পর্নোগ্রাফি এবং সাহিত্য || জয়িতা ভট্টাচার্য

Pornography and Literature || Jayita Bhattacharya


মানুষের জীবনের আদিম ও অকৃত্রিম রিপুগুলির মধ্যে যৌনতা একটি অন্যতম প্রধান অংশ। অথবা বলা যায়, একজন সুস্থ মানুষের জৈবিক চেতনা ও অবদমিত যৌন ক্ষুধাবোধ একটি অস্বস্তিকর সত্য। সাহিত্য সমাজ ও ব্যক্তি জীবনের অলিগলি থেকে রাজপথ—সবকিছুতেই যৌন উত্তেজনার অন্তঃসলিলা স্রোত হাজির থাকে।সেজন্য যৌনতা সৃজনের বাইরে নয়। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই প্রেম, শরীর, আকাঙ্ক্ষা এগুলি সাহিত্যের অংশ।

প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্য ও শিল্পে যৌনতা ও যৌন আকাঙ্ক্ষার নানা প্রকাশের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত, সাহিত্যে যৌনতার প্রকাশকে মোটামুটি দুটো ভাগে দেখা হয়—একটি পর্নোগ্রাফি, অন্যটি ইরোটিক সাহিত্য। ইরোটিক সাহিত্য অনেকটাই জনসমর্থন পায়—ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার নান্দনিক বা মধুর প্রকাশ হিসেবে।

পর্নোগ্রাফি শব্দটির উৎস প্রাচীন গ্রিক pornē—অর্থাৎ পতিতা বা যৌনকর্মী এবং graphein—অর্থাৎ লেখা, বর্ণনা বা লিপিবদ্ধ করা। আধুনিক pornography শব্দটি পরে ইউরোপীয় ভাষায় প্রচলিত হয়।

পর্নোগ্রাফি মূলত যৌন উত্তেজনার রসদ জোগায়, কিন্তু যৌনতার সাহিত্যিক উপস্থাপনায় মানুষের ক্ষমতায়ন, নিঃসঙ্গতা, মানসিকতা এবং সামাজিক অবস্থানের বিশ্লেষণও থাকতে পারে।

তবে পর্নোগ্রাফির কোনও সর্বজনস্বীকৃত, সর্বকালের সংজ্ঞা নেই। এক সমাজে যেটা যৌনতামূলক বা অশ্লীল বলে বিবেচিত হতে পারে, অন্য সমাজে হয়তো সেটি শিল্প, ধর্মীয় প্রতীক বা নান্দনিক প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। খাজুরাহোর মন্দিরগুলির ভাস্কর্যে ধর্মীয়, সামাজিক ও প্রেমমূলক নানা দৃশ্য পাশাপাশি রয়েছে। UNESCO-ও এই ভাস্কর্যগুলিকে পবিত্র ও অপবিত্র—উভয় ধরনের বিষয়ের শিল্পিত উপস্থাপনা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

খাজুরাহোর যৌন ভাস্কর্যকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আধুনিক গবেষণাতেও সেখানে যৌনতা, ধর্ম ও নন্দনতত্ত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সময় ও কাল একটি বড় বিষয়।যেমন,

প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শিল্পেও যৌনতা, ফ্যালিক প্রতীক এবং যৌন আকাঙ্ক্ষার নানা চিত্রায়ণ পাওয়া যায়। ফলে কোন প্রকাশকে ‘অশ্লীল’ বলা হবে, তা অনেকাংশেই সময়, সমাজ ও সংস্কৃতির মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আবার বিভিন্ন মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান বা অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের যৌন বিষয়বস্তুর ওপর যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তা পাশ্চাত্যের অনেক সমাজের তুলনায় আলাদা। অর্থাৎ যৌনতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড সর্বত্র এক নয়।

জিওভানি বোকাচ্চিওর ডেকামেরন-এ প্রেম, যৌনতা, বিবাহ ও মানবসম্পর্কের নানা কাহিনি রয়েছে। তবে এটিকে সরাসরি ‘মধ্যযুগের অন্যতম পর্নোগ্রাফিক রচনা’ বলা অপেক্ষাকৃত সরলীকরণ হবে। একইভাবে রোমান কবি ওভিডের Ars Amatoria বা The Art of Love যৌনতা ও প্রেম নিয়ে রচিত হলেও এটি মধ্যযুগের নয়, প্রাচীন রোমান যুগের গ্রন্থ।

মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সাহিত্যের নানা রচনায় ধর্মযাজক, যৌনতা, বিবাহ এবং সামাজিক নৈতিকতার সমালোচনামূলক বা ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনাও দেখা যায়।

