এক : প্রথম শাড়ির বিকেল
তখন আমার সতেরো। সদ্য কলেজে ঢুকেছি—বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ। পৃথিবীটাকে তখন মনে হতো,একটা খোলা খাতা। প্রতিদিন নতুন কিছু লেখা হচ্ছে, আবার প্রতিদিনই কিছু পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। কলেজের গেট, পুরোনো গাছের ছায়া, বন্ধুদের আড্ডা, লাইব্রেরির নিস্তব্ধতা—সবকিছুতেই এক ধরনের নতুনত্ব ছিল।
সেই নতুন পৃথিবীর বাইরে, আমার নিজের পাড়ার ছোট্ট পৃথিবীতে ছিল সাথী।
সাথী তখন পনেরো। মহারানী কাশীশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণি । সেই বয়সে প্রথম শাড়ি পরার একটা আলাদা উত্তেজনা থাকে। মেয়েটি তখনও পুরোপুরি কিশোরী, অথচ আয়নায় নিজেকে হঠাৎ একটু বড় বলে মনে হয়।
সাথীরও তেমনই হয়েছিল।
একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে তাকে দেখেছিলাম। পরনে শাড়ি। শাড়ির ভাঁজগুলো এখনও ঠিকমতো বসেনি। হাঁটার সময় এক হাতে আঁচল সামলাচ্ছিল, অন্য হাতে বই। মুখে কেমন একটা অপ্রস্তুত লজ্জা।
আমি রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
সাথী আমাকে দেখেছিল কি না জানি না। কিন্তু আমি সেদিন তাকে নতুন করে দেখেছিলাম।
কৈশোর থেকে মনে মনে যে মেয়েটিকে ভাল লাগত, সেই দিন থেকেই সে আমার কাছে অন্যরকম হয়ে গেল।
আমি প্রেমের অর্থ সঠিকভাবে জানতাম না। শুধু জানতাম, তাকে দেখলে বুকের মধ্যে অকারণে একটা শব্দ হয়। তার সঙ্গে কথা না বলেও সারাদিন তাকে নিয়ে ভাবা যায়। কিন্তু মুখে কিছু বলার সাহস ছিল না।
শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বের আড়াল নিয়ে সুজয়ের হাত দিয়ে একদিন সাথীর কাছে একটি হাতের লেখা চিঠি পাঠিয়ে দিলাম।
চিঠি দেওয়ার পরের কয়েকটা দিন আমার কাছে অসহ্য দীর্ঘ ছিল।
তারপর একদিন সাথীর সঙ্গে দেখা। মুখটা গম্ভীর।
“চিঠিটা তুমি লিখেছ?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“এসব কথা লিখতে তোমার লজ্জা করে না?”
আমি চুপ।
“আর কোনোদিন আমাকে এসব লিখবে না। আমি এসব পছন্দ করি না। “ বলে সে চলে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, ভালবাসা প্রকাশ করলেই ভালবাসা পাওয়া যায় না। কখনও কখনও নিজের সবচেয়ে সত্য কথাটাই অন্যের কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
তবু সাথীকে মন থেকে সরাতে পারিনি। বরং অদ্ভুতভাবে তার রাগটুকুও আমার স্মৃতির অংশ হয়ে গেল।
দুই : অপেক্ষার বছর
সেই ঘটনার পর আমাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হলো।
একই পাড়া। একই রাস্তা। একই আকাশ। তবু আমরা যেন দুটো আলাদা মহাদেশ। ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা।
দূর থেকে তাকে দেখতাম। সে কখনও তাকাত, কখনও তাকাত না। কখনও চোখাচোখি হলে দ্রুত অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিত।
আমি কলেজে যেতাম, ক্লাস করতাম, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম। কিন্তু দিনের একটা অংশ যেন সবসময় তার জন্য খালি থাকত।
বিকেল হলেই মনে হতো, আজ হয়তো দেখা হবে।
হতো না। নির্লজ্জতা কাটিয়ে ওদের পাড়ায় যেতে পারিনি কখনও ।
আমি তখন কবিতা লিখতে শুরু করেছি। খাতার পর খাতা ভরে উঠত অদ্ভুত সব কথায়। মনে হতো না কখনও, এর নাম কি কবিতা?
