রোখসানা ইয়াসমিন মণি’র গল্প ~ সেগুনের ভেতর লাল

The story of Rokhsana Yasmin Mani ~ red in the teak



দূর্বোধ্যতা ঠেকলে কোথাও দাঁড়ানো মুশকিল হয়ে ওঠে ।এমন যে সহজ হওয়ার অবকাশ থাকে না।দূর্বোধ্যতা হঠাৎ হয় না।পূর্বেকার জীবনের গতিপ্রকৃতি ভবিষ্যতের রাস্তা তৈরী করে।চলার ছন্দে যদি তাল হারায় লয় কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।মানুষ নিজের ভেতর দ্বিধাবিভক্ত হয়ে নিজেকেই কাটে। রক্তমাখা হৃদয় নিয়ে অন্য কোথাও দাঁড়াতে চায়। দুঃখ আগুনের। ওই আগুন নিংড়ে জল খোঁজে
বাঁচার জন্যে।বুকের ভেতরেই থাকে জল। জলটুকু না থাকলে মানুষ আয়ুর আগেই মরে যেতো। মানুষ বাঁচে তবে নিজের কাছে নয়। আর কেউ তাকে বাঁচায়। আবার মেরেও ফেলে। যেমন বেঁচে আছে লিলিথ।আমাদের মাঝেই। কীভাবে?
 অদ্ভুত জীবন লিলিথের। মেয়েটাকে বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ওর কোথাও দূর্ঘটনা বা আঘাত  আছে। কাঠিন্যের প্রলেপে ছাঁচা বহিরাবরণ । মায়াবি নীল চোখে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। ওখানে গভীর ক্ষত।অসহায়ত্ব ফুটে থাকে সবসময়। বুকে লাগে। লিলিথ একটি বেসরকারি ফার্মে চাকুরি করে। ফার্মটি অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান।ওখানকার ম্যানেজার সে। অফিস দূরে নয়। বাসা থেকে হাঁটা পথ। দশ মিনিটের।রাস্তাটা এখনো ডেভলপ হয়নি। পাকা রাস্তার চারিদিকে গাছগাছালি ভরা। পাশে বিস্তৃত মাঠ। মাঠের ওপারেই জঙ্গল আর ঝোঁপঝাড়। ঝোঁপ ঘেঁষে বয়ে গেছে একটি নদী। নদীটাকে স্থানীয়রা ডাকে সারল্য নদী। সাধারণত নদী আঁকাবাঁকা হয়। অদ্ভুত হলেও সত্যি এই নদী প্রায় দশ কিলোমিটার পর্যন্ত  সোজা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতির পৃষ্ঠার ওপর কে যেনো স্কেল দিয়ে সোজা জলছাপের মার্জিন টেনে দিয়েছে। লিখতে না জানা কোনো ছাত্র  ওটার ওপর সঠিক মাত্রা বসিয়ে লিখে নেবে প্রথম পাঠ। অদ্ভুত সুন্দর। লিলিথ এখানে প্রতিদিন আসে। কথা বলে নদীর সাথে। সব তার পরিচিত। আজও এসেছে। সারল্য নদীর পাড়ে বসে আছে। আশেপাশে কেউ নেই। থাকলে জায়গা পরিবর্তন করে। নদীর বুকে বয়ে যায় কচুরিপানার দল। একটার পেছনে আরেকটা। সে কথা বলে ওঠে।
নদীরে, এত বয়ে কই যাস? পানাগুলো তোর তাণ্ডবে ব্যথা পাচ্ছে। এগুলোরে কই নিয়ে যাবি?
