‘বর্ণমালা কীভাবে তৈরি হলো’ আবু সাঈদ তুলু’র প্রবন্ধ

 

How was the alphabet created? ~ Abu Saeed Tulu


 

লিখনধারা মানব সভ্যতার ইতিহাসকে তথ্যবদ্ধ করেছে। জ্ঞানের বাহন হিসেবে লেখ্য-উপকরণ আবর্তিত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। মানব সভ্যতায় ইতিহাসে আমাদের এ পৃথিবী ভূখ-ে কখন, কীভাবে মানব যাত্রা শুরু হয়েছিল তা নিয়ে আধুনিক মানুষের ভাবনার শেষ নেই। ধর্ম-দর্শন ও বিজ্ঞান নানাভাবে তা ব্যাখ্যা করে চলেছে। নৃতত্ত্ববিদরা পৃথিবীর প্রাচীনতম মানবজাতিকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন- অষ্ট্রলয়েড, মঙ্গলয়েড, নিগ্রোয়েড ও ককেশীয়। মানব জীবন যাত্রার সঙ্গে ভাষারও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনুমান করা হয়, পুরাতন প্রস্তর যুগে ভাষার সৃষ্টি। এ প্রস্তুর যুগেই মানুষের প্রতিকূল পরিবেশে জীবন-যাপনের জন্য একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময়ের দরকার হয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক শব্দ, পশু-পাখির চিৎকার, গর্জনের অনুকরণে মানুষ আদিম ভাষা সৃষ্টি করেছিল। অনেকে মনে করেন- আদিম মানুষ নানা ধ্বনির অনুকরণ বা সহজাত আবেগ, উচ্ছ্বাস, আনন্দ, বেদনা প্রকাশ, বা প্রজন্মকে শিক্ষার দেবার তাগিদে নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের জন্য ভাষার সৃষ্টি করেছিল। আধুনিক ভাষা বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখান একালেও প্রায় প্রতি ১০ কিমি পর পর ভাষার পরিবর্তন ঘটে থাকে।

ধ্বনি থেকে ভাষার সৃজন হলে স্বভাবতই ভাষার পরে লেখা পদ্ধতির সৃষ্টি। সভ্যতার শুরু দিকে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় বিষয় বোঝানোর সুবিধার্থে ভিন্ন ভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করতো। সে ব্যবহৃত প্রতীক দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতো। এ ব্যবহৃত প্রতীকই পরবর্তীতে বর্ণ/লিপি হিসেবে পরিগণিত হয়। আবিষ্কৃত বিভিন্ন গুহায় অঙ্কিত চিত্রে বিভিন্ন মানুষ, পশুপাখির ছবির সাথে বিভিন্ন রকমের চিহ্ন দেখা যায়। এ চিহ্নই লিপির উন্মেষের প্রথম ধাপ বলে ভেবে নেওয়া যেতে পারে। এসব চিত্র থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, তৎকালীন গুহাবাসী মানুষ কোনো বিষয়কে বোঝানোর জন্য তার ছবি এঁকে অন্যকে বোঝাতো। এর সময়কাল সম্ভবত পুরান পাথর যুগ। পুরান পাথর যুগ থেকে বেরিয়ে ক্রমশ মানুষ নতুন পাথর যুগের দিকে বিকাশমান হতে থাকে। এ সময়কার মানুষের ব্যবহৃত এ প্রতীকগুলি ক্রমশ সাংকেতিক থেকে সাংকেতিক স্তরে পৌঁছে যেতে থাকে। এ সাংকেতিক স্তরে পৌঁছেই লিপি নামে আখ্যা পায়। এ বিষয়ের ধারণা সম্পর্কে সত্যতার প্রমাণ মেলে বিভিন্ন গুহা চিত্রগুলোর মধ্যে একই ধরনের চিত্রসমন্বয় দেখে। প্রতিটি গুহাতেই দেখা যায় তাদের কর্মপদ্ধতি বা জীবনভূমিকা এঁকে এঁকে প্রকাশ করার মানসিকতা। এ থেকে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এ যুগের মানুষ ভাব প্রকাশ করার জন্য বা কোন বিষয় অন্যকে বোঝানোর জন্য চিত্র এঁকে এঁকে বোঝাতো। এ গুহাচিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্পেন ও ফ্রান্সের গুহাচিত্রগুলো।

এ সাংকেতিকতা প্রসঙ্গে একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ও রমাকৃষ্ণ মৈত্র তাঁদের ‘পৃথিবীর ইতিহাস’ গ্রন্থ। তাঁরা দেখিয়েছেন মাত্র কয়েকশ বছর আগে আমেরিকার সাতটি আদিম রেড ইন্ডিয়ান উপজাতি একমত হয়ে আমেরিকা সরকারের কাছে একটি আবেদন পত্র পেশ করে। আবেদনটি কোন শব্দ বা বাক্য দিয়ে গঠিত নয়। কিছু রেখা টেনে একটি সম্পূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ করেছেন। চিত্রে প্রতিটি উপজাতির নিজ নিজ টোটেম প্রতীক অঙ্কিত করে প্রত্যেকের চোখ ও অন্তর একসূত্রে গ্রথিত করে সবার একমত ও একলক্ষ জ্ঞাপন করা হয়েছে। আবেদনে সরকারের কাছে তারা বিশেষ এক এলাকায় মাছ ধরার অধিকার প্রার্থনা করেছিল।

