আমার মনের মধ্যে হাজারটা দোয়েল পাখি একবারে শীষ দিয়ে উঠত। আকাশের আলো যেন প্রতিদিনের শরতের স্বচ্ছ নরম আলো। ও কথা বলতে শুরু করলে মনে হতো স্রোতস্বীনি বইছে। আমি ভ্যাবলার মতো ওর গাঢ় গভীর চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ও অনর্গল কথা বলে যেত আমার মা, ওর মা, ওর দিদি, আমার কাকী আর ছুটকির সঙ্গে। কথার বিষয়বস্তু প্রায়ই হতো বিশ্বের যত অজানা রহস্য আর ওর নিজের দাবা খেলায় জেতার কৌশলের গল্প। ওর কথা শুনতে শুনতে আমার গাল অকারণে লাল হয়ে উঠতো। শরীরর ঝিমঝিম করতো। গলা আটকে আসতো। বিশেষত্বহীন আমি অন্যান্য দশ বারো জন স্রোতার সঙ্গে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম। নয়তো পুকুর ঘাটের বাঁধানো সিঁড়িতে এককোণে বসে ওর কথা গিলতাম।
আমার বয়স পনেরো ওর সতেরো কী আঠারো। সবেমাত্র গোঁফের রেখা কালো প্রজাপতির মতো ওর ঠোঁটের উপর জুড়ে বসেছে। হলুদ গমের মতো মাজা রঙ। ওর মায়ের গায়ের রঙ পেয়েছে। তবে চেহারার গঠন ওর আফগারি অফিসে চাকরিরত বাবার মতো। লম্বা পেটা দোহারা। সকালে সাতটায় উঠে কলেজে যায়। আমি স্কুলে যাবার আগে জানালার পর্দা ফাঁকা করে বই থেকে চোখ তুলে একবার প্রাণভরে ওকে দেখে নিই। আমার মনের মধ্যে দুধের সরের পেলবতা তৈরি হয়। ওকে একবার দেখেই দু’হাতে মায়ের বাটনা বাটা, তরকারি কাটা, থালাবাসন ধোয়া, রুটি বেলা সুপারম্যানের গতিতে করে দিই। কোনো কষ্টই অনুভব হয় না। প্রতি শুক্রবার বিটিভিতে সুপারম্যান সিরিজ দেখায়। কিন্তু আমার ওকে সুপারম্যান নয়, নিজেকে সুপারওম্যান মনে হয়। বিকেলে স্কুল থেকে ঘরে ঢুকলেই মনে হয় কী নেই কী নেই। হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নিয়ে স্কুলের পড়া করতে থাকি, শেষ হবার আগেই ওর ছোটো বোন ছুটকি আসে। হাতে কুয়াশা সিরিজের ২য় খণ্ড, ‘দাদা পাঠিয়েছে তোর জন্য। পরশু ফেরত দিবি। বই ছিড়িস না কিন্তু। আগের বার ছিড়ে ফেলেছিলি। দাদার ফেরত দিতে কষ্ট হয়েছিল। বই ছিড়ে গেলে আর ফেরত নিতে চায় না। তখন ভর্তুকি দেওয়া লাগে।” বুকের মধ্যে চিনচিন ব্যথা বোধ হয়। যে আমার জীবনকে রঙিন করে রেখেছে, সে কিনা তুচ্ছ বইয়ের প্রচ্ছদ ছেঁড়া নিয়ে কথা বলে? মন খারাপ হয়। কিন্তু বইটাকে সাবধানে ক্যালেন্ডারের পৃষ্ঠা দিয়ে মলাট দিই। নিউজ প্রিন্ট কাগজের বই একটুতেই ল্যাতল্যাতে হয়ে যায়। বইটা গুছিয়ে নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরি। ওর হাতের স্পর্শের ঘ্রাণ পাই। স্কুলের পড়া শেষ করে তাড়াতাড়ি পুকুরঘাটের দিকে যাই। আগেই সবাই ভালো ভালো জায়গা সব দখল করে বসেছে। আমার মা সিঁড়ির উপরের দিকে ধাপে বসে সোয়েটার বুনছে। মায়ের উলবোনার হাত খুব ভালো। একটা ঝুড়ির মধ্যে রঙির উলের বল গুলো প্রতিটা টানে পিংপং বলের মতো লাফাচ্ছে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি মায়ের হাতের গতি আর উলের বলগুলোর নৃত্যময় গতির দিকে। ও আমার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে মায়ের ঝুড়ির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। ওর মা রমলা কাকী একটা বড় অ্যালুমনিয়ামের গামলা ভর্তি করে পেঁয়াজ মরিচ আমের আচারের