আমার একান্তমতে....
যে আলো জ্বলে
সে আলো
ফলে
রাতবিরাত কিংবা অস্তসূর্য বা দৃষ্টিবাসনার তলে
দূর থেকে দেশে, যৌবন থেকে জীবন ফুলে! হ্যা, তাই তো বলি - যে মন
জেগে থাকে কবিতার বাগানে, সে তো চিরকাল ফুল ফোটাবেই শব্দে, বাক্যে ও ছন্দে। কবিতা
হচ্ছে ধ্রুপদী চেতনা, প্রখর অন্তর্দৃষ্টির প্রাণ। তাই যাপিত জীবন জুড়ে - কামনা,বাসনা,কাম-ক্রোধে
ও সমাজবান্ধব চৈতন্যে খেলা করে, তার চরাচর। এখানেই মানুষ নামক প্রাণীকুল কতই না
ভাষা,চিন্তা ও রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, তা মানুষই জানে। এ কারণে কবিতা নামক শব্দটি
- মানুষের মনোজগতের পরম বন্ধু। কবিতা হচ্ছে অন্তরাত্মার সরোবর। কাহলিল জিবরান তাঁর
বই " বালি ও ফেনা " তে লিখেছেন- কবিতা এমন এক প্রজ্ঞা যা আত্মাকে
পরিতৃপ্ত করে। প্রজ্ঞা নিজেই একটি কবিতা যা হ্দয় গেয়ে চলে। যদি আমরা কোনো মানুষের
আত্মাকে পরিতৃপ্ত করতে পারি, তাহলে একই সাথে আমরা তার হ্দয়ের গানও হতে পারবো,
তারপর হয়ত সে ব্যক্তি ঈশ্বরের কৃপায় ছায়ায় বসবাস করতে পারবে। " যা হোক - আজ
আমি কবিতার গুণগানের কথা বেশিকিছু বলব না, বলবো- তাঁর কথা - যিনি ইতিমধ্যে আমাকে
চমৎকার কিছু বাক্য, জ্ঞান, কলা, গঠনের মন্ত্রপাঠের মত মুগ্ধ করেছেন। তিঁনি হচ্ছে
কবি মোস্তফা।তাঁর লেখা বা প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বা গল্প এর আগে অনেক পড়েছি। তবে এরমধ্যে আরেকটি কাব্যগ্রন্থ পড়েছি তা হলো -
" চৈতালিপার্বনে কাঁচা মাংস "। তেইশের ফেব্রুয়ারিতে, প্রকাশক - ইনভেলাপ
পাবলিকেশন্স, প্রচ্চদ - নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। বইটি উৎসর্গ করেছেন -কাঁধে কাঁধ রেখে
বেড়ে ওঠা কয়েকজন কবিবন্ধুকে। কাব্যগ্রন্থটির সূচিতে - মোট ৫৩ কবিতা লিপিবদ্ধ। প্রতিটির
কবিতার শিরোনামও চৈত্রের দক্ষিণ হাওয়ার শিহরণের মত। বিমুগ্ধ চারণভূমি। প্রেম -
মায়া, মানবতা, সমাজ- রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ঘটনাবহের আকর। যা পড়লে - নির্মিত শৈলীর
আনন্দ জাগরণের উল্লাসের মত। এ আনন্দ- জোয়ারই তো একজন কবি তাঁর লেখা মাধ্যমে প্রকাশ
করে- সময়
