মাহবুব উল আলম-এর গুচ্ছ কবিতা

A bunch of poems by Mahbub ul Alam




কলি

কেমন করে ভুলব সেই স্মৃতি
বেঞ্চের ওপর উপুড় হয়ে লিখছিলে 
অনাবৃত হলে কদম ফুলের কলি
মৃদু চাপড় পড়ল তোমার পিঠে
চমকে উঠে উঠলে তুমি বসে
আবৃত হল সেই সে কলি
কবেকার কথা আজও ভুলিনি
চাপড়ের কারণ কখনও জাননি
কবে হল সে কলি পুষ্পিত সৌরভ
তাও জানিনি
স্মৃতিটা শুধু মনের মাঝে গুণগুণ করে
সুরভিত সৌরভ ছড়ায়
গুণগুণিয়ে মনের বনে ভ্রমর গায়
ফিরে ফিরে পায় সে কায়
তাই ত ভুলতে নাহি পায়
তুমি তা জানবে না কোনদিন
নেই তার কোন চিন
মাঝে মাঝে স্বপ্ন মনে হয়
তবু পায় কেন সে কায়
এ এক বিস্ময়




এই

এই যদি হবে তবে কেন এসেছিলে
ভালবেসেছিলে কাছে টেনেছিলে
কোমল পেলব পেঁজাতুলো
কেন তবে দেখিয়েছিলে
জ্যোৎস্নাধোয়া দুগ্ধধবল
নরমরোদে মেলেছিলে
কোমল কোমল এলোচুল 
বাতাসে কেন ভাসিয়েছিলে
মন আমার দুলিয়েছিলে
এই হবে জানতেই যদি
কেন তবে খেলেছিলে
দুধসাদা দেখিয়েছিলে
পেখম কেন মেলেছিলে
ময়ূরের মত নেচেনেচে
মন কেন ভুলিয়েছিলে
এই যদি ছিল মনে
কেন তবে ডেকেছিলে
দিনের পর রাত
রাতের পর দিন
সমস্ত রাত
তারপর সমস্ত দিন
তুমি আমায় দিয়েছিলে
তোমার কানের দুলে দোলা লেগে
দুলেছিল তন
ভরেছিল মন
কেন আমায় নিয়েছিলে
অতল গভীর গহীন বনে
কতকাল দেখি না খোঁপাভাঙা হাসি
পাই না সুঘ্রাণ কাঁঠালচাঁপা
শরীরে জড়াইনি সুখের চাদর
কতকাল অনাহারে হয়েছি কঙ্কাল
ফিরেও তাকাওনি
জলকপাট ভেঙে আসবে বলে
তোমার সোহাগী নাও কখনও ভাসাওনি
না যদি আসতে কাছে 
জীবন হত অন্যরকম
না যদি ডাকতে কাছে 
জীবন হত অন্যরকম
তুমি মারলে মরতেই হয়
তাই মরেছি সেই মরণ
পেয়েছি আমি এই জীবন
খুঁজে খুঁজে দুঃখ কষ্ট বাছে
খোঁজে কাউকে কাছে
আসিবে না জেনেও সে
খুঁজে খুঁজে খুঁজে মরে
আদিম সেই জ্বরে
অনেক কিছুই ফেরে
নদীতে জোয়ার ফেরে
শুকনো ডালে পাতা মেলে
শুকনো চরে বান ডাকে
রাত্রি শেষে দিন হাসে
অমাবস্যায় তারা জ্বলে
পূর্ণিমা ফিরে আসে
মেঘের কোলে চাঁদ খেলে
তুমিই শুধু ফেরো না
পেছন ফিরে তাকাও না
সেই বানে ভাসো না
এমন বানে সবাই মরে
চিরকাল স্মরণ করে





চকিত

চকিত চাহনি দেখত কি দেখত না
আমি বুঝিতে পারিনি
দৃষ্টিতে বিদ্যুৎ ছিল কি ছিল না
আমি বুঝিতে পারিনি
এমন দৃষ্টি আমি কখনও দেখিনি
আড়নয়নে চাওয়া ভাল লাগেনি
আড়নয়নে চাওয়ার মানে বুঝিনি
এখন একটু একটু বুঝতে পারি
এরা কিছু দেখে না পুরোপুরি
সব কিছু দেখে চুরি করি
চোর চোর ভাব ভাল নয়
ভাল সব হয় তাতে ক্ষয়
সোজাসুজি এরা দেখতে পারে না
কেননা মন এদের একটুও সোজা না
দোলাচলবৃত্তিতে ভোগে এরা
বেঁচে থেকেও এরা মরা
সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না
সোজা পথ সোজা দেখে না
তাই সোজা পথে চলতে পারে না
তাই ভাল কভু হয় না
এমন চকিত চাহনি ভাল না
চাহনি হত যদি মিষ্ট
হতাম হয়ত তিষ্ঠ




