পঙ্কজ সাহা’র দশটি কবিতা

 

পঙ্কজ সাহা'র দশটি কবিতা


জীবনের খেরো খাতা


বছর গড়িয়ে যায় যেন একটি শতাব্দীর মতো অপেক্ষা-
ছোট ছোট দুঃখ, কষ্ট, অপ্রাপ্তি
      বিন্দু থেকে সিন্ধুতে রূপ নেয়__
শতবর্ষী বটবৃক্ষের মতো সাক্ষী থাকে
জীবন বৃক্ষের চোখ।

দূরে চেনা কেউ অচেনার মতো মনে হয়
নির্ভেজাল ভালোলাগা কেন প্রশ্নবিদ্ধ?
ছন্নছাড়া অগোছালো যাপিত যে জীবন
সে জীবনের পথে পথে পড়ে থাকে
                 দুঃসময়ের পদচিহ্ন...

কেউ ভুলে যায় অনায়াসে__
আবার কারো কাছে 'ভুলে' যাওয়া শব্দটি 
             জীবনের ব্যাকরণ বহির্ভূত।

জীবনের নানাবিধ দুর্যোগে
সবকিছু ছেড়ে দিলেও-- যারা আদর্শ ধরে রাখে,
তাঁদের কাছে মাথা নত করে চলি
             আজন্ম নতজানুর মতো।




জীবনের পাঠ

সময়কে ধারণ করে অনতি-ক্রমে
জীবনের অবিন্যস্ত জমিন চষে চষে
গড়ে তুলি সুবিন্যস্ত ফলজ বাগান__
পিতার মাঝে জমাইত পূর্ব-পূরুষদের
অনাচার ভাঙি আর শিষ্টাচারটুকু
                        ধারণ করি সযত্নে__

হলো না হয় দুঃসাহস! 
জীবনের ক্যানভাসে গড়ে তুলি 
নিরব সংগ্রামী প্রতিবেদন।
অমোঘ প্রত্যাশায় জীবনকে ভেঙে দ্বিভাগ করি
একটি জীবনের মাঝেই স্বাদ টেনে নেই নতুন জন্মের।

সময়কে ধারণ করে নীরবে
কোদাল, কাস্তে, নিড়ানিতে ধার-কাটি
টেনে তুলি জীবনের অবাঞ্ছিত আগাছা__
ফেলে আসা ছোট ছোট অধ্যায় পাঠ করে
নতুন বীজ বুনে দেই ফলজ বাগানে।
একটি জন্মের মাঝেই নতুন একটি জন্মের
                                             পরিপাটি

জন্ম থেকে অদ্যাবধির মূঢ় আগাছা
টেনে তুলি-- ঘুমটুকু খেয়ে যায়
                              ঘুমভূক রাত।

একটি জন্মকে দ্বিভাগ করে
নতুন জন্ম__
নতুন বাগান__
নতুন সুর__
নতুন ছন্দ__
স্থায়ী, মুখোপাত, অন্তরা, সঞ্চারী, আবোগ,
মিলিয়ে যায় যেখানে পাখির গানে;
অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত অথবা মাত্রাবৃত্ত
কোন ছন্দই খুঁজে পাবেনা কোন
                              ব্যাকরণ বিদ্যান
নতুন ছন্দে নির্মাণ হবে নতুন কবিতা
বাগানে মাটির হৃদয় ভেদ করে উঠে আসবে
       প্রত্যাশিত ফলজ চারা__

                          
                              


কবিতা আজ ভাষাহীন

'মানুষের মন স্বভাবতই চঞ্চল' জানি__
তবুও সময়ের দায়িত্ব উপেক্ষা করা সাধ্যহীন।

বিপদ মুক্তির জন্য নিজেকে বন্দী করা
এ-এক ব্যতিক্রম যুদ্ধের মুখোমুখি পৃথিবী...
মানুষ স্বভাবতই পাখির মতো উড়তে চায়, জানি__
তবুও আজ শুধু ভালো থাকা নয়,
ভালো রাখার দায়িত্ব সম্মুখে প্রতীয়মান।

'কবিতা' আজ বড় অসহায়__
হৃদয়ের অনুভূতি অব্যক্ত নীল জল।
মানুষের কান্না দিকে দিকে
কবিতা আজ ভাষাহীন,পাথর!

