সবে তখন সপ্তম শ্রেণীতে উঠেছে শীলা -- শরৎ কাহিনী লুকিয়ে পড়ছে পাঠ্য বইয়ের ভেতরে, আর প্রতিটি নারী চরিত্রের অন্তরালে খুঁজে নিতে বা মিলিয়ে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনে চলছে নরম কিশোরী মনের সহজপাঠে। আসলে কিশোরবেলায় সবটাই আনকোরা সবটাই তরতাজা ----। নতুন করে ভালোলাগা নতুনভাবে জানা কিংবা নতুনত্বকে নিজের করে নেবার আনন্দে এক উদ্দীপনার রোমাঞ্চ শরীর-মনে প্রবাহিত হয় প্রকৃতির নিয়মেই।
এমন পরিস্থিতির অন্তর-বাইরের দোটানায় শীলা একটু একটু করে প্রেমের মানে বুঝতে গিয়ে এবং খুঁজতে গিয়ে নিজের প্রেমকে আবিস্কার করে তারই বাড়ির গৃহপরিচারিকার ছেলেটিকে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে শীলা এবং ছেলেটি তারা নিজেদের তাগিদ অনুভব করতে থাকে, একটু দেখা একটু কথা বলার মাধ্যমে তারা বুঝে নেয় প্রেম হয়তো একেই বলে। অল্প বয়সের কাঁচা হৃদয়ে কথাগুলোও তেমনি কাঁচা কাঁচা --- ঠিক পরিপক্ক না হলেও দু'জনের মধ্যে একটা যে সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে তা বুঝেছে অনেকটাই।
চোখাচোখি হতেই শীলা ছেলেটিকে বলে, এই তুমি লেখাপড়া কর না কেন বল তো ----।
ছেলেটি প্রথমে চুপ থাকে কিন্তু শীলা তাকে বলে এদিকে এস।
ছেলেটি তবুও নীরব, অগত্যা শীলা তাকে হাত ধরে এনে চেয়ারে বসিয়ে রবি ঠাকুরের কবিতার বই বের করে বলে, এটা পড়তে পারবে ----।
ছেলেটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, সে পারবে। শীলা কিছু বলার আগেই সে পড়তে শুরু করে।
শীলা তো অবাক ------ সে প্রশ্ন করে, কোত্থেকে শিখেছ বল তো -----।
ছেলেটি আবার চুপ, কারণ শীলাকে সে পছন্দ করলেও জানে আসলে শীলা এই বাড়ির গৃহকর্ত্রীর মেয়ে। শীলার মা ভীষণ চুপচাপ গোছের গম্ভীর এক মহিলা, ওনার সাথে কথা বলা তো দূরে থাক সামনে গেলেই ভয়ে বুক ঢিবঢিব করে।
একটু ঢোক গিলে ছেলেটি মুখ নামিয়ে উত্তর দেয়, বাবার কাছে --- আমার বাবা একজন প্রাইমারী স্কুলের টিচার ছিলেন এবং খুব ভালো আবৃত্তি করতেন ----।
এ কথা শুনে শীলার তো আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। শীলা ছেলেটিকে বলে, তারপর --- তারপরেরটা বল।
ছেলেটি আবার শুরু করে --- তারপর তো বাবা চলে গেলেন, আর ফিরে এলেন না।
শীলা, কোথায় চলে গেলেন?
ছেলেটি, ওই যে ওই দূর আকাশে --- যেখানে গেলে মানুষ আর ফিরে না। মা বলেন, বাবা সব দেখছেন আকাশের তারা হয়ে।
শীলার মন খুব খারাপ হয়ে রয়েছে --- ছেলেটি ওর মা'র সঙ্গে এ বাড়িতে আসে কারণ ছেলেটি ফাইফরমাশ খাটবে এই কথা বলেই কাজে ঢুকেছে ছেলেটির মা। শীলা আজ পড়া শেষ না করে বিছানায় শুয়ে পড়েছে আর বালিশ ভিজছে তার দু'চোখের জলে। শীলার খুব ইচ্ছে হচ্ছে ছেলেটিকে যদি সত্যিই তাদের বাড়িতে একেবারে রাখা হতো তাহলে ভীষণ ভালো হতো কিন্তু সেটি সম্ভবও নয় কারণ মা কিছুতেই তা মেনে নেবেন না ---। শীলা জানে এ ব্যাপারে কিছু বললেই মা তাকে বলবেন, শীলা তুমি খুব ইমম্যাচিউর --- সবতে বাড়াবাড়ি ঠিক নয়। আগে নিজেকে তৈরি কর - যোগ্য কর, তারপর বুঝতে শিখবে কোনটা সঠিক আর কোনটা ঠিক নয়।
শীলা আজ নিজেকে সত্যিই যোগ্য করে তুলেছে, সে এই ব্যস্ত শহরে একজন ব্যস্ত ডাক্তার --- । যার সব রয়েছে, গাড়ি - বাড়ি প্রতিপত্তি সব সব, ছেলে বিদেশে অধ্যায়নরত আর স্বামী দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো ব্যস্ত -সফল শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি।
শুধু একটি সুন্দর মুহূর্তের বড়ই অভাব --- ওই সেই কৈশরের ছেলেটি, যে তাকে কবিতা শোনাত চুপিচুপি --- তাকে নদীর কথা বলতো --- বৃষ্টির গান শুনিয়েছিল এক ফাগুনে --- সেই ছেলেটির নাম বিজয়।

0 Comments