রফিকুল নাজিম এর দুর্বোধ্য শিলালিপি ও অন্যান্য ৫টি কবিতা

Rafiqul Nazim's illegible inscription and 5 other poems




দুর্বোধ্য শিলালিপি

একদিন তোমাকে সুখপাঠ্য মনে হয়েছিল আমার
মনে হয়েছিল তুমি খুবই সহজবোধ্য আনন্দপাঠ,
তোমার চোখমুখ ঠোঁট দেখে মনে হয়েছিল তুমি বাল্যশিক্ষা
আদর্শলিপির অ আ ক খ এর মত প্রাথমিক প্রাথমিক ব্যাপার!
একদিন তোমাকে সরল বাক্যের মত সহজ ও সাবলীল মনে হয়েছিল
অথচ তোমাকে পড়তে গিয়ে আমার মনে হলো তুমি যৌগিক বাক্য
ইদানিং বোধগম্যতার স্তরে তোমাকে মনে হয়- তুমি জটিল বাক্য!

তাই তোমাকে আমার পড়া হয়ে উঠেই না
তোমাকে আর আত্মস্থ করা হয়ে উঠে না আমার
আমার কাছে কখনো কখনো তোমাকে মনে হয়
তুমি কোনো প্রাচীন সভ্যতার অমূল্য নিদর্শন- দুর্বোধ্য এক শিলালিপি!




খোকা, তুই এখনো ছোট-ই রয়ে গেলি


গঙ্গার প্রবাহমান ঘোলাজলের সাথে আমি বড় হতে থাকি
আমি বড় হতে থাকি শীত আর বসন্তের বাড়াবাড়িতে
আমি বড় হতে হতে একদিন নিজেকে পাহাড় মনে করি
তারপর একদিন বাইরে কালোমেঘের লম্ফঝম্প দেখে
মেঘে মেঘে বিজলি দেখে যখন আমি আঁতকে উঠি
তখন মা আমাকে সযতনে বুকে টেনে নেন
আঁচল দিয়ে আমার চোখমুখ ঢেকে দিয়ে বলেন,
'খোকা, তুই এখনো ছোট-ই রয়ে গেলি!'

তারপর মেঘ কেটে গেলে ঝলমলে রোদ উঠে আকাশে
গঙ্গার ঘোলাজল বয়ে যায় সূর্য়ের উদয়-অস্ত গুনে গুনে
আমিও ক্রমশঃ আবার বড় হতে থাকি
আমি বড় হতে থাকি প্রিয় মানুষের কাছে; পৃথিবীর কাছে।
আবার কঙ্কাল ডালে নতুন নতুন পাতা গজায়- ফুল ফুটে,
চক্রাকারে ঋতু হেঁটে যায় আরেক ঋতুর কাছে
আমিও চাঁদের সাথে জোয়ার-ভাটা খেলে বড় হতে থাকি
অথচ মা আমাকে কোলে তুলে চুমু খেয়ে বলেন,
'খোকা, তুই এখনো ছোট-ই রয়ে গেলি!'



মা-বাবা চলে গেলে


মা চলে গেলে ঘরের চৌকাঠ কাঁদে
বেঘোরে কাঁদে শোবার ঘর এলোমেলো বিছানাপত্র
রান্নাঘরের চেলাকাঠ হাঁড়িপাতিল থালাবাটি,
মা চলে গেলে ঘরময় হেঁটে বেড়ায় প্রগাঢ় এক শূন্যতা।

অথচ বাবা চলে গেলে অরণ্য উজাড় হয়ে যায়
খরতাপে পুড়ে পুড়ে ধূসর হয়ে যায় সবুজ ঘাস
পিচ্ছিল হয়ে যায় চেনাজানা পথঘাট
বাবা চলে গেলে ঘরের চৌকাঠ থেকে তাবৎ পৃথিবী কাঁদে।



প্রেম কেবলই এক বেদনার নাম


একদিন এক গণক ঠাকুর আমাকে বলেছিলেন,
যেদিন আমি তোমার অন্দরমহলে পৌঁছে যাবো ঠিকঠাক
যেদিন আমি নিরঙ্কুশভাবে তোমাকে আমার অধিকারে নেবো,
সেদিন নাকি আমার চরণে এসে চুমু খাবে সুখের পাখি
আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে নাকি পেতেও পারি স্বর্গের ঠিকানা।
অথচ আমার সর্বস্ব দিয়ে আমি তোমাতে ডুব দিয়ে দেখেছি
প্রেম তুমি কেবলই এক বেদনা!




বিচ্ছেদ 


আমারে তুমি বিচ্ছেদ দিবা!

আচ্ছা- বিচ্ছেদ খায়; না মাথায় দেয়?

আমি বিচ্ছেদরে সামনে পাইলে চটকনা মারি

বিচ্ছেদের কানের নিচে মারি টপাস টপাস 

ফ্লায়িং কিক্ মারি তার বুকে

উষ্টাইতে উষ্টাইতে আবর্জনার ভাগাড়ে ফালাই।


তবুও বিচ্ছেদ আমারে ছাড়ে না

বেহায়ার মতন আমার পাশে ছায়া হইয়া থাকে

মিহি বিরহবোধের সুড়সুড়ি দিতে চায় আমার বুকে

অথচ আমি বিচ্ছেদরে কখনোই লই না।

বিচ্ছেদের কপালে ঘুষি দিতে দিতে দেখি

আমার প্রাক্তন বিচ্ছেদটা শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে

প্রকাণ্ড এক বৃক্ষ হয়ে গেছে....

বিচ্ছেদ-বৃক্ষ বেদনা গিলে গিলে 

দেদারসে প্রকাণ্ড থেকে প্রকাণ্ডতর হচ্ছে....





রফিকুল নাজিম

জন্ম ১৯৮৬ সালে। নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলায়। শীতলক্ষ্যার স্বচ্ছ জলে কেটে দুরন্ত শৈশব। প্রকৃতির কোলেপিঠে বড় হয়েছেন। একান্নবর্তী পরিবারের স্নেহ মায়ায় কেটেছে ছেলেবেলা। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে জাতীয় পত্রিকায় লিখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন  এ পর্যন্ত কবির দু'টো কাব্যগ্রন্থ 'খড়ের মানুষ, ২০১৯' ও 'সুইসাইড নোট প্রেমপত্র হোক, ২০২০' প্রকাশিত হয়েছে।


রফিকুল নাজিম এর আরো কবিতা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Post a Comment

0 Comments