আমরা তখন সেন্টমার্টিন দ্বীপে। পারিবারিক ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত থেকে এখানে আসা। দেশের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই ছোট্ট দ্বীপটি দেখার একটা স্বপ্ন বহুদিন থেকেই ঝুলে ছিল চোখে। বিশেষ করে বিয়ের পরপরই। কর্মজীবনের নানান ব্যস্ততায় সেটি আর হয়ে ওঠেনি সে সময়ে। দিন যেতে যেতে যখন সেই মহার্ঘ্য সুযোগটি এল তখন আমার দুজনের পরিবারে যুক্ত হয়েছে আরো চারটি মুখ। অর্থাৎ আমার মিসেস ছাড়াও দুই কন্যা,জামাই আর সাড়ে তিন বছরের নাতনি। বছর ছয়েক আগের ঘটনা এটি। নির্ধারিত জাহাজটি কাল দুপুর বারোটায় আমাদেরকে নামিয়ে দিয়ে যখন ফিরে যাবার জন্য অপেক্ষা করছিল তখন সারপ্রাইজ দেবার মতো করে সবাইকে বললাম-‘আমরা আজ ফিরছি না,রাতটা কাটাবো এখানে’। তখন এক দারুণ আনন্দে উদ্বেলিত সবাই। আমার সিদ্ধান্তটাও এ রকম ছিল যে থাকার মতো পরিবেশ পেলে একটা রাত কাটিয়েই যাবো। আর রাত কাটালে গোপনে পুষে রাখা আরেকটি ভ্রমণের কাজটিও সেরে ফেলবো। তবে সেটি সারপ্রাইজ হিসেবেই মনের ভেতরে রেখে দিলাম। জাহাজটি বারোটায় এসে বিকেল তিনটায় ফিরে যায়। ছোট্ট এই দ্বীপটি ঘুরে দেখতে সেই তিনটি ঘন্টাই যথেষ্ট। অনেকে সেই কাজটিই করে। আবার ভিন্ন একটা পরিবেশে রাত কাটানোর মজাটাও ভিন্ন। সে রকম আনন্দ পিপাসুরাই থাকার সিদ্ধান্তটি নিয়ে থাকে। আমার থাকার ইচ্ছেটি অনেকটা সে কারণে হলেও দ্বিতীয় কারণটিও কম ছিল না। অনেকটা লম্বা সময় ধরে বেড়ানো,রাত কাটানো-এসবের সুযোগ পেয়ে আমার ভ্রমণ সাথীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ইচ্ছেমতো পুরো দ্বীপ চষে বেড়াতে লাগলো। একবার সমুদ্র তীরে, তো আরেকবার চিরল পাতার ডাব-নারকেলের বাগানে। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা’-অনেকটা সে রকম। প্রবালের খন্ড খন্ড পাথরের উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্রের নীল পানির দৃষ্টি নন্দন সৌন্দর্য সত্যিই মনে রাখার মতো। হোটেলে হ্যারিকেনের (তখন বিদ্যুত ছিল না) টিমটিমে আলোয় রাত কাটানোও ছিল অনন্য এক ভালোলাগা। এমন ভালোলাগা আবহের মধ্যেই পরেরদিন সকালে আরেকটি ভালোলাগার অপেক্ষা। তবে সেটা এই দ্বীপের চেয়েও বেশি ভালোলাগার মতো কিনা তা তখনও আমার অজানা।
“সৌন্দর্য উপভোগের ব্যাপারটা একেবারেই আপেক্ষিক। মরুভূমির চিক্চিক্ করা বালির দিকে চোখ রেখেও কেউ কেউ বিষ্ময়কর সৌন্দর্যের সন্ধান পেয়ে যেতে পারে। আবার কারো কারো কাছে সমুদ্রের দুরন্ত ঢেউগুলোর তীরে এসে আছড়ে পড়াকে প্রকৃতির বাহুল্য অত্যাচারও মনে হতে পারে। এটা দোষের কিছু না ’’
পাঁচদিনের এই ভ্রমণে আসার আগে আমার এক প্রিয় অফিস কলিগ এখান থেকে বেড়িয়ে গিয়ে খুব সিরিয়াসলি আমাকে বলে দিলেন,
‘সেন্টমার্টিন এ গেলে অবশ্যই ‘ছেঁড়া দ্বীপ’ এ যেতে ভুলবেন না। দারুণ এক জায়গা । ওখানে না গেলে বড় একটা আনন্দ মিস করবেন।’ কলিগের এ পরামর্শটি খুব আস্থার সাথেই নিয়েছিলাম। ছেঁড়া দ্বীপের কী রকম সৌন্দর্যে তিনি বিমোহিত হয়েছিলেন সেটি আর তাঁকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করিনি। কারণ, আমাকে অন্তত ফালতু ধারণা দেয়ার মানুষ তিনি নন। কিন্তু পরে বুঝেছি- সৌন্দর্য উপভোগের ব্যাপারটা একেবারেই আপেক্ষিক। মরুভূমির চিক্চিক্ করা বালির দিকে চোখ রেখেও কেউ কেউ বিষ্ময়কর সৌন্দর্যের সন্ধান পেয়ে যেতে পারে। আবার কারো কারো কাছে সমুদ্রের দুরন্ত ঢেউগুলোর তীরে এসে আছড়ে পড়াকে প্রকৃতির বাহুল্য অত্যাচারও মনে হতে পারে। এটা দোষের কিছু না। যাহোক, পরদিন ফেব্রুয়ারীর মিঠে রোদের সকাল। তিনটার জাহাজে আমাদের কক্সবাজার ফিরে যাওয়ার কথা। আমার মিসেসসহ মেয়ে জামাই নাতনি এদিক ওদিক ঘুরতে বেরিয়েছে। আমি এই ফাঁকে ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়ার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে বের হলাম। যে সেতুটি জাহাজ ঘাটের সাথে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে সংযুক্ত করেছে তার নীচেই অনেকগুলো ট্রলার,স্পীডবোট দাঁড়ানো। সেখানেই নৌ যানের চালকেরা ‘ছেঁড়া দ্বীপ, ছেঁড়া দ্বীপ’ বলে চিৎকার করে যাত্রীদের ডাকছে। খবর নিয়ে জানলাম-ট্রলারে গেলে চল্লিশ মিনিট,স্পিডবোটে গেলে লাগে বিশ মিনিট। আমাদের কোনটাতেই চড়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে ট্রলারের চেয়ে স্পীডবোটকেই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে হলো আমার। ভাড়া একটু বেশি হলেও সময়টা কম লাগবে ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম- গেলে স্পীডবোটেই যাবো।স্পিডবোট এর চালকের সাথে যাওয়া আসার কথাবার্তা পাকা হলো। এবার আমি ভ্রমণ সাথীদের কাছে ডেকে এনে সারপ্রাইজ এর বাক্সটি ওপেন করলাম। কিন্তু এই ভ্রমণের মজা বা যথার্থতা নিয়ে বেশি কিছু বলতে পারলাম না। বলার কথাও না। আমার কলিগের পরামর্শটিকেই রিপিট করলাম শুধু। তাতে কারো অনীহা না দেখলেও সারপ্রাইজের উচ্ছ্বাসটা তেমন চোখে পড়লো না। কেন? কারণটা বোঝার চেষ্টা করলাম। মানুষ তো দেখছি দল বেঁধে হুড়মুড় করে ছুটছে ওই দ্বীপটির দিকে, কেউ ট্রলারে, কেউ স্পীডবোটে চেপে। তাহলে দ্বীপটি নিয়ে আমার সাথীদের উচ্ছ্বাসে ঘাটতি কেন? ব্যাপারটা একটু পরে পরিস্কার হলো। সমুদ্রের দিকে চোখ রাখলাম। তাতে কপালে মনে হয় একটু ভাঁজই পড়লো আমার। মনে হলো-সমুদ্রকে দূর থেকে দেখা বা কোমড় পর্যন্ত নেমে ঢেউ এর সাথে খেলা করা যতটা আনন্দের, বুনো ষাঁড়ের মতো ফুঁসে ওঠা সেই ঢেউ এর পিঠে চেপে বসে কোথাও যাওয়া নিশ্চয়ই সে রকম উপভোগ্য কিছু হবে না। হোক বিশ মিনিটের পথ,তবুও তো সমুদ্র যাত্রাই। বেপরোয়া ঢেউ এর তলে ছিটকে পড়লে যে জানে বাঁচা যাবে না-এটুকু বোঝার মতো জ্ঞানবুদ্ধি কারো না থাকার কথা নয়। তো যাবো কি যাবো না- এ রকম একটা দোদুল্যমানতা যখন কাজ করছিল মনের ভেতরে তখন জামাই ফারুক ভীত সন্ত্রস্থ মুখ নিয়ে বললো,
‘থাক না বাবা,আমরা না হয় না যাই। আমার একে তো পানিতে খুব ভয়,তার ওপর বিশাল সমুদ্র।’ বাকি সবাই আমার সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে। আমি তখনও যাবার পক্ষে। নতুন কিছু দেখার একটা আকর্ষণ আমাকে সব সময়ই টানে। ভ্রমণ তো শুধু বেড়ানো নয়,কিছুটা এ্যাডভাঞ্চারও। আনন্দের সাথে একটু ঝুঁকিও থাকবে। ভ্রমণে বের হলে সেই ঝুঁকি নেয়ার সাহস একটু থাকতেই হয়। সেটি ইয়াং জামাই এর মধ্যে না দেখে একটু হতাশই হলাম। এতে অবশ্য কাজও হলো। ওর এই ‘নেগেটিভ এ্যাটিচ্যুড’ই আমার ভেতরে একটা চ্যালেঞ্জিং মুড তৈরি করে দিল। ভাবলাম-যা হয় হোক-যাবোই। আনন্দ করতে এসে এ্যাতো ভাবাভাবির কী আছে? তখন বেশ জোরের সাথেই বললাম,
‘কী বল ফারুক! আমি ছাপ্পান্ন বছরের বুড়ো হয়ে যদি সাহস পাই,ইউ ইয়াং ম্যান,তুমি পাবে না কেন? অনেকেই তো যাচ্ছে। ভয় কী?’
