মেঘে বোনা প্রেম || চন্দ্রশিলা ছন্দা

Love Woven in Clouds || Chandrashila Chhanda


বিকেলের সোনাঝরা রোদ যখন ওক গাছের পাতা ছুঁয়ে হালকা ভেজা ঘাসে ঝিলমিল করে, ঠিক তখনই আমার চারপাশের চেনা পৃথিবীটা কেমন যেন শান্ত আর মায়াবী হয়ে ওঠে। প্রতিদিনের নিয়ম মেনে আজও আমি এসে বসেছি আমার সেই নির্দিষ্ট লোহার বেঞ্চটিতে। সামনে বিস্তৃত সবুজ খোলা মাঠ, আর মাথার ওপর অসীম উধাও আকাশ। বিদেশের হেমন্তকালটি অলৌকিক সুন্দর! একই গাছে সবুজ, হলুদ, লাল,কমলা রঙের পাতার ঝিলিমিলি। মিষ্টি মুগ্ধ মৃদু বাতাস। প্রকৃতির এই মন জুড়ানো রূপ দেখে এবং উপলব্ধি করতে করতে আমার আবশেই চোখ দুটো মুদে আসছিল। আর ঠিক তখনই, হালকা চেনা এক জোড়া জুতোর শব্দ। চোখ না খুলেই আমি টের পেলাম, প্রতিদিনের মতো আজও একটু দূরত্ব রেখে বেঞ্চের অপর প্রান্তে এসে বসলেন সেই মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। ওঁর চন্দন কাঠের পারফিউমের চেনা সুবাস ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। গত তিন মাস ধরে এটাই আমাদের নীরব রুটিন। কোনো কথা নেই, শুধু এক অদ্ভুত মায়ার টান।

আজ বাতাসটা একটু বেশি চঞ্চল ছিল। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় আমার হাত থেকে আমার প্রিয় পার্পল রঙের ডায়েরিটা ফসকে ঘাসের ওপর পড়ে গেল। পাতাগুলো পতপত করে উড়ছে। আমি কুড়িয়ে নেওয়ার আগেই ভদ্রলোক আলতো করে ডায়েরিটা তুলে নিলেন। আমাদের হাতের আঙুলে আঙুল লাগলো। আশ্চর্য নরম কোমল স্পর্শে বিমোহিত হলাম। 

-আপনার ডায়েরি,

ওঁর কণ্ঠস্বরটা বেশ গম্ভীর। কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত মায়া জড়ানো।

আমি ডায়েরিটা হাত বাড়িয়ে নেওয়ার সময় আমাদের চোখাচোখি হলো। ভদ্রলোকের চোখে এক টুকরো শান্ত বিকেল লুকিয়ে আছে। আমি মৃদু হেসে বললাম, "ধন্যবাদ।"

ভদ্রলোক আজ প্রথম বারের মতো নীরবতা ভেঙে মৃদু হাসলেন। বললেন,

-আপনি প্রতিদিন এই সময়টায় এখানে এসে চোখ বন্ধ করে থাকেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য তো দেখার জিনিস, আপনি চোখ বন্ধ করেন কেন?

এমন বাচ্চাদের মতো প্রশ্ন শুনে আমার ভীষণ হাসি পেলো। ভেতর থেকে খিলখিল হাসি আসছিলো। কিন্তু শব্দ করে হেসে উঠলে উনি অপ্রস্তুত হবেন ভেবে নিজেকে সামলে নিয়ে 

আমি মাঠের শেষ প্রান্তের আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম,

-কিছু সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার নয়, মন দিয়ে অনুভব করার। চোখ বন্ধ করলে এই সোনাঝরা রোদ আর শান্ত বাতাস সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছায়।

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। ওঁর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। উনি পকেট থেকে একটি চিরকুট বের করে বেঞ্চের ওপর রাখলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, -আমি জানতাম আপনি ঠিক এই কথাটাই বলবেন। কারণ আপনার আর আমার অনুভূতিগুলো একদম একই।

উনি উঠে দাঁড়িয়ে পার্কের গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

আমি কৌতুহল সামলাতে না পেরে চিরকুটটা হাতে নিলাম। বুকটা ধক করে উঠল। চিরকুটের ওপর চমৎকার হাতের লেখায় লেখা,

-প্রিয়তমা, আজ থেকে ঠিক পনেরো বছর আগে এই পার্কের এই বেঞ্চিতে বসে আমি তোমাকে প্রথম ভালোবাসার কথা বলেছিলাম। আজ আমাদের প্রেমের পনেরো বছর পূর্তি। মাঝে কতো কিছু ঘটে গেছে! তোমার স্মৃতিশক্তি আমাকে আর আমাদের অতীতকে ভুলিয়ে দিয়েছে, কিন্তু আমার ভালোবাসা প্রতিদিন বিকেলে এই বেঞ্চে নতুন করে তোমার প্রেমে পড়ে। তুমি আগের থেকে অনেক অনেক বেশি শান্ত, স্নিগ্ধ, সুন্দর হয়েছো প্রিয়তমা। ডাক্তার বলেছিলেন তোমাকে জোর না করতে। প্রতিদিন তাই বিকেলে শুধু তোমার পাশে বসে তোমার ঘ্রাণ নিতাম। চোখ বন্ধ থাকায় আমার অবশ্য বেশ সুবিধা হতো তোমার সৌম্য সুন্দর মুখের দিকে প্রাণভরে তাকিয়ে থাকতে। আজ তুমি আবার ঠিক পনেরো বছর আগের সেই একই কথা বললে। শুভেচ্ছা অনিঃশেষ আমার অনুভবের পৃথিবী! 

আমার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে ডায়েরির পাতায় পড়ল। ঝাপসা চোখে পার্কের গেটের দিকে তাকালাম। ভদ্রলোক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন, ওঁর চোখে জল কিন্তু মুখে এক পৃথিবী জয় করার হাসি।

আমার অবচেতন মন যেন এক নিমিষেই সব মনে করিয়ে দিল। আমি আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বেঞ্চ ছেড়ে ওঁর দিকে ছুটে গেলাম। কিন্তু সত্যি বলতে সেখানে কেউ নেই। অথচ আমার কানে এক মধুর সুরের মতো বাজতে লাগল তাঁর কথাগুলো। চিঠিটির প্রতিটি অক্ষর। আমি বুঝতে পারলাম, আমার প্রেম আসলে কোনো মানুষের সাথে নয়। আমার প্রেম হলো এক নতুন অনুভূতির সাথে। যা মানুষকে নিজের অজান্তেই কবি বানিয়ে দেয়।

 হঠাৎ ঘরে ফেরা একটা পাখির ডাকে আমার কল্পনার ঘোর কাটল। আমি চোখ মেললাম। সামনে কেউ নেই, হাতে কোনো ডায়েরি বা বৃষ্টির বিকেলও নেই। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মৃদু হাসি আর বুকের ভেতরের ওই মৃদু স্পন্দন আমাকে বলে দিল, বাস্তবে কেউ না আসলেও, কল্পনার এই প্রেমের ছোঁয়া আমার মনকে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে দিয়ে গেছে

Post a Comment

0 Comments