দীপা বর্মন এর গল্প সোনাগাজী

Sonagazhi  the story of Deepa Burman


সোনাগাজী বরাবরের মতই খিটখিটে মেজাজের মানুষ।বাড়িভর্তি একপাল ছেলেপিলে। দাপাদাপি। চিৎকার, চেঁচামেচি। খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি। একজন আরেকজনকে তেড়ে আসছে। কিলঘুষি ছুড়ে মারছে। একজন আরেকজনের পিঠে ধারালো নখের আঁচড় বসিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে।এসব দেখে শুনে আজীবনই সোনাগাজীর মেজাজটা চড়ে থাকে সপ্তমে।সোনা একটা কাঁচা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তেড়ে যায়- 
ঐ- ঐ বদমাইশের দল- বাইর অ, বাইর অ বাড়িত্ থেইক্যা - বাইর অ কইলাম।অই আভাগির পুতাইন,দুইন্নাইত কতো মানুষ কতোবায় মরে,তরার মরন অয়না? মর তরা, মর।ডাইরিয়া, উলাউডায় মর। মর, মর, বজ্জাতের দল। ছেলেমেয়েগুলোকে সোনাগাজী বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে দিয়ে হাঁপাতে থাকে। বাঁশের কঞ্চিটা উঠানের এককোণে গোয়ালঘরের দিকে ছুড়ে ফেলে। কাঁধের গামছাটা ঝেরে আবার কাঁধের ওপর রাখে। লুঙ্গির খুটটা আলগা করে পরিপাটি করে পরে।বড় উঠানের তিনদিক দিয়ে তিনটি বড় বড় আধাপাকা কেওয়াড়ি ঘর ।এতগুলো ঘর বছরখানেক আগেও ছিলো না। ছিলো কেবল উত্তর ভিটার ঘরখানা।যার মাঝখানে ক্যাচা বাঁশের বেড়ার পার্টিশন দেওয়া। সেই ঘরের বারান্দায় জলচৌকির ওপর বসে দুই হাতের তালুতে মাথা গুঁজে খুকখুক করে কাশছে সত্তর বছর বয়সী হাসান গাজী। কাশতে কাশতে তার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে। বুকের পাঁজর উঠানামা করছে হাঁপানি রোগীর মতো। হাঁপানি রোগীর মতো কেন; সে তো হাঁপানি রোগীই। সোনাগাজী একবার আড়চোখে তার বাপের দিকে তাকায়। মনে মনে গজগজ করে।সত্তর  বছর বয়সী মানুষটাকে তার কাছে চরম শত্রু মনে হয়। হাসান গাজী সবই বোঝে। তবু সাহস করে ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ ফুটে দুকথা বলতে পারে না। মুখবন্ধ করে ছেলের অগ্নিমূর্তি দেখে যায় গোপনে। সোনাগাজী বাপের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে কপালে হাত ঠেকায়। আকাশের দিকে তাকায়।মাথার ওপর গনগনে সূর্যটা অনেকটা হেলতে শুরু করেছে। মেজাজটা দ্বিগুণ চড়ে যায়। আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে রান্না ঘরের সামনে গিয়ে গলা চড়িয়ে ডাক চিৎকার করে- 
বাড়িত্ কি কেউ নাই কিতা?খাওন দাওন কি পাইয়াম?