The Pearl নামে একটি ভিক্টোরিয়ান যুগের গোপন যৌন-সাহিত্যধর্মী সাময়িকী লন্ডনে ১৮৭৯ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল। এর মোট ১৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সাময়িকীটি সমকালীন অশ্লীলতা-বিরোধী আইনি ও সামাজিক পরিবেশের কারণে গোপনে প্রচারিত হতো।

পশ্চিমে পর্নোগ্রাফিক মুদ্রিত সাহিত্যের ইতিহাস আরও পুরোনো হলেও, ১৮শ শতক থেকে এই ধরনের মুদ্রিত সাহিত্য ও বইয়ের বাজার বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে Fanny Hill, or Memoirs of a Woman of Pleasure একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কিত গ্রন্থ। জন ক্লিল্যান্ডের এই উপন্যাসের প্রথম অংশ ১৭৪৮ সালে এবং দ্বিতীয় অংশ ১৭৪৯ সালে প্রকাশিত হয়। এটি দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল এবং ক্লিল্যান্ড তখন ঋণের দায়ে কারাগারে ছিলেন। গ্রন্থটি ইংরেজি ভাষার প্রথম দিকের মৌলিক গদ্য-যৌনসাহিত্যের অন্যতম এবং উপন্যাসের আঙ্গিকে লেখা প্রথম দিকের পর্নোগ্রাফিক/ইরোটিক রচনাগুলির একটি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

বইটি প্রকাশের পরপরই বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ১৭৪৯ সালে ক্লিল্যান্ডকে প্রকাশনা-সংক্রান্ত মামলার মুখোমুখি হতে হয় এবং বইটির প্রকাশনা প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে গ্রন্থটি গোপন বা বেআইনি সংস্করণে প্রচারিত হতে থাকে।

বইটির বিশেষত্ব ছিল শুধু যৌন বিষয়ের উপস্থিতিতে নয়, বরং নারীর আকাঙ্ক্ষা ও যৌন অভিজ্ঞতাকে একজন নারী কথকের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করায়। তৎকালীন নৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে এই উপস্থাপনা যথেষ্ট সংঘাত তৈরি করেছিল।

ফ্যানি নামের এক তরুণীর জীবনসংগ্রাম, তার বেড়ে ওঠা, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং যৌনতার সঙ্গে তার পরিচয়—এই পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতাগুলিই কাহিনীর কেন্দ্রে। পরবর্তী সাহিত্য-সমালোচনায় ফ্যানির চরিত্রের এই বিকাশকে Bildungsroman বা গঠনমূলক উপন্যাসের কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। গবেষক ডেভিড ম্যাকক্র্যাকেন ফ্যানির বিকাশকে নিষ্পাপতা, পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতা—এই তিনটি পর্যায়ে বিশ্লেষণ করেছেন।

বিশ্বসাহিত্যে Bildungsroman জনর খুব জনপ্রিয়। অসংখ্য উপন্যাস এই জনরে লেখা হয়েছে। Bildungsroman শব্দটি জার্মান Bildung—অর্থাৎ গঠন, শিক্ষা বা বিকাশ এবং Roman—অর্থাৎ উপন্যাস থেকে এসেছে। মূলত শৈশব থেকে যৌবন বা পরিণত বয়সে পৌঁছনোর সময় একজন মানুষের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ, অভিজ্ঞতা এবং আত্মপরিচয় গড়ে ওঠার কাহিনী এই জনরের মূল বৈশিষ্ট্য।

ফ্যানি হিলের কাহিনীতে ফ্যানির জীবন ও মানসিকতার পরিবর্তনকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়া হয়েছে। তবে Fanny Hill-কে নিঃসন্দেহে বা একমাত্রিকভাবে একটি Bildungsroman বলা নয়, বরং এটি একটি সাহিত্য-সমালোচনামূলক ব্যাখ্যা—এ কথা মনে রাখা জরুরি।

বইটি দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৭৪৮ সালের নভেম্বরে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৭৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

কী সেই গল্প?

