সারস ঠোঁটের নদী || জাকারিয়া প্রীণন

 

The Crane-Beaked River || Free-form Prose || Zakaria Prinon

যদি কোনো একটি পাহাড়ের দিকে চলে যাই আজ এই দুপুরেই—শারস ঠোঁটের মতো হেলে পড়বে দিন। অনেক গুলো সন্ধ্যার পর একটি অন্ধকার পথের মোড়ে এসে আমাদের দেখা হয়ে যাবে—বাড়ি ফেরার পথে এই কথা ভাবি প্রতিদিন। সমস্তটা দিন বসে থাকে একটি অন্ধকার মস্তিষ্ক নিয়ে—হাস্নাহেনার গন্ধের লোভে আমি প্রতিদিন পানি ঢেলে আসি। আথচ বিকেলের রাস্তা গুলো সন্ধ্যার আধারে কবেই মিলিয়ে গেছে। সব যেন এখন ভরা পূর্ণিমা। দূর থেকেই দেখি—জ্যোৎস্নার মতোই অধরা অনুভব ছাড়া কিছুই অবিশিষ্ট থাকলো না আমাদের। এই দুপুরে—দেখতে দেখতে ফাঁকা হয়ে গেল ট্রেনের সবকটা বগি তবু দুপুরের নির্জনতায় লেজ নেড়ে যাচ্ছে একটি নিঃসঙ্গ কুকুর। তোমার উঠানের রক্তকরবী গাছটির কথা মনে পড়ছে এই মূহুর্তে—প্রতিদিন উড়না শুকোতে দাও যেখানে। আমি চাই ৩৫৬টি পাখা গজাক তোমার উড়নায়। যেন যেকোনো দুপুরই হয় তোমার মতো সুগন্ধীময়। রোদের আলপিনে আটকানো তোমার হৃদয়—মাতালের মঞ্চ থেকে লাফিয়ে পড়েছে একটুকরো গোলাপে—আর সমস্ত বাগানের ছবি নিয়ে ফুটে গেছে মনে।


আমি যেদিন মরে যাব—পৃথিবীর বাতাসে করুণ কান্না তোমার বাড়ি আবধি পোঁছানোর আগেই ফুরিয়ে যাবে। ফুলতোলা বালিশে ঘুম তখনও ভাঙবে না। সকালের খিলানে এসে রোদ পড়বে—সরিষা মাঠে মৌমাছির আনাগোনা থেকে যাবে দৃষ্টির বাহিরে। পথের ধুলো, নদীভরা মাছ সব কিছু অচেনা হবে আমার। পৃথিবীতে আর আসব না বলে দুঃখ লাগছে। যেন পরাজয়ের সকল পথই আমার বন্ধু—তারা আঙুলে করে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার কোনো ঘরের দিকে। ইচ্ছে তো হয় একটু দাঁড়াই বিকেলের সিঁথিধরে নেমে আসা সন্ধ্যাটা দেখে যাই। আমার যাওয়ার পাশে কেবল ভাঙনের গল্প—তিরতিরে ঢেউয়ের মতো কাঁপতেছে যেন। কচি কচি ফুলের মতো যেসব দুঃখ জমিয়ে রাখ—যাবার আগে ইচ্ছে করছে তাদের একটু আদর দিয়ে যাই। আমার কোলে মাথা রেখে তারা ঘুমিয়ে যাক যেন কোনোদিন পৃথিবীতে জেগে উঠতে না পারে আর। তুমি কি জানো তুমি দুঃখ পেলে ফুলেদের মন পুড়ে যায়? মা হারা ছেলের মতো আমাদের দুঃখ গুলো কত অসহায়—হাওয়ার কিনারায় বসে সারাদিন গল্প বুনে। বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়েছে আশ্চর্য জিরাফ সকালের লাল রেখার উপর। কোথায় আমার শীতল পাটি? যাকে জড়িয়ে ধরলে পৃথিবীর সকল অভাব আমার কেটে যাবে। কোথায় রাখতে পারি আমাদের মন? কোন বন্ধুর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেতে পারে আমাদের অগোছালো সময়? আলো অন্ধকারে দণ্ডায়মান আমি—শৈশবের হাসির মতো হারিয়ে ফেলেছি উত্তর। ইদানীং তোমাকে খোদার মতো খুব একা একা লাগে। রোদের পকেটে করে পৃথিবী পাচার হচ্ছে এস্ত লালিমায়। তাই ডানা ভাঙা ফড়িংয়ের কথা মনে পড়ে বারবার। এই ক্লান্তিকর অরণ্যে রাবারের বন বনিকের দূতাবাস—পাখিরাও ব্যাচেলর সেখানে। রাবারের গন্ধে মুছে যাচ্ছে পরিচয় আমার ফিরার পথ যেন দীর্ঘ হয়। জালিমের ইতিহাস মনে রাখলেও পাখিদের ইতিহাস মনে রাখেনি কেউ। মানুষও এমন পাখি হয়ে মরে যায় মাঝে মধ্যে। মরে যেতে হয় বলে। 