আলতাবানু একটা মাদুর হাতে দৌড়ে আসে।পূবের ভিটার ঘরের বারান্দায় মাদুরটা পেতে দেয়। সোনাগাজী বুঝতে পারে সোনাই বাড়িতে নেই।তাই কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ মাদুরে বসে। আলতাবানু অনেকটা দৌড়ে দৌড়ে তার সামনে খাবার এনে হাজির করে।সোনা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।কতোইবা বয়স হবে এই মেয়ে মানুষটার?  বড় জোর তার থেকে বয়সে বছর দশেক বড় হবে? সোনার বয়স যখন দশ বছর, তখন কী এক অজানা অসুখে তার মা মারা যায়।চল্লিশা পার হতে না হতেই তার বাপ হাসান গাজী আলতাবানুকে বিয়ে করে নিয়ে আসে।যদিও গায় গড়নের সাথে আলতাবানু নামের কোনো মিল নেই। বিয়ের দশ বারো বছরের মধ্যে ছয় সাতটা ছেলে মেয়ে জন্ম দিয়ে এদের তত্ত তালাশি করে করে সে এখন দেখতে ষাট বছরের বুড়ির মতো হয়েছে। সোনাগাজী তাকে কোনদিন মা বলে ডাকেনি।তাই বলে অসম্মানও করেনি। তার যতো রাগ বাপ হাসান গাজীর ওপর। আলতাবানুকে ঘরে আনার পরও মানুষটা আরো দুটো বউ এনেছিলো। কিন্তু হাসান গাজীর অত্যাচারে তারা টিকতে পারেনি। নিজেদের জীবন নিয়ে পগারপার হয়েছে। আলতাবানু কি কম অত্যাচার সহ্য করেছে? বালক বয়সী সোনা সব দেখেছে। এখন তার মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, তার মায়ের মৃত্যুর জন্য হয়তো তার বাবাই দায়ী।সোনা নিজেই গামলা থেকে থালায় ভাত তরকারি তুলে নেয়। অনেকটা আনমনা হয়ে ভাত খায়। খেতে খেতে আলতাবানুর হাতপাখার আলতো বাতাসে আরামবোধ করে।ত্রিশ বছরের যুবক সোনাগাজী মনে মনে কী যেনো ভাবে আর নিঃশব্দে হাসে। দৃশ্যটা আলতাবানুর চোখ এড়িয়ে যেতে পারে না।সে হাতপাখাটা থামিয়ে দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে ছেলের দিকে তাকায়। সোনাগাজী জানে সোনাই কোথায় গিয়েছে। পাঁচ বছর হলো সোনাই এ বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে।আর সেদিন থেকেই সোনাগাজীর বউ তার বাবা মায়ের দেওয়া নামের খোলস ছেড়ে সোনাই হয়েছে। বাড়ির সবাই, এমনকি পাড়ার লোকেরাও তাকে সোনাই বলেই জানে। সেই সোনাই মা হওয়ার আকুলতায় বিভোর। তার সে আকুলতা ভরা মুখখানির কথা মনে হতেই সোনাগাজীর চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে। তার মনের গহীনেও যে বাবা ডাক শোনার ব্যাকুলতা মোচড় দিয়ে ওঠে। বিয়ের বছরখানিক পরেই সোনাগাজীর বাবা হবার বাসনা জেগেছিলো। কিন্তু ,একসাথে একই ঘরে শাশুড়ি ছেলের বউ পোয়াতি হবে, সেটা কেমন যেন সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড! তাই সোনাই আর সোনাগাজী ইচ্ছে করে তাদের বাসনায় জল ঢেলেছে। এতোদিনে হয়তো আলতাবানুর কোলে না হলেও আরো একটা কঁচিশিশু থাকতো। কিন্তু সেবার,যখন সোনাই এবাড়িতে বউ হয়ে আসার পর শাশুড়ি আবার নতুন করে মা হলো; সোনাগাজী আর সে পরামর্শ করে আলতাবানুকে না জানিয়ে লাইগেশনটা করিয়ে নিয়েছিলো। আর সে জন্য, শেষ সন্তান জন্মের সময় আলতাবানুকে বাড়িতে না রেখে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলো। এজন্য স্বামী স্ত্রী দুজনকে কম ছলনার আশ্রয় নিতে হয়নি।পড়শীরা বলেছে সোনাগাজী বউয়ের সাথে ষড়যন্ত্র করে সৎমায়ের সর্বনাশ করেছে।আলতাবানুকে কলংকিনী বানাইছে।পেট কাইট্টা  তারে পাপের ভাগী করছে।পাড়াপড়শীর এসব কথা শুনে হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়ে একাকার হয়ে হাপুস নয়নে সোনাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে  বুকউজার করা নিঃশ্বাস ফেলে ফেলে হয়রান।সোনাই তার শাশুড়িমাকে মৃদু ধমকের সুরে বলেছে- আহ! আম্মা আর কতো, নিজের শরীলডার কথা একবার ভাবুইনচে? এই বয়সেও
যদি বছর বছর পোলা বিয়ান- বাঁচবাইন ? কনচে? যেডা অইচে, আমনের বালার লাইগ্যাই অইচে।অহন রাহুইনচে আমনের কান্দাকুডি।অমনিই আলতাবানুর কান্না থেমে যায়।সে সোনাইয়ের মুখের দিকে  তাকিয়ে বিস্মিত চোখে মাথা নাড়ে।
: হ- সোনাই টিঅই কইচো। আমারও কি মনচা( মন চায়)? কিন্তুক, কী হরাম কও? কিচতা যে বুজিনা !
