লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে কয়েকদিন আগে বাড়ি ফিরেছে রাশেদ। এর ওর বাড়ি বেড়াচ্ছে, খাচ্ছে—দিন যাচ্ছে কোনো এক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায়; আহ্নিকগতির ছলে। সে কথা গুরুত্বপূর্ণ না হোক, আরো কিছু গূঢ় ব্যাপার থাকে। তেমনি একটা বিষয় উথলে উঠছে রাশেদের মনে, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়া চলছে।
আজ কত বছর পর তিথির কথা মনে উঠছে রাশেদের সেটা আন্দাজ করতে পারছে না সে। দশ বছর অথবা একযুগ! হ্যাঁ, একযুগ-ই হবে। সেই ২০০৮ সালের কথা। ওর সাথে পরিচয়টা যেন কিভাবে? ও আসলে কে? কিছুই মনে পড়ছে না।
আচ্ছা, ওই সময়টায় কোন ক্লাশে ছিল রাশেদ? ক্লাশ এইট হবে হয়তো। আহা! রঙিন স্মৃতির বোকা বোকা সময়ের দিনগুলো। সেইসব দিনের কথা মনে হলে ক্লাশ এইটের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। ক্লাশ এইটের কথা মনে উঠলে সিমলার মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে রাশেদের দু'চোখের আয়নায়। যাকে ভুলে যাবার দিব্যি কেটে স্কুল বদলাতে হয়েছিল তাকে।
সিমলার একজন বান্ধবী ছিল। শ্যামলা বরণ মেয়েটাকে দুধ-সাদা এপ্রোনে মন্দ লাগত না। হ্যাঁ, এবার ঠিকঠাক মনে পড়ছে রাশেদের; ওর নামই তিথি।
এই তিথির সাথে পরিচয়টা রাশেদের বন্ধু সায়েমের মাধ্যমে। সায়েমের চাচাতো বোন তিথি। এক স্কুল, এক ক্লাশে পড়ে অথচ সেকশন আলাদা বলে অচেনা ওরা। রাসেল স্যারের কাছে পড়তে গিয়ে তিথির সাথে পরিচয়। তিথিকে নিয়ে আর কথা বাড়ানো অপ্রাসাঙ্গিক ও অবান্তর মনে হচ্ছে রাশেদের। শুধু আজ নয়, এমনটা বহুবার হয়েছে স্কুল পাল্টানোর পরের দু-এক বছরে। হয় প্রথমে স্কুলের কথা অথবা তিথির কথা মনে পড়ে রাশেদের। তারপর চিরায়ত নিয়মে সিমলার কথা মনে পড়ে।
আপেলরঙা ছিপছিপে গড়নের মেয়ে। লেখাপড়ায় মাথা ভালো। গলাটা বেশ মিষ্টি। ভাওয়াইয়া ও দেশের গান তার গলায় যেন মধুর সুর-ঊর্মি তুলতো। দু'বছর একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ, পহেলা বৈশাখ ওর গান তন্ময় হয়ে শুনেছে রাশেদ।
রাশেদও বেশ মেধাবী ছিল। যেখানে বন্ধুরা ঘন্টার পর ঘন্টা স্যারদের বাড়িতে কাটাতো, রাত্রি জেগে জেগে বইয়ের সাগরে ডুবে থাকতো; সেখানে রাশেদ সর্বোচ্চ দু'ঘন্টার বেশি পড়ার টেবিলে কাটিয়েছে কিনা মনে নেই ওর। সে কথা মনে না থাকলেও আজ ঠিকই রাশেদের মনে পড়ছে সেই চিঠিটার কথা।
২০০৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। ভাষা শহীদদের স্মরণে শোকর্যালির পর চলছে দেশাত্মকবোধক সঙ্গীত আয়োজন। অনেকেই গান করছে। বেশ হচ্ছে। তবে রাশেদের মনে যার গলাটা ঠাঁই করে নিল সে যে সিমলা! সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তে তুমি.. সেই সময়গুলোতে এই গানটা ফিমেল ভার্সনে শুনলেই মনে হতো- সিমলা গাইছে।
এরপর ছাব্বিশে মার্চ, পহেলা বৈশাখেও ওর গলায় মাতোয়ারা হয় রাশেদ। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নেয় প্রেম নিবেদন করবে সিমলাকে। সত্যিই ওকে ভালোবেসে ফেলেছে রাশেদ। আঁধার ঘনরাতে ঝিঁঝিঁর ডাকের চাইতেও বেশি মাদকতা ছিল যেন সিমলার কণ্ঠে। মনে হতো- ওই তো, ওই তো সিমলা গাইছে:
ওকি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে, কোনদিন আসিবেন তোমরা, কয়া যাও, কয়া যাও রে...