  তোমার বাড়ির আঙিনায় এখনো কি ফুটে আছে কৃষ্ণচূড়া? এমন সন্ধ্যা আমি দ্যাখি নাই কোনোদিন—অথচ চোখের গভীরতায় ডুবে যেতে পারে মানুষ। তবুও আমাকেই কেন ভাসিয়ে রাখো—প্রয়াত ফুলের মতো। তুমি জানো না মৃত্যুর রং কেমন হয়। নাড়াকাটা ধানমাঠে বিকেলের রোদে হলুদ মৃত্যু আমি দেখি প্রতিদিন। যেন ভাই-বোনের মতো হাত ধরে চলে যাচ্ছে দিগন্তের পথে। আমার মৃত্যু হলে সেদিন সকালে খুব বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টি তোমার ভালো লাগার দিন। বৃষ্টি মন খারাপে আঁকা থাকবে আমার নাম। নিপুণ অস্থিরতার চাবি দিয়ে খুলে ফেলেছি হৃদয়। তুমি কী জানো? পৃথিবীর সব কিছুই অস্থির তার চেয়েও বেশি অস্থির মানুষের মন। যেকোনো সময় বদলে যায়—নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সাথে মনোজগতের সকল ভাবনা পালটে যেতে থাকে। তাই গভীর ভালো লাগাও জাগাতে পারে বেদনা কিংবা গভীর বেদনাও জাগাতে পারে গভীর প্রেম। এই বেঁচে থাকা—এই পৃথিবী—স্বৈরাচারি আয়ু। একটা পাখিকে দেখার পর জাগিয়ে তুলে শিকারি মন। একটি নদীকে দেখার পর দখল হয়ে যায়—যেমন নদী খননের নামে একটু একটু মরে যাচ্ছে আমার ব্রহ্মপুত্র। এই ফকিনের বাক্সে আমরা প্রতিদিন রেখে আসি চায়ের কাপ—সিগারেটের সাদা-কালো ছাই। এই মনোজগতের বিভ্রমে আটকে বোধয় জীবনানন্দ বলেছেন তার বোধের কথা—


আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে

স্বপ্ন নয়,—কোন এক বোধ কাজ করে!

স্বপ্ন নয়,—শান্তি নয় ভালোবাসা নয়,

হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!

          আমি তারে পারি না এড়াতে,

সে আমার হাতে রাখে হাত;

         সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,

সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময় 

        শূন্য মনে হয়,

শূন্য মনে হয়!


জেলেদের পাটাতনে নদীই একমাত্র বিছানা—ঈশ্বরের রত্ন কোষাগার। হ্যারিকেনের আলোয় নিভি নিভি জ্বলতে থাকে সম্ভাবনার দিনে। কখনো বা হাঁটার ভঙিমা ধরে বৃষ্টি নেমে আসে চিকন শরীরে। যেন পরান্ন জীবনের ছবি টানিয়ে রেখেছে ঘর। বিস্তারিত বাগানের মতো ঝাউবনের ছায়া। প্রতিটি মানুষের কাছে তার অর্থ আছে—পৃথিবীর প্রতিটি ফুলের আলাদা আলাদা যেমন গল্প থাকে। মানুষ যেমন মানুষের কাছে কোনো না কোনো কিছুর আশা করে। যদি আশাই না থাকতো তবে মানুষ মানুষের প্রতি মমতা বোধ জাগাতে পারতো না কোনোদিন। পৃথিবীর সব কিছুর আলাদা আলাদা রং আছে কিন্তু মৃত্যুর রং এক তার কোনো জাত নেই—ধর্ম নেই সে এক ও অভিন্ন সত্য। গতরাতের স্বপ্নে আমারই লাশ কাঁধেকরে দাফন করে এলাম। তখন পৃথিবীতে ঘুমিয়ে পড়েছে জোনাকিরা। আমি স্বপ্ন দেখি মৃত্যুর রং হলুদ—ঝরে পড়া পাতার মতো টকটকে হলুদ। সাদা, কালো, শ্যামলা রং মানুষের ভিরে হলুদ একটি মানুষ হেঁটে যাচ্ছে একা। সমুদ্রে পা বিছিয়ে ডুবে যাওয়া সূর্য দেখছে। অথচ মৃত্যু এখন ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকার মতো; কেবল দূর থেকে হাসে। তাকে পেয়ে গেলে জীবন পূর্ণ হয়ে যায়। মানুষ তো সারা জীবন মৃত্যুকেই পোষে রাখে শরীরে!


