গরীব গিরস্থ সোনা মিঞার বাড়িতে একটা নাদুসনুদুস কুকুর ছিল। কুকুরটা দিনমান শুয়ে-বসে হাই তুলে কাটাতো আর রাত হলে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বাড়ির চারপাশে পায়চারি করতে শুরু করতো। কুকুরটার পায়চারি দেখে সোনা মিঞা খুশি হয়ে পরদিন সকালে তাকে ‘ডিউটি’র পুরষ্কার হিসেবে এটা সেটা খেতে দিত। তবে সোনা মিঞা আসলে যা জানতো না তা হলো, সোনা মিঞারা ঘুমানোর সাথে সাথে কুকুরটাও ঘুম দেয়। সোনা মিঞার দেয়া খাবারে পেটুক কুকুরটার বিশাল পেটের কোনাও ভরতো না। তাই তাকে প্রায়ই পাশের বাড়ির রান্না ঘর থেকে খাবার চুরির ফিকির করতে হতো। এ কাজে সে ছিল বড়ই কামেল। দুয়েকবার ধরা পড়ে তাড়া খেলেও অধিকাংশ বারই সে সবার অগোচরে কাজ সেরে পালিয়ে আসতে সক্ষম হতো। শুধু এক বার পূর্ণিমার রাতে ঝকঝকে চাঁদের আলোয় তরফদার বাড়ির ছোট তরফের রান্না ঘর থেকে তাকে বেরুতে দেখে ফেলে খোদ গিন্নী। পরে তাই নিয়ে সোনা মিঞার সাথে ছোট তরফের কী হম্বিতম্বি! যাহোক, সোনা মিঞা তার কুকুরের হয়ে ছোট তরফের পা ধরে মাফ চাইলে সে যাত্রায় ভেলু রক্ষা পায়। সোনা মিঞার মেজ ছেলে কুকুরটার নাম দিয়েছিল ভেলু।
গিরস্থ সোনা মিঞার ছেলেমেয়েরা দেখতে শুকনো পাটকাঠি হলেও ভেলুর স্বাস্থ্যটা দেখার মতো। খালি চুরি-চামারি করে খাওয়ার দরুণই না, আরো যে কারণে ভেলু সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তা হলো তার উঞ্ছবৃত্তি- সোজা বাংলায় ফকিন্নী স্বভাব। পাড়ার যে বাড়ি থেকে যেদিন মাংসের সুবাস আসে, ভেলু সেদিন সে বাড়িতে ঠিক খাওয়ার সময় গিয়ে হাজির। গ্রামাঞ্চলের গিরস্থ লোকেরা শহরের বড়মানুষদের মতো খিল আঁটা বাড়িতে বাস করে না। তাদের অনেকে খাওয়া-দাওয়া করে খোলা বারান্দায়। তাই ভেলু সে বাড়ির উঠোনে দাঁড়ায়ে পাতের দিকে করুণ চোখে চেয়ে লেজ নাড়লে তার দিকে হাড্ডি ছুঁড়ে দেয়া ছাড়া তাদের অন্য উপায় থাকতো না। আবার সোনা মিঞার ছেলেরাও তাকে এত ভালোবাসতো যে নিজেদের আধপেটা থেকে আধমুঠো করে তুলে ঠিকই দোবেলা ভেলুর পেটে কিছু না কিছু দানাপানির ব্যবস্থা করতো।
মোটের উপর সোনা মিঞার বাড়িতে ভেলুর দিন ভালোই কেটে যাচ্ছিল। সোনা মিঞার চেয়ে অনেক সম্পন্ন গিরস্থ গ্রামে থাকলেও ভেলু সেসব বাড়িতে স্থায়ী হওয়ার কথা ভাবেনি। কারণ এই বয়সে নতুন কোন বাড়িতে সোনা মিঞার বাড়ির মতো সহানুভূতিশীল আচরণ পাওয়া নাও যেতে পারে। আর ভেলুর যা যোগ্যতা তাতে কোন বড়লোক তাকে আদরে পালবে? খাওয়া আর ঝিমানো ছাড়া ভেলু পারেই বা কি? ভেলু নিজে তার দর জানে। তাই সোনা মিঞার বাড়ি ছাড়ার কথা সে ভাবে না।