নদীর কি মুখ আছে যে কথা বলতে পারবে? তবে ভাষা আছে। সে ভাষা লিলিথ বুঝতে পারে। বুঝতে পেরে বলে, ও বুঝেছি, তোর খুব স্রোত হয়েছে তাই না? কচুরিপানার মতো আমাকে নিয়ে যাবি? যেখানে খুশি  ফেলে দিয়ে আয়। দেখ, আমার চেয়েও কচুরিপানা কত মূল্যবান। তোর জল পাচ্ছে, বুক পাচ্ছে। আমি শুধু মাটিই পেলাম। সে আমাকে কোথাও নিতে পারে না। আমাকেই ওর ওপর হাঁটতে হয়। 
রাতের বেলা লিলিথ স্বপ্ন দেখে। মূলত স্বপ্নই ওকে গতি দেয়। সে দেখে সারল্য নদী ওর পাশে শুয়ে আছে। নদী বলছে, বিকেলে খুব ডেকেছিলি আমাকে। এমন করে কেউ ডাকে? আমার বুকে জল দেখে কী ভাবিস? রাজা আমি? জলের রাজা? আরে নারে না! আমিতো আকাশের ভার লাঘব করি। জলতো ওই আকাশে। তোদের মাটির অনেক দুঃখ। এত দূঃখ যে ওর বুকটা গভীর খাদ হয়ে গেছে। পৃথিবীর তোরা ওই খাদ দেখলে ভয়ে মরে যাবি। তাই আকাশ জল দান করে খাদ ঢেকে দেয়। তোরা জল দেখিস। কিন্তু জলের নিচটা দেখিস না। সমতলে জল থাকে? কেনো থাকবে? দুঃখ আছে সমতলে? দুঃখহীন জীবন সমতলের মতো। দুঃখ গর্ত তৈরী করে। ওখানে তুই পড়ে গেছিস। আয় তোকেও ঢেকে দিই। লিলিথ সারল্য নদীর কথায় আরাম পায়। বলে- দাও, ঢেকে দাও আমাকে। লিলিথকে টেনে নেয় সারল্য। ওর জল ঢুকে যায় লিলিথের বুকে।পাঁজরের কোষ ভিজে ওঠে। জল ওর অনুভূতি খুলে দেখে কোথায় লিলিথের গর্ত হয়ে গেছে? হুহু করে জল ওকে ডুবিয়ে নেয়।লিলিথ জলে ডুবে নারী থেকে নদী হয়ে যায়। সরল নদী।নদী দুটি একসময় ফ্ল্যাটে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমানোর আগে সারল্য বলে-
লিলিথ, ভিজেছো?
হ্যাঁ,ভিজেছি।
কেমন লাগছে?
নদী নদী লাগছে।
কেমন করে উঠে এলাম দেখেছো?
কেমন করে এলে?
তুমি ডেকেছো, তাই এসেছি।ডাকলে কী না এসে পারা যায়?
তোমার যন্ত্রণার খাদ জলে ভরিয়ে দিয়েছি।
আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারিনি।
দিয়েছো।
কী?
তোমাকে।
আমাকে?
হ্যাঁ, তুমি পুরোটা আমাকে দিয়ে দিয়েছো। আমি তোমার ভেতর ঢুকে অনেক ক্লান্তি দেখেছি। তোমার ভেতরটা খুব ক্লান্ত লিলিথ! জীবন তোমাকে অনেক ঠকিয়েছে। তোমার হৃদয়টা দেখলাম খুব কাঁদছে। বুকটা দেখলাম ধড়ফড় করছে। কামারশালার হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করছে শ্বাস প্রশ্বাস। ফুসফুসের ভেতর আগুন জ্বলছে। আমার জলতো ভয়ে প্রথমে ওখানে ঢুকতে পারেনি। এত আগুন নিয়ে থাকো কী করে?
কই থাকতে পারি? পারি না বলেই তোমার কাছে দৌড়াই।মানুষের কাছে যাই না। মানুষের কাছে গেলে ওরা আরো আগুন ঢেলে দেয়। কিন্তু তুমি তা করোনি। তুমি দিয়েছো জল। তোমার অনেক জল।
ঠিক বলেছো। মস্তিষ্কে যেতেই দেখি তোমার হাইপোথ্যালামাস বিষন্ন। কত বছর ঘুমাও না লিলিথ?
