সমীর আহমেদ এর বড়গল্প


জুলেখা বিবি কিংবা জোতির্ময়ী দেবীর গল্প






আমি কে? জুলেখা বিবি নাকি জোতির্ময়ী দেবী? এ নিয়ে যখন সে মানসিক দ্বন্দ্বের চরমে, তখন তার বয়স ষাটের কাছাকাছি এবং সে শয্যাশায়ী। মায়ের অসুখের কথা শুনে তার বড় মেয়ে জরিনা আখতার ঢাকা থেকে ছয় বছরের ছেলে ফুয়াদকে নিয়ে চলে এসেছে ট্রেনে। সঙ্গে বাসার কাজের মেয়েটাও আছে। এসেই মায়ের পাশে বসে সে হেঁচকি তুলে কাঁদে, ও আম্মা, তুমার কী হইছি? চেহারা অমন হইয়ি গেছি ক্যান?
মেয়ের কথা শুনে সে মিটিমিটি হাসে। জরিনার বাবা আফসার মোল্লা বলে, কী আর হবি, বেটি। ডাক্তাররা তো কিছু কবার পারতিছে না। যার কাছে যাই, হে-ই পরীক্ষা-নিরীক্ষা কইরা কয়, কিছু না। শরীর দুর্বল। খাওয়াদাওয়া ঠিক মতো করে না। হয়তো চিন্তাভাবনা বেশি করে। এসব বাদ দিতে হবে। আমি কই, ও জরিনার মা, কীয়ের এতো চিন্তাভাবনা তোমার? বড় পোলা অস্ট্রেলিয়া ইউনিভার্সিটির পলিমার রসায়নের প্রফেসর। বউমা ফিজিক্সের অধ্যাপক। জরিনা সরকারি কলেজে সহকারী অধ্যাপক। যোগ দিছে বছর সাতেক অইলো। জামাই বাবাজি সরকারের আমলা। তার ভবিষ্যত উজ্জ্বল। ত্বর ত্বর কইরা প্রমোশন পাইয়া একদিন সচিব অইয়া যাইবো। ততদিনে নাতিপুতিরাও দেশবিদেশে প্রতিষ্ঠিত অইয়ি যাইবি। তাছাড়া আমাগো কি আল্লাহপাক কম দিছে? চকের পর চক জমিজমা। কতো ফসল। গোলায় ফসল থুবার জায়গা নাই। ফসল তোলার পর বেইচি দিতে অয়। সোনার সংসার তোমার। কীসের অভাব? কেন এতো চিন্তাভাবনা করো? তা তোর আম্মা কি আমার কথা শুনে? 
জরিনা বলে, না শুনলি তো হবি না আম্মা। এখন তোমার বয়স বাড়ছে। এই বয়সে দুশ্চিন্তা খুব খারাপ। ইনসোমনিয়া হয়। প্রেসার বাড়ে। হার্টের অসুখ হয়। স্ট্রোক হয়। ডায়াবেটিসও হতে পারে। আর ডায়াবেটিস তো যেমন তেমন রোগ না। নিয়ম মতো না চললি হার্ট, কিডনি, লিভার সব শেষ কইরি ফেলে। এখন তোমার বয়স অইছি। যে কইরিই হোক দুশ্চিন্তা বাদ দিতি হবি আম্মা। আব্বা তো ঠিকই কয়, কেন এতো ভাবনা তোমার, কীসের ভাবনা? ভাই, ভাবি, আমি, আমরা সবাইতো খুব ভাল আছি। চাকরিবাকরি আর সংসার নিয়ি সুখে আছি। এ কারণে আমরা হয়তো তোমার কাছে থাকতি পারি না। কিন্তু বড় ছুটিছাটা পেলে তো ঠিকই চইলি আসি। রোজার ঈদ তোমাদের সাথে কাটালি, কুরবানির ঈদ কাটাই আমার শ^শুর-শাশুড়ির সাথে। ভাইজান অবশ্য আসতে পারে না। অত দূর থেইকা ঘন ঘন দেশে আসা কি সম্ভব? তুমিই কও, আম্মা, সম্ভব?
 মেয়ের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে সে। জরিনা আখতার সুন্দর বটে, তবে তার কোনো চেহারাই সে পায় নি। না গায়ের রঙ, না মুখের গড়ন। বাপের গায়ের রঙ ও আদলই পেয়েছে সে। আর ছেলেটাও তাই। সে ভাবে, ছেলে-মেয়ে দুটোর একটিও তার মতো হল না কেন? যে কেউ একজন তো তার মতো হতে পারতো? না হওয়ার কারণ কী? এ নিয়ে হয়তো সে আরও কিছু ভাবতে পারতো। কিন্তু এখন সেই সুযোগ কোথায়? মেয়ের কথার জবাব তো তাকে দিতে হবে। সে বলে, তা তো আমি জানিই। 
জরিনা আখতার বলে, তাইলে এতো চিন্তা করো ক্যান? 