গরীব সোনা মিঞার বাড়িতে চোর-ডাকাত আসার কোন প্রশ্ন নেই। ভেলু তাই রাতে বড় আরামে ঘুমায়। মালিককে খুশি করতে সন্ধ্যা রাতে সে ছোট্ট বাড়িটার চার পাশে কয়েক পাক ঘোরে। তারপর মালিকপক্ষ ঘুমালে সেও ঘুমায়। এক রাতে এমনই ঘুমকালে তার ঘুম ভাঙ্গে কার যেন হাসি শুনে।
বাপ রে! কী হাসি!! ধড়মড় করে উঠে বসে দেখে এক শিয়াল তার দিকে চেয়ে হ্যা হ্যা করে হাসছে। সিংহের সাথে নেংটি ইঁদুরের খেলা করার গল্প ভেলু শুনেছে। সোনা মিয়ার ছেলে স্কুলের বইয়ে এ গল্প পড়ার সময় ভেলু কান পেতেছে। কিন্তু শিয়াল কুকুরের দিকে চেয়ে হাসবে এমন ঘটনা সে কখনো শোনেনি।
কুকুরটার ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখে শিয়াল তো মহা খুশি। সে দিব্যি রসিয়ে রসিয়ে বলতে লাগলো, কীরে ব্যাটা আলসের ডিম? ঘুম ভাঙ্গায়ে দিলাম বলে গোস্বা হলি নাকি?
কুকুর হাই তুলে বললো, নারে, পেটটা খিদেয় কেমন চোঁ চোঁ করছে। ঘুমডা ঠিক জমছিল না।
তা খিদে পেটে আছিস ক্যান? এঁটোকাটা কোথায় কী পড়ে আছে খুঁজে দেখ। তুই তো আর আমার মতন শিকার করে টাটকা খাবার খাস না। তাছাড়া তোগো যা স্বভাব, তাতে খাবারের অভাব তো হওয়ার কথা না। অবশ্য দিন বদলে গেছে। আজকাল ঘরে ঘরে স্যানিটারি ল্যাট্রিন...
হুম। কিন্তু আমরা তো বদলাইনি। এখনো আমাদের পেটে ঘি-মাখন ঠিক সয় না।
জানি তো। কিন্তু মনুষ্য পুরী যখন দুষ্প্রাপ্য, তখন কী আর করা, অভ্যেসটা না হয় একটু অন্যভাবে বদলে ফেল। চল আজ আমরা দু’জন মিলে তোর মালিকের বড় মোরগটা সাবাড় করি।
এ্যা! তোতে-আমাতে বন্ধুত্ব!!
ক্ষতি কী? ধরে নে তুই-আমি বিজনেস পার্টনার।
কলি কাল। কেয়ামত আসন্ন। নইলে আমি-তুই মিলেমিশে...
খুব ওয়াজ শুনিস, না? মানুষের সাথে থাকার এই ফল। সব কথাতেই ধর্মের টান। আরে, এখন দিন বদলের কাল। চারদিকে সব কিছু বদলে যাচ্ছে। আমগো শত্রুতা কেন চিরকাল জিইয়ে থাকবে? তাছাড়া দরকার বড় বালাই, জানিসই তো প্রয়োজন কোন আইন মানে না।
আইন না মানুক, দুনিয়াতে নিয়ম তো কিছু থাকা চাই। সরকারী আর বিরোধী দল মিলেমিশে চললে...
আমগো মিলমিশ কি কেউ দেখছে রে গাধা? শোন, নিয়ম যাই থাক, এই দিন বদলের কালে মিলেমিশে না চললে আমরা দুই পক্ষই মারা পড়বো। কিন্তু এই মিলমিশ মানুষ দেখলে বিপদ। তাইলে ওরা আর আমগো কাউরেই বিশ্বাস করবি না। আর জানিস তো, উগের বিশ্বাস হারালে তোর কী দশা ঘটবি? গদি তো হারাবিই, জানটাও খোয়া যাইতে পারে।
সে কি আর জানি নে! মানুষের মতন এমন নিমকহারাম প্রাণী দুনিয়ায় আর আছে নাকি! যদ্দিন তুমি ওদের জন্য করতে পারো তদ্দিন ওরা তোমায় সহ্য করবে। একদিন যদি তুমি না করো তো...