ব্রোঞ্জ যুগের পরবর্তী সময়ে কৃষিকে ভিত্তি করে সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়। সুমেরু সভ্যতায় প্রথম লেখার চিহ্ন প্রতীক ব্যবহার শুরু হলেও পরবর্তী মিশরীয় নগর সভ্যতায় তার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। কৃষিকাজকে প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে মানুষের যে জীবন যাত্রা শুরু হয় তাতে সামাজিক নানা ভাবের স্থায়ীকরণ কিংবা তথ্যবদ্ধতায় লিখে রাখার প্রয়োজন হয়। গুহা জীবনের যে চিত্র ব্যবহার হতো তারই অনুসরণে প্রতীকায়িত লিখন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় সামাজিক প্রয়োজনে মানুষ সম্পদের হিসাব রাখা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ঋণ দেওয়া বা ঋণ ফেরত নেওয়ার জন্য যে চিহ্ন বা স্মারক ব্যবহার করতো তা থেকেই আজকের আধুনিক লিপির উন্মেষ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় - একজন অন্যকে দশটি পশু ঋণ দিবে, কিন্তু কীভাবে মনে রাখবে ঋণদাতা। তাই মনে রাখার বিকল্প হিসেবে লিখে রাখার প্রবর্তন হয়। হয়ত সে সময় ঋণদাতা সে দশটি পশুর ছবি এ^ঁকে রাখতো। যাতে এ দশটি পশুর ছবি দেখলেই বোঝতে পারে যে, দশটি পশু ঋণ দেওয়া হয়েছে। ঋণদাতা যাতে ভুলে না গিয়ে ঋণ আদায় করতে পারে এ জন্যই এরূপ প্রক্রিয়ার প্রবর্তন। সুমেরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা কিন্তু নগরসভ্যতার দিক থেকে মিশরীয় সভ্যতা প্রথম। অঞ্চল হিসেবে সুমেরু মেসোপটমীয় সভ্যতার অঙ্গীভূত একটি অঞ্চল। পরবর্তীকালে মেসোপটেমিয়ায় ব্যাবিলনীয়, এসেরীয়, ক্যালডীয় প্রভৃতি সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল। এই সমুদয় সভ্যতা একযোগে মেসোপটেমীয় সভ্যতা নামে পরিচিত। যদিও সুমেরু সভ্যতায় প্রথম লেখার প্রচলন হয়েছিল বটে তবে, মিশরীয় নগরসভ্যতায় তার বিকাশ লাভ করেছিল। গ্রীফিথ্স তার ‘দি স্টোরি অব লেটার এন্ড নাম্বারস্’ গ্রন্থে মিসরীয় সভ্যতায় ব্যবহৃত লিখন পদ্ধতিকে পৃথিবীর প্রাচীনতম লিপি বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রাচীন মিশরীয়রা ছবি এঁেক এঁকে হিসেব রাখতো। এ সব চিত্রলিপির জন্য ব্যবহার হতো-হাড়, কাদামাটি বা মাটির ফলক, পার্চমেন্ট, ভেলাম, কডেক্স, হাতির দাঁত, কাপড়, পাথর ও প্যাপিরাস। চিত্রের এ লিপিই ‘হায়ারোগ্লিফিক’ (ঐরবৎড়মষুঢ়য) লিপি নামে পরিচিত। যার অর্থ পবিত্র লিপি। ধীরে ধীরে চিত্রের সাথে বিশেষ প্রতীক ব্যবহৃত হতে থাকে। মিশরীয় নগরসভ্যতার স্বর্ণযুগের সুমেরু জাতি গোষ্ঠীর সভ্যতায় যে লিপি ব্যবহৃত হয়েছে তাকে বলে সুমেরীয় লিপি। এ সুমেরীয় লিপির নাম কীলকলিপি (ঈঁহরভড়ৎস)। নরম কাদামাটির চাকটি বা ফলকের উপর অগ্রভাগের ন্যায় বিভিন্ন দাগ কেটে বা ছবি এঁকে এ লিপি উৎকীর্ণ হতো। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত ‘গিলগামেস’এর সময়ের লেখা দেখা যায়। ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের রোজেটা বা রশিদ নামক স্থানে নেপোলিয়নের সৈন্যরা পরিখা খনন করতে গিয়ে ভিন্নধর্মী এক পাথরের সন্ধান পান। পরে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পাঠোদ্ধারে দেখেন এটি পঞ্চম টলেমি রাজবংশের সময় লেখা। এতে কিছু কিছু ভাববাচক অক্ষর ব্যবহার ছাড়াও মূলত চিত্রলিপির পরবর্তী ধাপ দেখা যায়। অনুসন্ধানে দেখা যায় এ রোজেটা পাথরে হায়ারোগ্লিফিক, ডেমোটিক লিপি ও গ্রীক ভাষার অক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। টলেমী রাজবংশ প্রতিষ্ঠার পর সে চিত্রলিপি বা হায়ারোগ্লিফিক লিপির সঙ্গে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বর্ণের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। চারহাজার অব্দের দিকে মিশরীয় সভ্যতায় চিত্রলিপির প্রচলন ছিল বলে প-িতরা মনে করেন। এই চিত্রলিপির সময়কাল কয়শ বছর পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। প-িতরা মনে করেন টলেমি রাজবংশের পূর্ব পর্যন্ত হায়ারোগ্লিফিক লিপি প্রচলন ছিল। আলেকজান্ডার মিশর দখল করলে বহুভাষা-ভাষীর লোকসমাগম হতে থাকে। ফলে লিপি বিবর্তনের ধারায় ভাবলিপি-বর্ণলিপির উন্মেষ ঘটে। চিত্রলিপি পদ্ধতির আরো উন্নয়ন ঘটে এবং মনের সম্পূর্ণ ভাব বা কোন পূর্ণাঙ্গ শব্দ প্রকাশ করতে ক্রমশ চিত্রের বদলে সেই বিশেষ চিহ্নই ব্যবহার হতে থাকে। পরবর্তীতে ক্রীট, প্যালেস্টাইন, ফিনিশিয়া, লিডিয়া প্রভৃতি অঞ্চল মিশর কর্তৃক অধিকৃত হলে এ ধরনের হায়ারোগ্লিফিক লিপি এ সমুদয় অঞ্চলে ব্যবহৃত হতে থাকে।