একটু মনে হয় লজ্জাই পেল ফারুক। আর কিছু না বললেও ভয় ভয় ভাব নিয়েই সবার সাথে স্পিডবোটে উঠে পড়ে ও।
সমুদ্র তখনও শান্ত হলেও মাঝে মাঝে পানি ফুলে উঠছে। জোয়ার আসার সময় তখন। পুরো জোয়ারের সময় যে এই ফুলে ওঠা পানিই উঁচু ঢেউ এর রূপ নেবে তা তখনও জানতাম না। সে কথায় আসছি একটু পরেই। তো তীব্র বেগে ছুটে চলেছে স্পীডবোট। বোটটি সেই ফুলে ওঠা পানির মাথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে, সামান্য উঁচু থেকে নীচে আছড়ে পড়ছে বারবার। সো,একটু ঝাঁকুনি খেতেই হচ্ছে সবাইকে। একটু ভয় ভয় করলেও তখনও তা সহনীয় পর্যায়েই বলা যায়। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। মিনিট দশেক পরে দূরে পানি থেকে সামান্য উঁচুতে চরের মতো ভেসে ওঠা একটা ভূখন্ড নজরে এল। সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে তিন কিলোমিটার দূরে সম্ভবত। এটি নাকি আগে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সাথেই যুক্ত ছিল । পরে সেটি সমুদ্রের কোন এক ঘূর্ণিপাকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, মানে মূল থেকে ছিঁড়ে গিয়ে আলাদা হয়ে যায়। সেই থেকে নামটিও হয় ‘ছেঁড়া দ্বীপ’। আবার কারো মতে-এটিও সেন্ট মার্টিনের মতোই আরেকটি প্রবাল দ্বীপ,নতুন জেগে উঠেছে। সে বিতর্ক থাক। বিশ মিনিটের মাথায় আমরা যখন সেই ছেঁড়া দ্বীপটির কাছে পৌঁছুলাম তখন চালক ছেলেটি বললো,
‘দ্বীপে বোটটিকে ভেড়ানো যাবে না। সামনে বেঁধে রাখা কয়েকটি ট্রলারের উপর দিয়ে যেতে হবে আপনাদের। আর ফিরবেন একটু তাড়াতাড়ি,কারণ জোয়ারের ধাক্কায় বোটটিকে এখানে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবে না।’
তো কী আর করা। খুব সাবধানে ট্রলারগুলোর উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে দ্বীপটিতে পা রাখলাম সবাই। ছোটখাটো দ্বীপ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুরোটাই দেখা যায়। দেখলামও সেভাবেই। কী দেখলাম? মাঝখানে খোলামেলা ডাব চা বিস্কুট এর একটা দোকান আর তার কাছেই সবুজ ঘাসের ছোট্ট একটা ঝাউবন। দেখার মতো আর কিছুই নেই। দোকানটির সামনে পেতে রাখা বেঞ্চে বসে বেশ কয়েকজন ভ্রমণবিলাসি মজা করে এটা সেটা খাচ্ছেন, কেউ কেউ বড়বড় ডাবের পানি গলায় ঢালছেন,আবার কেউ কেউ অদৃশ্য কোন আনন্দে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছেন। আমি হতভাগা বেরসিক সে রকম ফেটে পড়ার মতো কিছু খুঁজে পেলাম না। এই তাহলে ছেঁড়া দ্বীপের চোখ জুড়োনো সৌন্দর্য ! যা না দেখলে ভ্রমণটাই আধা খেঁচড়া হয়ে যেত! আমার ভ্রমণ সাথীরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। আমার মুখে হতাশার ভাব দেখে কেউ কিছু বলছেও না। তবে যারা আনন্দ খুঁজে নিতে জানে তারা শূন্যতা থেকেও কিছু না কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে। আমার কন্যা দুটি এই শূন্যতার মধ্যেই যখন হৈ চৈ করে ডাব খেল,চা খেল,আমাকেও একটি ডাব মুখে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