আবার দ্যাখ না, তোরা এত উপকার করিস, অবশ্য তুই বাদে, মানে কুকুরের জাত অনেক উপকার করে আরকি, কিন্তু দ্যাখ, তোদের নামে উরা কী সাংঘাতিক গালি চালু করছে...
আমিও মাঝে মাঝে ভাবি, ওরা আমাদের বাচ্চাগুলানরে দেখতে পারে না ক্যানে। কারুর উপ্রে রাগ হলে দাঁত-মুখ খিঁচায়া গালি দেয়, কুত্তার বাচ্চা...
মাগার দ্যাখ, আমরা উগের কোন উপকারই করি না। তবু উরা আমগের নাম দেছে পণ্ডিত। উগের পুলাপাইনে যে রূপকথার বই পড়ে তার অর্ধেকেই আমগের গপ। তাইলে বোঝ উরা এই শিয়াল জাতটারে কী ইজ্জত দেয়!
এতক্ষণে ভেলুর মনটা খারাপ হয়। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলে, তা এখন তুমি কী চাও, তুমারে যারা ইজ্জত দেয়, তাগের ক্ষতি করবা? আমি তাতে সাহায্য করবো?
তুই হেল্প করলে কাজটা সহজ হবি।
তারপর কাল সকালে যখন ওরা আমারে বকাঝকা করবি, তখন?
তুই ভাব করবি যে তোর অসুখ হইছিল। তাই রাতে মড়ার মতন ঘুমাইছিলি। ইট্টুসখানি অভিনয়, পারবিনে?
দেখি।
তো সেরাতে শিয়ালটা ভেলুকে এভাবে হাত করে সোনা মিঞার বাড়ির সবচে বড় মোরগটা খোঁয়াড় থেকে বের করে নিতে সক্ষম হয়। মোরগ-মুরগীগুলো চেঁচামেচি করলেও গিরস্থের ঘুম ভাঙ্গেনি বা ভাঙ্গলেও কুকুরের নিঃশব্দতার দরুণ কেউ ব্যাপারটায় গা করেনি। বরং সোনা মিঞা আধো ঘুমে বিরক্ত হয়ে ভেবেছে যে বেয়াড়া মোরগটাকে আর রাখা যাবে না। ঠুকরে ঠুকরে মুরগীগুলোর জান শেষ করলো। কালই ওটারে হাটে তুলতে হবে।
কিন্তু সকালে কোনা ভাঙ্গা খোঁয়ার দেখে এবং মোরগটাকে খুঁজে না পেয়ে সোনা মিঞা যা বুঝবার তা ঠিকই বোঝে। রাগে-ক্ষোভে সে ভেলুর দিকে চ্যালা কাঠ ছুঁড়ে মারে এবং তাকে খেতে দেয়া বন্ধ করে দেয়। ক্ষুধার্ত ভেলু একসময় মাঠ পেরিয়ে খালের ধারে বেনা ঝোপে ঘুরতে থাকে। তার অনুমান এখানেই কোথাও থাকে শিয়ালটা। কাল রাতে সে মোরগটাকে নিয়ে সোজা মাঠ বরাবর দৌড় দিয়েছিল। কর্তব্যবোধ ভুলে যাওয়া ভেলু তখন হতভম্ব হয়ে চেয়ে দেখছিল শুধু।
কিন্তু দিনের বেলায় শিয়াল পণ্ডিতের টিকিও খুঁজে না পেয়ে ব্যর্থ ভেলু সন্ধ্যের মুখে ফের ফিরে আসে সোনা মিঞার বাড়িতে। তাকে দেখে সোনা মিঞা জ্বলে উঠলেও বাড়ির ছোট ছেলেটা মায়ের থেকে ফ্যান চেয়ে নিয়ে তাকে খেতে দেয় এবং শুধু ফ্যানে ভেলুর পেট ভরেনি বুঝতে পেরে রাতে নিজের ভাত কিছুটা বাঁচিয়ে গোপনে ভেলুকে দেয়। মাছের ঝোলে মাখা সে ভাতের আহা কী ঘ্রাণ! ভেলুর চোখে পানি এসে পড়ে। ইস্! কেন যে সে কাল রাতে অমন নিমকহারামিটা করলো!
