অন্ধকার একটি রঙ মাত্র, চাঁদ হীন রাত মানে এই রঙেরই একটি কালো রূপ। সেটা মনোহর কিংবা কমনীয় হতে পারতো। কিন্ত আজ সাইদের মন ভালো নেই তাই মনে হচ্ছে দৈত্যাকার মাছের অন্ধকার পেটের ভিতর দিয়ে হাঁটছে বাবুল আর সাইদ, বিদ্যুৎ হীন খোঁয়াওঠা পারুল পাড়ার পথটি এঁকেবেঁকে রূপিয়াদের বাড়ি গিয়ে শেষ হয়। তখন ৭৮/৭৯ সাল। এ পাড়া ওপাড়ায় বিদ্যুতের আলো তখনো ফোটেনি। বিদ্যুৎ এসেছে রূপিয়ার বিয়ের দুবছর পর।
রূপিয়ার ভাইয়ের বিয়ের দাওয়াতে গিয়েছে সাইদ, রিকাবীবাজার, খুব বেশি দূরের গ্রামও নয়। তখন বর যাত্রীরা হেঁটেই দুই চার পাঁচ মাইল পাড়ি দিত। বর্ষাকালে আনন্দ বিষাদের কালগঙা পাড়ি দিতে এক মাত্র ভরসা নৌকা। আর বিয়ের সাজে সজ্জিত বর কনের জন্য একমাত্র বাহন পালকী।
নানান সুস্বাদু উপকরণ সহ বিলাসী ভোজন শেষে সাইদ, বাবুল, রূপিয়া আর বেবী ওরা হ্যাজাক লাইটের আলো থেকে ঈষৎ দূরে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। সেই আড্ডাতেই রূপিয়া আর সাইদের সম্পর্কের রসায়ণ মাটি ভেদ করা অংকুরোদ্গম হয়। দুজনের মধ্যে এক ধরনের বিনয়ী, নম্র, সরল রসায়ন এবং বিশ্বাসী আশ্রয় কিছুটা সুগন্ধ অংগ থেকে উপাংগে ছড়ায়। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ যুবক পড়ে দশম শ্রেণিতে আর রূপিয়া অষ্টম শ্রেণিতে। বলা যায় কৈশোরিক গন্ধ লাগা শরীরে প্রেমের আভাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রূপিয়ার ভাইয়ের বিয়ের চারদিন পড়েই বান্ধবী নিহারের সাথে রূপিয়ার পুতুল মেয়ের বিয়ে হয়। নামে পুতুল বিয়ে হলেও গভীর আন্তরিকতার সাথে আপ্যায়নের কোন ঘাটতি ছিল না। খরচের একটা অংশ সাইদও বহন করে ছিল। রূপিয়ার মেয়ের বিয়ে মানে সাইদেরও মেয়ের বিয়ে। খরচ হয় সর্ব সাকুলে দুইশ টাকার মত। সাইদের দাওয়াত ছিল রাতে। সূর্যের বিদায়ের সাথে সাথেই বিয়ে বাড়ির আয়োজন শেষ হয়ে গেলে রহমান ও নূরু মিয়াকে ( নূরু মিয়া এখন মৃত) ডেকে পাঠায় রূপিয়া। ওদের বুঝিয়ে শুনিয়ে বলে দেয় রাত দশটার সময় ওনাকে নিয়ে আসবে। কদিনেই মা দাদীদের সেই চিরাচরিত প্রথা স্বামীকে নাম ধরে ডাকতে নেই তাই ওনাকে নিয়ে যেতে পাঠিয়েছে। রহমান ও নূরু মিয়া সাইদের আন্তসংযোগ রক্ষাকারী অতীব বিশ্বস্থ বন্ধু।
সাইদ, রহমানের ডাক শুনতে পেয়ে দরজা খুলে বের হয়ে আসে। এই ডাকের জন্যই অগ্নুৎসব বুকে নিয়ে অপেক্ষা করছিল সাইদ।