জানি না। পরিবার আর সমাজ আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলেছে। আমি বাস্তুচ্যূত।
না, তুমি বাস্তুচ্যূত হবে কেনো? আমি তোমাকে নদী বানিয়ে দিয়েছি। তুমি এবার বইতে থাকবে। তোমার মস্তিস্কে আমি জলের ঠান্ডা প্রবাহ পাঠিয়ে দিয়েছি। ওরা তোমাকে শীতল করছে। এসো ঘুমিয়ে পড়ি।
সারল্য নদী লিলিথকে জড়িয়ে আছে। জলের ভেতর শরীর লুকিয়ে লিলিথ ঘুমিয়ে আছে। দুই নদী সরল রেখার মতো বয়ে চলে আগুন হৃদয়ে।

পরদিন অফিসে যায় লিলিথ। সারারাত সারল্যের আলিঙ্গনে সে বুঁদ হয়ে আছে। সে মূলত স্বপ্ন আর প্রকৃতিতে বুঁদ হয়ে থাকে। মানুষ যখন তার প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে প্রবঞ্চনা, লাঞ্ছনা আর গঞ্জনায় লীন হয়ে যায় তখন নিরুপায় জীবন তাকে প্রকৃতিপ্রেমিক করে তোলে। মানুষ মূলত প্রকৃতিজাত প্রেমিক। লিলিথ হাঁটে।প্রতিটি পদক্ষেপে মাটিকে অনুভব করে। মাটির সাথে পায়ের প্রেম। পা আছে বলেই মাটি ছুঁতে পায়। প্রেমটা বুঝেছে আজ থেকে পাঁচ বছর আগে অর্নবকে প্রাণপনে ভালোবেসে। বিয়েও করেছে দুজন। তারপর ওর বদলে যাওয়া পরকীয়ায় আসক্ত অর্নব লিলিথকে দিনরাত টর্চার করে। মা- বাবার অমতে  বিয়ে করা লিলিথের কোথাও আর জায়গা হলো না। ওর দুঃখের কথা কেউ শুনতে চাইলো না। পরিবারের সবাই একে একে মুখ ফিরিয়ে নিলো। দাঁড়াবার জায়গা হলো না কোথাও। সেই মেয়ে মনের দুঃখে মরতে চাইলো। সংসারে মেয়েদের জায়গা না হলে মাটিতে টিকে থাকা কঠিন। লিলিথ খুব বাঁচতে চাইতো। প্রথম প্রথম বেদনার কথা দু' চারজন কাছের মানুষকে বলতো। শুনে  ওরা হা- পিত্যেস করতো আর বলত, তোমার বড়লোক মা-বাবার কাছে চলে যাও। এখানে কেনো বাপু? আমরা শুনে কি প্রতিকার করতে পারবো? নিজের ভাবনাকে  অন্যের কাছে প্রকাশ করে একটি বান্ধব কোথাও পায়নি লিলিথ। কেঁদেছে অনেক। একটি প্রেমের জন্য আত্মীয়, অনাত্মীয় থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাওয়া লিলিথ নিজের ভালো মন্দ সব দুঃখের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। যার জন্য সব ছেড়েছে সে হয়েছে পর। তাহলে আপন কে হবে? বুকের কাছে যখন কেউ রইলো না, পরাণটা যখন খালিই হয়ে গেলো তখন সে একা একা কাঁদত আর আপনমনে কথা বলতো। ও কথা বলতো গাছের সাথে, মাটির সাথে। মাঝে মাঝে ঝগড়াও করতো। চিৎকার করে উঠতো। এই আমলকি গাছ! তোর সামনে যে আমি কাঁদছি আমার চোখ একটু ছু্ঁয়ে দিতে পারিস না!অর্নব যে আমাকে এত যাতনা দিচ্ছে তোর নিচ দিয়েইতো যায়। একটি ডাল ওর মাথার ওপর ফেলে দিতে পারিস না? কীরে আমি কার কাছে দুঃখ জানাবো? এই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছি না। সে যে মেয়েটির প্রেমে পড়েছে তাকে নাকি বিয়ে করবে! আমাকে চলে যেতে বলেছে। কই যাবো আমি, বল! আমলকি গাছের ডাল নড়ে ওঠে। কিছু একটা বলতে চায় লিলিথ বোঝে না। গাছের ভাষা কেমন হয় বুঝবে কী করে?