‘যাই বল বাবা,এই দ্বীপটির আর কিছু না থাকলেও সবুজ ঘাসবনটি কিন্তু খুব সুন্দর। প্রজাপতিরা কি আনন্দেই না খেলা করছে সেখানে!’ তখন মনে হলো-এটা ওই ধরনেরই একটা চেষ্টা। আমাকে সান্তনা দেয়াও হতে পারে। কিন্তু মাটি খুঁড়ে আনন্দ খুঁজে বের করার জন্যে তো এখানে আসা নয়। আমার কলিগটির উপর রেগে গিয়ে মনে মনে বললাম,‘ এত কষ্ট করে এসে শেষমেষ পেলাম এই এ্যাত্তো বড় অশ্বডিম্ব! এমন নিষ্ঠুর রসিকতা না করলেই কি চলতো না জনাব?’ যাহোক, সেটি আর তাকে বলা হয় নি। তার আর দোষ কী? তিনি হয়তো এই শূন্যতার ভেতরেই দুর্লভ কিছু ভালোলাগা খুঁজে পেয়েছেন। তা তিনি পেতেই পারেন। যাহোক-এসেই যখন পড়েছি তখন কিছুটা সময় তো কাটাতেই হয়। সেটা কাটাতে ঘন্টাখানেক পার হয়ে গেল। এবার ফেরার পালা। সেই ফেরাটাও ছিল প্রাণ ছিঁড়ে নেয়ার মতো লোমহর্ষক।
বেলা তখন দুপুর বারোটার কিছু বেশি। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখলাম-সর্বনাশ! জোয়ারের তান্ডব চলছে সেখানে। মৃদু গর্জনের সাথে উথাল পাথাল ঢেউ এর ভয়াবহ গড়াগড়ি! স্পীডবোটটি যেখানে আমাদের নামিয়ে দিয়েছিল সেখানে গেলাম সবাই। কিন্তু একি! কোথায় বোট? সামনের দিকে তাকাতেই দেখি-অনেক দূরে আরো দুটো বোটের সাথে আমাদেরটাও ভাসছে। ছোট্ট খেলনা নৌকোর মতো করে। আমাদের খুব কাছেই রয়েছে চার পাঁচটি খালি ট্রলার। বোটের চালক আমাদের চিনতে পেরে দূর থেকে চিৎকার করে বললো,‘আং-কে-ল..ট্রলারগুলো আমাদেরই। .. যে কোন একটিতে চড়ে ...এই বোটের কাছে ..চলে আসেন.. বোট নিয়ে ...ওইখানে ...যাওয়া যাবে ...না..’
কী বলে চালকটা! ট্রলারগুলো এমনিতেই ঢেউ এর দোলায় দুলছে। চড়ার পর কী যে হয়,কে জানে। শেষমেষ এখানেই ডুবে মরতে হবে নাকি! ভয় আতংকে সবার মুখই এবার শুকনো। আমাকে তবু শক্ত থাকতেই হলো। বললাম,
‘ভয় পেয়ে আর কী করবে? যেতে তো হবেই। সাবধানে ওঠ সবাই ট্রলারে।’ ট্রলার চালকও অভয় দিল। ঢেউ এর দোলায় নাগরদোলার মতো দুলতে দুলতে এক সময় আমরা স্পিডবোটটির কাছে পৌঁছুলাম। এখন ট্রলার থেকে স্পিডবোটে ওঠার পালা। দুলছে ট্রলার,দুলছে স্পিডবোটও। ট্রলারটি বোটের গায়ের সাথে লেগে থাকলেও পা তুলে সেখানে পার হওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার না। ঢেউ এর সাথে তাল মিলিয়ে সমান লেভেলে পা রেখে বোটে পার হতে হবে। একটু আগে এক কলেজ পড়ুয়া মেয়ে এভাবে পার হতে গিয়ে বোটের গরোম ইঞ্জিনের ওপর পড়ে গিয়ে কোনমতে জানে বাঁচলেও হাতটাকে আর অক্ষত রাখতে পারেনি। পুড়ে ঝলসে যাচ্ছেতাই অবস্থা। শুনে আমাদের ধুকধুকুনিও গেল বেড়ে। যাহোক,চালকের সহযোগিতায় কোন বিপদ ছাড়াই একে একে সবাই পার হয়ে বসে গেল বোটে। সবার শেষে আমি। বোট তখনও অস্বাভাবিকভাবে দুলছে। আমার বাম পাশের চেয়ারে মিসেসকে বসিয়ে দিয়ে আমি