কলি


সুন্দরী লো সুন্দরী
চল চল পথ চলি
মনের যত কথা বলি
ভরে ফেলি সব থলি
ফোটাই মনের সব কলি
মাড়িয়ে যত পথের ধুলি
মিলনের গান শুনি
চুপিসারে কুসুমচয়ন
সুধামুখে কথার বুনন
ঢেউদোলা কুসুমশয়ন
উচাটন বড়ই নয়ন
বইবে সেথা মৃদু পবন
উড়িয়ে নেবে গাত্রবসন
তৃপ্ত হবে উভয় নয়ন
ধন্য হবে কুসুমকানন
কুসুমবনে ফুটবে কলি
গোপন ঘরের দুয়ার খুলি
দেহ মোদের দুলি দুলি
ভরবে মোদের মনের থলি
ফুলে আমরা যাব ভরি
পরস্পরকে আদর করি
সোহাগভরে দুলি দুলি




স্বর


সেই স্বর ভুলব কেমন করে
সেই স্বর সারা মন জুড়ে
সেই স্বর শরীরে কথা কয়
শরীরে জ্বালা সদা ধরায়
সুগন্ধ হয়ে বুকে কাঁপন জাগায়
শরীর অবশ করে
বাতাসে ঢেউ খেলে যায় জলে
সরোবরে পদ্ম ওঠে দুলে
সে স্বর আর শুনিনি কোনখানে
তাই বান ডাকেনি মনে
তাই ফুল ফোটেনি বনে
জোনাকি জ্বলেনি তনে
যেই শুনেছি মৃদু সেই স্বর
উঠেছে মনে ভালবাসার জ্বর
সেই জ্বর চলল জীবনভর
স্বর শুনলেই দেখতাম গোলাপ গাছ
কোকিল কণ্ঠ গাইত কানের পাছ
স্বর শুনলেই ফুটত তাতে ফুল
যেন কানে দোলে হীরার দুল
স্বর শুনলেই উঠক কেঁপে বুক
তাতেই ছিল আমার যত সুখ
স্বর একসময় পেলব হাত হয়ে ওঠে
সবুজ সাপের মত আমার গলা পেঁচিয়ে ধরে
স্বর একসময় মধুমাখা ওষ্ঠ হয়ে
মত্ত মধু ছড়াতে থাকে
মৃদু কোমল পেলব সেই স্বর
অনন্ত বৃষ্টির ছোঁয়ায় মোহনীয় প্রশান্তি
ঘাসফুলের কোমল সঙ্গীত
নদীর কলকল বয়ে চলা
সেই স্বর কখনও ভুলবার নয়
ত্বকের ভেতর
রক্তের ভেতর 
মেঘের ভেতর
আমার অন্তর্গত দেহের ভেতর
কাঁঠালচাঁপার সুবাস ছড়ায়
মৃণাল হয়ে কণ্ঠ জড়ায়
আমার গলায়
আমার মুখে
আলতো পরশ বুলায়
গভীর আদরে
আলোতে
অন্ধকারে
সেই স্বর কখনও ভুলবার নয়
সুরেলা সেই স্বর
আমার মুখে নিঃশ্বাস ফেলে
অন্তর্গত আমার ভেতর
কোমল মসৃণতায় প্রবেশ করে
কখনও জোয়ারের জল
কখনও জলপ্রপাত
কখনও বর্ষা বৃষ্টি হয়ে ঝরে
কখনও মেঘের ডাক
কখনও ঝর্ণার গান
কখনও দোয়েল হয়ে ডেকে ওঠে
পদ্ম হয়ে ফুটে ওঠে
ময়ূর হয়ে পেখম তুলে নাচে
সুরেলা কণ্ঠ ঘাই হরিণী হয়ে ওঠে
আমি অবশ হয়ে যাই
অসীম মধুরতায় ডুবে যাই
আবেশবিহ্বল তনুমন
কলকাললিতে মুখর হয়ে ওঠে
শুনব আবার স্বর
আনব আবার জ্বর




আগুন

বুকের মাঝে তুষের আগুন
ধিকিধিকি জ্বলে
তোমার দেখা পাওয়ার আশায়
চলি নানান ছলে
বিষণ্ন মেঘ নেমে এলে
আকাশের তারা কথা বলে
মরণ যখন আসবে আমার
সবই যাবে জলে
বুকের মাঝে তুষের আগুন
জ্বলবে ধিকিধিকি
তোমার আকাশে তারা
করবে ঝিকিমিকি
তোমার দেখা পাওয়ার আশায়
চলব নানান ছলে
জানি আমি জানি ওগো
মালা দেবে না মোর গলে
তুষের আগুন নিয়ে বুকে
জ্বলব ধিকিধিকি
খরাভরা জীবন আমার
চলেছি যে বয়ে
তোমার দিকে হাত বাড়িয়ে
রয়েছি তাকিয়ে
এভাবেই কাটবে সারা জীবন
খরায় আমার পুড়বে তনুমন