বুকের ভেতর আগুন জ্বলে। ধিকিধিকি আগুন। ভালোবাসার প্রত্যাখ্যান, প্রতারণায় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।একদিন অর্নব সেই মেয়েটিকে বিয়ে করে আনে। ব্যথাতুর বুক নিয়ে সারারাত বাইরে পড়ে থাকে লিলিথ।কাঁদতে কাঁদতে মাটির ওপর ঘুমিয়ে পড়ে। ভেতরে অর্নবের বাসরশয্যা, বাইরে মাটির ওপর হামাগুড়ি দিয়ে কেটেছে একটি মেয়ের দীঘল রাত। বড় কষ্টের সে রাত বড় নির্মম। অসহায়ত্ব ঘিরে ধরে ওকে। জীবনের কঠিন ভুলের প্রায়শ্চিত্ত  কি হামাগুড়ি দিয়ে কাটানো যায়? ভোরের আলো চোখে এসে পড়লে লিলিথ জেগে ওঠে। তখনও অর্নবেরা দরজা খুলেনি। সে কি সারারাত বাইরে ছিলো? এই মাটির বিছানায়? সবাই তাকে ফেলে গেলেও এই মাটি করুণা করেছে। মাটি বলেনি তোর ভার বয়ে নিতে পারবো না। সবাই স্থান পরিবর্তন করে। এখানে না সেখানে দৌড়ায়। মাটি? সে যাবে কই? তাকে নিয়ে যায় কার এত সাহস! নাকি সাধ্য আছে? মাটির কাছে পড়ে থাকা লিলিথ মাটি থেকে বিদায় নিয়ে  চলে আসে শহরে। ওর একজন বন্ধু কায়েস। একসময় ওর প্রেমপ্রার্থী ছিলো। অর্নবকে ভালোবাসে সেকথা জানতে পেরে সরে আসে। সেই কায়েস ওর ভরসা হয়। জীবন কত বাঁকের। যে মেয়েটি প্রেম করার অপরাধে পরিবার ছাড়া এবং স্বামীর লাম্পট্যের কারণে সংসার ছাড়া হয় সে মেয়ের জন্য আর কোথাও যে উত্তাপ লুকিয়ে ছিলো তা কি লিলিথ জানতো? উত্তাপও ঘুমিয়ে থাকে। অলৌকিক পরশে ঘুম ভাঙে। প্রেমের ভেতরেই প্রেম। লিলিথের ভালোবাসা যখন ফুরালো তখন আর কেউ তারজন্য বসেছিলো। সেই একই প্রেম তবে অন্যরূপে। সব তারার আলো আছে কিন্তু যে তারাটি অধিক উজ্জ্বল তাকে সবাই দেখতে পায়। লিলিথেরও হয়েছে এমন। সব হারিয়ে যখন কায়েসের সাহায্যপ্রার্থী সে তাকে বুকেই টেনে নিলো। লিলিথ নতুন করে চিনে নিলো প্রেম। প্রেম শব্দটি মনের স্থান পরিবর্তন করে দিলো। একটি অপ্রতিরোধ্য কামনা এবং গতি অন্যজীবন চেনালো। ভালোবাসা যায় কোথায়? সব শুনে কায়েস বলে- দুঃখই তোমাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে। এই দুঃখই একদিন আমি পেয়েছিলাম তোমাকে না পেয়ে। তোমার জন্য আমার ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। তুমি আমার মনে যেভাবে ছিলে ঠিক তেমনই আছো। ভালোবাসা কি পরিবর্তন হয় লিলিথ?
হয়...