চিত্র বা চিত্রপ্রতীক প্রণালিতে স্থুল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু ছাড়া কোন সূক্ষ্ম ভাব প্রকাশ অসম্ভব ছিল। তাই পরবর্তী পর্যায়ে সূক্ষ্ম ভাব প্রকাশের তাগিদে ভাবলিপির (ওফবড়মৎধস) উন্মেষ ঘটে। ভাবলিপি অবশ্য কোন স্বতন্ত্র লিপি পদ্ধতি নয়- তা চিত্রলিপির পরিপূরক। এর ফলে চিত্র লিপির চিত্রপ্রতীকসমূহ ক্রমশ ধ্বনিব্যঞ্জক হয়ে ওঠে। এক একটা চিত্র দিয়ে মানুষের মনের ভাব সূক্ষভাবে বোঝাতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় চিত্রলিপিতে মাছের চিত্র দিয়ে মাছ বোঝাতো কিন্তু ভাব লিপি সেই মাছের চিত্রের সঙ্গে তীর চিহ্ন ব্যবহার করে মাছ শিকার করাকে বোঝাতো যার ফলে তাদের মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হতো। এ কারণেই চিত্রলিপি সঙ্গে বিভিন্ন ভাববাচক চিহ্ন ব্যবহার করতো। এ চিহ্নের সমন্বয়ে চিত্রলিপি ভাব লিপিতে রূপান্তরিত হয়।

ভাবলিপিতে চিত্রের সাথে বিভিন্ন চিহ্ন ব্যবহার করে বিভিন্ন ভাব প্রকাশ করা হতো। যেমন-অর্ধবৃত্তের নিচে ‘তারা’ দ্বারা রাত্রি অথবা অর্ধ বৃত্তের নিচে ‘সূর্য’ দ্বারা দিন বোঝানো হতো। পরবর্তী পর্যায়ে এ প্রতিকৃতি সংক্ষিপ্ত ও সাংকেতিক হয়ে একটি বিশেষ চিহ্নে রূপান্তরিত হয়। তখন কোন আক্ষরিক চিত্র এঁকে বিষয় বা বস্তুকে বোঝাতো না। প্রতিটি চিহ্ন সে বস্তুকে না বুঝিয়ে বস্তুর নামবাচক শব্দকে নির্দেশ করতো। যথা- প্রাচীন সুমেরীয় লিপিতে প্রথমে ‘মাছ’ বুঝাতে মাছের চিত্রই আঁকা হতো। পরবর্তীতে মাছের চিত্র একটি বিশেষ চিহ্নে রূপান্তরিত হয়ে যায়; যার সঙ্গে মাছের আকৃতির কোন মিল নেই। এই লিপি থেকে মানুষ তার কাক্সিক্ষত বিষয়টি বোঝানের জন্য চিহ্ন সংক্ষেপকরণ শুরু করে। এই চিহ্ন সংক্ষেণকরণ থেকেই পরবর্তীতে বর্ণলিপি বা আক্ষরিক লিপির সৃষ্টি হয়।

লিপি বিবর্তনের ধারায় চিত্রলিপি থেকে প্রথমে ভাবলিপি বা অক্ষরলিপি এবং তারপরে ক্রমশ বর্ণভিত্তিক লিপির উন্মেষ ঘটে। এই বর্ণভিত্তিক লিপিই বর্ণলিপি হিসেবে পরিচিত। বর্ণমালা ভিত্তিক লিপির উন্মেষ ঘটেছিল ফিনিশীয় জাতিগোষ্ঠীর হাতে। প-িতরা মনে করেন ফিনিশীয় জাতিই প্রথম বর্ণভিত্তিক লিপির উদ্ভাবন করেন। এ লিপিতেই প্রথম বর্ণমালা সংঘটিত হয়। ফিনিশীয় জাতি ছিল মূলত বাণিজ্যগোষ্ঠী জাতি। তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে গমন করতো। ফলে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর সঙ্গে তারা পরিচিতি লাভ করে। তারা বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সব ভাষারই কিছু কিছু অংশ ধারণ করে স্বতন্ত্র লিপির প্রচলন করেন। যাতে যে কোন অঞ্চলের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য করতে বাধা প্রাপ্ত না হয়। এ ফিনিশীয় জাতির সাঙ্কেতিক চিহ্নগুলো সবজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের বাহন হিসেবে উল্লেখযোগ্য। এ জাতির এ স্বতন্ত্র লিপিতেই প্রথম বর্ণ ভিত্তিক লিপির উদ্ভাবন ঘটায়।

খ্রিষ্টপূর্ব আঠারো শতকের ‘আব্দো’ শিলালিপিতে এ বর্ণমালার আদিরূপ পরিলক্ষিত হয়। ফিনিশীয়রা অল্পসংখ্যক চিহ্নরাশির সাহায্যে বহু সংখ্যক জিনিসের হিসাব রাখার জন্য কিউনিফর্ম ও হায়ারোগ্লিফিক লিপির ভিত্তিতে ২২টি ব্যঞ্জনবর্ণের এক বর্ণমালা সৃষ্টি করেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, এতে একটিও স্বরবর্ণ ছিল না। এ বর্ণমালা আবিষ্কারের ফলে পরবর্তীতে চিত্রলিপির সর্বত্র ব্যবহার কমে যায়। বর্ণমালার এক একটি অক্ষর মানুষের কণ্ঠ দিয়ে উচ্চারিত এক-একটি ধ্বনির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। অনেকে অনুমান করেন, খ্রিষ্টপূর্ব সাতশ অব্দের দিকে ফিনিশীয়রা ব্যবসার কারণে তাদের এ বর্ণমালা প্রাচীন গ্রীস ও ভারতীয় সিন্ধু সভ্যতায় ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, ভারতীয় সভ্যতায় স্বতন্ত্র লেখার রীতি তারপূর্বে থেকেই প্রচলন ছিল বলে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

অধ্যাপক হ্যান্সজেনসেন তাঁর ‘সাইন, সিম্বল এন্ড ক্রিপ্ট’ গ্রন্থে পৃথিবীর প্রাচীনতম বর্ণলিপিকে ১২টি ভাগে বিভক্ত করেছেন। অধ্যাপক হ্যান্সজেনসেন প্রাচীন অঞ্চল ভেদে এ লিপির বিন্যন্ত করেছেন। তাঁরা সাতটি লিপিকে পৃথিবীর প্রাচীনতম লিপি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সেগুলো হলো-সুমেরীয় লিপি, মিসরীয় হায়ারোগ্লিফিক লিপি, ক্রিট দ্বীপবাসীর লিপি, হিত্তি লিপি, চীনা লিপি, এলামবাসীর লিপি ও সিন্ধুলিপি।