তেল দিয়ে মাখানো মুড়ি নিয়ে আসে, সঙ্গে কতগুলো পুরনো খাতার কাগজ। স্কুলের সামনের ঝালমুড়ি বিক্রেতা ইদ্রিস কাকার মতো কাগজগুলো কোন আকৃতি করে দিই। আমি এই কাজটাও খুব ভালোভাবে পারি। তাতে কৌটা দিয়ে অল্প অল্প করে মুড়ি ঢালে কাকী, আমি সবাইকে বিতরণ করি। বড় গামলার তলায় সমুদ্রের নিচে কয়েকটা অবহেলিত ঝিনুকের মতো সামান্য মুড়ি অবশিষ্ট থাকে, ও লক্ষ্য করে, বলে, “এই সোনালী, তোর ভাগে তো আর থাকলই না, নে, আমার থেকে নে।” ও যখন এগিয়ে এসে মুড়ি ঢালে তখন আমার বা হাতের পিছনে ওর ঠাণ্ডা নরম হাতের গাঢ় স্পর্শ লাগে, আমার সারা শরীর অবশ হয়ে আসে। ওর মা আমার ডান হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসায় যেন আমি তার কতদিনের আপনজন। ওইদিন দাবা খেলার গল্প নয়, ও বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের কাহিনি বলে। রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি, ও আর আমি একটা ইয়টে করে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য আবিস্কার করতে গেছি। কিন্তু সেই অতল টানে আমাদের জাহাজসহ আমরা তলিয়ে যাচ্ছি তলিয়েই যাচ্ছি, কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি! মনে হচ্ছে দমবন্ধ হয়ে মারা যাব জাহাজের সবাই, ও আমার বাম হাত আঁকড়ে ধরেছে শক্ত করে, আমাকে একইসাথে ওকে কাছে পাবার প্রবল আনন্দ আবার চরম মৃত্যুভয় অসাড় করে ফেলছে। আমি ঘেমে নেয়ে জেগে উঠি। আজানের শব্দ ভেসে আসছে। টিনের চালের নিচ থেকে সকালের আবছায়া ঘরের অন্ধকারকে পিষতে পিষতে এগোচ্ছে। আমার সেমিজ পাজামা সব ভিজে গেছে ঘামে। কী ভয়ঙ্কর স্বপ্নরে বাবা! সুতি কাপড়ে তৈরি মশারির বাইরে বেরিয়ে তাড়াতাড়ি কাপড় বদলাই। পুবের দিকে জানালাটা একটু খুলি। শিরশির করে হেমন্তের বাতাস ঢুকছে। শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। মা আমাদের ভাইবোনদের ঘরে ঢুকে বলেন, “চল সোনালী, তুই তো জেগেই গেছিস, আমরা চাঁদমারি ঘাট থেকে বকুল ফুল তুলে নিয়ে আসি। যাবি আমার সঙ্গে? তোর দিদিমার ফটোতে মালা দেব। বকুল ফুলে অনেকদিন ঘ্রাণ থাকে।” আমার দিদিমা অনেক আগে আমার মায়ের চৌদ্দ বছর বয়সে মারা গেছেন। মায়ের জন্য আমার ভীষণ মায়া হয়। আমি তাড়াতাড়ি স্কার্ট টিশার্ট পরে মায়ের সঙ্গে চাঁদমারি ঘাট যাই। নদীর তীরে ছড়িয়ে থাকা সকালের চাঁদমারি ঘাট কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। নদীর উপরে ভোরের শান্ত মিহি কুয়াশা ঝুলে আছে। সারারাত্রির মাছধরা শেষে ডিঙি নৌকাগুলো সেই কুয়াশার মধ্যে অলীক স্বপ্নের মতো ভাসছে। মা নিবিষ্ট মনে ফুল খুঁজছে। আমি বিহ্বল হয়ে একটা সিমেন্টের বেঞ্চে বসে চারপাশে চেয়ে দেখছি। প্রকৃতি এতো নীরব, এতো ঠাণ্ডা মনে হয় আমি কোনো অচেনা রাজ্যে হারিয়ে গেছি। কিছুক্ষণ পরে মা ঘাড় গোঁজ করে আমার পাশে এসে বসে। তার হাতের তালুতে মাত্র কয়েকটা ফুল। আমি পিছন থেকে মার গলা জড়িয়ে ধরে বলি, “বিশ বছর আগে তোমার মারা যাওয়া মায়ের জন্য মন খারাপ করে বসে আছো। আমি তোমার নিজের মেয়ে সামনে জলজ্যান্ত বসে আছি, তাও তোমার মন নরম হয় না।”
“তুই কি ভাবো তোর চেয়ে আমার মাকে আমি বেশি ভালোবাসি?”
