কুশল ভৌমিক এর প্রবন্ধ


আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের নাম শামসুর রাহমান। তাঁর কবিতা আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছে কবিতা লেখার। একলব্যের মতো আমি তাঁকে অনুসরণ করেছি, তিনি আমার দ্রোণাচার্য। 

শামসুর রাহমান সমাজ ও রাজনীতি সচেতন কবি। অভাবনীয় শব্দের বুননে অনায়াসে তাঁর কবিতা ছুঁয়ে দেয় হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশ। নাগরিক জীবনের সুখ, দুঃখ মিলন,বিচ্ছেদের সহজ সরল অথচ গভীর আখ্যান তার কবিতায় প্রতিধ্বনিত হয় স্বতন্ত্র স্বরে। বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশের পরে স্বতন্ত্র স্বর বা কাব্যভাষা নির্মাণে তিনিই অগ্রগামী। উনার সমকালে কিংবা পরবর্তীকালে অন্য কারো সাথে উনাকে তুলনা করাটা এক ধরনের প্রজ্ঞাহীনতা। শব্দের আদর, কল্পচিত্রের মূর্চ্ছনা আর মিথলজির এমন পরিমিত,অনবদ্য প্রয়োগ ও মিশ্রণ অন্য কোনো কবির মধ্যে দেখা যায় না। তিনি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের এবং বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। 

শামসুর রাহমান যে সময়ে কবিতা লিখেছেন, সেই সময়ের অভিঘাত,টানাপোড়েন, দ্বিধা দ্বন্দ, রাজনৈতিক সংঘাত, জন আকাঙক্ষা তাঁর মতো করে আর কারো কাব্যেই প্রতিফলিত হয়নি।শামসুর রাহমান মগজে মননে চিন্তায় চেতনায় সবসময়ই আধুনিক। সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা তাঁর কবিতায় উজ্জ্বল ।

কবি লিখেছেন– 

‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, 

এবার আমি গোলাপ নেবো।

গুলবাগিচা বিরান ব’লে, 

হরহামেশা ফিরে যাবো,

তা’ হবে না দিচ্ছি বলে।

ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, 

এবার আমি গোলাপ নেবো।'

আমাদের জাতিগত বিকাশ ও আবির্ভাবের প্রতিটি স্তর শামসুর রাহমান স্পর্শ করেছেন নিপুণ দক্ষতায়। আমাদের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে আমাদের ফিরে যেতে হয় তাঁর কবিতার কাছে--

'বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা' 

৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে নিহত আসাদ অমর হয়ে থাকেন তাঁর অবিনাশী পংক্তিমালায়--

‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিম্বা সূর্যাস্তের

জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট

উড়ছে হাওয়ায়, নীলিমায়।

বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে

নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো'

বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর তিনি লিখেন 'ইলেকট্রার গান' গ্রিক মিথলজিকে সমসাময়িক পটভূমিতে এমন করে আর কে সংযোজিত করতে পেরেছিলেন---

'নিহত জনক অ্যাগামেমনন কবরে শায়িত আজ' 

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা শামসুর রাহমানের এই কবিতাটি নান্দনিক সৌন্দর্যে এতটাই প্রোজ্জ্বল যে আমরা কাব্য শক্তির কাছে শ্রদ্ধায় অবনত হই বারবার--

‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?

তেমন যোগ্য সমাধি কই?

মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো

অথবা সুনীল সাগর জল–

সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই।

তাইতো রাখি না এ লাশ আজ

মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,

হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই'

শামসুর রাহমান এর লেখা 'স্বাধীনতা তুমি' এবং 'তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা' এই কবিতা দুটি এখন আর নিছক কবিতা নয়, আমাদের চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

'স্বাধীনতা তুমি 

রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার ' 

স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নিহত নূর হোসেনকে নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন। অর্থাৎ আমাদের জাতীয় চেতনার মুখপাত্র হয়ে প্রগতিশীলতার মশাল হাতে তিনি অগ্রণী প্রতিবাদে বিপ্লবে, প্রতিরোধে। 

কেবল কি রাজনৈতিক বা উচ্চস্বরের কবিতা? নাগরিক জীবনের সামগ্রিকতা- প্রেম,দ্রোহ, সংকল্প, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা কী নেই তাঁর কবিতায়। দশক বিভাজনে তিনি পঞ্চাশের কবি কিন্তু সমকালীনতাকে শতভাগ ধারণ করেও তিনি সময়ের চেয়ে অগ্রগামী। তা সে বিষয়বস্তুতেই হোক, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, অলঙ্কার আর মিথ ব্যবহারের মুন্সিয়ানাই হোক,কিংবা চমকপ্রদ শব্দের ব্যবহারই হোক, অক্ষরবৃত্ত ছন্দের নান্দনিক ব্যবহার ও অভিনবত্ব সৃষ্টিতেই হোক, বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমান এক ও অনন্য। তাঁর ' কখনো আমার মাকে', 'যদি তুমি ফিরে না আস', 'সায়োনারা',সহ অজস্র কবিতা বাংলা সাহিত্যের অমর সম্পদ।

এলিজাবেথিয় যুগকে ছাপিয়ে যেমন তা পরিচিত সেক্সপিয়রের যুগ হিসাবে,রোমান্টিক যুগকে ছাপিয়ে যেমন ওয়ার্ডসওয়ার্থ এর যুগ তেমনি বাংলা সাহিত্যে শামসুর রাহমান একটি যুগের নাম। 

এদেশে ইদানিং কেউ কেউ শামসুর রাহমান এর প্রতিপক্ষ হিসাবে কবি আল-মাহমুদকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন এবং বিষয়টি বহুলাংশেই রাজনৈতিক। তাদের অভিযোগ শামসুর রাহমান এখন আর প্রাসঙ্গিক নন এবং রাহমানের অধিকাংশ কবিতাই রাজনৈতিক। আল-মাহমুদ অবশ্যই অনেক বড় কবি,আমাদের গ্রামীন জীবনের লৌকিকতা তার মতো করে পঞ্চাশের আর কেউ তুলে ধরতে পারেননি,তাঁর কবিতার গীতলতা এবং নান্দনিক স্পন্দন অনস্বীকার্য। 

কিন্তু একজন কবিকে সমাজের মুখপাত্র হতে হয়, সমাজ, রাষ্ট্র এবং পারিপার্শ্বিকতাকে ধারণ করতে হয় এবং লিখতে হয় কিছু প্রয়োজনীয় কবিতা যা জনতার চেতনাকে শানিত করে পবিত্র মন্ত্রধ্বনির মতো।একজন কবির কেবল কবিসত্তা নয়, ব্যক্তিসত্তাও উঠে আসে আলোচনা এবং পর্যালোচনায়। কেবল শব্দ বুননের নিপুণতা নয় তার মধ্যে থাকতে হয় অভিনবত্ব, তাকে হয়ে উঠতে হয় স্বতন্ত্র। শামসুর রাহমান নিঃসন্দেহে বাংলা কবিতার স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর,কাব্য এবং ব্যক্তি জীবনের নান্দনিক বোধ এবং উদ্ভাবন শক্তির নিপুণ ঐশ্বর্যে যিনি অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয়। 










কুশল ভৌমিক

কবি, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক। 


Post a Comment

0 Comments