অপর্ণা সিনহার গুচ্ছকবিতা




মুখোশ



এত এত মুখের এত এত মুখোশ
একটা সকালের, একটা বিকেলের,
আর কোনটা আবার গভীর রাতের
মানুষ ভুলে গেছে মুখ তার নিজের।
লাগাতে হয় লাগিয়ে রাখে দিনেরাতে
কোনটা গৃহস্থের তো কোনটা চোরের
ভাবে না কেউ কখনো সময়ের কথা
কোনটা কালের বা কোনটা অকালের!
দক্ষিণ লাগিয়েছে উত্তরের মুখোশ
পূবের মুখে অবিকল পশ্চিম ছাঁটা
মুখোশে কারো স্বাচ্ছন্দ আসে মন-প্রাণে
কারো কাছে মুখোশ চলার পথে কাঁটা!
তবে, চোখগুলো পাথরের না বলেই 
বাধে সদা মুখোশে মুখোশে সংঘাত
পাখির চোখে নিজ চোখ রাখা যাদের
জানে তারা মুখোশের সুপ্ত সংবাদ!
প্রতারকের মুখে বিশ্বাসের মুখোশ
আপনের মুখেও তো অচেনা মুখোশ,
ভন্ডের মুখে আঁকা প্রিয় ভক্ত আদল
রঙ মাখানো একটি ধুরন্ধর ফানুস।




পরিত্রাণ


আমি অভিমন্যুর মত ঘুরছি তোমার চক্রব্যুহের মাঝে
বেড়ুবার পথ জানা নেই, কেবল ছটফট্ করছি।
একের পর এক নতুন অস্ত্র আঘাত হানছ,
অসহায় হরিণ শাবকের মত ক্ষুধার্ত বাঘিনীর কবলে!
দিন রাত জীবনের যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত দেহ!
কাল্পনিক বিচ্ছেদের অনলে দূরের কোনো নক্ষত্র
আকাশগঙ্গাকে আলিঙ্গন করে চুমু খাচ্ছে বারে বারে,
ছায়াপথ পেরিয়ে তার গন্তব্যে ফেরার আগে।
আমি সেতারের তারে ভৈরবী রাগের সুর একেঁ দিই,
একটা পাহাড় তখনও কুয়াশার চাদরে মুখ লুকিয়ে
নববধূকে অশ্লীল দৃষ্টিতে চাটছে তার বৃষ্টি ভেজা জিহ্বায়!
আগর গাছে তখনও বিষধর দম্পতি সঙ্গমে মত্ত
আর আমি? সিংহাসনের লোভে আগুনে ঝাঁপ দিই।
পাইনি কিছুই, হারিয়েছি একটা মেলা আর উৎসব,
ভিড় করা লোকারণ্যে হারিয়ে যেতে যেতে কুমেরুতে!
তোমার অন্দরমহল ছুঁয়ে মৃত্যু দাঁড়ানো-
অভিমন্যুর অঙ্গচ্ছেদ আজই হবে দেখতে! 



দূরত্ব


একটা ভৌত রাশিই তো
যা পরিমাপ করা যায়,
কত যোজন কত আলোকবর্ষ
সেও নিমেষে কষা যায়।
কত ইঞ্চির তফাতে ছিলাম
সে বড়ো কথা আজ নয়,
বড়ো হল,কত অভিমান দূরে
কত ছলনার পর,সে ভয়!
কত অভিনয়,কত প্রহসনের
পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাঁধ,
আমার জানা নেই,কত মিথ্যেতে
হয়,শুধু একটা অজুহাত!
যা অতিক্রম করার সাধ্য নেই
অপরিমেয় তবে এই দূরত্ব,
যতদিন যায় বাড়তেই থাকে এর,
সমানুপাতিক অসীম ঘনত্ব।



ভাঙাগড়া 


ভাবলাম এখানেই শেষ !
মান-অভিমান বিচ্ছেদ-বিরহ জ্বালা।
এরপর একটা মুক্ত আকাশ শুরু,
এরপর আর না বলা কথারা
রাত জেগে কাঁদবে না!
কিন্তু না!ওপারে আরও একটা দুঃখ-
একা দাঁড়িয়ে আছে শেষ সীমানা পেড়িয়ে।
সাহস করে পাশে যাই,চোখে জল?
সে মুছতে নয়,গেছি আয়না দেখতে,
গেছি এর শেষ দেখতে!
কিন্তু হায় ঈশ্বর! দেখলাম উলঙ্গ দ্রোপদী,
এই দিনে তুমি ছিলে কাছে!
তবে আজ কি হল তোমার?
অন্ন,বস্ত্র,বাসস্থান এতই দুর্লভ আজ!
স্বয়ং ঈশ্বরও?এখানেই শেষ নয়-
এগিয়ে গিয়ে দেখলাম সব সীমা পেরিয়ে,
দুহাত বাড়িয়ে আবারও তুমি
করছো আহ্বান!
আবারও সেই অগ্নিকুন্ড পুড়তে হবেই।
আমারও কি সাধ্য বলো ফিরায় তোমারে?
জানি এই ভাঙাগড়া বহুকালের
তবু সৈকতের হাসি-কান্না সব
জোয়াট ভাটার টানেই।



সুঁতো ছেঁড়ার সাধনে


ভয় পেও না,তোমার চাঁদ,মাটি,
আকাশ বায়ু সব ঠিক থাকবে।
শুধু একটা সুঁতো ছিঁড়ে যাবে
চিরদিনের জন্যে হারিয়ে যেতে।
যেখানে বাঁধা ছিল কিছু মূহুর্ত,
কিছু নদীর স্রোত,কিছু ঝাপসা স্মৃতি।
একদম চিন্তা করো না,সবই ভালো থাকবে,
শব-হিমের পর,আনন্দে ঋতুরাজ
আগের মতই ফিরবে মনোদ্যানে।
শুধু একটা গোধূলী না ফেরার দেশও নেই,
কোথাও সে আর থাকবে না।
তাতে কি? তোমার কবিতা দেখো-
আবারও অন্তঃসত্ত্বা হবেই!
ফিরবে চিঠি আগের মতই ডাকে!
চাঁদের জ্যোঁৎস্নায় বসবে প্রেয়সী মেলা।
মাতাল প্রেমিক গোষ্ঠী আবারও খেলবে খেলা।
শুধু ঐ উঠোন কোণায় আগের মত
শিউলিরা শুয়ে থাকবে না!
আকাশগঙ্গা,তুমি,আমি,কত্ত সুখী!
ঐ এক মূহুর্ত ছাড়া সবই ভালো আজ। 




Post a Comment

0 Comments