“সেটাই তো প্রমাণ করছ।”
“আয় তোকে শিউলি ফুল কুড়িয়ে দিই।”
আমার প্রিয় ফুল শিউলি। প্রথম হেমন্তে বিরলপ্রায়। মা শিউলি ফুল কুড়াতে কুড়াতে খুশি হয়ে ওঠে। আমাদের মায়েরা কতো অল্পে খুশি হয়। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে মহাখুশি। একটা ভালো রান্না করে সন্তানদের খাওয়াতে পারলেও খুশি। একটা সুন্দর ডিজাইনের সোয়েটার বুনতে পারলেও খুশি। বাড়িতে আগত অতিথিদের নিজের হাতের তৈরি আচার খাওয়াতে পারলেও খুশি। এমনকী কয়েকটা ক্ষীণায়ু শিউলি ফুল কুড়িয়ে মেয়ের আঁচলে দিতে পারলেও খুশি!
পরের দিন বিকালে ও পুকুরঘাটে গল্প করতে যাবার আগেই আমাদের সিঁড়ির গোড়ায় ওকে ধরি, “এই নাও তোমার কুয়াশা।” যদিও এই পাড়ার আট থেকে আঠারো সকলে একে অন্যকে তুই করে ডাকি। কিন্তু আমি ওকে তুমি করেই বলি। কেন যেন তুই বলতে মন সরে না। কিন্তু ও আমাকে অম্লান বদনে তুই বলেই ডাকে, বলে, “দুই দিনে তিনটা উপন্যাস পড়ে ফেললি, তুই কি পড়ার বই মোটে পড়িস না? দাঁড়া কাকীমাকে বলতে হবে।” একটু থেমে মাস্টারির ভঙ্গিতে বলে, “এ্যালজেব্রার চ্যাপ্টারগুলো শেষ করেছিস? আগামীকাল আমার কলেজ বন্ধ, তুই সকালে বইখাতা নিয়ে আমার বাসায় চলে আসিস। অঙ্কগুলো দেখিয়ে দেব।” বলে মুরুব্বীর ভঙ্গিতে চলে যায়। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, ‘না, কখনো না, কখনো আমি ওর কাছে অঙ্ক করবো না, আমার মনের মধ্যে ওর জন্য যে ছবিটা গত ছয়মাস ধরে একটু একটু করে তৈরি হচ্ছে। ওটা নষ্ট হয়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। শিক্ষকদের আমার একটুও ভালো লাগে না। সবসময় ভ্রু কুঁচকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, যেন এই ট্রানশলেসন কয়টা ঠিকঠাক না হলে আর আগামীকাল থেকে সূর্য উঠবে না। এই সুদকষা কয়টা ঠিকভাবে সমাধান না করতে পারলে সবার আয়রোজগার চাকরিবাকরি বন্ধ হয়ে যাবে। ঠিকঠাক দিস্তা দিস্তা রচনা লিখতে না পারলে সবাই বাংলায় কথা বলা ভুলে যাবে। স্কুলে ইব্রাহীম স্যার করিডোর দিয়ে হেঁটে গেলেও মনে হয়, পুরো দোতালা কাঁপছে। সেই মাস্টারি যদি ও আমার সঙ্গে করে, তাইলে আমি শেষ। একে তো ওকে দেখলেই আমার বুক ধরফর শুরু হয়, হাত-পা ঝিমঝিম করে, তার উপর ও যদি আমাকে বকাঝকা দেয় পড়ার জন্য, তাহলে আমি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাব অথবা কেঁদে ফেলব।
শুরু থেকে মানে ওকে প্রথম দেখার পরে থেকে, ওকে দেখার যেসব টুকরো টাকরা ছবি আমি গুছিয়ে তুলেছি, সব নষ্ট হয়ে যাবে, আমার কল্পনার স্বর্গ ভেঙ্গে পড়বে। দরকার নেই বাবা আমার অতো ভালো রেজাল্ট করায়।