: হ-আর বুজনের কাম নাই।অহন শান্ত অইনচে।
শাশুড়ি আলতবানুর পালা ক্ষান্ত করে সোনাই সেই থেকে মরিয়া হয়ে আছে নিজের শরীরের ভেতর আরেকটা শরীরের অস্তিত্ব টের পেতে।বিধি বাম । তার আকাঙ্ক্ষার দুয়ারে আলোর ছটা এখনও উঁকি দেয়নি । কতো বৈদ্য কবিরাজের জরিবটির রস উদরপূর্তি করছে, গলায় মাদুলি বেঁধেছে। শাশুড়ি আলতবানুও কম যায় না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে দোয়া দরুদ করছে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।সোনাইয়ের কোলজুড়ে এখনো একটা আবু মানে ছোট্ট শিশু আসলো না বলে তার মনেও কষ্ট কম না। সোনাইকে সে কখনো সতীনের ছেলের বউ বলে মনে করেনি,করেও না।সোনাইও তাই।আলাভোলা শাশুড়ি আলতবানুকে একটু বেশিই ভালোবাসে। তার জন্য দুঃখবোধ হয়। আলতাবানুর স্বল্পবুদ্ধিতার কারণে তাকে আরো বেশি আপন মনে হয়। সোনাগাজী  তাকে কোনদিন মা বলে না ডাকলেও,দরদ কম নয়। শুধু এর বহিঃপ্রকাশটুকু নেই।গাজী আনমনে টিপেটিপে ভাত খাচ্ছে আর সোনাইয়ের কথা ভেবে মিটমিট করে হাসছে। হঠাৎ আলতাবানুর সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। আলতাবানুর তখনও বিস্ময় কাটেনি।সোনাগাজীর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।সোনা হতচকিত হয়ে গোগ্ৰাসে ভাত খায়। হঠাৎই মেঘের মতো গর্জন করে ওঠে। গর্জন শুনে আলতাবানু তার সমস্ত শরীর ঝাঁকিয়ে চমকে ওঠে। সোনাগাজী মুখের খাবার ফেলতে ফেলতে রক্তাভচোখে বলে-
: এ্যাঁহ,ওয়াক - ওয়াক, এইতা খাওন নানচে( রান্না করেছে) কেলায়? এ্যাঁ -এইতা আঁসের( হাঁসের)খাওন? এ্যাঁ- নানচে কোন বান্দির ঝি?
আলতাবানু হাতপাখাটা মাটিতে রেখে একটু দূরে গিয়ে, মুখে আঁচল টেনে ভীতস্বরে আলতো করে বলে- 
: বাজান,নানচে আমনের বউ বান্দির ঝি।
আলতাবানু বরাবরই সোনাগাজীকে আদর করে আপনি সম্মোধন করে। তার কথায় ক্রোধের আগুনে যেন জল ঢেলে দেয় কেউ।সোনা একটু নড়েচড়ে বসে। বলে- 
: বাহ! বেশ বেশ।ডাইল কহনও মোরগ অইতে পারে?
তার এমন পরিবর্তনে আলতাবানুর চোখ চড়কগাছ । খেতে খেতে সোনা লক্ষ্য করে, সে বেখেয়ালে ভাতে লবণ মাখিয়েছে বেশি।সে আবার ঘোরের মধ্যে ডুবে যায়। দেখতে পায় দক্ষিণের গোপাট মানে পায়ে হাঁটার গ্ৰামের মেঠো পথ ধরে তার সোনাই ঘরে ফিরছে। কোলে তার চাঁদের মতো ফুটফুটে এক শিশু।নরম নরম হাত পা নড়েচড়ে ওঠছে। সোনাগাজী একমুখ হাসি নিয়ে সোনাইয়ের সামনে যায়। চোখে মুখে তার জোছনার খই ফুটছে।শরীরজুড়ে ফাল্গুনের হাওয়া। সে তার বউয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। আলতাবানু সোনাইয়ের কাছে গিয়ে সারা গায়ে হাত বুলিয়ে প্রশ্ন করে-
: কবিরাজ কী কইলো?
ততোক্ষণে সোনাগাজীর ঘোর কাটে।ভাতের থালা থেকে হাত উঠিয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে।সোনাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের মুঠো খুলে আলতাবানুর চোখের সামনে কয়েকটা তাবিজ তুলে ধরে।

Post a Comment

0 Comments