মাকে আগুনের মতন ভয় পেত রাশেদ, বাবাকে দাবানলের মতন। আদর নিয়ে বোঝানোর পর, নিষেধ করার পর যদি রাশেদ কোনো ভুল করে ফেলে তখন মা-বাবা তাদের স্বীয় চেহারা প্রদর্শন করে। দাউ দাউ রাগের আগুন ছড়ায় দুজনেই! দাদা অথবা দাদির যেকোনো একজন মধ্যস্থতা না করলে কেউই শান্ত হয় না।
তাদের ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে একটা চিঠি লিখেছিল রাশেদ। আবেগে ভরা চিঠি। প্রথম লেখা চিঠি জীবনে। আজ দেবে কাল দেবে- করতে করতে ষান্মাসিক পরীক্ষা দুয়ারে কড়া নাড়ে। সে সব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে রাশেদ।
পরীক্ষা শেষ হয়। মাস খানেক কেটে গেছে। নতুন একটা সাইকেল পেয়েছে রাশেদ। পড়াশুনা বোধ হয় চুলোয় যাবে এবার! সারাদিন ক্লাশ করে সুযোগ পেলেই সিমলার পেছন পেছন ওর বাড়ি পর্যন্ত যায় রাশেদ। সাদা চুনকাম করা একটা বাড়ি। খানিক তফাতে থেকেই আন্দাজ করা যায়, আধাপাকা তিন ঘরবিশিষ্ট বাড়ি।
চিঠিটার কথা ভুলেই যায় রাশেদ। ক্লাস শেষ করে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে ভাবে- আজ বাড়িতে গিয়ে চিঠিটা খুঁজতে হবে।
ওকে আর কষ্ট করে চিঠিটা খুঁজতে যেতে হয় নি। স্কুল থেকে ফেরার সাথে সাথেই মা এসে চিঠি নিয়ে ওর ঘরে হাজির। হাতের লেখা দেখে ওর মায়ের কিছুতেই বিশ্বাস হয় না এটা রাশেদের লেখা। মা ওকে একে তাই দেখিয়েছেও চিঠিটা। কেউ স্বীকার করে নি কার লেখা ওটা।
সংকোচ আর সংশয় মাখানো মুখে মা ওকে বলে- রাশেদ, সিমলা মেয়েটাকে? ওর বাড়ি কোথায়?
প্রশ্নরা কানে পৌঁছানোর সাথে সাথে যেন মাথায় আসমান ভেঙে পড়ে রাশেদের।
না, মাম্মী। আমি এ নামে কাউকে চিনি না। — বলে সেখান থেকে কেটে পড়ে রাশেদ। তবে শেষ রক্ষা হয় না বেচারার। বাবার সামনে ঠিকই স্বীকার করতে হয়। পরিস্থিতি তখন ভয়াবহ! যেটা কখনোই কল্পনা করতে পারে নি রাশেদ। টানা দশদিন সে স্কুলের মুখ দেখে নি, সিমলার মুখ তো দূরের কথা; তিথির দেখা পাওয়াও তো ডুমুরের ফল দর্শনের মতন।
নিজের প্রতি ঘেন্না আর রাগ হয় রাশেদের। কি রকম বোকা সে! চিঠিটা এমন এক জায়গায় রেখেছিল, যে কেউ খুঁজে পেত। চাইলে সে চিঠিটা তিথিকেও দিয়ে রাখতে পারতো, পরীক্ষা শেষে ওর কাছ থেকে নিয়ে সিমলাকে দিতে পারতো। কাজের কাজ কিছুই পারে নি রাশেদ!
রাশেদের মা-বাবাকে অনেক বুঝিয়ে ওর মামা শান্ত করে। আর রাশেদকে কড়া কণ্ঠে বলে দেয়: দেখো রাশেদ, যা ভাবছো, করছো; ভুল হচ্ছে খুব। বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হতে হবে তোমাকে।
রাশেদের বিশ্বাস হয় নি তাকে স্কুল পাল্টাতে হবে। ভেবেছিল বাবা-মা ওকে এমন সাজা দেবে না। অথচ তা হলো না, ওকে বাড়ি থেকে দূরে, অনেক দূরে এক স্কুল ভর্তি করানো হলো।
নতুন স্কুল, নতুন সহপাঠীতে ওর মন বসে না। মন পড়ে থাকে পুরনো স্কুলের ক্লাশরুমে, কাঁঠালতলায়, বকুলঝরা পথটায়।
ততদিনে সিমলা জেনে গেছে এসব ব্যাপার। স্কুলের শেষদিনে রাশেদ অপেক্ষার প্রহর গুনেছে, প্রিয় সিমলার জন্য। সে একটা বার রাশেদকে বলুক: ভালোবাসি। যেখানেই যাও ভুলে যেও না।
না, ও এমন করে বলতে পারে নি। হয়তো সাহসটুকু পায় নি। তবে ওর অপলক চেয়ে থাকা রাশেদকে বারবার কি যেন ইঙ্গিত করছিল, বোঝাতে চেয়েছিল।
স্মৃতির স্তূপে এলোমেলা সেসব দিন এতদিন চাপা ছিল। কেন এতদিনে মনে পড়লো সেসব?
এর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে যখন হন্নে হচ্ছে রাশেদ, ঠিক তখনই ওর ঘরে মায়ের আগমন।
রাশেদ, রেডি হয়ে নাও। তোমার খালাবাড়ি যাবো। ওর মেয়ে সীমাকে দেখতে। তোমার সাথে ওর বিয়ে দেবো বলে ঠিক করে রেখেছি।
আমার কথা শোনো মাম্মী..
কি শুনতে বলো? বারো বছর পর গ্রামে ফিরে এলে, চার বছর দেশের বাহিরে থাকলে। মাকে ফোনে দেখেই তোমার মন ভরে! কিসের রাগ আমার ওপর তোমার? দেশে থাকতেও একটা বার আমাকে দেখতে আসো নি গ্রামে। বাপের সাথে যে দু–এক বার দেখা হয়েছে তোমার।
থামো, এসব শুনতে চাচ্ছি না মাম্মী।
আমিও বলতে চাই না। যা বলেছি, করো। তোমার বাবা রেডি হচ্ছেন। আমরা বিকেলেই রওনা দেবো সীমাদের বাড়ির দিকে।
সিমলা কে? ঠিক মনে করতে চায় না রাশেদ। অথচ মনে করতে না চাইলেও কল্পনায় তাকে ঘিরে বাঁচতে হবে এখন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো—সূর্যজ্বলা সকালে ঘুম থেকে উঠে সীমা নামের ভিন্ন এক নারীর মুখ অথবা সে-ই রাশেদের মুখ দেখবে। জীবন বড়ই সুন্দর সাথে অদ্ভূতও বটে!

0 Comments