চক্রব্যূহভেদ ~ জ্যোৎস্নালিপি’র ছোটগল্প

Chakravyuhved ~ short story of Jyotsnalipi



তাহলে করিম পাগলাকে শাস্তির ব্যাবস্থা করতেই হয়। গ্রাম্য সালিশে দোষী সাব্যস্ত করে করিম

পাগলাকে ছাগলবাঁধা দড়ি দিয়ে হাজীর স্কুলের কৃষ্ণচূড়া গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হলে করিম

পাগলার মনে অথবা মনের বাইরে কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না। দুপাটি কালো দাঁত বের করে

খিকখিক করে হাসতে থাকে সে এবং কোনো রকমে তার পুরুষাঙ্গ বের করে চেয়ারম্যান আদম আলী

ব্যাপারীর উদ্দেশ্যে ধরধর করে প্রস্রাব করে; আর গুলিপাকানো একদলা থুথু ছঁড়ে দেয় প্রস্রাবের ওপর।


‘বাবু হে যায় হো ওঠে! হো যায় হে ওঠে।’- কান্না জড়ানো কণ্ঠে পুতুলরানীর মুখে এ

বাক্যটিই ঘুরপাক খেতে থাকে এবং মুখে নারী স্বভাবী আঁচল চাপার চেষ্টা করে সে। পুরো

ঘটনার বর্ণনা ফ্লাশব্যাকে দেখে পুলিশ। বলে, খারাপ মেয়েছেলে নাহলে কেন পুতুলরানী রাতে

বাজারের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল? উঠতি বয়সি যুবকদের সামনে ঢ্যাঙ্গা শরীর দুলিয়ে হেঁটে

গেলে তাদের ধরতে তো খায়েশ জাগবেই। বোকার মতো শুনতে হয় পুলিশের কথা। খারাপ মাগী বলে

গাল দিলে পুতুলরানীর কানে ও মনে বজ্রপাতের সৃষ্টি করে।


‘বাবু হামরা ছোটজাতের হোতে পারি কিন্তুক হামরা খারাপ লইরে বাবু। হামরা ছোটজাত বলে

তুই হামাদের গালি দিলি। হামাদের ঘেন্না করলি। হামরা যদি তোদের গু সাফ না করি তখন তোদের

কি হোবেক রে বাবু? ভগবান যদি থাকে তো এর বিচার হোবেকরে বাবু, বিচার হোবেক’ -

কান্না জড়ানো কণ্ঠে কথাগুলো বলে থানা থেকে বেড়িয়ে কানাইলালকে নিয়ে পুতুলরানী

চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে দ্রুত হাঁটতে থাকে বিচারের প্রত্যাশায়।


অপৃশ্য মেথরপট্টির লোকেরা উঠোনের এককোণে জড়ো হয়ে, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউবা বসে

বিভিন্ন ভঙ্গিমায় কলরবে মেতে ওঠে। পুতুলরানী ধর্ষণ মামলার রায় প্রকাশ করেন চেয়ারম্যান

নিজে।


‘তা মণ্ডলের ব্যাটা সালাম আর তার সাথে যারা আছিল সবাই পুতুলরানীর কাছে ক্ষমা চাইবে এবং

প্রতিজ্ঞা করবে তারা যেন আর এসব কাজ কোনদিন না করে।’


রায়ের সঙ্গে চেয়ারম্যান আরো বলে-

‘গ্রামবাসী আপনেরা সবাই অবগত হয়েছেন ওরা ছোটজাত বলে পুলিশ ওদের ফিরিয়ে দিয়েছে

কিন্তু আমার কাছে ছোটবড় বলে কিছু নেই। আমার এ সুবিচার সকলের মানি নেওয়া উচিত।’


মূর্খ গ্রামবাসীরা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। মেথরপট্টির লোকেরা কেউ কেউ নীরবে চলে যায়,

কেউ কেউ নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে। বিচার শুনতে আসা করিম পাগলা চিৎকার করে এবং

সালিসের চারপাশে চক্কর দিয়ে ভোঁ দৌড়ে ছুটে পালায়। সবাই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলে কানাইলাল

ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে আর পুতুলরানীর চোখে নামে ঝাঁঝালো স্রোত।


গ্রাম যেন আজ উৎসবমুখর; ছাগল ভোজনের উৎসব। গ্রামের মাথাজনেরা উৎসবের আয়োজক।

পটকা টাইপ দুষ্টছেলেদের ভাগ্যে ছাগলের মাংস হয়ত জুটবে না, তবুও তারা হৈ হৈ রৈ রৈ করে ছুটে

বেড়ায় এবং সুর করে ছড়া কাটে-

‘ইতি গেইলে হুট হুট করে

উতি গেইলে হইট হইট করে

বকরী কয় মরচম বাবা

আরতো বাচোম না।’

গ্রামের ভরা যৌবনা মহিলারা কখনও মুখ লুকিয়ে, কখনও প্রকাশ্য আলোচনায় মেতে ওঠে। আর

যারা বৃদ্ধ তারা মুখে ঘৃণার ভাব ফুটিয়ে, ‘আমাদের কালতো এমন ছিল না’- বলে পিছন ফিরে

চলে যায়। আব্দুল গনির চায়ের দোকানে বিক্রি বেড়ে যায় নির্বাচনী হাওয়া লাগার মতো।

সাদাকালো টেলিভিশনে সিনেমা দেখার ভিড় আরও বেশি জমে ওঠে। কোমলমতি শিশু থেকে শুরু করে

কবরে পা রাখা বৃদ্ধরা মিলে বাংলা সিনেমা নায়িকার মেদবহুল শরীর দেখতে ব্যস্ত হয়...। ফলে আব্দুল

গনির আয় আরও বৃদ্ধি পায়। সিনেমা শেষ হলে করিম পাগলাকে নিয়ে সবাই মেতে ওঠে।


গোয়াল ঘরে বেড়া সারানো অথবা কোয়ার লাগিয়ে তালা দেবার ব্যবস্থা কিংবা সারারাত

হারিকেন জ্বালিয়ে রাখার তোড়জোড় পড়ে যায় গ্রামে। এমতাবস্থায় করিম পাগলার বৃদ্ধ মা ভিক্ষা

পায় না। ধার পায় না কে নো গৃহিণীর দুয়ারে। ছাগল বাঁধা খুঁটি দিয়ে মিছেমিছি চুলা

জ্বালালে হঠাৎই বৃষ্টি নামে। করিম পাগলা নাচ গানে মেতে ওঠে।

‘ঝাড়ি আইল ঝড়ি আইল

বামনডাঙ্গা দিয়া

করিমের মাও ভাত চড়াইছে

খাটিয়া জোড়া দিয়া।’

সন্ধে তখনও খুব বেশি ঘোর হয়ে ওঠেনি। আবছা আলোয় স্পষ্ট চোখে পড়ার নয়, তবুও করিম দেখার

চেষ্টা করে, ঘন বাঁশের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায় এবং দেখতে পায় তাদের গাঁয়ের কয়েকজন যুবক

জোর করে সবার পরিচিত একটা মহিলাকে পাটক্ষেতের মধ্যে টানাহেঁচড়া করছে। পাট ভাঙ্গার

মটকানো শব্দ কারও কানে পৌঁছায় না রাত্রির নিস্তব্ধতায়, তেমনি পুতুলরানীর কাপড় গুঁজে দেওয়া

মুখ থেকে শব্দ বের হওয়া কঠিন। হারিকেনের আলো অস্পষ্ট, তবুও করিম পাগলা দেখার চেষ্টা করে।

এক সময় মুখ দিয়ে এক ধরনের শব্দ করলে একটা যুবক দৌড়ে এসে করিম পাগলাকে দেখে আশ্বস্ত

হয়।


পুকুর পাড়ে লুকিয়ে স্নানরত রমণীর সুস্পষ্ট বক্ষ কিংবা কাপড় লেপটে থাকা নিম্নাঙ্গ দেখার