নাম লিখতাম না, কিন্তু প্রতিটি কবিতার ভেতরে সাথীর ছায়া থাকত।
একদিন সুজয় বলেছিল, “তুই এখনও ওকে ভুলিসনি?”
আমি হেসে বলেছিলাম, “ভুলে যাওয়ার চেষ্টা তো করিনি।”
“ও তোকে খুব অপমান করেছিল।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিলাম, “কিছু মানুষকে অপমানের পরেও ভালবাসা যায়।” সুজয় আর কিছু বলেনি।
প্রায় একটা বছর কেটে গেল।
তারপর একদিন, পাড়াতুতো শিমুলতলায় হঠাৎ সাথীর সঙ্গে দেখা।
বিকেলটা ছিল অদ্ভুত শান্ত। শিমুল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ পড়ছিল। রাস্তার ওপর ধুলো উড়ছিল হালকা বাতাসে।
সাথী এসে আমার সামনে দাঁড়াল একাকী, “কী খবর তোমার ?”
আমি অবাক হয়ে মাথা নিচু করে বললাম, “ভালো।”
“আমার ওপর রাগ করেছ?”
আমি একটু হেসে বললাম, “রাগ করার মতো অধিকার তো কোনদিনই ছিল না।”
সে চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, “তুমি কি এখনও আমাকে ভালবাসো?”
আমার কাছে প্রশ্নটা যেন প্রশ্ন ছিল না—একটা পুরোনো দরজা হঠাৎ খুলে যাওয়া।
আমি বললাম, “ভালবাসা কি এত সহজে শেষ হয়?”
সাথী কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর সেই কথাটা বলল, যার জন্য হয়তো আমার পুরো একটা বছর অপেক্ষা করেছিল—“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
সেদিন পৃথিবীটা সত্যিই বদলে গিয়েছিল।
এক মুহূর্তে মনে হয়েছিল, এতদিনের সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত অপমান, সমস্ত একাকিত্ব যেন বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে।
বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা একই ছিল, মানুষ একই ছিল, দোকানপাট একই ছিল। শুধু আমি আর আগের মানুষটি ছিলাম না।
পর্ব তিন : প্রেমের ছোট্ট সংসার
তারপর আমাদের গল্পটা সত্যিই শুরু হল ।
আমাদের প্রেমে দামি উপহার ছিল না, বড় বড় প্রতিশ্রুতিও ছিল না। ছিল অপেক্ষা। একটা দেখা করার জন্য অপেক্ষা। একটা চিঠির উত্তরের জন্য অপেক্ষা।
একটা বিকেলের জন্য অপেক্ষা।
কখনও স্কুল ছুটির পর সাথী দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকত। আমি কলেজ থেকে ফেরার পথে তাকে দেখে থেমে যেতাম।
“আজ এত দেরি করলে?”
“তোমার জন্যই দাঁড়িয়ে আছি।”
“মিথ্যে কথা।”
“তুমি না এলে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতেই ভালো লাগে না।”
সে হেসে বলত, “তুমি খুব কথা শিখেছ।”
আমি বলতাম, “তুমি শিখিয়েছ।”
এই ছোট ছোট কথাতেই তখন আমাদের পৃথিবী পূর্ণ ছিল।
আমি ওকে নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কবিতা লিখতাম। সাথী পড়ে কখনও হাসত, কখনও বলত, “এগুলো তুমি সত্যিই লিখেছ?”
“হ্যাঁ।”
“আমাকে নিয়ে?”
“তোমাকে ছাড়া আর কাকে নিয়ে লিখব?”
তারপর শুরু হতো অভিমান। অতি সামান্য কারণে।
একদিন আমি নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছাতে পারিনি। সাথী অপেক্ষা করে চলে গিয়েছিল।
পরদিন দেখা হতেই বলল, “তুমি আসবে না জানালে না কেন?”
“হঠাৎ একটা কাজ পড়েছিল।”
“একটা খবর দেওয়া যায় না?”
“ভুল হয়ে গেছে।”
“সব ভুল কি ক্ষমা করা যায়?”