বিভুইযের লাবণ্য ও মরীচিকার বর্ণ।
একজন কবির কত ধরনের দুঃখবোধ, যন্ত্রনাবোধ, আবেগ - আক্রোশ ও অভিমানের মাতম উঠে তা
কেবল তিনিই জানেন।কাঁচা মাংস যেভাবে চৈত্রতাপে পুড়ো ছাঁই হয়, তার গহীনে কি ব্যথা
তা দেশ, রাষ্ট্র ও মানুষের মুখ দেখলেই বুঝা যায়?কবি মোস্তফা হায়দারের প্রথম
কবিতাটি পড়লে - তেমন কিছু অনুভব করা যাবে -
রাতের ঘরে সোহাগপরীরা সম্মুখপানে
ওপারে দাঁড়ানো আমার স্বপ্ন
বিরহিনী হাই তুলে হাঁটছে আনমনে
লাল মান্দারিজের মতো নয় গল্প।
প্রকৃতির কাছে হাত পেতেছি যৌবনের দামে
সওদা হয়নি শব্দ, বাক্যের এবং ভালোবাসার
যখন তোমাদের গোল্লায় দলচ্যুত হই
ফিরে আসি আমার মায়ের কাছে, ইতিহাসের কাছে।
[ নীলকমলে ছেড়ে দিলাম সোনালি রোদ্দুর /পৃ/৯]
কেউ কেউ বাঙালিকে চির অকৃতজ্ঞ বলে। কিছু কিছু লেখক ও মননশীল জাত- স্বভাবও ভাব নিয়ে
দেশের প্রতি খুবই উদাসীন। যা ভাবতে গেলে দেশপ্রেমহীন অচেনা সত্তার আর্বিভাব প্রকাশ
পায়। এমনতর আত্ম-দ্রোহে অস্বীকার সত্যিই দেশ- চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেক্ষে কি
মোস্তফা হায়দার দেশের প্রতি আমরণ প্রতিজ্ঞাবন্ধ?সচেতন কলম নন্দনকানন এবং চিরনমস্য মানবিক কবি। তাঁর কবিতায় জাতির পিতা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে - রক্ত গড়িয়ে পড়া সিঁঁড়ি বেয়ে - অজস্র প্রশ্ন থই থই
করে ফুটে উঠছে। যা ২৫ মার্চ থেকে কালো হরফে লিখিত আঁধার! নিমজ্জিত ৩২ নং বেদনাবহের
বুকছাতিম ডাঁশমাছির তাড়ানোর মতন - অহরহ ক্রুদ্ধ ব্যথা, ফুলে উঠে দুঃখী মায়ের
আঁচলে। দেশপ্রেম নিবেদিত কবিতাটি এমনই -
রাতের গতরে তোমার ছতর খুঁজতে খুঁজতে
জলহীন ডোবায় পড়েছে চোখ ;
পাখাহীন পাখিদের সবুজতায় গণভবন হয়ে সংসদ ভবন
এক গোধূলিবেলার আকাশে স্বপ্নের করেছি চাষ।
[ রাতের গতরে তোমার ছতর খুঁজি / পৃ/১০]
আমি
চিরকাল প্রেমবোধে স্পর্শকাতর। অসীম কল্পনার ডানাহীন পাখি। পথে চলতে দলছুট
পথিক,গহীনবাসে মর্মরধ্বনি ও মানুষ সংসারে গভীর বিস্ময়। তাই তো কবিতার পৃষ্ঠার পর
পৃষ্ঠা খুললেই - কেবল দেখি লেখক তাঁর ভাবনার মাঠে চষে বেড়ানোর আলপথ। সেই পথে হেঁটে
চলি শব্দ, বাক্য - বিন্যাস, চিত্রপট, চরিত্র ও ছন্দেবন্ধে মৌলিক সম্পর্ক তৈরিতে।
