ল্যুসুনের এক পাগলের ডায়েরি ও কাফকার মেটামরফসিস ।। ম নি র ই উ সু ফ ।। বামিহাল (পঞ্চম সংখ্যার ওয়েব ভার্ষণ) “Bamihal" eigjt year, five issues- march 2019






চিনের অমর গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ল্যুসনের একটি গল্প সংকলেনের নাম ‘হে যুদ্ধ স্বাগত’। ল্যুসুনেরগল্প- পৃথিবীর জন্য এক অমূল্য সম্পদ। যে লোকটি প্রথম দেখতে পেয়েছিলেন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। ‘এক পাগলের ডায়েরি’ নামক গল্পে প্রাচীন চিনের বাস্তবতাকে তিনি তোলে ধরেন নতুন চিনের সমাজকে বৈপ্লবিকভাবে সাজাতে। মাওসেতুংয়ের আগেই ল্যুসুন বিপ্লবের জন্য চিন জাতির মনোগঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে এই বিশাল জাতিসত্তার একটি দেশকে জাগিয়ে দেন। এটি ছিল মানব জাতির অগ্রগতির পথে চাঁদে যাওয়ার চেয়েও বড় উলম্ফন। তারপর পৃথিবী কতভাবে না এগিয়েছে, ধ্বসে গেছে, আবার দাঁড়িয়েছে। এই সময় ইউরোপে এলো শতাব্দীর আরেক সন্তান ফ্রান্জ কাফকা।
ইউরোপে ব্যুরোক্রেসির যখন জঘন্য অবস্থা তখন তাদের আর করার কিছুই ছিল না। ইউরোপ মানব জাতির অগ্রগতির জন্য যা যা দরকার তার সব কসরত দেখিয়ে ফেলেছে। তারা সঞ্চয় করেছে সম্পদ, মারণাস্ত্র, ভূমি, মহাকাশ, মিডিয়া। মানব শরীর প্রদর্শনীসহ মানুষের সমস্ত সম্ভাবনাও তারা দেখিয়ে ফেলেছে। সামন্তীয় ও পুঁজিবাদের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর অগ্রগতি যা হওয়ার মোটামুটিভাবে তা হয়েছে। ইতিবাচক এবং নেতিবাচবক। এখন কি করবে পৃথিবী! তার তো জমে আছে মারণাস্ত্র, অনেক অনেক অলস সময়। তারা তা ব্যবহার করবে। নতুন করে তারা তৈরি করলো কর্পোরেটোক্রাসি। মানুষ ঘুমানোরও সময় পেল না আর। অফিস, বস, বাসা, ঘুম, অফিস বাসা, ল্যারেটরি, রাজনীতি ঘুম, পরদেশ লুণ্ঠন, সেক্স, পর্নো, বস, বাসা নির্ঘুম, সামরিক কুচকাওয়া, ফাইভ স্টার হোটেলে মিটিং, সিটিং। এমন এক সমাজ ব্যবস্থা তৈরি হল নিজের জন্যও সময় বের করা মুশকিল হয়ে পড়লো। কাফকা লিখলেন- সেই সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘মেটামরফসিস’ যা পৃথিবীকে নতুন করে ধাক্কা দিল। মানব জাতির এই ধ্বসকে রুখতে কাফকা অবতার হয়ে উঠলেন। কিন্তু, ইউরোপ তার নিয়মেই এগিয়ে যায়। কাফকাও ইউরোপের সন্তান। তার গল্পে তিনি মানব জাতির অবমাননাকে ধরেছেন কিন্তু মানুষকে সেখানে নতুন পথ বাতলে না দিয়ে সে সমাজ ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে মেরে ফেলেছেন। এ যাবৎ কাফকার সেই বাস্তবতার বদল আমারা ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থায় দেখিনি। যার জন্য কাফকাও সেই সমাজ থেকে বের হতে পারেনি। কেননা, কাফকার সামনে দুটি বিপ্লবের রক্তাক্ত অধ্যায় রচিত হয়েছে। কাফকা আশাহত হয়ে পড়েছিলেন। ইউরোপিয় দানবদের মত বড় দানব প্রাচীন রূপকথার মধ্যেও কেউ কখনও দেখেনি। সুতরাং সংবেদনশীল কাফকা মানব সভ্যতার