ফ্যানি হিল নামের মেয়েটি শৈশবে অনাথ হয়ে যায়। তারপর নানা জীবনসংগ্রামের ভেতর দিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য সে কাজ নেয়। ঘটনাচক্রে তার জীবন যৌন ব্যবসার জগতে প্রবেশ করে। কাহিনীর মূল বিতর্ক ও বৈশিষ্ট্যের একটি দিক হলো—ফ্যানির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নারী-ইচ্ছা, যৌনতা এবং সামাজিক নৈতিকতার প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা।

শেষ পর্যন্ত ফ্যানি তার প্রেমিককে বিবাহ করে এবং জীবনের একটি স্থিতিশীল পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়।

তৎকালীন খ্রিস্টধর্ম-প্রভাবিত সমাজ-সাহিত্যে যেখানে নারীর কামনা-বাসনা ও যৌনতার উচ্চারণ নিয়ে নানা নৈতিক নিষেধ ছিল, সেখানে বইটিতে নারীকে কেবল পুরুষের আকাঙ্ক্ষার বস্তু হিসেবে নয়, নিজের আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছিল। এই দিক থেকেই Fanny Hill তার সময়ের সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ।

বইটিকে স্যামুয়েল রিচার্ডসনের Pamela-র সঙ্গে তুলনা করাও সাহিত্য-সমালোচনায় দেখা যায়। Pamela-য় নারীর সতীত্ব, নৈতিকতা ও আত্মসংযমের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ; Fanny Hill-এ নারীর আকাঙ্ক্ষা ও যৌন অভিজ্ঞতার একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সাহিত্যিক উপস্থাপনা দেখা যায়।

Fanny Hill প্রকাশের পর বহুবার অশ্লীলতার অভিযোগের মুখে পড়ে। ২০শ শতকেও এর প্রকাশনা নিয়ে মামলা হয়। ১৯৬৩ সালে ব্রিটেনে বইটির একটি আধুনিক সংস্করণ প্রকাশের পর ৮২,০০০ কপি বিতরণ হওয়ার কথা নথিভুক্ত আছে; ১৯৬৪ সালে সেই সংস্করণকে ঘিরে অশ্লীলতার মামলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রেও বইটি অশ্লীলতা নিয়ে আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে আসে। ১৯৬৫ সালে ম্যাসাচুসেটসের আদালত বইটিকে অশ্লীল বলে রায় দিয়েছিল। পরের বছর, ২১ মার্চ ১৯৬৬-তে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের Memoirs v. Massachusetts মামলায় সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয় এবং বইটির প্রকাশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তন আসে।

ব্রিটেনে ১৯৭০ সালে বইটির একটি অসংযত বা uncensored সংস্করণ আবার প্রকাশিত হয়। সুতরাং ১৯৭০ সালকে বইটির ওপর অশ্লীলতার অভিযোগ থেকে ‘মুক্তি পাওয়ার’ সরল ঘটনা না বলে, ব্রিটেনে সেন্সরশিপের পরিবর্তিত সামাজিক ও আইনি পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা বেশি যথাযথ।

Fanny Hill নানা কারণে বিশ্বসাহিত্যে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, বইটি প্রকাশনা ও সেন্সরশিপের দীর্ঘ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কে বইটি বারবার আলোচিত হয়েছে। তৃতীয়ত, সাহিত্যে যৌনতার ব্যবহার এবং নারীর আকাঙ্ক্ষার উপস্থাপনা নিয়ে আলোচনায় Fanny Hill একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গ্রন্থ।

Fanny Hill ও Memoirs of a Woman of Pleasure একই গ্রন্থের প্রচলিত ও মূল নাম। জন ক্লিল্যান্ড এই উপন্যাসে শব্দ নির্বাচনে অসাধারণ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। গ্রন্থটির ভাষা ও অলংকার নিয়ে পরবর্তীকালে বিভিন্ন পণ্ডিত আলোচনা করেছেন।

এই Bildungsroman-ধর্মী পাঠে প্রোটাগনিস্ট ফ্যানির চরিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে তিনটি পর্যায়ে—সরল ও নিষ্পাপ চরিত্র, তার পরবর্তী পরীক্ষানিরীক্ষা এবং জীবনের অভিজ্ঞতা। গোটা বইটিতে আছে শব্দের খেলা ও নানা রকম রূপক।

অথচ একসময় এটাও বলা হয়েছিল যে, Fanny শব্দটাই অশ্লীল, যার অর্থ নারী-যৌনাঙ্গ, এবং Hill বলতে mound of Venus বা mons pubis-এর ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক ভিত্তি দুর্বল, কারণ fanny শব্দটি নারী-যৌনাঙ্গ অর্থে ব্যবহারের প্রমাণ ১৮৩০-এর দশক থেকে পাওয়া যায়; ১৮শ শতকের অভিধানে এই অর্থের উল্লেখ ছিল না। ফলে ক্লিল্যান্ড ইচ্ছাকৃতভাবে এই অর্থে নামটি ব্যবহার করেছিলেন—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

