দিদির মৃত্যুর দিনে বৃষ্টি হচ্ছিল, বৃষ্টি হচ্ছিল আর
থেকে থেকে হাওয়া, প্রবাল প্রাচীরের ওপার দিয়ে
হেঁটে আসতে গিয়ে
দেখি বৃষ্টি টেনে নিয়ে যাচ্ছে সবাইকে আর
গোল হয়ে
এগিয়ে আসছে
শোকচিহ্নত দিদির মৃত্যুর দিন
(দিদির মৃত্যুর দিন/সুবীর সরকার)
.................................................................................
যখন কবিতাটির পাঠনুভব লিখতে বসেছি তখন বাইরে ঘোর শ্রাবণ। গত চব্বিশ ঘন্টায় বৃষ্টির কোন বিরতি নেই, সঙ্গে বৃষ্টিভেজা হাওয়াও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অনেক ব্যক্তিগত পাঠে থাকা এই কবিতা এবার যেন অন্য এক আবহ নিয়ে কথা বলতে চাইছে। আসলে যাকে কথা বলছি তা কোন কথাও নয়। এক অস্পষ্ট গোঙানি। স্তরে স্তরে ছড়িয়ে রাখা বিষাদ। শ্রাবণের মেঘের মতো আকাশ ভরা দুঃখবোধ। সুবীর সরকার একাধারে কবি ও গদ্যকার। ওর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বাইরে সুবীর সরকারের লেখাপত্র ব্যক্তিগত পাঠ জুড়ে আমার। চঞ্চল শিশুসুলভ কৌতূহলপ্রবণ সুবীরকে জানতাম। অনেক দেখা জানা এই কবির সবটুকু কি জানতাম তারপরও? একদম না। ওই যে কথাটি ‘কবিরে পাবে না তার জীবন চরিতে’ এ যেন তাই। তাহলে কবির জীবন ছড়ানো তাঁর কবিতার পথে? -হয়তো বা! এই কবিতাটি কবি সুবীর সরকারকে জানা-বোঝার ক্ষেত্রে আর এক নতুন পৃষ্ঠা উল্টিয়ে আমাকে দেখাবে ভাবিনি।
মনে আছে, কোন এক বৃষ্টিদিনের সকালেসুবীরের টাইমলাইনে ‘দিদির মৃত্যুর দিনে বৃষ্টি হচ্ছিল’ এমন একটি ক্যাপশন যুক্ত করে চিরায়াত এক দিদি চেহারার মহিলার সাদাকালো ছবি পোস্ট করেছিল সুবীর। অবাক হয়েছিলাম। সুবীরের সহোদর দিদিছিল, যাঁর আবার মৃত্যু হয়েছে! কবে? অনেক সময় ধরে সুবীরকে জানাশোনা আমার। ওর সঙ্গে বন্ধুত্বে যুক্ত হবার আগে কিংবা ওকে এভাবে জানাশোনার পূর্বে দিদির মৃত্যুর ঘটনাটি যদি ঘটেও থাকেতো আমার জানবার কথা। আমি ওকে জানতাম,জানতাম ও বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। টাইমলাইনে পোস্ট দেওয়া ক্যাপশন যুক্ত ছবিটির আমার জানা ও ধারণায় সন্দেহ জাগায়। শেষে সুবীরকেই জিজ্ঞেস করি।ও জানায়, ও যখন ছোট তখন এক ঘোর বর্ষাদিনে দিদির মৃত্যুকথা। এর পর মনে আসে পূর্বের পঠিত এই কবিতাটির কথা। অনেক অনেক বার ওর ‘সুবীর সরকারের নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থে পড়েছিলাম কবিতাটি। কবিতাটি ভালোলাগার হলেও নিছক একটি বিষাদমাখা কবিতা হিসেবেই দেখেছিলাম। স্বংয় কবি সুবীর সরকারের সহোদর দিদির মৃত্যুর বিষাদকে ধারণ করেই কবিতাটি এক অন্যরকম ভালোলাগা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিল তা কে জানতো!
