চোরকাঁটা ~ কাজী লাবণ্য’র গল্প


Chorkanta ~ Kazi Lavanya's story



                    ‘মধুমিতা’ ওরফে ‘মধু’ একটা বুনোফুল। একটা মেঠো পথ, একটা গুবরে পোকা। একটা বুকের জমাট বাতাস। বাতাস ভরা সেই বুক মায়ের নয়, বাবার নয়, বোনের নয়, রক্তের সম্পর্কের কেউ নয়। সেটি ভাইয়ের বউ জোনাকির। জোনাকির চোখের তারার মলিন দর্পনে বিম্বিত হয় এক বিষণ্ন, বিবর্ণ, হা করা মুখ। মধুর ফ্যাকাশে মুখের উপর ডুমো মাছি ভনভন করে। আলোছায়া স্যাঁতসেঁতে জায়গাটায় মশার রাজত্ব। ঠোঁটের পাশে কষ গড়িয়ে পড়ার শুকনো দাগ। নির্মিলিত চোখের চারপাশে ঘন কালি। জটা চুল এলোমেলো। কুঁচকানো জামায় নোংরা ময়লার সাথে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের কালো দাগ। পরনের পাজামা খুলে রাখা হয়েছে। একটা মলিন চাদরে মধুর শরীর ঢাকা।


                   পাঁচদিন আগে, হঠাত করে মধুর গোঙানো আর পেট চেপে ধরে ছটফট করাতে সকলেই সচকিত হয়ে ওঠে। যে কোনো ঘটন, অঘটনে মেথরপল্লীর ছোটবড় অসীম কৌতূহলী মানুষ প্রথমেই গায়ে গা লাগিয়ে জমায়েত হয়। আর পল্লীর সবিতা মাসির কাজ হচ্ছে ধমকে ধামকে এই জমায়েত ভেঙে ভাগিয়ে দেওয়া। 

    দাওয়ার চারপায়ার উপরেই মধু গোঙাতে থাকে আর কাটা পাঁঠার মত তড়পাতে থাকে। দাওয়ার নিচে পাথরের উপর অদ্ভুত অভিব্যক্তিহীন পাথরমুখে বসে থাকে মধুর মা। শুকনো চোখে দৃষ্টিহীন তাকিয়ে থাকে। বিচলিত হয় জোনাকি। সে কোলের ছেলে রেখে দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি শুরু করে। ভয়ে আতংকে, বাড়ি থেকে ছুটে বের হয়ে যায়। কাউকে পেলে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী স্বামী হীরালালকে খবর পাঠাবে। মধুবুকে হাসপাতালে নেওয়া লাগবে মনে হয়। জমাদার শ্বশুরও বাড়িতে নাই।

কাউকে না পেয়ে সে আবার দৌড়ে ঘরে এসে দেখে কষ্টে, যন্ত্রণায় মধু গড়াগড়ি দিচ্ছে আর তার পাজামার তলা রক্তে ভিজে যাচ্ছে। ভয়ে সে শাশুড়িকে ধরে ঝাকাতে থাকে,

                     -অমা! মধু বুর কি হইলো? এত রক্ত ক্যানে মা? প্যাটে এত ব্যাদনা ক্যানে? অর তো সুমায় এলাও হয় নাই! বুবু তো একদম সুস্থ আছিলো! এই মোতোন তো এমনি এমনি হবার কতা না। অমা! তু কতা না কস ক্যান মা!

 

   ওর শাশুড়ি নির্বিকার বসে থাকে, মেয়ের পাশে। নড়েও না কথাও বলে না। একদম হঠাত করে জোনাকির কি যেন মনে হয়। সে এক দৃষ্টিতে মধুর মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর সবিতা মাসির দিকে তাকায়। মাসি আস্তে চোখ নামিয়ে নেয়। সে মাসির কাছে গিয়ে কিছু বলার জন্য মুখ না খুলতেই স্বামী হীরা এসে যায়, কারো কাছে সে খবর শুনেছে। বউ শশব্যস্তে বলে ওঠে,

       -ভ্যান আনছ? মধুবুকে হাসপাতালত নিয়া যাও। সে মরি যাচ্চে, অরে বাঁচাও, অর বাচ্চাটাক বাঁচাও।  