আসলে লেখক মানেই- পাঠককে আবিষ্ট করা, মনোনিবেশ করা ও ঘোলা মনে স্বচ্ছতা ছড়িয়ে দেওয়া। ঠিক কবি
হায়দারের কবিতা পাঠ করতে করতে - আলোভোলা প্রেমিকা হয়েও হারমোনিয়ম তারের আটকে পড়ি।
কবি যখন তাঁর কবিতায় - জাহাঙ্গীর মাঝির সাথে জলজ যে সম্পর্ক পালতোলা নৌকায় দাড়
বেয়ে স্বপ্নের খুঁজে, তখনি কবির মন বাক্য, কল্পনাশক্তি প্রেমকে ছাড়িয়ে সমাজ ও জীবন
সাংর্ঘষিক অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। কবি এখানেই সার্থক। যে লেখক তাঁর লেখায় নগর,
শহর, সমাজ- সংকট, প্রত্যয় - চেতনা ও জীবন ঘনিষ্ঠ তুলে ধরতে পারে। তিনিই একমাত্র
শব্দ বুনন- কৌশলে গেঁথে দেয়- জীবন সৌন্দর্যে জন্মের দাগ,নিখুঁত আদি ছায়ার সেলাই।কবি
কবিতায় যখন এসবের সমন্বয় করেন -
জলজ, জোছনা, চাঁদ, পানি এবং ইতিহাসের দেশ তখন কবি হয়ে উঠেন - মাল্টিপল ট্যালেন্ট
বা মাল্টি শব্দ- বাক্য ও গঠনজাতের মূলকারণ। এই ধরনের কাব্যিক সত্তাকে - সুপার
কারিগর বলা বাহুল্য। পড়ুন -
জলের গায়ে হাঁটছে সুপারমুন
হাঁটছে পাটাতন ডিঙি নৌকা
জলজ হতে হতে দাড় বেয়ে জাহাঙ্গীর মাঝি
পানি ও চাঁদের রং হয়ে যায় একাকার
স্বপ্নেরা স্মরণ করায় বৈকালিক হ্দ্যতা।
[ সুপারমুনের জলজ জোছনায়/ পৃ/১৩]
বর্তমানে অনেক কবি- লেখকের লেখা পড়ি। বাস্তব ওসবে বহু গড়মিল
পরিলক্ষিত হয়। যা বাংলা সাহিত্যের সৌন্দর্য,বিশুদ্ধতা, চর্চা, মানবিকতা, দেশপ্রেম
ও সমাজপ্রীতি জলের উপর ভাসমান ফেনা। এক দেউলিয়া মনোভাব বিস্তর ঠাওর করা যায়।
সেক্ষেত্রে কবি মোস্তফা হায়দারের কবিতা উল্লেখিত সব গুণাবলি পাঁচমিশালি লক্ষীর
ঘোমটা। সত্যিই আমি অভিভূত তাঁকে পড়ে। দিন যতই যাচ্ছে - সদাই পোক্ত হচ্ছে তাঁর কাব্য
সাধনা ও সাহিত্যরসের শিল্পরূপ।তাঁর কবিতা "শোলমাছের পাখনায় চড়ে যাচ্ছে
নষ্টদের ঘাড়ে " বুঝতে সহজ - কতটুকু মানবতাবোধ তিঁনি লালন করেন। পড়ুন -
‘মানুষ আর মানবতা অংসাং সুচির লেজ ধরে হাঁটছে
এ বাঁদর আর জাতিসংঘের হনুমানগুলো নিয়ে কাঁদছে
বিশ্বমানবতা
ওরা রক্ত চুষতে চুষতে সোহানের মৃত রক্ত খেয়েই ছাড়ল।’
[ পৃ/ ১৬ ]
কবি হায়দারের কী অদ্ভুত কবি প্রতিভা?