পৃথিবীর অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার মতো সিন্ধু নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা। দক্ষিণ ভারতে, কাশ্মীরে, এবং বাংলা ও আসাম অঞ্চলে প্রাচীন নব্যপ্রস্তর যুগের কৃষি সংস্কৃতির সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রাচীন ভারতের এ সিন্ধু সভ্যতায় স্বতন্ত্র লেখার রীতি প্রচলিত ছিল। প্রত্নস্থান হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত লিপিতে তার প্রমাণ মেলে। সিন্ধুর সভ্যতার দুটি নগর ছাড়া আর কোন উল্লেখযোগ্য তথ্য আবি®কৃত হয় নি। সিন্ধু সভ্যতার অঞ্চলের আয়তন বিশাল। হিমালয়ের পাদদেশে সিন্ধু অববাহিকায় প্রায় ৯৫০ মাইল জুড়ে উত্তর থেকে আরব সাগরের উপকূল পর্যন্ত ছিল এই অঞ্চল। এই অঞ্চলের আয়তন প্রাচীন মিশরের পুরাতন রাজবংশের সাম্রাজ্যের দ্বিগুণ এবং সুমের” ও আক্কাদের প্রায় চারগুণ। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারের দূরত্ব ছিল ৩৫০ মাইল। এতেই বোঝা যায় সিন্ধু সভ্যতায় বহু নগর গড়ে উঠেছিল যা এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায়। সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেলে শুরু হয়েছিল বৈদিক সভ্যতার। বৈদিক যুগে বেদ, সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ, সূত্র ইত্যাদির চর্চা লক্ষ্য করা যায়। বৈদিক যুগের পরবর্তী পর্যায়ে পৌরাণিক সভ্যতায় রামায়ণ, মহাভারতের চর্চা হতে দেখা যায়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবের মন্টোগোমারী জেলার হরপ্পা অঞ্চলে এবং ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু লারকানা জেলার মহেঞ্জোদারো অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চালিয়ে সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শনের উদ্ধার করেন। সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত নিদর্শনাবলিতে বেশ কিছু সিল (ঝবধষ) পাওয়া যায়। তাতে প্রমাণিত হয়, পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতার মতো সিন্ধু সভ্যতায়ও লিখন পদ্ধতি ছিল। মূলত এ লিখন পদ্ধতিই ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার লিখন পদ্ধতি।

প্রাচীন ভারতীয় লিখন পদ্ধতি ছিল দু ধরনের। একটি ব্রাহ্মী লিপি ও অন্যটি খরেষ্ঠী লিপি। সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত নির্দেশনে তারই প্রমাণকে সুদৃঢ় করে। কিন্তু ব্রিটিশ প্রত্মতাত্ত্বিক ম্যাক্সমূলার মনে করেন- বৈদিক ও পৌরাণিক যুগের সাহিত্যগুলো ছিল শ্রুতিনির্ভর। সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার এখনো সম্ভব হয়নি। প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার জন মার্শাল বলেন ‘মাটির ফলক বা সীলমোহরের বাইরে সিন্ধুলিপির ব্যবহারের বিশেষ নিদর্শন পাওয়া না গেলেও আমরা অনুমান করতে পারি যে, ভূর্জপত্র, তালপাতা, চামড়া, কাঠ বা কাপড়ে সিন্ধু লিপি লিখিত হয়েছিল। কিন্তু সে উপকরণগুলি অপেক্ষাকৃত কম টেকসই হওয়ায় তা কালের অতলে হারিয়ে গেছে।’ মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় প্রাপ্ত কিছু নির্দশন এখনো ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। সিন্ধু সভ্যতায় ২৫০০টি সীলমোহরে চিত্রধর্মী লিপি পাওয়া গেছে। অনেক প-িতগণ অনুমান করেন শুধু মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা নয় ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক স্থানেই এখনো অনুসন্ধান চালালে সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন তথ্য উদ্ধার হবে। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক শ্রী এস. আর. রাও এই লিপির কিছুটা পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। তার পাঠোদ্ধার আবার অনেকটা অনুমান নির্ভর বলা যেতে পারে। তিনি ৩৬০টি শব্দে মধ্যে ৩০টি শব্দের পাঠোদ্ধার করে দেখিয়েছেন, এ সভ্যতার অভিবাসীগণের একটা বড় অংশ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, এবং অপর অংশ ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর। সিন্ধু সভ্যতায় চিত্রলিপি ছিল এবং এ চিত্রলিপি থেকে ভাব লিপি; পরবর্তীতে বর্ণলিপির উদ্ভব ঘটেছে। যা হোক, সিন্ধু সভ্যতায় প্রথমদিকে লেখার জন্য ৩৬০টি চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। পরবর্তীতে এগুলোর বিলুপ্ত হতে থাকে। বহুজাতি মিশ্রণের ফলে এ চিহৃগুলো কমে বর্ণলিপিতে রূপান্তরিত হতে থাকে। সিন্ধু সভ্যতার শেষ সময়ে (হরপ্পার অন্তিম যুগে) চিহ্নের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছিল ২০টিতে। তবে এ ২০টি চিহ্নের সঙ্গে ১৪টিই প্রাচীন ক্যানানীয় অথবা প্যালেস্টাইনীয় এবং ফিনিশীয় চিহ্নের কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়।

ভারতীয় সভ্যতা বিকাশের ধারায় নগর হিসেবে একসময় প্রধান উঠে- তক্ষশীলা, পাঞ্চালা, কোশল, কাশি, পুলিন্দ, বিদর্ভ, মুতাবি, কলিঙ্গ, অন্ধ্র, দ-ক প্রভৃতি। সে সময় ভারত বর্ষের লিখন ধারা নানা নামে পরিচিত থাকলেও দুটো রীতিতেই তার বিকাশ ঘটেছিল-ব্রাহ্মী ও খরেষ্ঠী। অঞ্চলভেদে তার নানারূপে বিকাশ ঘটেছিল। সংস্কৃত ভাসের নাটকগুলো পাওয়া গেছে মালোলিয়াম লিপিতে। একই গ্রন্থ ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন লিপিতে লেখা হতো।