চেষ্টায় ব্যস্ত করিম পাগলা। রমণীরা তাদের শরীর নিয়ে আলোচনা চরমে উঠলে দুএকজনের চোখ

করিম পাগলার উপর গেলেও তার পাত্তা দেয় না। করিম মজা পায় এবং মুখ দিয়ে লালা বের করে। তার

পুরুষাঙ্গ উথিত হলে রমণীদের মাঝখানে পুকুরের মধ্যে লাফ দেয়। কেউ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করে আবার

কেউ রঙ্গ-তামাসায় মত্ত হয়। সাঁতরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে করিম পাগলা

ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং শান বাঁধানো ঘাটে দেহটা এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম নেয়। কোনো

বালকের ডাকে তার মা এসে লাঠির আঘাত করলে সে চোখ মেলে এবং পেটে হাত দিয়ে মাকে

বোঝায় তার ক্ষিদে পেয়েছে। মাকে জড়িয়ে ধরে হেসে ওঠে সে। মার চোখে জল আসে। বগলের

নিচে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় সে।


এখন রৌদ্রে উত্তাপ নেই। উত্তাপ নেই করিম পাগলার মনে। মা ভাবে কী হবে ছেলের। অথচ করিমতো

এমন ছিলা না। দুঃস্বপ্ন তাড়া করে ফেরে। বাইশ-তেইশ বছর আগে অন্ধকার রাত! কুকুরের ঘেউ

ঘেউ ডাক কোথাওবা শোনা যায়, কোনো বুনো জঙ্গল থেকে হুক্কা হুয়া রবে শিয়াল ডেকে ওঠে।

পুরোনো ছেঁচার বেড়া হঠাৎই মড়মড় করে ভেঙ্গে যায়। তারপর গামছা ঢাকা একটা শরীর মুখ

চেপে ধরে।

তারপর...।

হাতের মধ্যে টাকা গুঁজে দিয়ে বলে, ‘নে থো। পরে নাগলে আরো দেইম। কাকো কিছু

কইসনা।’ বছর কয়েকের করিম কিবা আর বোঝে। সে ঘরের কোণে জড়ো হয়ে থাকে, তবুও সে

বেড়ায় গোঁজা কাইদা নিয়ে ছুটে যায়।


করিম কেমন যেন হয়ে যায়। চিকিৎসার টাকা নাই। ঘরে চাল নাই। এখন প্রায় রাতেই চেয়ারম্যান

আসে। খাওয়া পরার অভাব নেই। করিমের মার পেট বৃদ্ধি পায়। নেমে যায়। গ্রামবাসীরা হাসে। শুধু

করিমের পাগলামি বেড়ে যায়। সে মাঝে মধ্যেই মাকে ধরে পেটায়। ভাবনায় দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে

আসে।

করিমের বিচার হবে হাজী স্কুলের মাঠে। চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েও কোন সুবিধা করতে

পারেনি করিমের মা। চেয়ারম্যান বলে-

‘বিচারতো হওয়ায় নাইগবে করিমের মাও। আমি চেয়ারম্যান যদি বিচার না করি তাহইলে পরের

বার ভোট পামো কেমন করি। বাড়িত যাও। যেটা করলে ভাল হয় সেইটাই করমো।’


চোখ মুছতে মুছতে যখন গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে হাজেরা বেওয়া হেঁটে আসে, তখন

রাস্তার বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন কথা ভেসে ওঠে-

‘যেমন মাও তেমন ছাও বিচার এবার জমবে ভাল।

‘মাও যায় মানুষের কাছে ছাওয়া যায় ছাগলের কাছে।’- ভাবনায় পেয়ে বসে করিমের মাকে।

ধানের চাতালে কাজ করা, অন্যের পুকুরে জল আনা গরুছাগলের খাওয়ানো কোন কিছুই হয়ে ওঠে

না। পুর্ব পাড়ার রহিমুদ্দি ব্যাপারীর তাদের ছাগলটা কেনার কথা। সেটাও হয় নাই। তিনটা

খাসিই খাইবে বলে চেয়ারম্যান বাড়ি ধরি নিয়ে গেইচে। হাজেরা বেওয়ার চুলাতে আজ হাড়ি

