রত্না মাহমুদা গদ্য~ মাসুদুল হকের লজ্জা ও বোতামের কবিতায় জীবন-প্রকৃতি

Ratna Mahmuda Prose~ “The Nature of Life in Poet Masudul Haque's Poetry o





বাংলা সাহিত্যের  কবিতার নন্দনতত্ত্বের গবেষক ড.মাসুদুল হকের জন্মদিন ছিল ৩ জানুয়ারি। নানা মানুষ তাঁকে শুভকামনা ও জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে একটু অন্যভাবে মাসুুদুল হক স্যারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই! সে প্রত্যাশা থেকেই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য সব্যসাচী লেখকদের মধ্যে মাসুদুল হক অন্যতম। মাসুদুল হকের এই পর্যন্ত সর্বমোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ত্রিশটি। কবি হিসেবে মাসদুল হক কেমন? কলকাতা বইমেলা ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘লজ্জা ও বোতামের কবিতা’ - কাব্যগ্রন্থটি শব্দ রং হাউস, পূর্ব মেদিনীপুর থেকে প্রকাশ করা হয়।
‘লজ্জা ও বোতামের কবিতা’- কাব্যগ্রন্থে সর্বমোট ৫৩ টি কবিতা রয়েছে। কবিতায় মানুষ-প্রকৃতি-পশুপাখি ও নান্দনিক পৃথিবীর দারুণ সব শব্দ খুঁজে পাওয়া যায়। কাব্যের প্রথম কবিতাটি হাই সুন্দরবনে কবি বলেছেন-

“কেবল সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে 
গাঢ় অন্ধকারের বুক চিরে বেরিয়ে আসবে 
পারমাণবিক আলো!
যেখানে একদিন দাপিয়ে বেড়াতো
 আমাদের 
জাতীয় পশু প্রতীকের বাস্তব অস্তিত্ব!”
পৃঃ৯

সুন্দরবন রক্ষার নিবেদনে কবি ‘হায় সুন্দরবন’ কবিতাটি রচনা করেছেন। এই কবিতায় সুন্দরবনের পশুপাখি ও বন উজাড় করার অনিয়মের প্রতি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কারণ বাংলাদেশের দুর্যোগ  থেকে রক্ষা করার জন্য- সুন্দরবন আমাদের সবসময় প্রতিরক্ষা করে। বাংলাদেশের মানুষের সুন্দরবনকে রক্ষা করা নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। বসন্ত সবশেষ ঋতু। বসন্তকে ঋতুরাজও বলা হয়। বসন্তের আগমনী বার্তা বইয়ে আনে মানবমনে প্রকৃতি প্রেমের অপরূপ সৌন্দর্য অনুভূতি। কারণ বসন্তকালে সবচেয়ে বেশি ফুল ফোটে।  ফুলের সুভাসে মুখরিত হয় সাধারণ মানুষ। কবি তো তাই ‘তবুও বসন্ত’- রচনা করেন। তবুও  বসন্ত কবিতায়-

“বসন্ত, প্রেম, প্রকৃতি........ সনাতন যা ছিল সবই গেছে! 
শুধু দেখি আমাদের অবশিষ্ট অলস দুপুরে 
একটা পোস্ট -বাক্স বন্ধ জানালায় ঘুমিয়ে পড়েছে 
ইচ্ছে হয় তাকে বলি এবার আমার বার্তা দাও!” পৃঃ১১

বসন্ত যেমন ফিরে ফিরে আসে, মানুষের জীবনে ও আমাদের দেশে। তেমন করে কবি জীবনেও বসন্ত আসুক। মানুষের জীবনে বসন্ত আসুক। বসন্তের আগমন বার্তা- ফুলের সুভাস- প্রকৃতির নবনবরূপ-  মানুষকে মুগ্ধ করে। মানুষের মনে  রং দোলা দেয়। বসন্তের দীর্ঘশ্বাস কবিকে অবরুদ্ধ করে তুলে। কবিরে প্রত্যাশা- প্রাপ্তির মন খারাপে ‘তবুও বসন্ত’ কবিতা। 