নাতনিকে কোলে নিয়ে বসলাম। বাকিরা পেছনে। ছুটতে শুরু করে স্পিডবোট। জোয়ারের হুংকারে ঢেউগুলোর উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছেই। বোটটি দৌড়ুচ্ছে আগের মতোই ওইসব ঢেউএর মাথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে। চার পাঁচ ফুট উঁচু এক একটা ঢেউ পেরোচ্ছে মানে এক ঢেউ থেকে লাফ দিয়ে নীচে পড়ে আরেক ঢেউএর মাথায় ওঠা এবং সেখান থেকে আবার নীচে ঠাস্ ঠাস্ করে পড়া। হাড়ভাঙা ঝাঁকুনি যাকে বলে। সেই ঝাঁকুনিতে বোটটি একটুখানি কাত হলেই সলিল সমাধি হবার মতো অবস্থা তখন। যে যা পারছে দোয়া দরূদ পড়তে শুরু করেছে। আমার ভেতরটাও ভয়ে শুকে কাঠ। একহাতে নাতনিকে বুকের সাথে চেপে ধরেছি,আরেক হাতে নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা। মিসেসের কোমড়ে ব্যথার ব্যারাম। সে ভয়ে চুপসে গেছে। তাকে বললাম,
‘তুমি পায়ের নীচের লাইফ বয়টি (গোল চাকা) চেয়ারের ওপর রেখে বস। তাতে কোমড়ের জয়েন্টগুলো অন্তত না-ও খুলতে পারে।’ শুনে সে ওভাবেই বসলো। মেরুদন্ডের সুরক্ষার জন্য আমার নিজেরও একটা লাইফ বয় এর দরকার ছিল। কিন্তু সেটা আর ছিল না। তখন ঝাঁকুনি থেকে নিজেকে বাঁচাতে একটা উপায় বের করলাম। বোটটি ঢেউএর মাথায় উঠে লাফ দিয়ে নামার মুহূর্তে আমিও চেয়ার থেকে ইঞ্চি ছয়েক উঠে ঝাঁকুনি পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম। এতে কষ্টটা কম হলেও ঝুঁকি ছিল। নাতনিকে কোলে নিয়ে নিজেকে ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়েছিল। দুইতিন সেকেন্ড পরপরই এভাবে ওঠা বসা করতে গিয়ে হাঁফিয়ে পড়েছিলাম। দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা আমাদের সবারই। দাঁতে দাঁত চেপে মিনিট দশেক যাওয়ার পর সবাই এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে মনে হচ্ছিল- গন্তব্যের দেখা বোধ হয় আর এ জনমে মিলবে না। এক একটা মিনিটকে মনে হচ্ছিল এক একটা ঘন্টার চেয়েও দীর্ঘ আর অসহনীয় যন্ত্রনার। পেছনে তাকিয়ে দেখি মেয়েরা আর জামাইটি মাথা নিচু করে শক্ত করে একে অপরকে ধরে রেখেছে। মনে হচ্ছিল-নিশ্চিত পরপারে যাওয়ার প্রস্তুতিটা ওরা ইতোমধ্যে নিয়েই ফেলেছে। ওদেরকে ভরসা আর কী দেব ? নিজেরই তো তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা! এ পর্যন্ত কতবার যে ঢেউ এর মাথায় উঠে তীব্র ঝাঁকুনি হজম করতে হয়েছে তার হিসেব নেই। আরো মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর যখন দূরে জাহাজ ঘাটের সেই সেতুটি চোখে পড়লো তখন মনে হলো-উহ্,,প্রায় খাঁচাছাড়া প্রাণটাকে ফিরে পাওয়া গেল তাহলে! ঘাম ঝরিয়ে দেয়া জ্বরটা ছাড়লো যেন। স্পীডবোটের গতিও ততক্ষণে কমে এসেছে। সামনেই সেতু। কিন্তু দু:খ লাগছিল ভেবে যে-আনন্দ ভ্রমণে গিয়ে ফিরতে হলো জীবনটাকেই একেবারে হাতে নিয়ে! সখের ভ্রমণে এমনও হয়!
https://facebook.com/bamihal


0 Comments