    বউ যতটা ভীত, উদ্বেলিত উল্টোদিকে মা ততটাই নির্লিপ্ত, শীতল। মায়ের চোখের দিকে তাকায় হীরা। ওর মা চোখের ইশারায় জানায় ভ্যান লাগবে না, ব্যস্ত হবার কিছু হয় নাই। হীরা চুপচাপ ঘরে যায় ঘুমন্ত ছেলের কাছে। জোনাকি কিছুক্ষণ একা একাই হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলে বলে একসময় চুপ হয়ে যায়। ওর অসম্ভব কষ্ট হতে থাকে, খারাপ লাগে, তার চেয়ে বেশি লাগে খটকা। মা, মাসি কেউ কিচ্ছু বলছে না ক্যানে? তারা এত নির্লিপ্ত এতো চুপচাপ ক্যানে? সে মধুর কাপড় বদলানোর কথা বললে ওর শাশুড়ি হাত ইশারায় থামিয়ে দেয়।

এভাবেই দিন পেরিয়ে রাতও চলে যায়। জোনাকির মনে নানা প্রশ্ন। কিন্তু সে আপাতত চুপ থাকে। সে আর শাশুড়িকে কিছুই না বলে কেবল স্বামীকে শান্ত স্বরে বলে 

   -দয়া করি ভ্যান ডাকো, মধুবু মরি যাওচে, অরে বাঁচাও। সে তোমার বোন, সে কতা কইতে পারে না, বলে সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। বউয়ের কান্নায় কিংবা বোনের মৃত্যু আশংকায় হীরা অতঃপর ভ্যান ডেকে আনে। বউয়ের চেষ্টায় ধরাধরি করে মধুকে ভ্যানে তোলা হলে জোনাকি শাশুড়িকে বলে,

    -ছাওয়ালক দ্যাকেন। আমি হাসপাতালত যাই। 

বেড খালি না থাকায় ওয়ার্ডের মেঝেতে মধুর ঠাই হয়। হীরার দৌড়াদৌড়ি, জোনাকির কান্নায় কিছু আয়া নার্সের সহযোগিতায় একজন ডাক্তার দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। আর দ্রুত ব্লাড যোগাড় করতে বলেন। একথা শুনে জোনাকি জোরের সাথে বলে ওঠে, 

   -আমার রক্ত নেন। হীরাও এগিয়ে আসে। নার্সকে ওদের ব্লাড ক্রস ম্যাচিঙের কথা বলে ডাক্তার চলে যান।  

বাড়িতে থাকতেই, রক্তের সাথে সাথে মধুর গর্ভের সন্তানও চলে গেছে। কিন্তু রক্তপাত বন্ধ হচ্ছে না। হীরার সাথে মধুর রক্তের গ্রুপ মিলে যায় এবং একব্যাগ রক্ত মধুকে দেওয়া হয়। 

এরমধ্যে জোনাকি বাড়ি গিয়ে ছেলেকে দেখে, নিজে খেয়ে মধুর জন্য একটু রুটি আর নিজের জমানো ক’টা টাকা সাথে নিয়ে হাসপাতালে আসে। সাথে ওর শাশুড়িও আসে। তার নির্লিপ্ত, গা ছাড়া আচরণ জোনাকিকে ক্রমশ আরো বেশি সন্দিহান এবং রাগান্বিত করে তুলছে।  


      চারপাশে এই যে এত এত আকর্ষণ, মনোহরণ, অপার মুগ্ধতা হীরককুচির মতো ছড়িয়ে থাকে, যে অস্তাচলের যাত্রী একমাত্র সেই বোঝে এসব ছেড়ে যাওয়া কতটা অবিশ্বাস্য বেদনার! হোক না সে জীবন স্থবির, হোক না গুঙা, লুলা, তবুও জীবন। 

নীল আকাশ, সবুজ পৃথিবীর মায়া বড়ো অদ্ভুত। কিছুতেই বেঁচে থাকার আশ মেটে না। সকলেই বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকার সাধ হাজার বছরের সাধ। 