দু’দিন পরের রাত।
আধাপেটা খেয়ে ভেলু ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি। সোনা মিঞার পরিবার গভীর ঘুমে মগ্ন। কার যেন ধাক্কায় ভেলু কুঁই করে উঠে দাঁড়াতেই দেখে সেদিনের সেই শিয়াল নিঃশব্দে দাঁত বের করে হাসছে। ক্ষুব্ধ ভেলু ঘেউ করতেই শিয়াল তাকে চুপ থাকার আদেশ দেয়। কিন্তু আজ ভেলু শিয়ালের নির্দেশ মান্য করতে চায় না। সে বরং ঘর ঘর করে সেরাতে চুরি করা মোরগটার ভাগ চায়। শিয়াল হেসে বলে, সে হবে’খন। তুই আজ চুপ থেকে আমাকে সাহায্য কর দেখি। তোর মালিক তো খোঁয়ারের পচা কাঠ সব পাল্টে ফেলছে। তুই বরং খিলটা খুলে দে। তোরাতো আবার এসব গেরস্থালী কাজে পাকা।
কিন্তু ভেলু আজ আর শিয়ালের কথায় ভোলে না। সে সোজা দর কষাকষির সুরে বলে, যদি আমি এটা না করি? যদি আমি আমার কর্তব্যে অবহেলা না করি?
সে তোর বিবেচনা। কিন্তু তুই কাজটা করলি জানে বাঁইচা থাকতি।
মানে?
চায়া দ্যাখ তুর পিছে।
ঘাড় ফিরিয়ে ভেলু যেই পিছনে তাকিয়েছে অমনি শিয়ালটা বিদ্যুদ্বেগে এক লাফে ভেলুর উপর চড়াও হয়ে সোজা কামড়ে ধরে তার টুঁটি। সে এমন মরণ কামড় যে নাদুসনুদুস ভেলু একবার ‘কুঁই’ টাইপ একটা শব্দ শুধু করতে পারে। মুহূর্তে শিয়ালটা চিরে ফেলে তার কণ্ঠনালী ও গলবিল। কিছুক্ষণ হাত-পা ছুঁড়ে ভেলু হয়ে পড়ে নিথর।
শিয়ালটা আজ একা ছিল না। সাথে ছিল তার শিয়ালনী। সোনা মিঞার বাড়ি থেকে আজ খালিমুখেই তাদের ফিরতে হচ্ছিল। শিয়ালনী আফশোস করে বলে, ইস্! সে রাতে তুমি উরে মোরগটার একখান ঠ্যাং খাইতে দিয়া গেলে আজ উ আমগেরে সাহায্য করতো।
শিয়াল উদাস সুরে বলে, করতো না বৌ। উরা মালিকের গোলাম। বিশ্বাসঘাতকতা ওদের রক্তে থাকলে মানুষের সাথে ওরা বাস করতে পারতো না।
তয় সেরাতে যে করলো?
লোভে পড়ছিল। বোকা, আলসে আর পেটুক কিনা, তাই। তার শাস্তি আজ আমিই দিলাম।
কেন?
শিয়ালে আর কুকুরে কোনদিন দোস্তি হয়? যে বুদ্ধু তা বোঝে না তার কপালে তো এমন হবিই। ওদের সাথে আমগো শত্রুতা সেই পুরনো। যেদিন ওরা বনের স্বাধীন জীবন ছেড়ে মানুষের গোলামি করতে আসলো সেদিন থেকেই ওদের আমরা ঘেন্না করি। কেউ কারো ছায়াটাও সইতে পারি না। এই গাধাটা সেটা ভুলে কিনা আমার সাথে গপ-সপ করে! কে কবে শুনছে যে কুকুর শিয়ালেরে এত কাছে ঘেঁষতে দেয় যে সে তার টুঁটি চিরে দিতে পারে!
একটা মনভোলানী হাসি হেসে শিয়ালনী বলে, সবই কলিকাল।

0 Comments