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রাসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রয়েল লাইব্রেরি থেকে ‘চর্যাপদ’ পুঁথিটি আবিষ্কার করে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘হাজার বছরের পুরানো বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে প্রকাশ করেন। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ে ১৯২৬ ঙউইখ-এ প্রমাণ করেন, এ চর্যাগীতির ভাষা বাংলা। নেপালের রাজদরবারে রয়েল পাঠাগারে প্রাপ্ত এ পা-ুলিপি নেওয়ারী লিপিতে লেখা। ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে বৌদ্ধসংস্কৃত ভাষায় লিখিত ‘ললিতবিস্তর’ নামক বুদ্ধচরিতে গ্রন্থে ৬৪টি লিপির নাম দৃষ্ট হয়- ব্রাহ্মী লিপি, খরোষ্ঠী, পুষ্করসারী, অঙ্গলিপি, বঙ্গলিপি, মগধ লিপি, মঙ্গোল্য লিপি, মনুষ্য লিপি, অঙ্গুলী লিপি, শকারী লিপি, ব্রহ্মাবল্লী লিপি, দ্রাবিড় লিপি, কিনারী লিপি, দক্ষিণ লিপি, উগ্র লিপি, সংখ্যা লিপি, অনুলোম লিপি, অর্ধ ধনু লিপি, দরদ লিপি, খাস্য লিপি, চীন লিপি, হুন লিপি, মধ্যক্ষর লিপি, পুষ্প লিপি, দেব লিপি, নাগ লিপি, যক্ষ্মা লিপি, গন্ধর্ব্ব লিপি, কিন্নর লিপি, মহোরগ লিপি, অসুর লিপি, গরুড় লিপি, মৃগচক্র লিপি, চক্র লিপি, বায়ুমুখ লিপি, ভৌমদেব লিপি, অন্তরীক্ষদেব লিপি, উত্তর কুরুদ্বীপ লিপি, অপরগৌড়াদি লিপি, পূর্বাধদেহ লিপি, উৎক্ষেপ লিপি, নিক্ষেপ লিপি, বিক্ষেপ লিপি, প্রক্ষেপ লিপি, সাগর লিপি, বজ্র লিপি, লেখপ্রতিলেখ লিপি, অনুদ্রুত লিপি, গণনাবর্ত লিপি, উৎক্ষপাবর্ত লিপি, অধ্যাহারিণী লিপি, সর্ব্বরুত সংগ্রহণী লিপি, বিদ্যানুলোম লিপি, বিমিশ্রিত লিপি, ঋষীতপস্তপ্তা লিপি, রোচমনা লিপি, ধরণী প্রেক্ষণ লিপি, নিক্ষেপাবর্ত লিপি, সর্ব্বৌষধি নিঃষ্যন্দা লিপি, সর্ব্বসার সংগ্রণী লিপি, গগনপ্রেক্ষণী লিপি, সর্ব্বভূতরুত সংগ্রহণী লিপি, পাদলিখিত লিপি।

জৈনদের ‘নন্দীসুত্ত’ গ্রন্থে ছত্রিশ প্রকারের লিপির উল্লেখ পাওয়া যায়-হংস লিপি, ভূত লিপি, যক্ষ লিপি, রাক্ষসী লিপি, যাবনী লিপি, তুরস্কী লিপি, কীরী লিপি, দ্রাবিড় লিপি, সৈন্ধবী লিপি, মালবী লিপি, নাড় লিপি, নাগরী লিপি, পারসী লিপি, লাটি লিপি, চানক্কী লিপি, অনিমিত্র লিপি, মৌলদেবী লিপি, ল্যাটি লিপি, চৌড়ী লিপি, ডাহলী লিপি, কানড়ী লিপি, গুজরী লিপি, সৌর্ট্টি লিপি, মরহঠী লিপি, কোক্কনী লিপি, খোড়সানী লিপি, মাগধী লিপি, সৈংহলী লিপি, হাড়ী লিপি, হাম্বিরী লিপি, পরতিরি লিপি, মসী লিপি, মহাযোগী লিপি ইত্যাদি।

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে ইউরোপীয় প-িতগণ দাবি করতেন ভারতীয় লিপি ইউরোপীয় গ্রিক কিংবা ফিনিশীয় লিপির দান। তারমধ্যে ম্যাক্সমূলার, উইলিয়াম জোনস, সেবীয় অন্যতম। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে দেখা যায়- আবিষ্কৃত সিন্ধু লিপি ভারতীয় সভ্যতার নিজস্ব সম্পদ। কারো অনুকরণ নয়। সিন্ধু লিপি থেকেই ব্র্হ্মাী লিপির উদ্ভব এবং ভারতীয় লিপি সমূহের বিস্তার। ব্রাহ্মী লিপির প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় পিপ্রাবা ও বলী নাম দুটি অভিলেখে, যা খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে উৎকীর্ণ। শতকে সম্রাট অশোকের সময়কালে ভারতীয় উপমহাদের পশ্চিমাংশ ছাড়া সর্বত্র ব্রাহ্মী লিপির প্রচলন ছিল। অনেকে এই লিপিকে ‘পালি লিপি’ বা ‘ভারতীয় পালি লিপি’ ‘অশোক লিপি’ বলে থাকেন। জানা যায়- তক্ষশীলায় খরেষ্ঠী লিপির প্রচলন ছিল। তক্ষশিলায় প্রাপ্ত অশোকের শিলালিপিটি খরেষ্ঠী লিপিতে।