 ০২

গ্রীষ্মের দুপুরের ছায়াহীন পথে যারা হেঁটে যায়—তাদের অনেক পিপাসা। তার কাতরতা এক সময় ছড়িয়ে পড়ে মেজেতে পড়ে থাকা মদের মৌতাতের মতো। কিন্তু ছায়ার সন্ধান করে যেতে হয় বলেই জীবন উর্ধগামী। তাই মাঝে মধ্যে নিজের সাথে কথা বলার প্রয়োজন পড়ে। মানুষ কথাই বলে আনন্দ উপভোগ করতে। কথা বলাও মনে হয় মনের সৌন্দর্য। অথচ একই পৃথিবীর আলোয় আমরা আছি নির্জন কোনো দ্বীপের ছায়া হয়ে। আমাদের ছায়ায় জন্মানো একেকটি ঘাস—এই পৃথিবীর চেয়েও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মনের মধ্যে ফুটে গেছে সুনিবিড় সচেতনতায়। ঝুমকোলতা তুলি নিয়ে গাঢ় কোনো রং মেখে দিতে পারে মনে। মন তো অবচেতনা মাত্র। অবচেতনা একটি সাময়িক মৃত্য। আমি তো বারবার মরে যাই—প্রেমিকার ঠোঁটে দীর্ঘ পিপাসার মতো। 


পৃথিবীতে যা কিছু মহৎ তার সবটাই কবিতা। দৈব অনুভূতির জগতে যে সকল হরিণ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তার অনুকৃতি বর্ণনা কে দেবে? এই যে জগতের আলো, আঁধারের অপরিসর নৃত্য—তারাদের কানাকানি তা কে শুনবে? স্টেরি নাইটে ভিনসেণ্ট মনের রং মিশিয়ে আমাদের প্রথম বিস্তার গঠিয়েছিলেন কল্পনার। কিন্তু দেখার চেয়েও শ্রবণের যেই ঘ্রান তাই কি আলোকিত করেনি মানুষকে যুগযুগ ধরে? আমরা কি জীবনানন্দের নক্ষত্রের শিথিলতায় জীবন দেখতে পারিনি। প্রেমে চূর্ণ হতে হতে আমরা কি বলিনি? মরা নক্ষত্রের শীত লাগিতেছে আমার হৃদয়ে কিংবা "প্রেম ধিরে মুছে যায় নক্ষত্রের ও একদিন মরে যেতে হয়!"। ভাষার অনেক মাধ্যম আছে কিন্তু মানব জাতির প্রধান মাধ্যম কথা বলা। এবং তার ভিতর দিয়েই আবেগের বিস্তার ঘটে। যাকিছু মৃত প্রাণ প্রায় তারা জেগে উঠে অলিক দেবতার মতো প্রাণে—


"পাখিটা কানের পাশ দিয়ে ফুরুৎ করে যাওয়া আসা করে

দোয়েল পাখিটা ধরতে পারিনি

মৃত্যু তোমায় ধরে ফেলেছি"


(দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু) 