আমরা এবাড়িতে ভাড়া নিয়ে আসার পরে, একসপ্তাহ গেল বাড়িঘরদোর গুছাতে গুছাতে। ঐ সময়ে ও ওর মামাবাড়ি দিদিমার কাছে ছিলো। তাই দেখিনি। একদিন ঝিম বৃষ্টিতে সক্কাল বেলা আমার পড়ার ঘরের পুবের জানালা খুলে দেখি, একজন রূপকথার রাজকুমার সামনের বাড়ির জানালা খুলে গুনগুন শব্দে বই পড়ছে। আমি জানালার শিক ধরে হাঁ করে তাকিয়েই আছি। আমার পিঠাপিঠি ছোটো ভাই বাবলু পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ও এক সপ্তাহেই সারা শহরের খবর যোগাড় করে ফেলেছে। ঠোঁট উল্টে বলল, “খুব পড়া দেখাচ্ছে। এরপর বাবা এসে আমাদের পিঠের ছাল তুলবে, বলবে, ঐ ছেলে সারাদিন জানালায় বসে বই পড়ে, আমরা পড়ি না কেন।”
আমি মজা করে বললাম, “ঠিক। ঐ ভাড়াটে তুলে দে, তুই তো কতোরকম নিনজা টেকনিক জানিস।”
বাবলুর গলায় হতাশা, “তুলবো কি রে দিদি। আমাদেরই ও তুলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আমরাই ওদের ভাড়াটে। আমরাশুদ্ধ এই বাড়ির ছটা ঘর, বাগান, পুকুর সব ওদের। ওর বাপ এই বাড়ির মালিক। আবগারি দপ্তরের বড় অফিসার। প্রচুর ঘুষ খায়।”
আবগারি কি জিনিস তখন আমি জানতাম না, কিন্তু এটা জেনে আনন্দ লাগলো যে ওকে তুলে দেবার ক্ষমতা কারোর নেই। আমি জানালা খুলে প্রতিদিন ওকে প্রাণভরে দেখতে পারব।
ওর চুল মিঠুন চক্রবর্তীর মতো। এদিকে আমি ছিপছিপে বেতসলতা। হাঁটু পর্যন্ত একঝাপ চুল। চুল আমার শরীরের সব রক্ত শুষে নেয়, তাই আমার শরীরে কখনো মাংস লাগে না। ভীড়েরর মধ্যে আমি নাই হয়ে থাকি, কেউ আমাকে লক্ষ্য করে না। মনোযোগ দেয় না। শুধু কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হবার পর, আমাদের সহপাঠী আরজু বলেছিল, ‘সোনালীর চুল ঠিক ‘গিফট অব দ্য মেজাইয়ে’র ডেলার মতো। ওর চুল বিক্রি করলে কয়েকটা পাউন্ড পাওয়া যাবে।’ আমার মনে হয়েছিল, সপ্তাহে সপ্তাহে আমার মায়ের করা চুলের পরিচর্যা সার্থক। যাক, সে তো কলেজের কথা।
একদিন আমি স্কুল থেকে ফিরছি, ও পাবলিক লাইব্রেরি থেকে। হাতে খবরের কাগজে পেচানো বই। এর মধ্যে ধুম বৃষ্টি শুরু হলো। আমি তাড়াতাড়ি শম্ভু কাকার চায়ের দোকানের চালাটার নিচে দাঁড়ালাম। ও প্রায় দৌড়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। চালার নিচে আর কেউ নেই। শম্ভু কাকার দোকান আজ বন্ধ। নিভানো মাটির চুলাটা কালিঝুলি মেখে অনাথের মতো একপাশে ঘাড় গোঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। কাকা শালীর বিয়েতে কালিকাঠী গিয়েছে গতকাল। বাবা গতরাতে গজগজ করতে করতে বলেছিল। খাদ্য গুদামের চাকরি শেষে অফিস থেকে বেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টা দুই তিন আড্ডা মেরে বাড়ি ফেরার পথে শম্ভু কাকার দোকানে এককাপ সরভাসা দুধ চা খান প্রতিদিন। আমি রাতে শুয়ে শুয়ে শুনছিলাম, ঘরের কাঠের পার্টিশানের ওপাশ থেকে বাবার ক্ষুব্ধ গলা ভেসে আসছে, ‘শম্ভুটা যে কি, শালীর বিয়ে পরশু, আজই তোর দোকান পাট বন্ধ করার দরকার কি। পাড়ার মানুষ চা খাবে কোথায়?’ মা সান্ত¦না দিচ্ছেন, ‘আগামীকাল তুমি ওঠার আগে, সোনালীকে নিয়ে আমি ফুলির বাবা নসু মিয়ার কাছ থেকে খাঁটি দুধ নিয়ে এসে অফিসে যাবার আগেই দুধ চা বানিয়ে দেব।’ বাবা শান্ত হয়ে আহ্লাদী গলায় বলে, “কথা দেলা কিন্তু, মনে থাকে যেন।” তারপর আরও কী বলে গুণগুণ করে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু সকালে মা ঠিকই আমার মধুঘুম ভাঙ্গিয়ে ডেকে তুলেছে দুধ আনতে যাবার জন্য। এখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। মাথায় আরেকটু লম্বা হয়েছি। মাত্র ওড়না ধরেছি। এতোদিন তো একটা স্কার্ট আর টি-শার্ট গায়ে দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াতাম। ওড়না ধরার পর এক যন্ত্রণা হয়েছে। সারাক্ষণ কাপড়টা বুকের ওপর টানাটানি করি। মনে হয় এই বুঝি সরে গেল। বৃষ্টিতে আমাদের ছোটো পাড়ায় যেন রাত্রি নেমে এল। আমি আর শুভ দা চা দোকানের চালার নিচেও বৃষ্টির ছাটে পায়ের দিকে অর্ধেকট ভিজে যাচ্ছি। আমি বইয়ের ব্যাগটা ভালোভাবে পিঠের দিকে সরিয়ে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে দিলাম যেখান থেকে অঝোরে জল ঝরছে সেই টিনের প্রান্তের দিকে। আমার দু’ হাতের অঞ্জলি মুহূর্তেই ভরে গেল জলে। আমি সেই জল ছুড়ে ছুড়ে দিতে লাগলাম রাস্তার দিকে। পুরো রাস্তা ফাঁকা। একটা কুকুরও নেই রাস্তায়। ভালো ছেলে শুভ দা বা হাতে বইগুলো নিরাপদে ধরে আমার মতো ডান হাতে আমার মতোই জল নিয়ে খেলা করতে লাগল, হঠাৎ তার মাথায় কি দুষ্ট বুদ্ধি চাপল, জল ছুড়ে দিল আমার দিকে, আমার ডান দিকের চোখমুখ কানে আচমকা জলের ঝাপটা লাগল। আর আমি চমকে উঠে প্রায় গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম। ও জানত আমি এমন হাবলা, বুদ্ধিহীন, তাই ভিজা হাতেই আমার ডান হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমার কোমরে হাত দিয়ে ধরে রাখল আমাকে স্থিত হতে দিতে। আমি এখন শুভ দাদার নিঃশ্বাসের মুখোমুখি। মনে হল যেন আমার কান গরম হয়ে গেছে, সমস্ত মুখমণ্ডল লাল হয়ে উঠেছে, বুকের হৃদস্পন্দন এতো বেড়ে গেছে আর এতো জোরে শব্দ করছে নিশ্চয়ই আমার মায়ের কানে পৌঁছে গেছে এই বৃষ্টি ঝরঝর বিশ গজ পথ পেরিয়ে। এবার ও আমার হাত ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলল, “কী রে ভয় পেয়েছিস, কাকিমাকে বলে দেবো, ইচ্ছে করে বৃষ্টি ভিজে ঠাণ্ডা লাগাচ্ছিস।” আমার আর সহ্য হলো না, আমি খুব দ্রুত বৃষ্টি ধারার জল দু হাতে ধরে ওর গায়ে সেঁচে দিলাম, বার বার, ও প্রায় ভিজে গেল, কিন্তু কিছু করল না, শুধু বইগুলো বাঁচানোর জন্য হাত দুটো উপরে তুলে যীশুখ্রীস্টের মতো দাঁড়িয়ে রইল, মুখে মিটিমিট হাসি। সেই হাসির অর্থ আমি আজও বুঝিনি।