পৃথিবীর এই সকরুণ দুঃসময়ে
কবিতা মহাশূন্যের দিকে তাকিয়ে...
কবে হবে প্রভুর করুণার জলসিঞ্চন
শান্তির সুবাতাসে দোল খাবে সবুজ শ্যামলিমা__



                           

একটি জীবন্ত শব্দ

শৈল্পীক ক্যানভাসে ক্রমাগত
স্পষ্ট হয়ে উঠলো
রক্ত-তুলির সুনিপুন বিন্যাসে সংবেদনশীল
প্রত্যাশার একটি জীবন্ত শব্দ,--- 'স্বাধীনতা'!

আরো স্পষ্ট___
সম্ভাবনার দুয়ারে হানা দেওয়া
মৃত শৃগালের কাছাকাছি অভ্যস্ত
পশ্চিম থেকে ধেয়ে আসা শকুনের ঝাক...

দিন বদলায় নয় মাসের নিদারুণ হুঙ্কারে
শত্রুর পরাভুত ইচ্ছা ডুব দেয় অস্তমিত সূর্যে__

আর আমরা ধারণ করি, রক্ত-তুলির ক্যানভাসে
প্রত্যাশার একটি জীবন্ত শব্দ,-- 'স্বাধীনতা'!



                                

বর্ষার দূত

তবুও কদম ফোটে বর্ষার দূত
চেতনার পরাভূত বাতাসে ঘ্রাণ ছোটে
উঠে দাঁড়ায় জলে থৈ থৈ জনপদ
ভেজা মাটিতে নীল-পদ্মের শেকড়
আঁকরে ধরেছে;
চোখের সামনে ধূসর সরোবর__

শ্রান্তির দুপুরে স্বপ্নে বিভোর
খেয়া ঘাটের মাঝি
কোথায় যেন অবরুদ্ধ শালিকের ঝাক__

শিকারির হিংস্র দৃষ্টিতে
কাঁপে সাদা পাখি
স্বপ্ন-দগ্ধ কৃষকের কদম দু'টি চোখ
চেয়ে থাকে জলদের সতৃষ্ণ নেশায়...





আক্রান্ত

নিজ বাসভূম রোগশয্যা- উঠোনে পদচিহ্ন নেই কারো
গজিয়েছে সবুজ-দূর্বা আর হেলেঞ্চার শাক
তবুও প্রকৃতি ঋতু বদলায়
পৌষের শীতে মৃদু আমেজ...

নারা পুড়িয়ে উত্তাপ যেটুকু ছড়ায় প্রান্তিক কৃষক
বৈষম্যের খেরোখাতায় তা অতি নগন্য
এখানেও ঘটে বসন্তের আগমন,- কিন্তু
ফুল ফোঁটার আগেই আক্রান্ত -
বিবেকহীন বাতাসে ওড়ে সাদা পাঁপড়ি...

ফেলে আসা অনুভূতি সক্রিয় হয়ে ওঠে
শ্রম আর ঘামের মূল্য অবহেলায় তালাবন্দি
তবুও সাধ্যের সীমানায় কৃষক বুনে যায় স্বপ্নবীজ
বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ- মহাকাব্য।





জানালা

জানালা অন্যতম প্রকৃত বন্ধু
যেন, প্রিয় লেখকের বইগুলোর মত;
পর্দা সরালেই কথা বলে
                  স্নেহময়ী বাতাস__
গোধূলি বিকেল অথবা বৃষ্টি-সকাল
বিষণ্ন দুপুর অথবা ঘুমহীন রাত
সর্বদা স্বার্থহীন বন্ধুর মতোই সঙ্গ দেয়
পর্দা সরালেই উঁকি দেয়
                      অনাবিল শৈশব__

