। পুকুর উপচে উঠেছে। উঠোনে হাঁটুসমান কাদা। জবা গাছটার নিচে বৃষ্টির পানি জমে ছিল। একটা রক্তজবা ভিজে নুয়ে পড়েছিল। আমি অনেকক্ষণ জবার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, ফুলও কখনো কখনো মানুষের মতো কাঁদে।

নূপুর চলে গেছে। নূপুর চলে যেতে থাকে ধীরে ধীরে; ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। আমি জবার দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় জবাকেও বুকের গভীরে রেখে দিই। পড়াশোনা, চাকরি, সংসার, সন্তান, দায়িত্ব—সবকিছু একসময় আমাকে পুরোনো দুঃখের ওপর নতুন নতুন দিন চাপিয়ে দিতে শেখায়।

কিন্তু কিছু দুপুরকে চাপা দেওয়া যায় না। এত বছর পরও যখন কোথাও রক্তজবা দেখি, আমি থেমে যাই। মনে হয়, একটা সরু কাঁচা রাস্তা দিয়ে সাদা-নীল পোশাক পরা একটা মেয়ে হেঁটে আসছে। ওর হাতে বাংলা বই। কপালে দুপুরের ঘাম। পুকুরে শাপলা। বাঁশঝাড়ে বাতাস। দূরে রেডিও বাজছে। কোনো বাড়ির উঠোনে কেউ ধান শুকোচ্ছে। ছেলেরা মাঠে খেলছে। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি একটা জবা ফুলের সামনে।

নূপুর এসে বলছে, “এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

আমি এবারও উত্তর দিতে পারি না।

আমি যে আসলে জবার জন্য দাঁড়িয়ে থাকি; সেটাও বলতে পারি না। আমি দাঁড়িয়ে থাকি আমার প্রথম বিস্ময়ের জন্য; যেখানে দুপুর এত দীর্ঘ ছিল যে একটা জবার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিকেল হয়ে যেত। যেখানে প্রেম মানে ছিল অপেক্ষা, চিঠির ভাঁজ, চোখের আড়ালে চোখ রাখা, আর একটি নাম মনে মনে উচ্চারণ করে সারাদিন ভালো থাকা।

নূপুর আমার জীবনে আসেনি; থেকে গেছে জবার মতো।

প্রতিটি গ্রীষ্মে ফুটে ওঠে। প্রতিটি দুপুর রক্তিম হয়ে দাঁড়ায়। আর আমি, যত বয়সই হোক, সেদিকে তাকিয়ে আবার সেই পুরোনো ছেলেটা হয়ে যাই। মনে হয়, বিকেল হওয়ার আগে কোনো এক মুহূর্তে দুপুরের রোদকে অন্ধ করে নূপুর এসে দাঁড়িয়েছে ফুলবাগানে। আমি বেভুলো হয়ে যাই। আমি ভুলে যাই—আমি আসলে ঠিক কিসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। শুধু জানি, আমার প্রথম প্রেম এখনো ফুটে আছে রক্তজবা হয়ে।


Post a Comment

0 Comments