মানুষের প্রথম প্রেম কোনো মানুষ নয়—তার প্রথম প্রেম পৃথিবী। পৃথিবীতে আসার প্রস্তুতিই তার পৃথিবীকে ভালবাসার অংশ।
পৃথিবীকে পরিপূর্ণ ভালোবাসতে শেখারও আগেই প্রেম হয় মায়ের কোলের সাথে।
জন্মের পর একটি শিশু পৃথিবীর কিছুই জানে না। জানে না নীল আকাশের বিভা চেনে না ফুলের সৌরভ,বুঝে না সম্পর্কের অর্থ। সে মায়ের স্পর্শ চিনে নেয়। মায়ের কণ্ঠ শুনে শান্ত হয়। মায়ের বুকের কাছে মাথা রাখলে তার অজানা পৃথিবী নিরাপদ মনে হয়।
কোনো শব্দে নয় ভালোবাসার প্রথম ভাষাটি উচ্চারিত হয় স্পর্শে।
মায়ের কোল—মানুষের প্রথম আশ্রয়, প্রথম বিশ্বাস, প্রথম প্রেম।
তারপর ধীরে ধীরে পৃথিবী তার সামনে খুলতে থাকে হৃদয়ের গোপন ও প্রকাশ্য দ্বার। জানালার বাইরে একটি সবুজ গাছ, নীল আকাশ ঋতুর পরিক্রমা। পাখি বৃষ্টির গান, শীতের হিমেল হাওয়া মিঠেল রোদ, নদীর ঢেউ, পালতোলা নৌকা, বিছানায় লুটিয়ে পরা পূর্ণ চাঁদের ভরা আলো।
মানুষ জানে না সৌন্দর্য কী, কিন্তু সৌন্দর্যের সঙ্গে তার আত্মীয়তা তৈরি হয়ে যায়। এভাবেই প্রকৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্য প্রেম হয়ে যায়। তারপর আসে মানুষ।
বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু—একটি শিশুর পৃথিবী ধীরে ধীরে সম্পর্কের অসংখ্য সুতোয় বোনা হয়।
প্রথম বই, প্রথম খাতা, প্রথম বেঞ্চ, প্রথম বন্ধু, প্রথম শিক্ষক।
একজন শিক্ষক হয়তো তাকে অক্ষর চিনতে শেখান; আরেকজন শেখান মানুষের মুখের ভেতর মানুষটিকে দেখতে। কোনো কোনো শিক্ষক জীবনে এমন একটি বাক্য রেখে যান, যা বহু বছর পরও অন্ধকার সময়ে পথ দেখায়।
তারপর কলেজ।
কৈশোর পেরিয়ে মানুষ নিজের ভেতর আরেকটি পৃথিবী আবিষ্কার করতে শুরু করে। তখন বন্ধুত্বের অর্থ বদলায়, স্বপ্নের রং বদলায়, পৃথিবীকে দেখার চোখও বদলে যায়।
তারপর কোন একদিন, হঠাৎ একদিন!