ওরা গ্রামের রাস্তা দিয়ে না গিয়ে ঘুর পথে ক্ষেতের আল দিয়ে, নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে রূপিয়াদের বাড়ি পৌঁছে দেয় সাইদকে। কারণ জুলহাস, হারুন সহ তিন চার জন রাস্তায় পাহারায় ছিল, সাইদ আসলেই অপমান করে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিবে।
রূপিয়া এমনিতেই অসম্ভব সুন্দরী, তার উপর ভাবীর শাড়ী, ব্লাউজ, ইমিটেশনের গহণা পরে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। মুখোমুখি হতেই সাইদের বুক কাঁপে, অন্ধকার রাত্রি কাঁপে, অজানা ভয় ও শিহরণে কাঁপে রোম কূপ। দুরু দুরু বুকে গল্প করতে করতে আর দুজনের আহারাণ্য শেষ করতেই রাত বারোটা বেজে গেল। আমার আশ্বাস বাণীতে ( রূপিয়ার মুখে শোনা) রূপিয়ার মাও আশ্বস্থ হয়েছিলেন বলেই তিনি না ঘুমালেও ঘুমের ভান করেছিলেন। অথবা ঘুমিয়ে ছিলেন তা আর জান যায়নি। রূপিয়ার বড় ভাইয়ের ফুল শয্যায় শুয়ে আকাশ কুসুম ভাবতে থাকে সাইদ, কদিন আগে বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে এখনো সুগন্ধী ফুলের ঘ্রাণ ঘরময়। বউ বউ গন্ধে জেগে ওঠে সাইদের শরীর। অন্যদিকে অনাঘ্রাতা কুমারীর লাজ নম্র মুখ শুধু শরীরের ভাষায় কথা বলছে। শাড়ী পড়াতে অনভিজ্ঞ রূপিয়ার বুকের আঁচল বার বার পড়ে যায়। ঘোমটা পড়ে যায়, কিছুতেই বুকের উত্থান ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। মুখের কথা ফুরালে তখন শরীরের ভাষার কথা ফোটে। ইন্দ্রিয়, অতিন্দ্রিয় অনুভুতি জাগতিক বিশ্বের মোহ মায়া ছিন্ন করে পৌরাণিক মহা মিলনের আহ্বানে একটি নির্ঘুম রাত কাটিয়ে ভোরের আলো ফোটবার আগেই অত্যুৎকৃষ্ট সময় কাটিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পরে সাইদ।
সাইদের বাবা মোল্লা মশিউর রহমান যে কোন ভাবেই ঘটনার টের পেয়ে যান। দুইদিন পর অগ্নিশর্মা হয়ে রূপিয়াদের বাড়িতে যান। তার আকস্মিক উপস্থিতিতে প্রথমে রূপিয়ার মা ভরকে গেলেও মনে মনে বিশ্বাসের খড়কূঁটো খুঁজতে থাকেন সাইদের বাবার চোখে। না তিনি তা পাননি। মধ্য বয়স্কা নারীকে অপমান অপদস্ত করে এবং পনের দিনের মধ্যে মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জোড়ালো নির্দেশ দিয়ে বাড়ি ফেরেন। প্রভাব প্রতিপত্তির কারণেই মোল্লা মশিউর রহমানকে সবাই সমীহ করে। মাণ্য করে। এদিকে রূপিয়া এক সপ্তাহে অন্তত বিশ বার খবর পাঠায় রহমান আর নূরু মিয়াকে দিয়ে। সাইদ খবরও পায়, কিন্তু যাওয়া হয়নি, কারণ সেই রাতের ঘটনার পর পরই মোল্লা মশিউর রহমান খাল পাড়ের দেবদারু গাছের তিনটি ডালা একত্রে বাঁধে। আর সাইদের মা মতি ভানুকে বলে সাবধান করে দেয়, আজ সাইদকে ইচ্ছে মত