আতিদ তূর্য’র কবিতা

 

Poems by Atid Turya



শতবর্ষী মায়া


'সেই যে গণ্ডগোলের বছর
তহন তোর বাপের বয়স আট।'
চোখ বুঁজে আঁকা হয়ে যাচ্ছে দৃশ্যপট।
আমার জন্মের কথা উঠতেই কালো গাইয়ের বাছুরের জন্মকথা বলা হয়ে যায়। 
ছানিপড়া চোখে ফেলে আসা সময়ের জাল বুনতে থাকে দাদু। 
সন্ধ্যারাতে কাঁপা হাতে অতীত পেষেন হামানদিস্তায়।
বাপ-চাচাদের দালান করার জায়গায়
বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দাদুর নিজহাতে লাগানো আমগাছ।
বড়েচাচার সমবয়সী গাছ সময়ের সাথে হয়ে উঠেছে দাদুরই অন্য এক ছেলে। 
বৃদ্ধের আপত্তি সবাই মিলিয়ে দেয় হাওয়ায়।
সময় গড়ায় আর বিচলিত হতে থাকে আমার শান্তস্বভাবের দাদাভাই। 
সেদিনের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত এলেই কাঁচামিঠে আমগাছটার গায়ে ঠেস দিয়ে বসে থাকতো দাদু।
বাকলে হাত রেখে কি যেন গোপন বাতচিত চলতো বৃক্ষতনয়ের সাথে। 
পাঞ্জাবির খুঁটে দূর থেকে দাদুকে মুছতে দেখা যেত চোখ।
গাছকাটার দিন এলে দাদুকে আমরা দেখি না কোথাও।
পারিবারিক গোরস্তানে খুঁড়তে হয়েছে নতুন একটি কবর। 







স্বপ্ন নয় সত্যি 


ধরো, ভরসা করবার মানুষ বলতে তোমার এখন আর কেউ নাই।
ধরো, জনবহুল এক দ্বীপে তুমি বন্ধুহীন হয়ে পড়ে আছো।
ধরো, ফুলে ওঠা জীবনঢেউয়ের সাথে তুমি লড়ছো একা।
ধরো, তোমাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে সবাই।
ধরো, তোমার কলিগেরা সবাই মিলে তোমাকেই বানিয়েছে বলির পাঠা। 
ধরো, তোমার আপন ভাই কৌশলে নিজের নামে লিখে নিয়েছে পৈত্রিক সম্পদ।
ধরো, তোমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে চেনা মানুষজনের কাছে।
ধরো, তোমার স্ত্রী নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্নে বিভোর।
ধরো, অসুখে আর বিপদে তোমার পাশে থাকবে কেবল তুমি। 
ধরো, বাজার থেকে ফেরার পথে 
ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মাঝে রাস্তা থেকে তোমাকেই দুর্বৃত্ত সন্দেহে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ।
ধরো, সারাজীবন শান্তিপ্রিয় থাকা তোমার বিরুদ্ধে খুনের চার্জশিট আনা হয়েছে।
ধরো, অসংখ্য ইস্যুতে ব্যস্ত থাকায় তোমাকে নিয়ে নিউজ করার সময় পায়নি মিডিয়া হাউজগুলো। 
ধরো, মহামান্য রাষ্ট্রপতি তোমার প্রাণভিক্ষার আবেদনে সাড়া দেননি। 
ধরো, তোমার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী খেতে দেওয়া হয়েছে পদ্মার ইলিশ আর বগুড়ার দই।
ধরো, জমটুপি পরানোর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তুমি ভেবেছো ঘুমটা নিশ্চয় ভেঙে যাবে এখনি।
ধরো, এটা কোনো স্বপ্ন ছিলো না। 






অভাব


বাজারে দরদাম করছিলে সেদিন।
ইলিশের কেজি পনেরশো করে দিলে দোকানিকে জানিয়েছিলে বড়ো দুটো কিনে নেবে।
পোশাকি শাড়িতে তোমার নাকের ডগায় জমেছিলো মুক্তোর ঘাম। 
বৃষ্টি শেষের মাছবাজারের জল-কাদা মাড়িয়ে যাচ্ছিলো ফরসা দুটো পা।
রিক্সা ডেকে নিলে স্বভাববিরুদ্ধ উপায়ে, 
ভাড়াটা আগে থেকে ঠিক না করেই। 
বাসার নিচে পৌঁছালে, 
দড়ির একপ্রান্তে বেঁধে রাখা ব্যাগে  
ভুলে ফেলে যাওয়া প্রধান ফটকের চাবি পাঠাবে আমাদের একমাত্র ছেলে।
পোশাকি শাড়ি পাল্টাতে তুমি ঢুকবে স্নানঘরে।
'বেলা পড়ে গেছে রান্না চাপানো হলো না, ছেলেটার পড়াশোনায় দিনদিন বাড়ছে অমনোযোগ, কাজের মেয়েটি আসেনি আজ নিয়ে তিনদিন, বাড়িওয়ালাকে জানাতে হবে সিঙ্কে পানি আটকে যাওয়ার খবর'
এমন গুরুতর চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে ঝরনার নিচে ভিজতে থাকবে তুমি। 
...  সমস্ত কাজ সেরে রাতে তুমি বিছানায় যাবে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে। 
তোমার ক্লান্ত মাথা বালিশে রাখলে মেট্রোপলিটন ঘুম নেমে আসবে চোখের পাতায়।
তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকবে বছর চারেকের পোষা পাশবালিশ।
এই দুর্মূল্যের বাজারে তোমার আরো একটি ইনক্রিমেন্ট হয়ে গেলো আজ। 
আদরের শূন্যতা ছাড়া 
অভাব শব্দটি আজকাল তোমার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না।

Post a Comment

0 Comments