কেউ একজন মানুষ এসে দাঁড়ায় সেই বদলে যাওয়া পৃথিবীর মাঝখানে।
হয়তো প্রথম দেখায় কিছুই ঘটে না আবার হঠাৎই ঘটে যায় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, চোখে চোখ সেই দৃষ্টি একটু মুচকি হাসি, অথবা কিছু বলা,
একই পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কয়েক মুহূর্ত পাশাপাশি থাকা।
আমাদের সময়ে খুব বই পড়া হতো, বইয়ের আদান প্রদান হতো এই বিষয়টাও মন দেয়ানেয়া জানানোর উপযুক্ত মাধ্যম।
হয়তো বৃষ্টির দিনে একই ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা।
ঘটনাটি এতই সামান্য, তবুও মূহুর্তটা অনন্য অসামান্য আলোয় আঁকা। অসাধারণ অনুভূতি, অস্পর্শিত উপলব্ধি।
সেদিনের পর মানুষটিকে অকারণে মনে পড়তে থাকে।
সকালে ঘুম ভাঙার পর তার কথা মনে আসে। আমাদের সময় প্রচুর গান শোনা হতো, কোন গানের লিরিক শুনলে মনে হতো তার উদ্দেশ্যই এগুলো লেখা, কবিতার লাইন মাথায় আসা কখনো পুরো কবিতা লিখে ফেলা।
এটাই হয়তো প্রথম প্রেমের বিস্ময়। প্রথম প্রেম পৃথিবীর দেখার দৃষ্টি বদলে দেয়।
প্রথম প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর সত্যের পাশাপাশি সবচেয়ে কঠিন সত্যটিও এখানেই।
যাকে প্রথম ভালোবাসি, সে সবসময় সঠিক মানুষ নাও হতে পারে।
মানুষ কখনো ভুল মানুষের সাথে সত্যিকারের প্রেমে পরে। ভুলটা প্রেমের নয়, তাতেও প্রেমের মহিমা কমে না।
প্রথম প্রেম শেখায়, হৃদয় কত গভীর হতে পারে।
মানুষ কতটা সহ্য করতে পারে।
কাউকে ভালোবাসার অর্থ তার জীবনকে নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করা নয়।
মানুষের প্রথম প্রেম হলো নিজে এবং নিজের চেহারা। সবচেয়ে কুৎসিত মানুষটির ঘরেও আয়না আছে, সে নিয়মিত কেশ পরিচর্যা করে সাজ পোশাক পরে সবচেয়ে সুন্দর মানুষটির পাশে বসেও নিজের শরীরের কোন ক্ষতি হতে দেয় না। দীর্ঘদিন বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। রোগে চিকিৎসা করায়।
প্রথম প্রেম আসলে প্রথম কোনো মানুষের জন্য নয়।
তার প্রথম প্রেম ছিল মায়ের কোল। তারপর প্রকৃতি পরিবার, বন্ধু
তারপর কোনো এক প্রিয় মানুষ।সময়ের সাথে সাথে প্রেমের উপকরণও বদলাতে থাকে, প্রেম চলমান বহমান স্থির নয় আবদ্ধ নয়, তবুও মানুষ স্থির হতে চায় আবদ্ধ হতে চায় কারো প্রেমে, প্রেম তো প্রেমই এর কোন নম্বর নেই। সকল প্রেমই প্রথম প্রেমের মতো বিপুল বিস্ময় নতুন উপলব্ধি পবিত্র ভাবনা।
আমার ব্যাক্তিগত জীবনের কথা বলি, আমার কিশোরীকালে বিয়ে, তারপর সংসার সন্তান এগুলোর সাথে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তারপর চাকরি।
এতোটাই কি নিরেট! নাহ্ মাঝে প্রাণময় বিষয় তো আছেই।
কে সে? কোথায় সে?
এখনও যখন কোন কবিতা লিখি সে এসে দাঁড়ায় পাশে, কোন গল্পের নায়কের চুল মিশে কোন গল্পের পোশাকে মিশে কোন গল্পের নায়কের পৌরুষে সে থাকে।
তার চেহারা কেমন, এই যে যেমন আমি আঁকি। এতোটাই কি বায়বীয় এতোটাই কি অদৃশ্য, সেটা হয়তো হ্য হয়তো না।
প্রেম কেবল কারো জন্য স্মৃতি নয় । হয়ে ওঠে দর্শন সত্য উপলব্ধি
প্রেম মানুষকে শুন্য করে যায় না বাহ্যিকভাবে শুণ্য মনে হলেও হৃদয় ভরে দিয়ে যায় অভিজ্ঞতা,
কখনো কখনো হারানো প্রেমই মানুষকে দীর্ঘ পথ ঘুরিয়ে
তার নিজের প্রেমের কাছে ফিরিয়ে আনে।
সবশেষে সকল প্রেমই ঈশ্বর প্রেমে উপনীত হয় নিমজ্জিত হয়

0 Comments