বিবাহ

ঘুরেফিরে এলো আবার সেই দিন
যেদিনে ছিল না সুখের কোন চিন
এমন বিবাহ যেন আর কারো না হয়
কারো জীবন এমনি করে হয় না যেন ক্ষয়
রসাবেশে ভাসতে আরেক বাসর চাই
সদা জাগে ভয় পাই কিবা না পাই
এমন বিবাহ আগে দেখেনি ক কেউ
স্বামীর ডাকে দেয় না সাড়া বউ
ধাড়ি মেয়ে শুইয়ে দেয় দুজনের মাঝে
এমন বাসর দেখেছে কেউ আগে
জোনাকি জ্বলে না বাসর রাতে
কিছুই জোটে না স্বামীর পাতে
সারারাত থাকতে হয় একই কাতে
যেন সারা শরীর ধরেছিল বাতে
জোয়ারে তরী পারে না ক বাইতে
ঐ রাতে পাল্টে গেল বিবাহের মানে
জগতের যত অনল জড়ো হল মনে 
কারো যেন না হয় এমন দুখের গীত গাইতে
মিলন ছাড়াই ডুবতে যেন না হয় শীতের রাতে





বাসর

এমন বাসর না যেন পায় কেউ
আমার মত কাঁদে না ভেউ ভেউ
তোমরা যদি শোন তবে
থাকতে চাইবে না এই ভবে
বাসর তোমরা চাইবে না কেউ
জানলে কাঁদবে ভেউ ভেউ
এমন বাসর হল কেন আমার
জানতে কি ইচ্ছে হয় তোমার
জানতে যদি চাও তবে শোন
সবই ভাগ্য বলে মেনো
ধাড়ি মেয়ে শুইয়ে দিল মাঝে
দুজনে দুপাশে পেলাম না কাছে
দুঃসহ যন্ত্রণায় কাতরাই সারারাত
সারাজীবন হয়ে রইলাম কাত
এমন বাসর হয় না যেন কারো
কেউ যেন এমন হয় না মরমর





যখন

যখন তোমার ঠোঁটে আলতো ঠোঁট ছোয়ালাম
কই কেঁপে উঠলে না ত
অথচ আমাকে এরকমই বলা হয়েছিল
নাভিতলে হাত রাখলে 
কই শিহরিত হলে না ত
অথচ আমাকে এরকমই বলা হয়েছিল
কবোষ্ণ বুকের বোঁটায় নখাঘাত করলে
কই থরথর করে উঠলে না ত
অথচ আমাকে এরকমই বলা হয়েছিল
তাহলে যা বলা হয় সবই কি সত্যি নয়




ঝড়

মনের মধ্যে যখন ঝড় উঠল
গর্জন করে সমুদ্রের জল ধেয়ে এলো
পুকুরের পূব পাশের তালগাছটা
একবার উত্তরে একবার দক্ষিণে
লুটোপুটি খেতে লাগল
বাজ পড়তে লাগল কড়কড় করে
বাতাস বইতে লাগল শাঁ শাঁ করে
বিজলী চমকে চমকে উঠল
বুকের মধ্যে আগুন দাউদাউ করে জ্বলল
কাশবন ধরাশায়ী হল বায়ুদাপটে
ভেসে গেল স্বপ্নের দুপুর প্রবল জলোচ্ছ্বাসে
তাতানো লোহায় কামারের ত্বরিত আঘাত
খালখসা ছাগলের অনুভূতি
এক চিলতে জ্যোৎস্নার অপেক্ষায 
কাটে সহস্র বছর
যা হবার তা হতে দেয়াই ভাল
কাঁকন ভেঙে গেলে জোড়া না লাগানোই ভাল
বৃথাই আকাশের সীমারেখা খোঁজা
বৃথাই ভয়ে চোখ বোঁজা
ঝড়ের পর নির্মল আকাশে নীল
সানন্দে ওড়ে সেথায় চিল
সমীরণে দুলে ওঠে টলটলে ঝিল
কিন্তু আমার মনে উঠেছে যে ঝড়
মনের ডালপালা ভাঙে মড়মড়