চাপেনি। ইচ্ছে করে নয়, ঘরের চাল নাই বলে। গর্ভবতী গাভীটা তাকিয়ে আছে তার দিকে। তারও

কালো চোখ দিয়ে জল পড়ছে। পেটের দিকটা কিছুটা উঁচু হলেও না খাওয়ার কারণে গর্ত হয়ে

গেছে।


তখন বর্ষা। এক কোমর জল ভেঙ্গে বড় ঘর থেকে রান্না ঘরে পৌঁছতে মার বকবকানি কানেই

লাগায় না। পোড়া আলু খেয়ে বাঁকি অংশ মাকে এনে দেয়। মা খুশি হয়। এমনি কত ছোট

ছোট স্বপ্ন পেয়ে বসেছে আজ করিমের মাকে।

আজ করিমের পেটে ভাত পড়েনি। রাগ করে গুলতি নিয়ে পাখি শিকারে বের হয় সে। হঠাৎই কুলা

থেকে ধান পড়ার দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ায়। কুলার বাতাসে ধান ওড়ে।ওড়ে করিম পাগলার মন। চাতালে

কাজ করা মর্জিনার শরীরের দুলনিতে দোলা লাগে করিম পাগলার মনে। কুলার দোল খাওয়ার দুলনিতে

শরীর নড়ে। করিম পাগলার মন দোলে। মর্জিনাকে ভাল লাগে তার। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ছুটতে

ছুটতে অল্প জল জমে থাকা পরিত্যাক্ত ধান ক্ষেতের দিকে এগিয়ে যায় এবং গুলতি তাক করে ধরে। দুধ

সাদা রঙা বক দেখতে পেয়ে করিম উল্লসিত হয়। সে পাকা শিকারির বেশে গুলতি তাক করে। অবশেষে

দেখে সে যখন বক ধরছিল তখন বকের মুখে ছিল একটা টাকিমাছ আর টাকিমাছের মুখে ছিল

চিংড়ি মাছ। চিংড়ি মাছটা তখনও নড়ছিল।


সেদিন কাল সন্ধ্যে পেরিয়ে গেলে আকাশে ধবধবে চাঁদ ওঠে। চাঁদের আলোয় মণ্ডলবাড়ির গোয়াল

ঘরের ভাঙ্গা বেড়ায় চোখ পড়লে উথিত পুরুষাঙ্গ ধরে তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকে পড়ে করিম পাগলা।

একসময় ছাগলের ম্যাঁ ম্যাঁ ধ্বনি গোয়ালঘর ছাপিয়ে চাঁদের ধবধবে আলোয় মিশে যায়।

গৃহকর্তা দৌড়ে আসে এবং করিমকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে।


শিউলি গাছের পাতার ফাঁকে জোনাকিরা ঘুরে বেড়ায়। উদাসভাবে চেয়ে দেখে আবার হাত

দিয়ে ধরতে থাকে কিংবা হোমিও শিশিতে জোনাকি ভরে নেয়। কখনও ছাড়ে। কখনও ধরে। এভাবেই

সন্ধ্যেটা শেষ হয় করিম পাগলার। অবশেষে কালিপূজা উপলক্ষে আসা বিচার আসরে গিয়ে

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বসে পড়ে। অস্থিরতা বেশি কাজ করলে এক দৌড়ে গানের আসরের

মাঝখানে ঢুকলে চড়থাপ্পর খেয়ে বেরিয়ে আসে। বাঁধাপ্রাপ্ত করিম পাগলা পুনরায় জোনাকি

খেলায় মত্ত হয়। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে উপুড় হয়ে শুয়ে মাটির গন্ধ শোঁকে। অবশেষে কাঁদা-মাটি

মেখে ঘুমিয়ে পড়ে। কাল বিচার হবে করিম পাগলার।


পশুজেনার দায়ে করিম পাগলার বিচার হলে পুতুলরানী একা একা বিড়বিড় করে বলে- তা পশু বিচার

পেলো বাবু??

Post a Comment

0 Comments