যার হয়, হয়। আমার হয় না। আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।
অর্নব বাসেনি আমাকে।
সে বাসবে কোত্থেকে?  ভালোবাসতে জানতে হয়।
সত্যিকার অর্থে তুমি যদি কাউকে ভালোবাসো সে ভালোবাসা তোমাকে সুন্দরের পথে নিয়ে যাবে। অসুন্দরে ভালোবাসা নেই। ওটাকে প্রতারণা বলে। সত্যিকারের ভালোবাসার মর্ম যে বুঝতে পারে না তার মত অভাগা পৃথিবীতে নেই।
এভাবেই দুঃসহ দুঃখের ভেতর লিলিথ নতুন করে ভালোবাসার পাঠ নিলো। কায়েস তাকে শেখায়। লিলিথ ভুলে যায় পেছনের দিন। বিয়ে করে ওরা। সুখে যাচ্ছিলো সব। কায়েস চাকুরিতে চলে গেলে একা লিলিথের কিছু ভালো লাগে না। একদিন ওকে বিএ ভর্তি করিয়ে দেয় কায়েস। পাস করার পর একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাইয়ে দেয়। কায়েস বলতো, বাসায় একা থাকবে সেটা হবে না ম্যাডাম! সংসার গোছাব দুজন মিলে। আপনার জন্য চাকুরীর ব্যবস্থা করে এসেছি। তাছাড়া আমার যদি কখনোও কিছু হয় কোথায় দাঁড়াবেন আপনি, বলুন? আপনার পায়ের নিচে শক্ত মাটি দিলাম।আর যেনো খাদে পড়তে না হয়। কিন্তু নিয়তি বলে একটা কথা আছে। সেই নিয়তির দূর্বিপাক টেনে নিলো কায়েসকে। আর পাঁকে ডুবে গেলো লিলিথ। গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু! দূর্ভাগ্য কাকে বলে। এক মহান প্রেমিকের রক্ত চুষে নিলো নিয়তি।মুছে গেলো লিলিথের সুখের সিঁদুর। অর্নব থেকে বিতাড়িত হয়ে ওর এত কষ্ট হয়নি যতটুকু ভেঙ্গে গেছে কায়েসকে হারিয়ে। কায়েসের মৃত্যুর সাথে লিলিথেরও মরণ হলো। সে ভেতরেই মরে গেলো। জীবন চলে শোক করে, কেঁদে। সারল্য নদী জানে লিলিথের ব্যথা। নদীর পাড়ের গাছগুলো দেখে ওর কান্না। মাটি দেখে লিলিথের হাহাকার। লিলিথের যাওয়ার জায়গা থাকে না কোথাও। অর্নবকে ছেড়ে আসার পর কায়েসের কাছে সাহায্য চেয়েছিলো। কায়েস তাকে সাহায্য নয় বরং ভালোবাসার মর্যাদায় জীবনের স্বাদ চিনিয়েছিল লিলিথের প্রতি অনুরাগ জিয়ল মাছের মতো বুকের জলে জিইয়ে রেখেছিলো। বিয়ের পর কায়েস বলেছে, জানো লিলিথ! কোন মেয়েকে যদি ভালোবাসি সে ছিলে তুমি। তোমাকে না পেয়ে মনোবেদনায় ভুগেছি অনেকদিন। এরপর পড়ালেখা চাকুরি এসবে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। পরিবার থেকে চাপ বিয়ে করি না কেনো? আসলে বিয়ের আগ্রহই হারিয়ে ফেলি। প্রথম প্রেম খুব খারাপ লিলিথ। ভালো থাকতে দেয় না। তোমাকে কত চেয়েছি। আজ পেয়েছি। তবে প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেলা শেষে। আমার কোন অভিযোগ নেই। তোমাকে খুব ভালোবাসি! আমাকে গ্রহণ করো লিলিথ। লিলিথ সেদিন হাউমাউ করে খুব কেঁদেছিলো। বুকের সমস্ত হাহাকার কায়েসের বুকে ঢেলে শান্তি চেয়েছিলো। আজ কায়েস নেই ওর জীবনে। লিলিথ সহ্য করতে পারছে না। সে কোথায় যাবে? কার ছায়ায় নিজেকে শীতল করবে? নেই, কোথাও কেউ নেই। চারিদিকে অন্ধকার। লিলিথের রাজা মরে গেছে। তাকে একাকী এক অন্ধকার রাজত্বে রেখে সে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। লিলিথের বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। কায়েসের মৃতুতে ওর আকাশ নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। সে বুকে হাত চালায়। বুকের বেদনাদের খুলে দেখতে চায়। সে অনুভব করে ওর অঙ্গ প্রতঙ্গ অভিশপ্ত। ক্ষতগুলো ওকে নিয়ে পরিহাস করে। কী ভয়ংকর! সে নিজেকে লুকাতে চায়, কোথায় লুকাবে? ওর মলিন মুখে যন্ত্রণা প্রকাশিত। সমস্ত বিষাদে ছেয়ে গেলে অস্তাচলে পা বাড়ায়। দিনের শেষ আলোরেখা দেখা যায় নদীর বুকে। ওখানে যাওয়ার জন্য ওঠে।যেতে যেতে কাঁদে। কান্না সামলাতে না পেরে মাটির ওপর বসে পড়ে। সেখানেই বিলাপ জুড়ে দেয়। শোকের গান গাইতে থাকে কায়েসকে স্মরণ করে। জীবনের সেরা স্মৃতি, সেরা সুখ হারিয়ে কাঙাল। শোকের তীব্রতা ওকে এলেমেলো করে দেয়। দূরে নদী তটে তাকায়। স্রোতময় নদীর কলকল ভেসে আসে। লিলিথের বুকে আর দুঃখ জন্মায় না। দুঃখের শেকড় পুরোটা ওর হৃদয়কে গ্রন্থিত করে নিলে এক অসার অনুভূতি ওকে গিলে ফেলে। বোধ বুদ্ধিহীন হয়ে এলোমেলো হাঁটতে থাকে। বেঘোরে হাঁটতে হাঁটতে সে নদীপথে না গিয়ে ডানে ফিরে। ওখানে ঘনমতো জঙ্গল আর বড় বড় গাছে ভরা। লিলিথের মনে হলো গাছগুলো ওকে ডাকছে।কিছুদূর যেতেই একটি ঝোপের পাশে ফিসফাস শব্দ শুনতে পায়। দেখে তিন চারটি ছেলের জটলা। ছেলেদের দেখে সে পিছু হটে আসে। এরমধ্যে দুটি ছেলে ওকে ধাওয়া করে। লিলিথ দৌড়ায়। পারে না। ক্লান্ত বিষাদিত শরীর নেতিয়ে আসে। পেছন থেকে একটি ছেলে ওড়না টেনে ধরে। লিলিথ পড়ে যায়। বাকী ছেলেরা ছুটে আসে। দুটি ছেলে ওর দুই পা টেনে আরো ঘন জঙ্গলে নিয়ে যায়। হায় জঙ্গল! তুমি এমন কেনো? অপরাধীর অপরাধের জন্যই কি তুমি অভয়াশ্রম? কোথায় বনদেবতা? সে কি একটি দুঃখীর কান্না শুনতে পায় না?ছেলেরা লিলিথকে পেয়ে খুশিতে টগমগ করতে থাকে। এত সুন্দর শিকার এই বনে? একজন ওর মুখ চেপে ধরে। আরেকজন বলে তাড়াতাড়ি শুরু কর। তর সইছে না। লিলিথের স্বর বন্ধ হয়ে আসে। না আসে চিৎকার, না কান্না, না শোক! ভয়ও উধাও হয়ে যায়। সে চেয়ে থাকে। শুধু এতটুকু বোঝে ওর মৃত্যু আসন্ন। চোখ গড়িয়ে জল পড়ে। ছেলেরা শরীর থেকে কাপড় খুলে নেয়। দুইদিকে দুই ছেলে দুটি হাত চেপে ধরে আরেকজন ওর শরীরের ওপর ওঠে। ওরা এসব না করলেও পারতো। কারণ লিলিথ আরো আগেই মরে গেছে। শুধু একটু শ্বাস বাকী ছিলো। একের পর এক ছেলেরা খাবলে খুবলে ছিঁড়ছে ওকে। সমস্ত শরীর রক্তাক্ত হয়ে এলে বনের গাছগুলো কেঁপে ওঠে। গাছের ডালপালা একটা আরেকটাকে আঘাত করতে থাকে।একটার ওপর আরেকটা যেনো আছড়ে পড়বে। বনে ভূমিকম্প আসে। চারদিক অন্ধকারে ছেয়ে যায়। নদীর জল কাঁপতে থাকে। সমস্ত বনের গাছ একটার সাথে আরেকটা আটকে যায়। মোটা একটি সেগুন গাছ শাল গাছের ভেতর ঢুকতে গিয়ে ফেটে যায়। কটকট শব্দ হয় বনে। শব্দের তোরে পাশের অশ্বত্থের ডাল ক্রেনের মতো বেঁকে ঝুঁকে লিলিথের শরীর টেনে ওপরে তোলে। আরেকটি ডালের ধাক্বা খেয়ে লিলিথের শরীর সেগুন গাছের ভেতর ঢুকে পড়ে। লিলিথের