উষ্ণতার জন্যে

পুলকভরে ডাক দিয়ে যায় 
বাসন্তী হাওয়া
কোন্ ছলে আমার 
তোমার কাছে যাওয়া
তোমার তরে প্রাণ আমার
করে আইঢাই
মন আমার বলে কেবল 
ওরে নাই নাই
বুকের মাঝে মাদল বাজে
প্রাণের মাঝে গন্ধ ভাসে
নরম রোদে আবেগ আসে
উতল প্রাণে আজ আমি 
যাব তোমার কাছে
বসব আমি কোলটি ঘেঁষে
আদর করে মাথা আমার
নেবে কোলের পরে
উষ্ণ হয়ে তোমার জন্যে
তৈরি আমি হব
কানে কানে ফিসফিসিয়ে
মনের কথা কব
উষ্ণ সাদর অনুরাগে
তুমিও উতল হবে
আদর সোহাগ মাঝে তুমি
অতলে তলিয়ে যাবে
এই উষ্ণতার জন্যে আমরা
সহস্র বছর হেঁটেছি
হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত আমরা
গন্তব্যে কি পৌঁছেছি
হয়ত সেদিন আসবে
অথবা আসবে না
সেই দিনের অপেক্ষায়
তাই বলে কি থাকব না
নইলে যে বাঁচব না
চলতে চলতে ভাল বাসতে বাসতে
একদিন তোমার কাছে পৌঁছে যাব
পাখির মত বুকে নিয়ে
সোহাগাদরে ভরিয়ে তোমায় দেব
উষ্ণতার জন্যে কাছে আসতে হয়
কাছাকাছি হলে উষ্ণতা পাওয়া যায়






যদি

যদি শুনতেই হয় তোমার কথা শুনব
যদি মানতেই হয় তোমার কথা মানব
তুমি ছাড়া আর কেই বা আছে বল
তুমি আমি দুজনে একসাথে যাই চল
তুমি ছাড়া আর কার কাছেই বা যাব
তোমার জন্মদিনে এই কথাটিই বলব
ভালো আর সুখে থেকো এটাই ত চাইব
জগতের যত সুখ সারা অঙ্গে মেখো
মনের মত যা যা চাও সবই তুমি চেখো
চিরকাল ঢলঢলে টলটলে থেকো
অন্যের কথা না ভেবে নিজের কথাই ভাবলে
কারও জন্য না করে নিজের জন্যই করলে
তবুও তোমার জন্যই রইল সব শুভাশিস
তোমার জন্যই রইল যত আছে কিসমিস





পারলে
তোমার জন্য কিছুই করার নেই আমার
সুযোগ যদি থাকত 
সুখের সাগরে ভাসিয়ে দিতাম 
সামর্থ যদি থাকত
রাজপুরী বানিয়ে দিতাম 
কিন্তু তুমি ত জান
কত নিরুপায় আমি
কিন্তু তুমি যা জান না তা হল
কত নিস্ফল হতাশায় নিমজ্জিত আমি
সুযোগ পেলে নিয়ে যেতাম 
সুন্দরবন আর হরিণহাটায়
শান্তিডাঙার আলপথে হেঁটে যেতাম
তোমার হাত ধরে
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে
পা ডুবাতাম তোমায় সাথে নিয়ে
তুমি ত জান 
তোমাকে অদেয় কিছুই নেই আমার
কেবল তুমিই পারলে না নিতে
আমায় নিয়ে পারলে না পথ চলতে






ভাল

দাপটে সুখ তোমার ভাল
সর্বগ্রাসী মন তোমার    ভাল
পদভারে চলতে চাও    ভাল
মেদিনী কাঁপাতে চাও    ভাল
দেমাগ দেখাতে চাও    ভাল
কুকাজ করতে চাও      ভাল
অসৎ হতে চাও          ভাল
উৎকোচ নিতে চাও      ভাল
টাকা কামাতে চাও ভাল
ল্যাং মারতে চাও        ভাল
পিশাচ হতে চাও        ভাল
নেই কোন বাধা ভাল
শুধু আমার ঘাড়ে না পড়লেই  ভাল




ইচ্ছে

আমাকে তোমার ভাল লাগতে পারে
আবার নাও লাগতে পারে
কিন্তু কেমন লাগে বড় জানতে ইচ্ছে করে
আমাকে তুমি আপন ভাবতে পার
আবার নাও ভাবতে পার
কী ভাব বড় জানতে ইচ্ছে করে
আমাকে ভালবাসতে পার
আবার নাও বাসতে পার
বাস কিনা বড় জানতে ইচ্ছে করে
তোমার মনে আমি কী
বড্ড জানতে ইচ্ছে করে
একটা কথা বলতে বড্ড ইচ্ছে করে
আদরে আদরে পারি তোমায় ভাসাতে
সোহাগচাদরে নতুন করে সাজাতে
বীণা তোমার তারে বাজাতে
জানবে না আর কোনদিন
তোমার জগৎ যে আজ ভিন

Post a Comment

0 Comments