স্বপ্নের ভিরে ডুবে ডুবে মারা যান কবি। আবার বেঁচে উঠেন স্বপ্নে। স্বপ্ন ছাড়া কবির জীবনে আদৌ কিছু আছে কি? সেদিন স্বপ্নে মঞ্জু ভাই এলেন আমরা একটি বিস্তীর্ণ মাঠের দিকে চলে গেলাম। নুড়ি পাথরে জন্মানো ঘাসের শাদা শাদা ফুলের উপর আমরা বসে গেলাম। উনার বাড়িয়ে দেওয়া ওয়াইনের গ্লাসটা হাতে নিতে নিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। কবিতা এমন ভেঙে পড়া এক টুকরো জল কেবল গড়িয়ে নামতে থাকে সম্ভাবনার দিকে। আমাদের অনুভূতি গুলো প্রকাশ করি কথায় আর কথার একমাত্র শৈল্পিক বুনন হলো কবিতা। তাইতো তীব্র ব্যথায় অভিমান করে বলতে পারি " বুকের ভিতর দুই একটি পাথর থাকা ভালো—ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়"...। কিংবা


এখন কিছুই করছি না

পানপাত্রে পড়ে আছে মৃত প্রজাপতি

তাকে শুধু সাঁতার শেখাচ্ছি...


(দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু) 


এই যে আমি বললাম "দুঃখ—সে তো বুকের ভিতর জিইয়ে রাখা মিন—তোমার নামে দরূদ পড়ে জেসমিন জেসমিন" যদি কবিতা নাই থাকতো তাহলে আমি কেমন করে বলতে পারতাম? কবিতা লেখা না হলে পৃথিবী মানব শূন্য, প্রেম শূন্য হয়ে যেত। মানুষ বিরহ বা প্রেম কোনো কিছুই নিজের মধ্যে আটকে রাখতে পারে না। মানুষ কেন কান্না করে? কাঁদে কিছুটা নির্ভার হতে যেন দুঃখটা কমে আসে। যদি তা না হতো তাহলে হৃদয় ফেটে মরে যেত মানুষ। রাগ উঠলে কেন আমরা গালি দিই যেন রক্তচাপ কমে আসে। কিন্তু অবহেলার ভাষা—প্রেমের—বিরহের ভাষা কবিতার চেয়ে কেমন করে সুন্দর হতে পারে? 


উর্দু সাহিত্যের কবি মীর তকি বেদনাকে গোপন করতে চেয়েছিলেন তার পরিণয় হলো মুত্যু। মানুষ মরে যায় তার জন্যে রচিত হলো এলিজি যা একটি কবিতা। মানুষের প্রয়োজন পড়লো ধর্মের—ধর্মের বাণী মানুষ প্রচার করলো কবিতায়। মানুষে মানুষে হিংসা বাড়লো অখ্যান তৈরী হলো। এসব কাহিনি পুঁজি করে রচিত হলো পুঁতি সাহিত্য। কবিতায় যখন সুরের দরকার হলো পৃথিবীতে জন্ম নিলো অসংখ্য কবিয়াল। মসজিদ থেকে মন্দির—গীর্জা থেকে এপিটাফ কোথায় নেই কবিতা? যখন প্রেম প্রকাশিত হলো সর্বত্র খোদার অস্তিত্বের মতো যখন সেও তার উপস্থিতি ঘোষণা দিল মনে—আমি লিখলাম—"পৃথিবীতে যেকোনো ফুল ঝরে গেলে আমি তারে জেসমিন বলে ডাকি" যদি নাই থাকতো কবিতা তাহলে কী হতো আমার মৃত্যু ছাড়া? যখন শখের নারীটি চলে যাচ্ছে দূরে—অসংখ্য যুবকের প্রেম হয়ে আমি বলতে পারছি—


"বাড়ি ফেরাত পথে

কেবল তোমার কথাই ভাবি

অথচ তুমি ব্যস্ত হয়ে যাও অন্য কোথাও 

                অন্য কারো সঙ্গে—

তবুও তোমাকেই বিশ্বাস করে ফোটে যায়

আমাদের প্রেম—করুণ ভালোবসায়।"


যদি কবিতা না থাকতো কী হতো আমার এবং আমাদের? আমার সেই অজানা প্রশ্নের কথা তোমার হয়তো মনে নাই এখন। এসব দৈবচয়ন ছায়াপার্বতী—জলের উপর এঁকে রাখা আলপনা। মৃত্যুর কাছে গেলে শুরু হয় রিনরিনে বাতাস—বৃষ্টির মতো টুপটুপ ঝরে পড়ে। সন্ধ্যার বু

দ্বুদে যেন অট্টহাসির পিয়াল তোমাকেই দেখছে গোপনে।

Post a Comment

0 Comments