মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি শব্দ উচ্চারিত হয় নীরবতার ভেতর দিয়ে, মুখ দিয়ে নয়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের বুকের গভীরে এমন কিছু বাক্য জমে থাকে, যেগুলো কোনোদিন ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছায় না। যে কথাগুলো বলা হয়ে ওঠেনি, যে ভালোবাসাগুলো স্বীকার করার আগেই সন্ধ্যা নেমে এসেছে, যে ক্ষমাপ্রার্থনা ঠোঁট পর্যন্ত এসে ফিরে গেছে বুকের অন্ধকারে—সেই সব না-বলা কথাই হয়তো মানুষের সবচেয়ে দীর্ঘ সাহিত্য।
আমরা কথা বলতে শিখি খুব ছোটবেলায়। মা ডাকতে শিখি, নিজের প্রয়োজন জানাতে শিখি, হাসি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে শিখি। বড় হতে হতে শিখে যাই যুক্তি, তর্ক, অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি। অথচ জীবনের সবচেয়ে জরুরি কিছু বাক্যের সামনে এসে আমরা হঠাৎ নির্বাক হয়ে যাই। কাউকে বলতে পারি না—তুমি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে বলতে পারি না—তোমাকে হারানোর ভয় আমার আছে। আবার কোনো কোনো মানুষের কাছে সারাজীবন ধরে বলতে পারি না—আমি ভুল করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিও।
শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডিগুলোতে মানুষ যতটা সংলাপে বেঁচে থাকে, তার চেয়েও বেশি বেঁচে থাকে না-বলা দ্বিধায়। হ্যামলেটের বিখ্যাত প্রশ্নের মতো—থাকা না থাকার মাঝখানে যে দীর্ঘ অন্ধকার, আমাদের জীবনেও তেমনি বলা আর না-বলার মাঝখানে একটি বিশাল মহাদেশ পড়ে থাকে। সেই মহাদেশের কোনো মানচিত্র নেই, কোনো রাষ্ট্র নেই, কোনো সীমান্ত নেই। আছে শুধু স্মৃতি, অনুশোচনা, অপেক্ষা আর কিছু অসমাপ্ত বাক্য। সেখানে মানুষ একা হাঁটে, নিজের অতীতের সঙ্গে কথা বলে, অথচ যার জন্য এত কথা—সে হয়তো বহু দূরে।
রবীন্দ্রনাথের গল্পের চরিত্রগুলোর মতো আমাদের জীবনেও এমন মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয় সব কথা বলার জন্য ভাষা তৈরি হয়নি। কিছু অনুভূতি কেবল জানালার বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বোঝাতে হয়। কিছু ভালোবাসা চিঠি হয়ে লেখা হয়, কিন্তু ডাকবাক্স পর্যন্ত পৌঁছায় না। কিছু নাম সারাজীবন ঠোঁটে আসে না, অথচ নিঃশ্বাসের সঙ্গে প্রতিদিন উচ্চারিত হয়। মানুষের হৃদয় কখনো কখনো এমন এক ভাষায় কথা বলে, যার কোনো বর্ণমালা নেই।
না-বলা কথাগুলো আসলে পুরোনো কোনো গ্রন্থাগারের মতো। সেখানে ধুলো জমে থাকে, মাকড়সার জাল পড়ে, সময়ের গন্ধ মিশে যায় পাতার সঙ্গে—কিন্তু কোনো বই সত্যিই নষ্ট হয় না। একদিন হঠাৎ কোনো পুরোনো গানের সুর, কোনো পরিচিত সুগন্ধ, কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেল কিংবা রাস্তার একটি মোড় সেই গ্রন্থাগারের দরজা খুলে দেয়। তখন দেখা যায়, যে মানুষটিকে ভুলে গেছি বলে মনে করেছিলাম, সে এখনও একটি বাক্যের মধ্যে বসে আছে।
স্মৃতি বড় অদ্ভুত জিনিস। সে কখনো সরাসরি ফিরে আসে না। সে আসে একটি পুরোনো কাপড়ের গন্ধ হয়ে, একটি বইয়ের ভাঁজে শুকিয়ে থাকা ফুল হয়ে, কিংবা বহু বছর আগে শোনা কোনো গানের প্রথম দুটি লাইনের মতো। তখন মনে হয়, মানুষের জীবন আসলে কতগুলো না-বলা কথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যাদের ভুলে গেছি বলে দাবি করি, তারা হয়তো আমাদের ভেতরে অন্য কোনো নামে বসবাস করে।
জীবনানন্দের নিঃসঙ্গ পথের মতো মানুষের ভেতরেও এমন অনেক রাস্তা আছে, যেখানে কেউ কোনোদিন হাঁটেনি। সেখানে জমে থাকে শৈশবের ভয়, প্রথম ভালোবাসার কাঁপুনি, মায়ের কাছে বলতে না-পারা কষ্ট, বাবার কাছে চাওয়া অথচ না-চাওয়া ক্ষমা। আমরা বড় হতে হতে কথা বলতে শিখি, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কথাগুলোই বলতে ভুলে যাই।
কাফকার চরিত্রগুলোর মতো কখনো কখনো আমরা নিজের জীবনেই অপরিচিত হয়ে পড়ি। চারপাশে অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য শব্দ, অসংখ্য যোগাযোগের মাধ্যম—তবু একটি জরুরি কথা বলার মতো সাহস থাকে না। আজকের পৃথিবীতে মানুষ এক মুহূর্তে হাজার মাইল দূরের মানুষের কাছে বার্তা পাঠাতে পারে, কিন্তু পাশের ঘরে বসে থাকা মানুষটিকে বলতে পারে না—তুমি কষ্ট পেয়েছ, আমি বুঝতে পারিনি।