বাবার হঠাৎ বদলি হলো চার জেলা দূরে একটা লবনাক্ত জেলায়। বদলির খবর বাড়ির সবাই জেনেছিলাম যেদিন বাবা জয়েন করে এলেন। জানালেন সব কিছু গুছিয়ে নিতে হবে। দু’দিনের মধ্যে ট্রাক এসে পড়বে। খাদ্য বিভাগের ট্রাক, এই ট্রাকে গেলে বাবার পথ খরচ, মালপত্রের খরচ বেঁচে যাবে। আমি কান্নাকাটি শুরু করলাম, আমি এই বাসা ছেড়ে যাব না। বাবা রক্তচক্ষুতে তাকালেন, মা রুটিবেলার বেলন নিয়ে তেড়ে এলেন পিটানোর জন্য। আমি বই খাতা গোছাই আর হাপুস নয়নে কাঁদি। শুভ দাদা আবার মামা বাড়ি গেছেন একসপ্তাহ আগে। তার দিদিমার অসুখ।
যেদিন চলে যাচ্ছি ঐ দিন ভোরবেলা ছুটকি এলো, হাতে একটা প্যাকেট। প্যাকেটে নিমাই ভট্টাচার্যের মেমসাহেব। বইয়ের মধ্যে একটা ময়ুরের পালক। আর কাগজের বাক্সে একটা নকল মুক্তার মালা। বললো, ‘দাদা তোকে নিজের হাতে এগুলো দিতে চাইছিলো। কিন্তু দিদিমার অসুখ যে।” হঠাৎ ও আমাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলো, বললো, “আমাকে, দিেিক, দাদাকে তুই ভুলে যাবি সোনালী?” আমি কোনো জবাব দিলাম না, শুধু কেঁদে ফেললাম। যখন ট্রাক ছাড়ছে, দেখি যে রমলা কাকী আঁচলে চোখ মুছছেন, আমার মা ও তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। মার কান্না দেখে আমার পিত্তি জ্বলে গেল। নিজেই বাবার সঙ্গে যাবার জন্য এক পা বাড়িয়ে আছেন, এখন আবার ন্যাকামি করছেন। যত্তোসব।
আর জীবনে কখনো ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। কোনো যোগাযোগও হয়নি। আমি ওর ঠিকানা জানতাম, কিন্তু ও আমার ঠিকানা জানত না। আমি চিঠি দিইনি লজ্জায়। যদি ও কিছু মনে করে। ও তো আমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এদিকে আমি খিটখিটে হয়ে উঠেছিলাম। একদম পড়াশোনা করতাম না। ঘরের কাজকর্মও করতাম না। সারাদিন গুম মেরে বসে থাকতাম। এসএসসি পরীক্ষা দেয়াতে বাবা ঐ শহরে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন ও ভার্সিটি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য ঢাকায় কোচিং করছে। ওর সঙ্গে দেখা হয়নি। আমি এসএসসিতে প্রথমবার ফেল করলাম। মা গম্ভীর হলেন। বাবা হাল ছাড়লেন না। তার চাকরিস্থলের কাছেই এক স্কুলে নতুন করে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে আমাকে দ্বিতীয়বার বার পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করালেন। বাইরের আড্ডা বন্ধ করে নিজেই পড়ালেন। দুপুরে টিউটর রেখে দিলেন। আমি দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করলাম।
এখনো কোনো বাচ্চার হাতে কুয়াশা, মাসুদরানা, ওয়েস্টার্ন সিরিজের বই দেখলে বুকের মধ্যে এক আঁজলা রক্ত ছলকে ওঠে। মেমসাহেব বইটা পুরনো হয়ে হয়ে পাতা প্রায় হলুদ হয়ে গেছে। ময়ুরের পাখাটি নষ্ট হয়নি। আমি বুদ্ধি করে পলিথিনের প্যাকেটে আঠা দিয়ে লাগিয়ে লেমিনেটিং করিয়ে রেখেছিলাম। সাদা পুঁতির মালাটি এখনো আমার ওয়াড্রোবের গহনার দেরাজে একটা মখমলের বাক্সে রেখে দিয়েছি। রঙ সেই রকমই আশ্চর্য উজ্জ্বল, দ্যুতিময়। ঐ মালাটা আমি জীবনে একবারও পড়িনি।

0 Comments