শাদমান শাহিদ এর একগুচ্ছ কবিতা

A collection of poems by Shadman Shahid



বুটজুতা

যদি বন্দি হয়ে যায় রাজপথ
থেমে যায় যদি সকল নড়াচড়া
তবে এও জানা হোক
বোবার দেশে দেবতার নাম বুটজুতা
যার জিহ্বা থেকে গড়িয়ে পড়া একেকটি

 শব্দ___ শাস্ত্রের একেকটি অধ্যায়
অধ্যায়গুলি চড়ে বসে বাতাসের মুখে
ফলে আগুনের দৃশ্যই নেভে না শুধু

আগুনও নিভে যায় একদিন।

১ ডিসেম্বর ২০২৩




সন্ধান

"কাকা কলা খায়" থেকে কাকা হারায় যে পরম্পরায়
একই পথে খরস্রোতা হারায় তার নিজেকে
ঘূর্ণি হারায় প্রাণ
প্রগাঢ় লাল হয়ে যায় ধুসর
আগস্ট হারায় আঙুল ট্রিগার

কী লাভ বলো আফসোসের মাথা ঠুকে পাথরে
কবে পেয়েছি কিছু সুতা বেঁধে বটগাছে
তার চেয়ে পথে নামাই ভালো
যেখানে তুমি হারিয়েছো পীঠের দাঁড়া
আমি হারিয়েছি ঘাড়ের রগ।

১২ নভেম্বর ২০২৩




সাপ

দূরের চেয়ে ঘরের সাপ ভয়ংকর
ঘরে বালবাচ্চা রাতের ঘুম
আবার এও জানা, দূরের সাপ মুসা নবীর হাতের লাঠি না
কাছের দূরের যেখানেরই হোক
তার নাম সাপ
ছোবল আর গিলে ফেলাই যার স্বভাব

ফলে কেবলই দীর্ঘ হয় নিকাশের খাতা
চোখ বন্ধ করলেই মোচড় দিয়ে ওঠে পিতৃপুরুষের মুখ
মুখ তো নয়___আফ্রিকা
অপরদিকে বেজেই চলেছে বীণ বাতাসের মুখে
এবং রাগের যে ওঠানামা
হয়তো বেশি দূরেও নেই প্রত্যাশিত ফণা

ফলে কেবলই দীর্ঘ হয় নিকাশের খাতা।

২৮ ডিসেম্বর ২০২৪




দর্পান্ধ

ছলচাতুরি দিয়ে যারে করেছে কাবু
দম্ভ করতে যেন না যায় তার সামনে
তাহলে ধেয়ে আসে অভিশাপ
যা আটকানের ক্ষমতা রাখে না কেউ

কে না জানে, যে নিষ্কৃতি চায় তার পথ কখনোই বন্ধ হয়  না
কোথাও না কোথাও ফাঁক থেকেই যায়
দুঃখ তো তার জন্যে____ যে দর্পান্ধ

ব্যাঙের মতো কেবল ফুলেই যায়, ফুলেই যায়।

৩০ নভেম্বর ২০২৩




পথ ও পথিক

পথ কি পথিকের চিনা?
নাকি পথ পথিককে চিনে?

মন বলে___কেউ কাউরে চিনে না
না পথিক না পথ
দুজনেই হাঁটে যার যার বাড়ি ধরে।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩




মৃত্যু

দেয়ালের পুরুত্বই বলে দিচ্ছে
মৃত্যু খুব সন্নিকটে
অচিরেই দেখা যাবে ল্যাংড়া মশা
অথবা শোনা যাবে একটা বিকট শব্দ
অথবা কোনো শব্দই হবে না
অদৃশ্যেই ঘটে যাবে যা ঘটার

এমন অনেককিছুই ঘটে
কখনও আঁচ করা যায় কখনও যায় না
নৃশংসতার সময় শিশুর চোখ ঢেকে রাখে মা
মৃত্যুও ঢেকে রাখে অনেককিছু

কারণ কিছু কিছু ঘটনা থাকে যা হজম করার ক্ষমতা সাধারণ রাখে না।

২১ অক্টোবর ২০২৩




বন্দী

জানি কী বলবে
আর এও জানি, কথাগুলোয় থাকবে না

সত্যের 'স'ও
তারপরও শুনতে হবে
হাততালি দিতে হবে
ঠিক হ্যায় ঠিক হ্যায়
চিৎকার করতে হবে
করবোও
বন্দী মাত্রই জানে---এটাই কর্তব্য
সহ্য করা আর অপেক্ষা করা

১২ আগস্ট ২০২৩




এসকেপ

আজ ছুটিবার
সারাদিন এসকেপ করে বেড়াবো
ছুটিবার এসকেপ করতে খুব ভালো লাগে
ওটা নিয়ে যায় অনেক দূর
পথের একেবারে শেষ প্রান্ত
যেখানে বাস করে পরাবাস্তব
যাদুর মন্ত্রের মতো ঢুকে যাবো এসকেপ থেকে পরাবাস্তবে
বোধের এ স্তরে ঢুকলে পরিষ্কার হয়ে যায়  অনেককিছু
কেন রবীন্দ্রনাথ সঙ্কোচের বেড়াটা ভাঙতে পারেননি
কেন নাদের আলী সুনীল বাবুকে নিয়ে যেতে পারেনি তিন প্রহরের বিল দেখাতে
কেন মনসা কেবল চাঁদ সওদাগরকেই নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিলো

পরাবাস্তব শুধু পথের শেষ প্রান্তেই আটকে রাখে না
নিয়ে যায় আরও দূর
যেখানে নির্ণিত হয় তেলেসমাতির সব আঁকিবুঁকি
যেখানে কলমের দাগ একটু এদিকসেদিক হওয়া মাত্র অস্থির হয়ে ওঠে ভূমধ্যসাগর
তেল আবিবে একটা বাজি ফুটল তো বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া 
কোথায় পাপনগর আর কোথায় গঙ্গাতীর
থরথর করে কেঁপে ওঠে তীরের যত গর্ত

দুনিয়ার কত রহস্য কত কুটচাল
সবই ধরা পড়ে এসকেপের রাডারে।

১২ অক্টোবর ২০২৩




সময় এখন শুধু দেখার

সময় এখন শুধু দেখার
দেখে যাও
প্রশ্ন করো না কোনো

সবই পরিষ্কার হয়ে যায় একসময়

সব করেছে বলে যে অট্ট হাসতো আর

লাফাতো তালফড়িঙের মতো
তার তলাটাই ফুটো হয়েছে সবার আগে
সব জয় করেছে বলে অহর্নিশ দাবড়ে বেড়াতো যে
তার সমাধি এখন শহরের ভাগাড়

সূর্য অস্ত যেতো না যাদের আকাশে
আজ সেখানে রোদের বড়ো আকাল
ক্রমেই ডুবে যাচ্ছে ঘনায়িত অন্ধকারে
মানুষের সবচেয়ে করুণ অসহায়তা হচ্ছে
নিজের মুখ দেখতে না পাওয়া
কাউকে দেখাতে না পারা

সময় এখন কেবল দেখার
দেখে যাও
প্রশ্ন করো না কোনো
সবই পরিষ্কার হয়ে যায় একদিন।

২৪ অক্টোবর ২০২৩




ঘাতক

যাত্রার শুরু থেকে অনেকেই ছিলাম
মোড়ে মোড়ে অনেকেই পুঁতে রেখে

এসেছিলাম পদচ্ছাপ
আজ পেছন ফিরলে দেখা যায়
কিচ্ছু নেই কোথাও
সবখানে কেবল বুলডোজারের দাগ।

৭ নভেম্বর ২০২৩




যদি কেউ মনে করে থাকে

যদি কেউ মনে করে থাকে__ ইচ্ছে করলেই সব করা যায়

তার জানা দরকার

যে কথা ঢুকে যায় কানে
যে দৃশ্য স্থির হয়ে যায় চোখের ফ্রেমে
অথবা যে ভাষা সেট হয়ে যায় বাকযন্ত্রে, মগজে
তা উপড়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে না কেউ

যে পথ চিনে ফেলেছে মাটির ঘরবাড়ি

এবং তার শেকড়বাকড় ছড়িয়ে গেছে ক্লোরোফিলের গহীনে
তা কোনো নেইল পোলিশের দাগ নয়

যদি কোনো পথহারা রপ্ত করে ফেলে জনপদের ভাষা
আর ছিঁড়ে ফেলে যদি ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে
মনে রাখা উচিত, যেকোনো শক্তিধরের চেয়ে সে পরাক্রমশালী
অথবা
জীবন যাকে খেয়ে উজাড় করে দিয়েছে
কিংবা যে নিজেই জীবন খেয়ে খেয়ে বেঁচে আছে
সহজ ব্যাপার নয় তার সামনে যাওয়া

এই জায়গায় স্বয়ং শনিকেই ভাবতে হয় সত্তরবার।

১৩ ডিসেম্বর ২০২৩





সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে

পোড় খাওয়াদের মন এতোটা ভঙ্গুর হলে চলে?
তাহলে আস্থার ঘোড়াটা যে মরে যায়
মনে রাখা দরকার, কখনও কখনও 

মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া ফসিলও নড়েচড়ে ওঠে
ঘটিয়ে দেয় মহাবিপ্লব

যার অপেক্ষায় আছি হয়তো পথেই
হয়তো কালই এসে উড়িয়ে দেবে শাদা পায়রা
আর দুটো আকাশ মেলে দিয়ে বলবে ____ আর ভয় নেই, এসে গেছি
খুলে দাও যত সিটকানি দরজাজানালার
ছিঁড়ে ফেলো ঘুঙুর শিশুর কোমরের

হয়তো তারপরেই দেখা যাবে একে একে

ছিঁড়ে ফেলছে পায়ের নূপুর
অজ্ঞাতবাস ছেড়ে ফিরে আসছে রড সিমেন্ট আর ইটেরা
ফিরে আসছে অক্সিজেন সমৃদ্ধ অরণ্য
ফিরে আসছে ঝাঁক ঝাঁক ফুল পাখি আর নান্দনিক সুন্দর

ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু এবার___  

হাতের বান খুলে পরম বিছনায় ফিরে যাবে আদালতপাড়া

এতোকিছু যখন পথেই
আর এও যখন জানা, রাত্রির দেহে

গণ্ডারের চামড়া জুড়ে যাওয়া মানেই

পাখিদের ঘুম ভেঙে যাওয়া
তখন আর কেন অস্থিরতা
কেনই বা পিঁপড়া হয়ে ওঠা।
১ নভেম্বর ২০২৩




____________________________________

শাদমান শাহিদ 

রোহান মঞ্জিল। কলেজপাড়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থ:  যমকুলি (ছোটগল্প), একদিন হোসনে মিয়ার সঙ্গে (ছোটগল্প), পোস্টার চোখ (উপন্যাস), পাহারা (উপন্যাস), চেয়ারচক্র (উপন্যাস), সিজ্জিল (উপন্যাস), সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে (কাব্যগ্রন্থ), যে কথা জমা রেখেছি রক্তে (কাব্যগ্রন্থ), কামালমুড়া-গণহত্যা (গবেষণাগ্রন্থ)। 


Post a Comment

0 Comments