   সেই হাজার বছরের সাধে মধুও জানটাকে খিমচে ধরে শ্বাস টানে, ফুসফুস ভরায়। অন্তহীন লড়াইয়ে বাতাসটাকে ধরে রাখে ফুসফুসের বায়ুথলিতে। কিছুতেই সে এই বাতাসকে শেষ বিদায় দিতে চায় না। বাতাস! তুমি থাকো, থাকো আমার বুকের ভেতর, থাকো আমার শ্বাস প্রশ্বাসে। পৃথিবীতে কত বাতাস! আর এখন মধুর জন্য একটু বাতাস নেই কেন! বহুকষ্টে নেতিয়ে পড়া মাথাটা কিঞ্চিৎ উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করে কে হেঁটে যায় এই পরাজিত সন্ধ্যায়। কে হাওয়া বিলায় তার বায়ুথলি ভরে রাখার যুদ্ধে। কে তার লড়াইয়ে অফুরান রসদ যুগিয়ে যায়! 

দেখে মায়ের মুখ পাথরের মত ঠাণ্ডা, খরখরে চোখ। সেখানে সে দৃষ্টি রাখতে পারে না। চোখের তারা ঘোরে, ডানে বামে খোঁজে, স্থির হয় এক মায়া আদ্র ব্যাকুল মুখে। কী অপরূপ সেই মুখ। কী দরদ সেই মুখে, সমুদ্র সমান দরদ। সে কি দেখে! মায়া! ভালোবাসা! নাকি অক্সিজেন! ফুসফুসের তৃষ্ণা মেটাতে সে আরো জোরে অক্সিজেন টানতে আপ্রাণ চেষ্টা করে।

 

   অতঃপর পাঁচদিন পরে মধুর ছুটি মেলে। দেহের খাঁচা ছেড়ে পাখি উড়াল দেয় অজানার পানে। কেমন অজানা? যা কেউ জানে না। কি পাখি সেটাও কেউ জানে না। এই পাখি পারস্যের মিথানুসারে কি সিমুর্গ! যে দেখতে ময়ুরের মত, কখনও তার মাথাটি কুকুরের মত, তার পালক পিতল রঙের এবং পায়ে সিংহের নখর। কিন্তু সে খুবই দয়ালু প্রকৃতির। নাকি হুপো! নাকি ফিনিক্স! যে হাজার বছর বাঁচার পরে নিজের চারপাশে পাতা জড়ো করে ডানা ঝাপটিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, আর সেই ছাই ভস্ম থেকে জন্ম হয় নতুন ফিনিক্সের। 

কিংবা সে ছোট্ট পাখি চড়ুই। হুপো নয়, ফিনিক্স নয়, মধু হয়তো চড়ুই-ই। জগতের মাটিতে মিশে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উর্বরতা ছাড়া ওর করার কিইবা ছিল।  

 

শেষ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী মেয়েটি জীবনের সাথে লড়াই করে হেরে যায়। অন্তিম মুহূর্তে মা নয়, বাবা নয়, ভাইবোন কেউ নয়, ভাইয়ের বউয়ের মায়াবী মুখে ওর জন্য গভীর ভালোবাসা দেখতে দেখতে, ওর হাতটি ধরেই মেয়েটি হারিয়ে যায়।

   আদতে কি হারায়! কোনো না কোনো জায়গায়, কারো না কারো বুকের কোণে থেকে যায় একটি বিন্দু হয়ে। জোনাকির বুকে এক জ্বলন্ত অনির্বাণ শিখা হয়ে থাকে মধু, মধুবু। 


    বাড়িতে আনার পর মেথরপল্লীর মানুষ যখন নিষ্প্রাণ মধুকে নিয়ে ব্যস্ত, সেই শোরগোলের মাঝে সন্তান কোলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় পৃথিবীতে মধুর একমাত্র বন্ধু, অভিমানী, ক্রুদ্ধ জোনাকি।  

জোনাকি জানতে পেরেছে, গাছের শেকড় দিয়ে অবিবাহিতা প্রতিবন্ধী মেয়ে মধুর গর্ভপাত ঘটিয়েছে ওর নিজের মা। আর এতেই প্রাণ দিয়েছে বোবা মেয়েটা। 

জোনাকি চেয়েছিল অবিবাহিতা, প্রতিবন্ধী মায়ের বাচ্চাটা পৃথিবীতে আসুক।   


Post a Comment

0 Comments