এক হাতের আঙুলে-ই গোনা সম্ভব মাত্র কয়েকটি লাইন ও শব্দ কবিতাটিতে। শিরোনাম ‘দিদির মৃত্যু দিন’। এমন একটি শিরোনাম পাঠককে স্পর্শ করে বৈকি।‘দিদির মৃত্যু দিনে বৃষ্টি হচ্ছিল’ এই ঘোর বৃষ্টির আবহ মৃত্যু জনিত বিরহ কাতরতাকে চূড়ান্ত এক আচ্ছন্নতায় ঢেকে দেয়। ‘আর/ থেকে থেকে হাওয়া’ কবি যখন বলেন, তখন মনে হয় দিদির মৃত্যু দিনের ‘বৃষ্টি’ তা বিরহের কান্না আর ‘হাওয়া’ তা যেন দিদির বিরহে ভাইটির প্রলাপ বলে যাওয়ার প্রতীকী। বৃষ্টি ও হাওয়ার প্রতীকী ব্যবহারের পর লক্ষ করি, কবি ‘প্রবাল প্রাচীরের’ প্রসঙ্গ টেনেছেন। কবিতায় ব্যবহৃত এই স্টোকটি এক রহস্যময়তার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঠকে এখানে বহুবিধ ভাবনার মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যেন। ব্যক্তিভেদে ক্ষেত্রভেদে এখানে বোধের বহুমাত্রিকতা আসতেই পারে। পাঠোদ্ধারে ভিন্নতা আসাও স্বাভাবিক। আমরা যদি প্রবাল প্রাচীরকে মানবজীবন বলে ধরে নিই তো; কবির কথায় আসতে পারি এভাবে ‘...প্রবাল প্রাচীরের ওপর দিয়ে/ হেঁটে আসতে গিয়ে/ দেখি বৃষ্টি টেনে নিয়ে যাচ্ছে সবাইকে...’আমরা যদি প্রবাল প্রাচীরকে রহস্যময়মানবজীবন বলে ধরে নিই; তো সে জীবনকে ‘বৃষ্টি’ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই ‘বৃষ্টি’ হল কান্না-বিষাদ-বিচ্ছেদ। অর্থাৎ, জীবন মাত্র বিষাদ আর শোক, যা দিদির মৃত্যু দিনের মতো ঘিরে ধরে মানবজীবনকে। শোনা যায়, কোন কোন বিষাদ দুঃখ মানুষকে স্রষ্টা করে তোলে, শিল্পী বা কবি করে তোলে। কবি সুবীর সরকার কি দিদির বিরহ কাতরতা ও বিষাদকে কাব্যশক্তিতে রূপান্তর ঘটিয়ে ফেলেছেন। হয়তো হাঁ, কিংবা হয়তো না। তবে কবিতাটি পাঠক হিসেবে কবিতাটি বিষাদ আচ্ছন্ন করে দেয়। এমন কথাটিও কোথাও শুনেছিলাম, ‘বিরহের কবিতা, কষ্টের কবিতা নাকি প্রকৃত কবিতা’। মানি, কথাটি শুধু কথার কথা। কাব্যসাহিত্যে পূর্বেও দিদির মৃত্যু বিরহ কাতরা এসেছে। গদ্য সাহিত্যের দিকে চোখ রাখলে সহজেই বিভূতিভূষণের অপু-দুর্গার কথা মনে আসবে। তবে সমকালীন কবিতায় সুবীর সরকারের এই কবিতাটি দিদির মৃত্যু জনিত বিষাদকে অন্য এক কাব্যমাত্রায় নিয়ে গেছে। কবিতাটি সমকালীন কাব্যভাষা ও নান্দনিকতায় চরম জীবনদর্শন জাত।

0 Comments