চন্দননগর একটা গ্রাম চন্দননগরে চন্দন বন রয়েছে। ছিটাও চিল নির্বাসনে গাছে গাছে লেপ্টে আছে মানুষের গন্ধ। পাখির কলরব বন্ধ থেমে গেছে! প্রকৃতির বিলীনতা চন্দননগর কে নগ্ন করে তুলেছে! তাই কবি বলেছেন-

“প্রকৃতির এমন অস্বেচ্ছাকৃত রূপান্তরে 
মনে হয় এ বন্যায় চন্দননগরে!”-পৃঃ১২

‘ভবের বাজার’ কবিতায়:
সারস জানেনা তবু আগামীকাল ও যাবে
মানুষেভরা  বের বাজারে! পৃঃ১৪

কবি ও কাব্যচর্চা অনেকটা সমুদ্রের মতই। কবি ও সমুদ্র- শব্দ দুটো যেন পারস্পরিক সম্পর্কে গাঁথা। কবি যেমন কাব্য সাধনা করে- কোনো কূলকিনারা পায়না! ঠিক তেমনি সমুদ্র প্রকৃতিকে শুধু দিয়ে যায়- মানুষের কল্যাণে- নিজেকে নিবেদিত রাখে- সমুদ্রের ঢেউ, উত্থান-পতন সবকিছুই যেন মানুষের সঙ্গে জড়িত। সমুদ্রের ঢেউয়ে কেউ বিলীন হয়- কেউ ভেসে বেড়ায় আবার সমুদ্রের ঢেউ এর মতই কবিকে কবিতার তরঙ্গের সাথে খেলা করে। ঢেউয়ের সঙ্গেই শব্দতরঙ্গ অভিমানে অনুরণন ঘটায়।

‘‘কবি ডুবে যাচ্ছে সমুদ্রে 
সৈকতে কতিপয় বালিকা। 
বেলুন খেলায় মগ্ন! 
নীল জলে ভরা সমুদ্র 
ছুটে আসছে হাঙর..... 

জন্মবধীর চিৎকারে কবি
 বাঁচতে চায়! 
পাখিরা উড়তে থাকে 
দিগ্বিদিক 
হঠাৎ হাইড্রেন্টের জল কমে এলে কবি সমুদ্র থেকে উঠে দাঁড়ায়! "
পৃঃ১৫

কবি বিকেল কিনবা তুমি কবিতায় বিকেলের এক দারুণ সংজ্ঞা দিয়েছেন। 

“বিকেল একটা মুহূর্ত 
বিকেল একটা স্থান 
বিকেলে একটা বয়স 
বিকেলে একটা স্বপ্ন 

অথচ বিকেলের মুখোশ খুলে বসে আছো তুমি 
স্নিগ্ধমুখী আসলে তুমি বিকেল!” পৃঃ১৬

মানবজীবন বিকেল রয়ে যায়- ক্ষয়ে যায় জীবনের স্বাদ। বিকেলের গভীরে লুকিয়ে থাকে সময়-স্থান-বয়স ও মানুষের স্বপ্ন। সূর্যের অপেক্ষায় বিকেল জন্য এক ক্লান্ত পথিক। লাল সূর্য বাড়ি যাবে আঁধারে ঢেকে যাবে মানুষের দিনযাত্রা।

‘মুখ ও মুখোশ’ কবিতায় কবি বলেছেন:

“মুখ আমি আর আমার ব্যক্তিত্ব 
তাই আমি মুখোশকে বলি আমার আমি

ধীরে ধীরে মুখোশ থেকে আমার আমি
 তোমাদের কাছে অস্তিত্ব পেয়েছে 

এখন লক্ষ্য করছি এই মুখোশটাযই আমাকে চালায় আমার মুখ মরে গেছে অনেক আগে।” পৃঃ৪০

মানুষের মুখ ও মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ব্যক্তিগত গুণাবলি। যা মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে তুলে।কবির মুখ মরে গেছে অনেক অনেক আগেই।কিন্তু মুখোশটাই রয়ে গেছে! প্রকৃত মানব আত্মা লুকিয়ে থাকে মুখেই। 
‘নারী ও নদী’ কবিতায় নারীকে চিহ্নিত করেছেন:

“বাহান্ন তীর্থের শরীর খুলে 
সূর্যমুখী চোখ হয় নাই বিছিয়ে নিলেই
 নারী দেখতে পায়ে জল। " পৃঃ৪৪

নদীকে কবি সংজ্ঞায়িত করেছেন:

“পারদের রঙে ভিজে থাকা শরীর দেখে 
বুঝে যায় সেমনিজেই নদী। 
কতােশত নদীর মুখ 
এক নদীতে বাতাস ঢুকি;
 অন্য নদীতে জল
জোয়ার-ভাটার  রাতে মধ্য নদীতে 
রক্ত গড়িয়ে পড়ে 

ঋতু জুড়ে শরীরের চরে  জমা হচ্ছে
 বালি, মাটি, নুড়ি আর  পাথর!” পৃঃ৪৪


বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতায় বলেন_ মোর লাগি করিয়ো না শোক-
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক! 

ঢাকায় জন্ম হওয়া কবি মাসুদুল হকের বর্তমানে বসবাস দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জে। তিনি বীরগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত। ঢাকার ছেলে হয়েও নিজেকে প্রকৃতির রূপ-রস ও গন্ধের সাথে মিশে গেছেন। গ্রামীণ জনজীবন হয়ে উঠেছে তাঁর কাব্যস্রষ্টার পাথেয়।জন্মদিন ফিরে ফিরে আসুক আপনার জীবনে! 

২৮ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসে আমার ঠিকানায় কাব্যগ্রন্থটি পাঠান কবি মাসুদুল হক। যদিও কাব্যটি আমি তার কাছ থেকে চেয়ে এনেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংযুক্ত থাকায় আমি দেখি প্রতিনিয়ত তার কবিতা বিদেশের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। সে লোভ  সামলাতে না পেরে আমার কাছে মনে হয়েছে তার কোন এক কাব্যগ্রন্থকে আমি রিভিউ করি। সে আগ্রহ থেকে রিভিউ করা। আমার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রায় সবগুলো গবেষণা জার্নালে ড.মাসুদুল হকের পিএইচডি গবেষণা গ্রন্থ বাংলাদেশের কবিতায় নন্দনতত্ত্ব বইটি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করি। নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করেছিলেন যিনি আমাদের কবিতা পড়াতেন।তিনি আমার প্রণম্য অগ্রজ শিক্ষক ড.কৃষ্ণা ভদ্র ম্যাম।কবিতার ছন্দ-অলংকার-শব্দ ব্যবহার সম্পর্কে আমি অজ্ঞ। তবুও পীর কাব্য নিবেদনের ভাষা কারো কাজ প্রেম মানব জীবনের অস্তিত্বকে কিছুটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি মাত্র। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কবি মাসুদুল হকের কবিতা তাইওয়ানিজ, চীনা, নেপালি, আজারবাইজানিজ, তার্কি, রেমানিয়ান, আরবি, ইতালীয়, অসমীয় ও স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি ইংল্যান্ডের The poet পত্রিকা কর্তৃক International  poet of the week"- এ ভূষিত হয়েছেন। এছাড়াও বাংলাদেশের বহু পুরস্কাকারে তিনি ভূষিত হন। তারমধ্যে ২০১৩ সালে ‘চিহ্ন পুরস্কার’, ২০১১ সালে বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার, ২০১৪ সালে জেলা শিল্পকলা নিজন সম্মাননা অর্জন করেন।



রত্না মাহমুদা 
কবি ও গবেষক 
০৪.০৫.২০২৪

Post a Comment

0 Comments