পৃথিবীতে লিপির উৎপত্তি সম্পর্কে নানা জনশ্রুতি আছে। অনেকের মতে, দেবতা ব্রহ্মার কাছ থেকে প্রাপ্ত বলেই এ লিপির নাম ব্রাহ্মী লিপি। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ব্রাহ্মণদের লিপি বলে কিংবা ব্রহ্মা দিয়েছেন বলে এর নাম ‘ব্রাহ্মী লিপি’। আবার অনেকে মনে করেন, বাম দিক থেকে ডান দিকে লেখা হতো বলে এর নাম ‘ব্রাহ্মী লিপি’। রোমানদের বিশ্বাস, তাদের লিপি দেবতা ‘মার্কারি’র কাছ থেকে তাদের ব্যবহৃত রোমান লিপি প্রাপ্ত। গ্রীকদের মতে, ক্যাডমাস নামক প্রাচ্য দেশীয় এক দেবতা য়ুরূপা নাম্নী রমণীর সন্ধানে গ্রীসে আগমন করেন এবং তিনিই সাথে নিয়ে আসেন বর্ণমালা। মিসরীয়গণ মনে করেন, তাদের লিপির আর্বিভাব ঘটেছে তাদের লিপি দেবতা ‘থথ’এর দানে। অনুরূপভাবে ব্যাবিলনীয়রা বিশ্বাস করে, দেবতা ‘নেবো’ এর কাছ থেকে তাদের বর্ণমালা প্রাপ্ত। চীনাদের মতে, তাদের লিপি ‘সাংচিয়েন’ নামক চার চক্ষুবিশিষ্ট ড্রাগনমুখী দেবতার প্রদত্ত।

অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ব্রাহ্মী লিপি হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব সম্পদ। অশোকের অনুশাসনের অনেক পূর্ব থেকেই ভারতীয় সভ্যতায় ব্রাহ্মী লিপির প্রচলন ছিল। সম্রাট অশোকের সময় প্রচলিত ব্রাহ্মী লিপির বিবর্তিত রূপ কুটিল লিপি থেকে বাংলা লিপির উদ্ভব হয়েছে বলে প-িতগণ মনে করেন। মহোমহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৩২৭ বঙ্গাব্দের সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় ‘বাংলার পুরাণ অক্ষর’ প্রবন্ধে লিপি বিবর্তনের ছক তুলে ধরে দেখান কালক্রমে কীভাবে ব্রাহ্মী লিপি থেকে পরবর্তীকালে বাংলা লিপির আকার লাভ করল, তার সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও দেওয়া আছে। তার ছকটির মাধ্যমে দেখা যে, ব্রাহ্মী লিপি চারটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়ে পঞ্চম স্তরে বাংলা অক্ষরে পরিণত হয়েছে। ব্রাহ্মী লিপির বিবর্তনের ইতিহাসে পরবর্তী দুটি প্রধান স্তরের নাম কুষাণ লিপি (১০০-৩০০ খ্রিস্টাব্দ) এবং গুপ্ত লিপি (খ্রিস্টীয় ৪র্থ থেকে ৫ম শতক)।

মৌর্যোত্তর কালে সম্ভবত মধ্য এশিয়া থেকে ইউচি নামে এক জাতির লোক ভারতবর্ষে এসে আস্তানা ফেলে। এই জাতি পাঁচ ভাগে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। কালক্রমে এই পাঁচ শাখার মধ্যে এক অনুন্নত যাযাবর শাখা মাথা তুলে এশিয়া থেকে বারাণসী পর্যন্ত সাম্রাজ্য গড়ে তুলে। এরাই কুষাণ জাতি নামে ইতিহাসে খ্যাত। এ কুষাণ জাতির ব্যবহৃত লিপিই কুষাণ লিপি। খ্রিষ্টীয় প্রথম থেকে তৃতীয় শতক পর্যন্ত কুষাণ রাজাদের আমলে কুষাণ লিপি প্রচলিত ছিল। কুষাণ রাজাদের নামানুসারে ব্রাহ্মী লিপি বিবর্তিত হয়ে কুষাণ লিপিতে রূপ নেয়। কুজুল কদফিস (কধফঢ়যরংবং) নামে এক দলপতি বাকি চার শাখাকে পরাজিত করে নিজেকে ওয়াং বা রাজা বলে ঘোষণা দেন। এই কুজুল কদফিস (কধফঢ়যরংবং) বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন এবং বৌদ্ধের বাণী চারদিকে ছড়িয়ে দেন। এ কুষাণ জাতি প্রচারিত ও প্রচলিত মুদ্রা ও লেখা নাম দেন ‘কুষাণ মুদ্রা’ এবং ‘কুষাণ লিপি’। এ লিপিতে ‘ক’ ‘চ’ ঝ‘ ‘ড’ ‘দ’ ন’ ‘প’ ‘য’ বর্ণের সংক্ষিপ্ত মাত্রার ব্যবহার দেখা যায়। পরবর্তীতে কুটিল লিপি কোন রাজবংশের প্রভাব ছাড়াই ষষ্ঠ থেকে নবম খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। এ লিপির অক্ষর ও স্বরের মাত্রা অনেকটা কুটিলাকৃতির বলে নামকরণ কুটিল লিপি হিসেবে অনেকে উল্লেখ করতে চান।

দশম শতকে বিনায়ক পালের তাম্রফলকে প্রথম বাংলা লিপি দেখা যায়। তবে সে বাংলা লিপির বর্ণগুলো আজকের দিনের মতো পরিপক্ক নয়। বহু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে দশম শতকের শেষভাগে মূল বাংলা বর্ণমালায় পরিণত হয়। ড. রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, অচিন্ত্য বিশ্বাস, দীনেশচন্দ্র সেনের প্রবন্ধের ভাষ্য অনুসারে বাংলা বর্ণমালার জন্মক্রম প্রসঙ্গে একটি ছক তৈরি করা যায় এভাবে-অষ্টম শতাব্দী : ধর্মপালের ‘খালিশপুর’ তাম্রশাসন, নবম শতাব্দী : নারায়ণ পালের ‘বাদাল’ স্তম্ভলিপি, দশম শতাব্দী : প্রথম মহীপালের ‘বাণগড়’ তাম্রশাসন, একাদশ শতাব্দী : তৃতীয় বিগ্রহপালের ‘আমগাছি’ তাম্রশাসন, দ্বাদশ শতাব্দী : বিজয় সেনের ‘দেওয়াপাড়া’ শিলালিপি।

খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে পূর্বাঞ্চলীয় কুটিল লিপির বিবর্তন শুরু করে দশম শতকে এসে পূর্ণাঙ্গ বাংলা বর্ণের আকারে রূপান্তরিত হয়। এ কারণে অনেকে মনে করেন-বাংলা বর্ণমালার প্রথম সার্থক নির্দশন প্রথম মহীপালের (৯৮০-১০৩৬ খ্রি.) বাণগড় দানপত্রে এবং কম্বোজের রাজা নয়পাল দেবের (১০৩৬-১০৫৩ খ্রি.) ইর্দার দানপত্রে। বিজয় সেনের (১০৯৮-১১৬০ খ্রি.) দেওপাড়ার খোদিত লিপিতে এই মূল বাংলা বর্ণমালার আরও উৎকর্ষ পরিলক্ষিত হয়। পঞ্চদশ শতকের বোধিচর‌্যাবতার গ্রন্থে বাংলা লিপির পূর্ণ বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। এ সময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। ১৫শ-১৬শ শতাব্দীর শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের লিপিকে পূর্ণ বাংলা লিপিতে লেখা বলে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের লিপিকর ছিলেন কৃষ্ণপঞ্চানন। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ পশ্চিম বঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রামে বৈষ্ণব মহান্ত শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র-বংশজাত দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধিত পুঁথিটি গোয়ালঘর থেকে অযত্নে রক্ষিত অবস্থায় আবিষ্কার করেন। অনুমান করা হয়, সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাংলা লিপি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেই প্রথম সার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

মুসলিম শাসক গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (১৩৮৯-১৪১০) এর পৃষ্ঠপোষকতায় শাহ মুহম্মদ সগীর অনুবাদ করেন ইউসুফ-জোলেখা, জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ (১৪১৮-৩১) পৃষ্ঠপোষকতায় কৃত্তিবাস অনুবাদ করেন ‘রামায়ণ’, রুকনউদ্দিন বারবক শাহ (১৪৫৯-৭৪) এর পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু রচনা করেন ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১) এর পৃষ্ঠপোষকতায় জৈনুদ্দিন রচনা করেন ‘রসুল বিজয়’ আলাউদ্দিন হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯) এর পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা মঙ্গলকাব্যের ধারার বিকাশ ঘটতে থাকে। আরাকান কেন্দ্রিক দৌলত উজির বাহরাম খান ‘লাইলী-মজনু’ দৌলত কাজীর ‘সতী ময়না-লোরচন্দ্রানী’ আলাওলের ‘পদ্মাবতী’, ‘সপ্তপয়কর’, কোরেশী মাগন ঠাকুরের ‘চন্দ্রাবতী’ উল্লেখ্যযোগ্য। এ সময় প্রায় সর্বত্র বাংলা লিপির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ষোড়শ শতকের দিকে বাংলায় পালা-কীর্তন প্রভৃতির প্রাধান্য দেখা যায়।