আমি চুপ করে ছিলাম।
কিছুক্ষণ পরে সে নিজেই বলল,
“কাল এসো।”
এই ছিল আমাদের প্রেম—রাগ, অভিমান, আবার কাছে আসা।
কিন্তু প্রেম যত গভীর হলো , লোকজনের চোখও তত তীক্ষ্ণ হলো।
পাড়ার মানুষ কথা বলতে শুরু করল। কে কার সঙ্গে কথা বলেছে, কে কোথায় দাঁড়িয়েছে—সব খবর যেন বাতাসে ভেসে বেড়াত।
একদিন সাথী বলল, “সবাই আমাদের নিয়ে কথা বলে।”
আমি বললাম, “মানুষ কথা বলবেই।”
“কিন্তু আমার ভয় করে।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, “আমাদের ভালবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে মানুষের কথায় কী এসে যায়?”
সে মৃদু হেসেছিল।
কিন্তু আজ মনে হয়, তখনই হয়তো আমাদের গল্পের ভেতরে একটা অদৃশ্য ফাটল তৈরি হচ্ছিল।
চার : যে বিকেলে নদী অন্যদিকে বয়ে গেল
সময় থেমে থাকে না।
আমার কলেজের দিন এগিয়ে চলছিল। সাথীরও পড়াশোনা চলছিল। আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক কথা বলতাম, কিন্তু কোন কথারই যেন শেষ ঠিকানা ছিল না।
আমরা ভাবতাম—একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
কৈশোরের প্রেম ভবিষ্যৎকে খুব সহজ মনে করে।
কিন্তু জীবন কখনও কখনও আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদী।
একদিন খবর পেলাম—সাথীর বিয়ে ঠিক হয়েছে।
প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি।
তারপর এক বিকেলে সাথীর সঙ্গে দেখা হল ।
অনেকক্ষণ দুজনেই চুপ করে ছিলাম। শেষে আমি বললাম, “শুনলাম তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
সাথী মাথা নিচু করল।
“হ্যাঁ।”
“আমাকে বলোনি?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “সব কথা কি নিজের ইচ্ছেমতো বলা যায়?”
আমি কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না। “তুমি কি আমাকে ভালবাসো না আর?”
সাথী এবার আমার দিকে তাকাল।
“ভালবাসা কি সবসময় মানুষকে নিজের করে রাখতে পারে?”
প্রশ্নটার উত্তর আমার জানা ছিল না।
আমাদের সামনে তখন একটা দীর্ঘ রাস্তা। কিন্তু দুজনের পথ যেন আলাদা হয়ে গেছে।
সাথী বলল,“আমাদের যা ছিল, সেটা তুমি ভুলে যেও না।”
আমি মৃদু হেসে বলেছিলাম, “ভুলতে পারলে তো ভালোই হতো।”
বিয়ের দিন যত এগিয়ে এল, আমাদের দেখা তত কমে গেল।
তারপর একদিন সে সত্যিই চলে গেল।
শুনলাম, কৃষ্ণনগরের কোন এক এলাকায় তার নতুন সংসার হয়েছে। পদবি বদলে গেছে। পরিচয় বদলে গেছে।
একটা মেয়ের নাম বদলে গেলে কি তার পুরোনো দিনগুলোও বদলে যায়? আমি জানি না।
শুধু জানি, সাথীর চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শহরের অনেক রাস্তা হঠাৎ অপরিচিত হয়ে গেল।
শিমুলতলা আর আগের মতো লাগত না।
সেই রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মনে হতো, কোন এক বিকেলে সাথী এসে বলবে, “আমি তোমাকে ভালবাসি।”
কিন্তু কেউ আসত না। শুধু বাতাস আসত।
পাঁচ : সাথী, দূরতম দ্বীপ
আজ এত বছর পরে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি, মানুষ আসলে তার অতীতকে ছেড়ে কখনও পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারে না।