অবমাননার ভয়ে আতকে উঠেছিলেন, ব্যক্তি মানুষের ‘জব’ নামক যে কর্পোরেটেক্রাসি শুরু হলো তার মৃত্যুকে অবলোকন করেছেন কাফকা। তিনি দেখাচ্ছেন মানুষের ভবিষ্যৎ এখানে নয়, ইউরোপের তৈরি কর্পোরেটোক্রসির ভেতরও নয়, মানুষের সম্ভাবনা মানুষের বিশ্বাসের ভেতর, কোনো সিস্টেমের ভেতর নয়। কাফকা মানুষের কঠিন বাস্তবতাকে ধরলেন। কর্পোরেটোক্রাসির লোকজন মানব সভ্যতার আদার্স বা অপর মানুষকে পোকা বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন শুধু তাদের খায়েশকে মেটোনোর জন্য। বিজ্ঞান, ব্যবসা, উৎসব, আনন্দ, মতবাদ এই সব প্রজ্ঞা, বিজ্ঞান কর্পোরেটোক্রাসির ব্ল্যাকহোল গিলে ফেলতে লাগলো। সেই ধ্বংস থেকে বাঁচার জন্য শতাব্দীর দুই মহান মানুষ চিৎকার করে প্রতিবাদ করেন যার একজন ল্যুসুন- তিনি বলেন- মানব সভ্যতায় শিশুরা এখনও মানুষের মাংস ভক্ষণ করেনি, এখনও তারা সংবেদনশীল ‘শিশুদেরকে বাঁচাও। সেভ দ্য চিলড্রেন। কর্পোরেট মহান ল্যুসুনের এই আতকে ওঠা শঙ্কিত হওয়া বানী নিয়েও ব্যবসা শুরু করেছে। মানব জাতিকে রক্ষা করার জন্য ল্যুসুন ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ চেয়েছিলেন মানব আন্তরিকতার সবটুকু দায় নিয়ে। সেখানেও ইউরোপিয় দানব এনজিওরা শব্দটি গিলে ফেলে, চুরি করে তা ব্যবহার করছে শিশুদের মেরে ফেলার জন্য। পৃথিবীর কি দুভার্গ্য।
ইউরোপের মানুষগুলো ভেতরে ভেতের যে তেলাপাকা বা ছারপোকা হয়ে পড়েছে তাকে কি নিপুন দক্ষতায় এঁকেছেন কাফকা। ষোল শতকের ব্যক্তি স্বাধীনতা শতাব্দীকে উপহার দিয়েছিল একটি সুন্দর পৃথিবী নির্মাণের তেজি সূর্যময় সকাল। কিন্তু সতের শতক যেতে না যেতেই ব্যক্তি স্বাধীনতার বল্গাহীন ব্যবহার মানুষকে করে তুললো এমন স্বেচ্ছাচারি যা এর আগে তারাও কল্পনা করেনি। এর পরিণতিতে আওয়াজ উঠলো শ্রেণি সংগ্রামের, সাম্যবাদের। একটি সামষ্টিক সুখের স্বর্গ নির্মাণ করার জন্য রক্তাক্ত বিপ্লবও হল। অনেক মেধাবী সন্তানের জন্ম হল পৃথিবীতে। যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েও সামরিক, রাজনৈতিক, কর্পোরেট কর্তাদের বুঝাতে পারল না, যুদ্ধ নয় শান্তি, যুদ্ধ নয় আলোচনার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ একটি শ্রেণি ভোগ করবে, বাকী মানুষ শুধু শ্রম দেবে। ষোল, সতের আঠার, ঊনিশ, বিশ, একুশ শতকের এই পর্বে এসেও তারা তাদের এই মতবাদে অটল থাকল। মাঝখানে এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকাকে তছনছ করে ফেলল। ’
এখন সময় এসেছে কাফকার অভিজ্ঞতা ল্যুসুনের আর্তি আর মানব জাতির আর্তনাদ মুছে দিতে নতুন করে বিপ্লবের জন্য তৈরি হওয়া। ‘সেভ দা আর্থ’ এনজিওর মত বাণিজ্য উপলক্ষে ব্যবহার না করে তাকে সত্যিকার মানুষের মুক্তির জন্য ব্যবহার করা। এক্ষেত্রে কাফকা ও ল্যুসুনের সাহিত্য আমাদের পথপ্রদর্শক হতে পারে। মানুষকে প্রস্তুত করে তুলতে হবে। ‘যে বিপ্লব আসন্ন তাকে স্বাগত’।

Post a Comment

0 Comments