মহাভারতের যুদ্ধ হয়তো কুরুক্ষেত্রে হয়েছিল, কিন্তু মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধ ঘটে নিজের ভেতরে। একদিকে হৃদয় বলে—বলে দাও। অন্যদিকে অহংকার ফিসফিস করে—থাক, দরকার নেই। একদিকে ভালোবাসা হাত বাড়ায়, অন্যদিকে ভয় হাত টেনে ধরে। তারপর সময় এসে দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায়।
সময় পৃথিবীর সবচেয়ে নির্দয় সম্পাদক। সে কোনো অসমাপ্ত বাক্যের জন্য অপেক্ষা করে না। সে কোনো চিঠি শেষ করার সময় দেয় না। সে কাউকে বলে না—আরেকবার ভেবে নাও, কাল হয়তো সুযোগ থাকবে না। একদিন মানুষটি চলে যায়, সুযোগটি ফুরিয়ে যায়, সম্পর্কের দরজাটি বন্ধ হয়ে যায়, আর বাক্যটি থেকে যায়—অর্ধেক লেখা কবিতার মতো।
তখন মানুষ বুঝতে পারে, কিছু নীরবতা আসলে শান্তি নয়; কিছু নীরবতা সারাজীবনের অনুশোচনা।
কখনো কখনো মনে হয়, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ভেতরে একটি অদৃশ্য জাদুঘর আছে। সেখানে কাচের বাক্সে সাজানো থাকে—একটি না-পাঠানো চিঠি, একটি অসমাপ্ত ফোনকল, একটি ক্ষমা চাওয়ার মুহূর্ত, একটি প্রত্যাখ্যাত কান্না, একটি ভালোবাসার স্বীকারোক্তি। কোনো কোনো বাক্সে থাকে মৃত মানুষের জন্য জমিয়ে রাখা কথা। সেই বাক্সগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি অসহায় বোধ করে, কারণ মৃত মানুষের কাছে কোনো চিঠি পৌঁছায় না।
দর্শক কেউ নেই, তবু সেই জাদুঘর প্রতিদিন খোলা থাকে। আমরা নিজেরাই সেখানে গিয়ে পুরোনো স্মৃতির সামনে দাঁড়াই। কখনো কোনো ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবি—সেদিন যদি কথাটা বলতাম! কখনো কোনো পুরোনো বার্তা পড়ে মনে হয়—আরেকটু চেষ্টা করলে হয়তো মানুষটি থেকে যেত। কিন্তু অতীতের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা হলো, সেখানে ফিরে যাওয়া যায় না; শুধু ফিরে তাকানো যায়।
তবু সব না-বলা কথা দুঃখের নয়।
কিছু নীরবতা পূর্ণিমার আলোর মতো—স্পর্শ না করেও চারপাশ ভরে দেয়। দুটি মানুষের মধ্যে কখনো এমন বোঝাপড়া তৈরি হয়, যেখানে শব্দ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। চোখের দিকে তাকালেই একটি উপন্যাস শেষ হয়ে যায়। হাতের সামান্য স্পর্শে লেখা হয়ে যায় হাজার বছরের কবিতা। পাশাপাশি বসে থাকা দুটি মানুষ কোনো কথা না বলেও পরস্পরের সমস্ত ক্লান্তি বুঝে ফেলে।
সেই নীরবতা সুন্দর।
কিন্তু যে নীরবতা ভয় থেকে জন্ম নেয়, অহংকার থেকে জন্ম নেয়, কিংবা সময় নষ্ট করার অভ্যাস থেকে জন্ম নেয়—সেই নীরবতা একদিন বিষণ্নতার মতো ফিরে আসে। কারণ জীবন কোনো সংশোধিত পাণ্ডুলিপি নয়, যেখানে পরে ফিরে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া বাক্য বসিয়ে দেওয়া যায়। জীবন কোনো উপন্যাসও নয়, যেখানে শেষ অধ্যায়ে এসে সব ভুল বোঝাবুঝির সমাধান হবে।
মৃত্যু যেমন শেষ অধ্যায়ের আগে অনুমতি নেয় না, তেমনি বিচ্ছেদও দরজায় কড়া নাড়ার সময় দেয় না। মানুষ হঠাৎ করেই দূরে চলে যায়। একটি ফোনকল শেষ ফোনকল হয়ে যায়, একটি দেখা শেষ দেখা হয়ে যায়, একটি সাধারণ বিদায় সারাজীবনের বিদায় হয়ে দাঁড়ায়।
তাই কোনোদিন যদি মনে হয়—কাউকে বলতে হবে, তুমি আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ছিলে—তবে বলে দিও।
কোনোদিন যদি মনে হয়—আমি ভুল করেছি—তবে ক্ষমা চেয়ে নিও।
কোনোদিন যদি মনে হয়—তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ বোধ করি—তবে অহংকারের দেয়াল ভেঙে ফেলো।
আর যদি মনে হয়—আমি তোমাকে ভালোবাসি—তবে অন্তত একবার উচ্চারণ করো।
কারণ না-বলা কথার জাদুঘর যতই সুন্দর হোক, সেখানে সারাজীবন বসবাস করার জন্য মানুষ জন্মায়নি। মানুষের জন্ম আলোয় ফেরার জন্য, মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য, অসমাপ্ত বাক্যকে পূর্ণ করার জন্য।
সব কথা হয়তো বলা সম্ভব নয়।
কিন্তু যে কথাটি আজ বলা যায়, সেটি কালকের জন্য রেখে দেওয়া সবচেয়ে বড় ভুল।
কারণ কাল কখনো কখনো আসে না।
#

0 Comments