হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি কবিতা




অন্ধকারের আঁচলে

অশান্ত নদীর বুক থেকে
হাত বাড়িয়ে যতটুকু জল উঠে আসে
সেটাই আমার মেরুদণ্ড

সব রা দরজা এঁটে দিলে
ঘাসে উড়ে এসে বসে চিল

সব অঙ্ক করা হয়ে গেলেও
শেষ পাতায় পড়ে থাকে অনেকটা সাদা

খর দুপুরে সাদা থালায় সূর্য উঠলে
চিলের নখ ঠোঁট রোদ্দুর জলে আটকে যায়
দেখা যায় এঁটো পাতে ভাতের কণার মতো
অন্ধকারের আঁচলে এখনও কিছু আলো লেগে আছে ।



পাতার সংসার

দ্বিতীয় পাতায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে
মনে হলো আমার পুরোটাই একা
চেনা মুখের দেখা না পাওয়া নিয়ে আমি যত না চিন্তিত
তার থেকে অনেক বেশি বেশি 
আমার ভাবনায় ডুবে যেতে যেতে মনে হলো 
আমার অনেকটাই আমার জন্যে একা

প্রথমের একটা গোটা পাতাতেই মনে হচ্ছিল
আমার জীবনের সবকিছু ঠিক ঠাক সাজানো
এসব ভাবতে ভাবতেই দ্বিতীয় পাতা
আমার মনের থেকে অনেকটাই দূরে চলে গেল

দুটো পাতার অনেকটা সাদা জমিতে
এমন কিছু লেখা হয়ে যাচ্ছিল
যা দুটো পাতার কোনোটারই চেনা কেউ নয়

আর একটামাত্র সকাল
প্রথম পাতার কথা ভাবতে ভাবতে 
এমন দূরে চলে যাচ্ছি যেখান থেকে 
কোনো পাতাকেই ঠিক ঠিকভাবে চেনা যাচ্ছে না
ততক্ষণে খেয়ে ফেলেছি একটা গোটা দিন
অথচ দুটো পাতাতেই আমি ছিলাম
কিন্তু পাতার সাদা অংশে এমনভাবে পা বসে যাচ্ছে
শুধু আমি নয়, পাতারাও আবছা হয়ে যাচ্ছে ।



যৌথ পরিবার

যেদিন আমরা প্রথম আকাশ দেখেছিলাম
সূর্যোদয়ের আলোকে মনে হয়েছিল যৌথ পরিবার
গাছের পাতা দিয়ে গড়িয়ে
মাটির পাঠশালার দুয়ার দিয়ে
চৌমাথায় সকলের দুপুরের থালায় ভাত এঁকেছিল

কঠিনের সংজ্ঞা মনে করতে আমরা যারা বিরক্ত হই
তারা ভাতের থালার গভীরে এঁকে রাখি জল বাতাসা
যে হাওয়াই আসুক বারান্দায় পা ছড়িয়ে একটু বসবে
দু একটা কথা বললেই বুঝতে পেরে যাবে
একদিন দুপুরে আমরা অনেক গল্প করেছিলাম
দেওয়ালের গল্প আমাদের দিয়ে খুব একটা জমবে না ।

      



দুপুরের পাঠশালা মক্তবে

যেসব মানুষেরা গাছেদের হাত ধরে
ঘুমিয়ে গেছে কোনো এক নিঝুম রাতে
তাদের পায়ের কথা এখনো লেগে আছে
ধুলোপথের কিছু বাউণ্ডুলে ঘরের আনাচে কানাচে
গর্তের মতো কিছু ধুরন্ধর মাথার চর্চায় স্থান পায়
আলোকিত ভূগোলের কিছু জটিল সমীকরণ
ভোররাতে নদী চিনেছিল যারা
ইতিহাসের শেষ পৃষ্ঠায় তাদের কিছু পা 
আকাশের ধ্রুবতারা দেখে পায়চারি করে 
নিবিষ্ট মাটির আলপথ ধরে 
পৃথিবীর অভিধানে নদীচর্চা নেই বলে মাঠের উদাস কুটির
মাঝে মাঝে সাড়া ফেলে দেয় দুপুরের পাঠশালা মক্তবে ।




মূঢ়তার ভঙ্গুর অক্ষর

পুৃরোনো বাড়ির খসে পড়া ইঁট আত্মীয় হত আমাদের
যদি সবটুকু নদীজল বুকে নিয়ে ধনী হতো চরাচর 

স্রোতের মতো আলো হাতে দিগন্তে আমপাতা জামপাতা
দিনরাত চোখে চোখে ঘরবাড়ি জমি জল আর মাঠঘাট

তবু বাঁধা ঘরে একা একা ছক কষে সব জল মুছে দিয়ে
সারি সারি বেঁধে দেবে রাশি রাশি মূঢ়তার ভঙ্গুর অক্ষর ।












........................................................................

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় 

জন্ম ১৯৬৭ সালের ২ জানুয়ারি ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলী জেলার ধনিয়াখালি গ্রামে। লেখালিখির শুরু খুব ছোটবেলা থেকেই। পেশায় গৃহশিক্ষক হলেও সাহিত্যই চব্বিশ ঘণ্টার ধ্যানজ্ঞান। 


প্রকাশিত গ্রন্থ  -- 

তুমি অনন্ত জলধি (কবিতা) 
মধ্যরাতের সংলাপ (কবিতা) 
জানলা সিরিজ (কবিতা) 
চিরহরিৎ (কবিতা) 
বিমূর্ততার অনন্ত প্রবাহে (কবিতা সংক্রান্ত গদ্য) 
দু এক পশলা মান্না (ছড়া) 
চার ছক্কায় শচিন (ছড়া)


সম্পাদিত পত্রিকা : 

ছায়াবৃত্ত  
কাটুম কুটুম  (ছোটোদের পত্রিকা ) 




Post a Comment

1 Comments

  1. কবিতার স্বর্গরাজ্য বলতে যা বোঝায়,এ কবিতা তাই। একজন অতি সাধারণ কবিতাপাঠক হিসেবে আপনার কবিতায় এই আমার উপলব্ধিত প্রত্যয়।

    ReplyDelete