কত প্রিয় বন্ধুরা চলে যায় মিথ্যাচারে
স্বার্থের কাছে বেচে দেয় সুগভীর সম্পর্ক
সঁপে দেওয়া বিশ্বাস উড়ায় ঘুড়ির মতোই দ্বিধাহীন__
কিন্তু, জানালা সময় অথবা অসময়ে
আশ্রয় দেয়-- অভিমান জানেনা
মিথ্যার কাছে মাথা নত করে না;
ঠিক যেন আমার প্রিয় লেখকের
                        বইগুলোর মত__

 

                   
                      
অনুভবে শরৎ

শরতের নিশ্চয় নিজস্ব শক্তি আছে!
নইলে কীভাবে টেনে নিয়ে যায়
                       ধুলিমাখা শৈশবে?
কাশবন থেকে ধেয়ে আসা বাধাহীন বাতাস
ধাক্কা দেয় সজোরে স্মৃতির দুয়ারে_
দরজা খুলে যায়, সামনে গেঁয়ো নদী
                   উপরে নীল আকাশ।

বান নেমে যাওয়া কাদামাটি গায়ে মেখে
এখানে ঘুমাতাম একদিন সবুজ ঘাসে
ঘাসের চাদর ধুয়ে রাখতো
                               অগ্রজ বর্ষা।

মানুষের বয়স বাড়ে কিন্তু শরৎ
বড় হতে দেয়না, টেনে নিয়ে যায়
                          ধুলিমাখা শৈশবে_
শরতের নিশ্চয় নিজস্ব শক্তি আছে!
নইলে কিভাবে টেনে নিয়ে যায়
                         অনুভবের দুয়ারে?
আমরা নতুন করে দেখি খেলার মাঠ,
সাদা বক আর মাছরাঙ্গার ঝাঁক;
নতুন করে পাঠ করি জীবনের প্রথম অধ্যায়
ধুলো মুছে যত্ন করে রাখি শিশুশিক্ষা,
রূপকথার গল্প আর ধারাপাত।
নিশ্চয় শরতের টেনে নিয়ে যাওয়ার
                      নিজস্ব শক্তি আছে!





   
অন্তমিল--- ৪

মাটির ঋণ। কাঁধটি ভারী।
হাঁটি-- কিছু সময় দাঁড়াই;
এই অন্ধকার আমার আদি নিবাস__

জীবাণুরা জেগে। কত পথ বাকি?
চাতকেরা-- সিলেবাস বদলায়__
এভাবেই হাঁটি। অন্ধকারে একা।
রাত্রির করতলে সূর্য ঘুমায়__

বৃষ্টিথামা রাত। জোনাকিরা জ্বলে।
ডেকে ডেকে ক্লান্ত-- ডাহুক জিরায়__
ঘুমচুরি রাত। শব্দেরা নিশ্চুপ!
পায়ের এ-শব্দ দূরেতে মিলায়__

মাটির ঋণ। কাঁধটি ভারী।
হাঁটি-- কিছু সময় দাঁড়াই;
এই চেনা পথ যেন অনন্ত নিবাস__






                          
অন্তমিল--৩

অনাবাদী জমির বর্গাচাষীরা
ধার নিয়েছে পলি
ফসলের মাঠে চিটাধান রেখে
হেমন্ত গিয়েছে চলি__

তবুও কৃষক স্বপ্ন বাঁধে
আবার নামে মাঠে
এবারও বুঝি স্বপ্ন পোড়ে
স্বপ্নপুরীর ঘাটে__

স্বপ্ন-- কৃষক বুকে রেখে
ধার নিয়েছে পলি
ফসলের মাঠে শিলাবৃষ্টি রেখে
মেঘ গিয়েছে চলি__

 
পঙ্কজ সাহা
সম্পাদনাঃ ঋতুচক্র 
(একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্র)

Post a Comment

0 Comments