শব্দচয়নের ক্ষেত্রে নানা চাতুরি দেখা যায় বইতে। ফ্যালাসের বর্ণনা ও তার প্রতি ফ্যানির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নিয়েও সাহিত্য-সমালোচনায় আলোচনা হয়েছে। ডেভিড ম্যাকক্র্যাকেন দেখিয়েছেন, ফ্যানির অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যালাসকে বর্ণনা করার ভাষাতেও পরিবর্তন আসে।

ফ্যানি হিলের জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যৌনতা, ক্ষমতা, সামাজিক নৈতিকতা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার পারস্পরিক সম্পর্ককে উপন্যাসটি সামনে নিয়ে আসে। এই দিক থেকে জন ক্লিল্যান্ড রচিত Fanny Hill, or Memoirs of a Woman of Pleasure একটি সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

সাহিত্যের বাঁকবদল, ভাষা, জনর-প্যাটার্ন বদল আবশ্যক। একঘেয়ে পরম্পরায় আঘাত করা জরুরি। যেমন ১৭৪৮ সালে, যাকে অনেকে পর্নোগ্রাফি বলে চিহ্নিত করেছিলেন, তা সাহিত্যিক আঙ্গিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হয়ে উঠেছিল। এভাবেই জড়তাকে ধাক্কা দিয়েছেন ভ্যান গঘ, যেমন বোদলেয়ার প্রমুখ। এক্ষেত্রে সাহিত্য কোনও উচ্চ মানে পৌঁছেছে কি না, সেটিই একমাত্র জরুরি নয়; সমসাময়িক সমাজ ও পাঠক তাকে নাও গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু কোনও কোনও রচনা ইতিহাসে পাকা জায়গা করে নেয়।

সাহিত্যে অশ্লীলতার দায়ে কারারুদ্ধ হওয়ার ঘটনা কেবল বিদেশে নয়।

বাংলা সাহিত্যে লেখক মলয় রায়চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা "প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার" কবিতাটি নিয়েও অশ্লীলতার অভিযোগে মামলা হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে হাংরি জেনারেশন-সংক্রান্ত পুলিশি পদক্ষেপের পর ১৯৬৫ সালের ৩ মে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ধারায় চার্জশিট দাখিল হয়। ১৯৬৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক মাসের সরল কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে ১৯৬৭ সালে কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে অব্যাহতি দেয়। সুতরাং শুধু “১৯৬৫ সালে হাজতবাস” বলা পুরো ঘটনাটিকে কিছুটা সরল করে দেয়। এই সূত্রে একথা উল্লেখ করা যায় যে

উনিশ শতকে বাংলায় একসময় প্রকাশিত হতো সস্তার জনপ্রিয় সহজ ভাষার বই, যাকে বলা হতো বটতলার বই। বটতলা মূলত কলকাতার একটি জনপ্রিয় মুদ্রণ ও বই-বাণিজ্য সংস্কৃতির নাম হয়ে উঠেছিল। উনিশ শতকে চিৎপুর-গড়ানহাটা অঞ্চলের আশেপাশে এই মুদ্রণশিল্পের বিকাশ ঘটে।

বটতলার বইয়ের মধ্যে পাতলা চটি বই, পুঁথি, ধর্মীয় বই, পুরাণ, রামায়ণ-মহাভারতের সংস্করণ, পঞ্জিকা, পাঠ্যপুস্তক, নাটক, কবিতা, উপন্যাস, প্রেমকাহিনী এমনকি যৌনতা-নির্ভর রচনাও প্রকাশিত হতো। অর্থাৎ বটতলা সাহিত্যকে শুধু অশ্লীল বা যৌনতামূলক সাহিত্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়; এর বিষয়বৈচিত্র্য ছিল অনেক বিস্তৃত।

সস্তা কাগজ, দ্রুত মুদ্রণ এবং তুলনামূলক কম দামের কারণে বটতলার বই ব্যাপক পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছতে পেরেছিল। এই সাহিত্যকে তৎকালীন উচ্চশিক্ষিত সমাজের একাংশ নিম্নমানের বা ‘স্ট্রিট লিটারেচার’ হিসেবে দেখলেও বাংলা ভাষায় মুদ্রিত বইয়ের প্রসার এবং পাঠাভ্যাস তৈরিতে বটতলা মুদ্রণসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। বটতলা মুদ্রণশিল্পকেও ঔপনিবেশিক বাংলায় জনপ্রিয় পাঠকসমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল তা সাহিত্যিক গবেষণায় জানা যায়।

                   ________

Post a Comment

0 Comments