গরুপেটা করবো তুই যদি ধরিস তাহলে তোর আমার তালাক হয়ে যাবে। সাইদ টের পেয়ে রাতে বাসায় না থেকে বন্ধু আমিরের বাসায় শুয়েছিল। সাইদের এই ছোট্ট জগতের বাইরে যাওয়ার আর কোন উদার পথ ছিল না। মোল্লা মশিউর রহমান জানতেন সাইদ কোথায় আর রাত্রি যাপন করবে? তাই নির্ভুল নিশানা নিয়ে আমিরদের বাড়ি থেকে ধরে এনে মনের ঝাল মিটিয়ে বেদম পিটুনি দেয়। মা ও সাইদকে রক্ষা করতে পারছেন না। শুধু কাঁদছেন।
সাইদ অপরাধীর মত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই রইলো।
রূপিয়ার বিয়ের দুদিন আগে সাইদ দেখা করতে যায়, আজ রূপিয়ার মা ও সাইদকে বসতে বলল না। রূপিয়াও না। জল ছলছল চোখে শুধু রূপিয়া বলল, আমি ব্যাকুল চিত্তে এত গুলি খবর পাঠালাম আপনি আসলেন না কেন? এই যে কেন? এটা একটা অভিযোগ। কিন্তু কি উত্তর দিবে সাইদ, নত মুখে দাঁড়িয়েই রইলো, রূপিয়ার হঠাৎই খেয়াল করল সাইদের ঘাড়ের কাছে কালো কালো দাগ, তখনও কালো হয়নি, কিছুটা লাল আভা তখনো ছড়াচ্ছে। মারের দাগ বসে আছে ঘাড়েও। রূপিয়া বুঝতে পারলো নিশ্চই সাইদের উপর নিদারুণ অত্যাচার হয়েছে। কোন কিছু না ভেবেই সাইদকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠল, নিশ্চয়ই তোমার বাবা খুব মেরেছে। পিঠে রূপিয়ার হাত পড়তেই আকম্পিত সাইদ পিঠের ব্যথা সয়ে অদ্রষ্ট বইগুণ্য মেনে নিয়ে কোন ভাবান্তর না দেখিয়ে স্তম্ভিত হয়ে রইল। রূপিয়া পিঠের উপর থেকে জামাটা তুলে দেখে তো বিস্ময়, হতবাক মূহুর্তে সাইদকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গেল। বলল, তোমার বাবা তোমাকে এই অবস্থা করেছে। কিছুক্ষণ মুখোমুখি নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকলো প্রবাহমান দুটি জীবন্ত মানুষ নদী।
বিয়ের রাত্রে রূপিয়াকে কনে রূপে কেমন লাগে তা দেখতেই হবে। এই প্রত্যয় নিয়ে বন্ধু বাবুলকে নিয়ে পারুল পাড়া যায় সাইদ। দূরে তো নয়, পাশের গ্রাম। রাস্তার পাশে রূপিয়াদের বাড়ি। তারপর একটি পুকুর, পুকুর পাড়ে মাথা উঁচু করে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে প্রচীন একটি নারকেল গাছ। এদিকে আকাশের যতো কালোমেঘ জমা হচ্ছে সাইদের দুই চোখের পাতায়।
হ্যাজাক লাইটের আলো পথ দেখিয়ে রূপিয়াকে পালকীর কাছে নিয়ে আসে। যেন কোন হোঁচট না খায়, তবে যে অমঙ্গল হবে। ঝাঁপসা চোখে সাইদ রূপিয়াকে দেখল কি দেখল না, প্রথমে সাইদের বুকটা দুই তিন বার দমকে দমকে কেঁপে উঠল তারপর সাইদের চোখের জল পারুল পাড়া গ্রামটিকেই যেন ভাসিয়ে দিল।

0 Comments