তাঁর যে শুদ্ধিহস্ত, চর্চায় আসক্তি আছে, মেধা- মননে যথেষ্ট স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য
ভরপুর, তা বেশকিছু অন্ত্যমিল ছড়া কবিতা পড়লে বুঝা যাবে। এখানে জাতির পিতাকে নিয়ে, ফাগুন থেকে রক্তঝরা মার্চ, দেশ
নির্বাচন বা ভোট নিয়ে চালবাজি বিবেক ধসের অসাধারণ জ্বালাময়ী বাক্যে তুলে ধরেছেন।
যা সমাজের প্রতিস্তরের মানুষের অপ্রকাশিত ভাষা। পড়ুন বঙ্গবন্ধু কে নিবেদিত কবিতা -
আজকে আমার সাধ হয়েছে
রাতের কাছে
যেতে
ভুলের মাঝে যাদের জীবন
দিবস রাতি মেতে।। ( প্রথমাংশ)
রাতের আলোয় তুমি হাসো
হাসে তোমার জাতি
শেখ মুজিবের কণ্ঠে দেখো
স্বাধীনতার বাতি। ( শেষাংশ)
[ শেখ মুজিবের কন্ঠে দেখো / পৃ/ ২৪)
কবি
হায়দার তাঁর লেখার পিঠে - শব্দ,
বাক্য উপমা,
ও চিত্রপটে যথেষ্ট সচেতন। মেদবর্জিত ছন্দেও পরিপুষ্ট। যা তাঁকে পড়লে ক্লান্তি বা
বিরক্তি আসে না। ঝরঝরা ভাবনায় সহজ ও সতেজ ভাষা - জ্ঞানে তাঁর কবিতাকে গেঁথেছেন।
আমি পাঠক হিসেবে তবুও বলব- ছোটখাটো অসঙ্গতি বা কবিতা শিরোনাম দীর্ঘকেশী, দেখতে
অসুন্দর লাগলেও, পড়তে চমৎকার শোধরায়।আরেকটি জিনিস বেশ চোখ লেগেছে তা হল- কাব্যগ্রন্থের নাম ভূমিকা " চৈতালিপার্বণে
কাঁচা মাংস" শব্দটির কবিতার - শিরোনামের সাথে মিলকরণ বা সামঞ্জস্যতা রাখলে
পড়তে শ্রুতিমধুর শোনাত। তাঁর বেশকিছু প্রবীণ লেখকের প্রতি কাব্য পড়ে - বেশ লেগেছে।
আসলে এই বিষয়টি - নবীণ লেখকদের মগজে নিলে সাহিত্যে আলাদা একটি সৌন্দর্যের সেতু
তৈরি হবে। এবং আমি তাঁকে পড়তে পেরে ধন্য হয়েছি।আপনারা পড়লে নিরাশ হবেন না। সময়ের
বেড়াজাল ছিনিয়ে আপনারাও তাঁকে মগ্ন হতে পারেন।
কবি মোস্তফা হায়দারে কবিতা আশ্রম
দিনদিন ডালপালা ছড়াচ্ছে। সত্যিই এক সৃষ্টিশীল চেতনার অসাধারণ খুশবু। তাঁর এই গতিময় তৃষ্ণা আরও বাঞ্ছা প্রসার হোক।
অনার্স পড়ুয়ার সময়কালীন থেকে
বিরতিহীন কাঁধের এ ঝুলি ৩৬ ইঞ্চি মাপকাঠি ছাড়িয়ে - আরও ভারি হোক। প্রাপ্তি হোক
ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্য পুরস্কার। গ্রাম থেকে দেশ, দেশ থেকে অন্য দেশে প্রসারিত হোক -
তাঁর সাহিত্যভাবনা। রাজ করুক তাঁর কলম সুনামে, রাজত্ব পাক শিল্পবোধ। আমি ক্ষুদ্র
মেধায়,অল্প জ্ঞানে যতটুকু পেরেছি, আমার পাঠক আবেশিত মনে খুদেছি তাঁকে। শতভাগ
চেষ্টায়, উদারমনে। আপনার মন- মেজাজে যদি কোথাও মনে হয়- আমি অতিমাত্রায় এগিয়েছি,
তাহলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি দিয়ে
দেখবেন। দেখুন - জগতে কোন পাঠক, তাঁর পঠিতব্য বইয়ের ১০০% বিশ্লেষণ করতে পারো না।
তাই আগেই মার্জনা চাচ্ছি। আর আমার ভুল হলে - শুধিয়ে দিলে - কলম আরেকটু ধাঁরালো
হবে, মরীচিকা দূর করতে সহজ হবে। জয় হোক সাহিত্যপুষ্ট বাগান, জয় হোক আপনার কলমের।
কাব্যগ্রন্থ : চৈতালিপার্বণে কাঁচা মাংস
লেখক : মোস্তফা হায়দার
প্রকাশক: মো: ইকবাল হোসাইন
ইনভেলাপ পাবলিকেশন্স
প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

0 Comments