নবম খ্রিষ্টাব্দের দিকে চীনে প্রথম মুদ্রণ যন্ত্রের প্রচলন হয়। তবে তা আধুনিক মুদ্রণ যন্ত্রের মতো ছিল না। একধরনের অক্ষর তৈরি করতো পাতকে দীর্ঘক্ষণ গরম করে কোন বস্তুর উপর ছেঁকা দিয়ে ছাঁচ তৈরি করে। পরে তাতে রং লাগিয়ে চেপে ধরে ছাপাতো। চীনের এ প্রাক-মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় পোড়ামাটির ফলক, ভেলাম, পাথর, ভূঁর্জ্যপত্র, ধাতুর পাত ইত্যাদির ব্যবহার হতো। কিন্তু ছাপার এ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছিল জার্মানে। অনুমান করা হয়, ১৪৪৮ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানীর মেঞ্জ শহরে মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপন করেন জোহান গুটেনবার্গ, জোয়ান ফাস্ট নামক এক ধনী স্বর্ণকারের কাছে থেকে অর্থ ঋণ করে ল্যাটিন ভাষায় ভালগেট বাইবেল নামে একটি গ্রন্থ মুদ্রিত করেন। এটিই ছিল ১৪৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপে প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ। ভারতীতে প্রথম মুদ্রণ যন্ত্র আমদানী করেছিল পর্তুগীজরা। পর্তুগীজরা ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে জেবিয়াতে বসতি স্থাপন করার পর সেখানে দুটি ছাপাখানাও স্থাপন করেন। গোয়ায় মুদ্রিত প্রথম বইটি পর্তুগীজ ভাষায় রচিত যার নাম ‘কনুকসোজ’। ১৮০০ সালে ইংরেজরা যখন আগ্রা দখল করে তখন সেখানে একটি মুদ্রণ যন্ত্র পাওয়া যায়। তা থেকে অনুমান করা হয় মোঘল রাজ্য চালনার সঙ্গে ছাপাখানা জড়িত ছিল। আর ভারতীয় রাজ-রাজাদের মুদ্রাগুলোও ছিল পাঞ্জ খোদাই বা ছাপা। মেজল ইয়নু নামে জনৈক ইংরেজ সেনাধক্ষ্যের বিবরণীতে জানা যায়, মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্ আলম এই ছাপাখানা স্থাপন করেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী শাসনাধীন হলে পাশ্চাত্য থেকে সিভিলিয়ানরা এদেশ শাসন করার জন্য আসে। কিন্তু ভাষাগত কারণে শাসন কর্তৃত্ব পর্যদস্ত না নয় সেজন্য সিভিলিয়ানদের বাংলা ভাষা শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা হয়। এ সূত্র ধরেই ব্রাসি ন্যাথানিয়েল হ্যালহেড রচনা করেন অ এৎধসসধৎ ড়ভ ঃযব ইবহমধষ খধহমঁধমব। এ রচনার বাংলা অংশ ছাপানোর জন্য তার বন্ধু সিভিলিয়ান ও প্রাচ্য তত্ত্ববিদ চার্লস উইকিন্সকে দায়িত্ব দেন বাংলা টাইপ তৈরি করার জন্য। চার্লস উইকিন্স বাংলা প্রাচীন পা-ুলিপির বর্ণকে অনুসরণ করে বাংলা অক্ষরের নকশা ও তাতে প্রথম পাঞ্জ খোদাই করেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের বর্ণের স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনিকেই প্রধান রূপে অবলম্বন করেন। ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে লিসবন শহর থেকে প্রকাশিত হয় হ্যালহেডের অ এৎধসসধৎ ড়ভ ঃযব ইবহমধষ খধহমঁধমব। এতেই প্রথম বাংলা বর্ণ ছাপার অক্ষরে বের হয়। তারপর ধীরে ধীরে ভারতীয় উপমহাদেশে বিকাশ ঘটতে থাকে মুদ্রণ শিল্পের। পরে শ্রীরামপুর মিশনারী কর্তৃক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হলে জাত লিপিকর পঞ্চানন কর্মকার বাংলা অক্ষরকে বিন্যাস ও মুদ্রণ উপযোগী করেন। উইলিয়াম কেরির তত্ত্বাবধানে এ ছাপাখানার মূল লক্ষ্য ছিল যিশুর প্রচারিত বাণীকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রসঙ্গ উল্লেখ্য যে, এ পঞ্চানন কর্মকারের পরিবারের মধ্যেই বাংলা হরফ তৈরি তথা ছাপাখানার কাজে প্রায় ৭০ বছর প্রাধান্য ছিল। বংশানুক্রমে পঞ্চাননের পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র কর্মকার এবং তার পুত্র রামচন্দ্র কর্মকার বাংলা ছাপাশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটান। ছাপার প্রথম দিকে স্বরবর্ণ ব্যবহৃত হতো ১৬টি। মদনমোহনের শিশুশিক্ষা বইতে স্বরবর্ণ ১৬টিই ব্যবহৃত হয়েছে। সেগুলো হলো- অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ,ঋৃ, ৯, ৯৯, এ, ঐ, ও, ঔ. অং, অঃ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শিক্ষাদানের লক্ষ্যে ‘বর্ণপরিচয়’ গ্রন্থের মাধ্যমে আজকের বর্ণমালা সন্নিবিষ্ট করেন। বিদ্যাসাগর স্বরবর্ণ কমিয়ে নিয়ে আসেন ১২টিতে। আর ব্যঞ্জন বর্ণে নতুন কয়েকটি বর্ণ যোগ করেন। অনুস্বর ও বিসর্গকে সর্বত্র স্বরবর্ণ ধরা হলেও বিদ্যাসাগর এ দুটো বর্ণকে ব্যঞ্জনবর্ণ হিসেবে সন্নিবেশিত করেন।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরীসহ অনেকেই বাংলা বর্ণমালা নিয়ে নানা নিরীক্ষা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অ্যা’ যেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, তেমনি ‘৯’ ‘অং’ ‘অঃ’ সহ নানা বর্ণ বাদও গেছে। এভাবে নানা নিরীক্ষা ও পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে আজকের এ সময়ে আমরা ১১টি স্বরধ্বনি ও ৩৯টি ব্যঞ্জনধ্বনি নিয়ে গঠিত বর্ণবিন্যাসে বাংলা ভাষাকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি। আধুনিক মুদ্রণপ্রক্রিয়া আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীর সমস্ত লেখ্য শিল্পের শুরু হয় নব পথ চলা। প্রাচীন হাতে লিখিত পা-ুলিপি বদলে সর্বত্র বাহন হয়ে ওঠে ছাপার অক্ষর। ফলে বর্ণ একটি নির্দিষ্ট অক্ষয় মাত্রা ধারণ করে।

মুদ্রণ যন্ত্র ব্যবহারের ফলে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় বাংলা লিপির বিবর্তন। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে বাংলা লিপির প্রকৃতরূপ অপরিবর্তিত রেখে ক্রমাগত বিভিন্ন প্রকার শৈল্পিক রূপ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলা বর্ণ অভিন্ন রেখে শৈল্পিকতার দিক থেকে হয়েছে ভিন্ন এবং গঠন হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন লিপিসুষমা। বর্তমানে সুতুন্ননি, সেহরী, বিজয়, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, অভ্র প্রভৃতি নামে শৈল্পিক বর্ণধারা তৈরি হচ্ছে। মুদ্রণযন্ত্র ক্রমশ আধুনিক থেকে আধুনিকতর হচ্ছে। কিছুদিন আগেও জনপ্রিয় মুদ্রণযন্ত্র গুলো ছিল- কর্ড, হাইডেলবার্গ ইত্যাদি। বর্তমানে ডিজিটাল প্রিন্টিং মুদ্রণ কাজের প্লেট মেকিং, প্রসেসিং ও অফসেট মুদ্রণের ঝামেলার দূর করে দিয়েছে। ইন্টারনেটেও বাংলা ভাষা ব্যবহারের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। এখন মানুষ মুখে কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে তা ছাপার অক্ষরে বের হওয়া সম্ভব। প্রযুক্তিগত দিক যত উন্নয়ন হচ্ছে বাংলা লিপির মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে শৈল্পিক বিকাশের দিকেই ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে।

 

তথ্যসূত্র

১) পৃথিবীর ইতিহাস, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/রমাকৃষ্ণ মৈত্র  

২) ভাষা বিজ্ঞানের ইতিহাস-অধ্যাপক মোহাম্মদ নুরুল হক

৩) লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায়- আবু সাঈদ তুলু

৪) বর্ণমালার উদ্ভববিকাশ ও লিপিসভ্যতার ইতিবৃত্ত, দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা 

৫) বিশ্ব সভ্যতা- এ. কে. এম. শাহনাওয়াজ 

৬) মানুষের ইতিহাস- আবদুল হালিম/নূরুন নাহার বেগম

৭) পা-ুলিপি পাঠ ও পাঠ-সমালোচনা-মোহাম্মদ আব্দুল কাইউম 

৮) প্রাচীন পৃথিবী- এ কে এম শাহনাওয়াজ

৯) ভারতবর্ষের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্যযুগ) প্রথমখ-, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

১০) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (১ম-৭ম খ-) অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

১১) বাংলা পিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি, সিডি ভারসন

১২) বাংলা পুথির কথা, অচিন্ত্য বিশ্বাস

Post a Comment

0 Comments