শরীর মিলিয়ে যায় সেগুনের বুকে। গাছের ডাল একটার সাথে একটা আঘাতে ভেঙে পড়ার সময় ছেলেগুলোর মাথায় পড়ে। উলঙ্গ, ক্রুর আর লালসার দৃষ্টি চোখে মুখে রেখেই ওদের সেখানে মরণ হয়। নদীর জল পাড় ঠেলে বনে ঢুকে পড়ে। সারল্য নদী শোকে পাগল হয়ে যায়। ওর উন্মাতাল জলে দূরমাঠে খেলতে থাকা ছেলেরা দিগ্বিদিক বনে দৌড়াতে থাকে। চারটি উলঙ্গ ছেলের লাশ দেখে ওরা হতভম্ব। ভাবে বনে সুনামি এসেছে। ছেলেরা একটা আরেকটাকে বলে- দেখ, পোলাগুলো কেমনে মরে পড়ে আছে। আরেকজন বলে- মরলে ন্যাংটা ক্যান? আরেকজন বলে- তাগো কাপড় কই? মাথা দেখ, রক্তে ভাইস্যা গেছে। আরেকজন বলে- থাকগা, চল, ওদের পাতা দিয়া ন্যাংটা জায়গা ঢাইক্যা দিই। ওরা পাতা খোঁজে। বনে সেগুন পাতা পড়ে আছে। অনেক বড় বড় পাতা। ওরা পাতা দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে লাশগুলোর লজ্জাস্থান। একটি ছেলে সেগুন পাতার মচমচ শুনে পাতা ছিঁড়ে। কিন্তু এ কী! পাতা থেকে রক্ত ঝরছে। সেগুন পাতায় রক্ত? ছেলেটি সৌমিক আর ফারুক নামে দুটি ছেলেকে ডেকে বলে- দ্যাখ দ্যাখ! পাতার ভেতর রক্ত। ওরা দেখে অবাক হয়। সবাই এবার পাতা ডলতে থাকে। সবার হাত থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বের হচ্ছে। ওদিকে সেগুন গাছ চিৎকার করে ওঠে। এই তোমরা কী করছো? গাছ কথা বলছে? প্রথমে ওরা বিশ্বাস করে না। আবারো সেগুন গাছের চিৎকার! একজন ছেলে এগিয়ে যায়, তুমি কথা বলছো?
হ্যাঁ, আমি কথা বলছি।
কীভাবে সম্ভব? 
যেভাবে মানুষ মারা সম্ভব সেভাবে...
মানে?
ওই ছেলেগুলো একটি মেয়েকে নৃশংসভাবে মেরেছে। মেয়েটার কেউ নেই । তাই ওদের মেরে ফেলেছি।মেয়েটার শরীরের রক্ত আমাদের পাতায়। এই যে তোমরা পাতা ডলে রক্ত বের করছো এই রক্ত লিলিথের।
লিলিথ?
হ্যাঁ, লিলিথ। সে আমাদের মেয়ে। ওর কেউ নেই তাই আমার বুকে ওকে দাফন করেছি। যার কেউ নেই তার প্রকৃতি আছে। তোমরা আর, ওর রক্ত বের করো না। আমি আমার সেগুন পাতায় ওর রক্ত নিয়ে নিয়েছি। এবার থেকে সেগুন পাতার কষ হবে লাল। এ যে লিলিথের রক্ত। আমাদের লিলিথের রক্ত। বড্ড দুঃখী সে।  ছেলেরা স্থব্ধ হয়ে যায়। হাতের পাতা ফেলে দেয়। ওদের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। মেয়েটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে প্রার্থনা করে। 
ওদের চোখের জল মাটিতে পড়তেই বন শান্ত হয়ে আসে। সারল্য নদী ফিরে যায় তটে। জায়গায় জায়গায় জমে থাকা জল শুকিয়ে যেতে থাকে। মেয়েটির জন্য প্রার্থনা আর চোখের জল ফেলায় সারল্য নদী শান্ত হয়ে আসে। মানুষের দুঃখের ভার মানুষকেই নিতে হয় কিছুটা। না হলে অতৃপ্ত আত্মা জগতে ঘুরে প্রকৃতিকেও ছাড়েও না।

কিছুক্ষণ আগে বনে যে তাণ্ডবলীলা চলছিলো সে বনে যেনো কিছুই হয়নি। মানুষের প্রার্থনা আর জল পেয়ে সেগুন গাছ একটি দুঃখী মেয়ের কান্না, শোক। আর রক্ত বুকে লুকিয়ে ফেললো।  লিলিথের রক্ত সেগুন পাতায় বেঁচে রইলো।


Rokhsana Yasmin Mani




Post a Comment

0 Comments