সময় তাকে দূরে নিয়ে যায়, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করায়, নতুন সংসার দেয়, নতুন দায়িত্ব দেয়।
তবু মনের কোথাও একটা ছোট্ট ঘর থেকে যায়।
সেই ঘরে কিছু মানুষ সারাজীবন বসে থাকে।
সাথী তেমনই একজন।
আমি জানি না সে আমাকে কখনও মনে করে কি না। হয়তো করে না। হয়তো তার নিজের জীবনের ব্যস্ততায় সেই কৈশোরের দিনগুলো বহু আগেই মুছে গেছে ওর মন থেকে ।
কিন্তু আমার কাছে সেগুলো মুছে যায়নি।
আজও প্রথম শাড়ি পরা কোন কিশোরীকে দেখলে আমার মনে পড়ে সেই বিকেল।
আজও কোন পুরোনো হাতের লেখা দেখলে মনে পড়ে সেই চিঠি।
আজও শিমুল ফুল দেখলে মনে পড়ে সেই উচ্চারণ—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
জীবনে অনেক মানুষ আসে। কেউ পাশে থাকে, কেউ চলে যায়। কেউ স্মৃতি হয়ে থাকে, কেউ অভ্যাস।
কেউ কেউ মনের অন্ধকারে খোঁজে সেই সারস্বত প্রেমের স্মৃতি। তারা হয়ে যায় এক একটা দূরতম দ্বীপ।
যার কাছে পৌঁছানোর কোন পথ নেই, অথচ দূর থেকে তার অস্তিত্ব সারাজীবন দেখা যায়।
সাথী আমার কাছে সেই দ্বীপ।
তার বিয়ের পর পদবি বদলেছে। ঠিকানা বদলেছে। জীবন বদলেছে।
শুধু আমার স্মৃতিতে তার নাম বদলায়নি।
সেখানে সে এখনও সেই পনেরো বছরের মেয়ে—প্রথম শাড়ির ভাঁজ সামলাতে সামলাতে স্কুলে যাচ্ছে।
আমি এখনও সতেরোর সেই ছেলেটি, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছি।
সময়ের নদী আমাদের দুজনকে দুদিকে নিয়ে গেছে।
মাঝখানে জমেছে, অনেকগুলো বছর।
তবু কখনও কখনও সন্ধ্যার আলো নিভে আসার আগে মনে হয়, সেই নদীর ওপারে এখনও একটা মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে একা ।
হয়তো সে আমাকে দেখতে পায় না। হয়তো আমার ডাকও তার কাছে পৌঁছয় না।
তবু আমি জানি, আমার জীবনের কোন এক অদৃশ্য পৃষ্ঠায় তার নাম লেখা আছে।
সেই নাম মুছে ফেলার কোনো প্রয়োজনও বোধ করি না। কারণ সব ভালবাসার শেষ পরিণতি একসঙ্গে থাকা নয়।
কিছু ভালবাসা জীবনের কাছে শুধু একটি স্মৃতি চায়। একটি নির্মল স্মৃতি। একটি বিকেল।
একটি কিশোরী কণ্ঠের চারটি শব্দ। “আমি তোমাকে ভালবাসি।”
আমার জীবনের এই প্রান্তিক বিকেলে বসে তাই স্মৃতির পুরোনো পাতা উল্টাই।
কত মানুষ, কত ঘটনা, কত সম্পর্ক—সবকিছু সময়ের বেনোজলে ভেসে গেছে।
কিন্তু আশ্চর্য, সাথীর সেই ভালবাসাটুকু এখনও ডোবেনি।
হয়তো কোনদিন ডুববেও না। কারণ কিছু স্মৃতি জলের নিচে থেকেও আলো দেয়। সাথী সেই আলো। আমার কৈশোরের আলো। আমার প্রথম প্রেমের আলো। আমার জীবনের এক দূরতম দ্বীপের আলো।
সেই আলোর দিকেই তাকিয়ে, জীবনের প্রান্তিক বিকেলে আজও মনে মনে বলি—
সাথী, তুমি যেখানে থাকো ভাল থেকো।
তোমাকে আমি কোনদিন ভুলিনি। ভুলতে পারিনি। হয়তো কোনদিন পারবও না।
কারণ তুমি আমার জীবনে থেকে সরে যাওনি—তুমি আমার স্মৃতিতে থেকে গেছ।
স্মৃতির কোন পদবি হয় না, কোন ঠিকানা হয় না। শুধু থাকে—একটা নাম, সাথী। আমার ভালবাসার দূরতম দ্বীপ।
____________________________________

0 Comments