কুশল ভৌমিক এর গুচ্ছ কবিতা

A collection of poems by Kushal Bhowmik


জল ও সমুদ্র 


চোখের জলের কোনো রঙ নেই 
একটা গন্ধ আছে
গন্ধের কোনো নাম থাকতে নেই।

উপাস ও উপাসনার তফাৎ 
আমাদের মা কোনোদিন টের পায়নি
এইসব অমীমাংসিত ব্যাকরণের ভেতর 
মৃত্যুর ইশতেহার নিয়ে 
আমাদের জন্ম হয় প্রতিদিন। 

সাদা কাগজে দুটো দাগ দিয়ে নদী আঁকতেন মা
নদীর ভেতর চুপচাপ শুয়ে থাকতেন বাবা 
বাবারা নদী না সমুদ্র  সে প্রশ্ন দু'হাতে সরিয়ে 
কেবল দাগগুলো অনিবার্য ঢেউ। 

মায়ের থেকে পাওয়া জলের গন্ধ
বাবার সমুদ্র হয়ে শুয়ে থাকা
স্রেফ এটুকু সম্বল নিয়েই 
আমার কবিতার কলম
অন্য কোনো কৌশল জানা নাই।





অলজ্জ দুঃখগুলো


একটা ট্রেন চলে যাবার পর
মফস্বলের স্টেশনটা যেমন শুরু করে অস্থির পায়চারি  
হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় যাত্রীদের বাড়ি
আমার মন খারাপগুলো ঠিক তার বিপরীত। 
কেমন যেন ঘরকুনো, শত গঞ্জনা সয়েও সংসারে পড়ে থাকা বাঙালি বউ
ভাঁজে ভাঁজে দাগ পড়ে যাওয়া পুরনো শাড়ি
মুখ গুজে শুয়ে থাকে আলমিরায়।

তারপর বহু বহুদিন পর তালা ভেঙে বের করে আনি
জানালা খুলে দিয়ে বলি-বিদেয় হ
নাছোরবান্দা দুঃখগুলো
দুলতে থাকে বারান্দায়, রেলিঙে, কার্নিশে
ইলেকট্রিক পাখায়, ফুলের টবে, এটোবাসনে 
ভাঙা কাঁচের টুকরোর মতো ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে 
নিজস্ব ভঙিমায়। 

উপায়ান্তর না দেখে দুঃখের টুকরোগুলো 
পুটলিতে বেঁধে তুলে রাখি আলমিরায়
যেভাবে সতর্ক রমণী লকারে ভরে রাখে
স্বর্ণালঙ্কার। 




খুন

 
চলো, আমরা দুজন মিলে 
খুন করে ফেলি 
আমাদের সীমাহীন ব্যস্ততাগুলো  
অকারণ দম্ভ 
দূরত্বের দীর্ঘশ্বাস 
আর সূচ হয়ে ঢুকেপড়া 
তৃতীয়পক্ষের অনাবশ্যক আস্ফালন। 
যেহেতু খুন করার জন্য 
আমাদের  মজুদ আছে 
ভালোবাসার মতো
একটি ধারালো অস্ত্র। 

এসো প্রকাশ্যে খুন করে 
আমরা একে অপরের কাছে 
আত্মসমর্পণ করি। 

তারপর ---
আমাদের সাজা হয়ে যাক
একই ছাদের তলায় 
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।




তিস্তা যেদিন ভাগ হয়ে যায়


তিস্তা যেদিন ভাগ হয়ে যায়
বাতাসের বিপরীতে দোল খায় টাঙ্গাইল ও হুগলী 
সীমান্তের মতো সম্পর্কগুলোও আটকে থাকে
বর্ডারলাইন বরাবর -কাঁটাতারে। 

গঙ্গার জল একই নিয়মে গড়িয়ে পড়ে পদ্মায়
একই বাতাসে দুলতে থাকে
যশোর রোডের শতবর্ষী বৃক্ষ 
রবীন্দ্র-নজরুল একই দ্যোতনায় দূর করে দেয়
যাবতীয় সেমিকোলন, হাইফেন 
কেবল ভিসা অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে 
দিদাইয়ের চোখের জল 
রাষ্ট্রের ভেতর তৈরি করে নো-ম্যানস ল্যান্ড! 
ভদ্রেশ্বর সি,সি,চ্যাটার্জি রোডে ছড়িয়ে পড়া
বড়ো মামার দীর্ঘশ্বাস 
গঙ্গা পদ্মা যমুনা পেড়িয়ে আছড়ে পড়ে 
সদুল্যাপুর স্কুল মাঠে
আঁজলা ভরে সেই দীর্ঘশ্বাস মা তুলে দেয় 
দিদাইয়ের আঁচলে। 

সেই থেকে দিদাই জানে
তাঁর হৃৎপিন্ড বরাবর কেউ চালিয়েছে করাত 
এপার-ওপার 
মাঝখানে তিস্তার জল 
টকটকে লাল...




যাদুকর 


স্কুল পালিয়ে মঙ্গলবার এলেই 
রসুলপুর হাঁটে ছুটে যেতাম
হরেণকাকা হরেকরকম ম্যাজিক দেখাতেন
কাউকে ডেকে বোতাম খুলতেই
কখনো চকলেট 
কখনো কবুতর 
কখনো বেড়িয়ে পড়তো সুগন্ধি গোলাপ

আমিও ম্যাজিশিয়ান হতে চেয়েছিলাম নরেণ কাকা
নতজানু হয়ে তোমার মতো করে 
কতবার খুলে নিয়েছি মানুষের বুকের বোতাম

পরশ্রীকাতরতা ছাড়া আজ অব্দি কিছুই বেরুলো না!

Post a Comment

0 Comments