 সে চুপ করে থাকে। জরিনা বলে, আর এখন এমন যুগে বাস করতিছো, দূর আর দূর নাই। বাটনে একটা চাপ দিলেই জাদুর মতো সব ভাইসা উঠে চোখের সামনে। এই যে আমি আইতে না পারলেও মোবাইলে তোমার খোঁজখবর নেই। ভাইজান ও ভাবির সাথে কয়দিন পর পরই তোমার কথাবার্তা হয়। মোবাইলে, কম্পিউটারে তাদের ছবিও দেখতে পাও। নাতিপুতিও বাদ যায় না। তারপরও এতো চিন্তা কর কেন? 
 সে বলে, কিডা কইছে আমি চিন্তা করি? তোর বাপে? তোর বাপ তো খালি আজাইরা পাঁচাল পারে। ডাক্তারের কাছে আমি যাইবার চাই না। হে জোর কইরা নিয়া যায়। নিয়া কী লাভ অইছে? কোনো অসুক পাইছে? খামাখা টেহা নষ্ট। আমার কোনো রোগ নাই।
 রোগ নাই, বুঝলাম। কিন্তু তোমার শরীর এতো খারাপ অইয়ি গ্যাছে ক্যা? আয়নায় একবার নিজের চেহারাহান দ্যাখছো? কী শরীর কী অইয়ি গ্যাছে!
 সে যুক্তি দেখায়, কারো চেহারা কি চিরকাল একরম থাকে রে মা। এখন আমার বয়স অইছে না? আর কতো?
আব্বায় কয়, কয়দিন ধইরি তুমি ঠিক মতো ঘুমাও না। খাওয়াদাওয়াও ঠিক মতো করো না। মেজাজও তোমার খিটিমিটি। কারণ কী আম্মা?
কারণ? তা তো কিছু না কিছু আছেই। কিন্তু তা সে কী করে বলবে? কী-ই বা বলবে? জরিনা তার নিজের মেয়ে হলেও কি সব কথা খুলে বলা যায় তাকে? সে কি তাকে বলতে পারবে কোনোদিন, চোখ বুজলেই মণীন্দ্র চ্যাটার্জি মুখ গোমরা করে তাদের উঠোনে বড় আমগাছটার নিচে মন্দিরের পাশে খাড়ায়া থাকে! এতো কইরি কই, তুমি এইখানে খাড়ায়া আছো ক্যা? যাও গা। সে যায় না। কিছু বলেও না। শুধু মুখ গম্ভীর করে খাড়ায়া থাকে। তারপর এক সময় হু হু কইরি ওঠে, ও জ্যোতি, জ্যোতি। তুমি কি সত্যি আর কোনোদিন আমার সাথে যাইবা না?
 সে তখন নিষ্ঠুর হতে বাধ্য হয়, না, আমি যামু না। তুমি চইলা যাও। আর কোনোদিন আইও না। তোমার জ্যোতি মইরা গ্যাছে। তারে চিতায় দিয়া গ্যাছো মনে নাই? তারপরও ক্যান আসো এদিকে? যাও, চইলা যাও। ওরা দ্যাখলে তোমারে খুন কইরি ফেলবি। তারপরও লোকটা যায় না। দাঁড়িয়ে থাকে অনড়, একেবারে বেহায়ার মতো। তারপরও কি সে চোখ বুজে থাকতে পারে? 
 চোখ খুললে অন্ধকার, নাকি আলো? না, অন্ধকারও না, আলোও না। আলো-অন্ধকারের এক ফিনফিনে পর্দা সারাটা জীবন তাকে ঘিরে রাখলো বলা যায়। চারদিকে ফাঁকা। ভীষণ ফাঁকা। বুকের ভেতরটাও ফাঁক ফাঁকা লাগে। মাথাটাও ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তার মনে হয়, সেই কতোকাল আগে তার ভেতরটা কেউ ফাঁকা করে দিয়ে গেছে, এতদিনেও তা পূরণ হয়নি। কোনোদিন তা পূরণ হবারও নয়। তার চোখ জ¦ালাপোড়া করে। ঘুম আসে না। সারা রাত সে এপাশ ওপাশ করে। আফসার মোল্লা কিছু জিজ্ঞেস করলেই তার মেজাজ খিঁচিয়ে ওঠে। তার সাথে ইদানিং ভাল ব্যবহার সে করতে পারে না। লোকটার সাথে অনেক সময় তার কথা বলতেও ইচ্ছে করে না। তার ওপর অনেক রাগ। কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারে না। আফসার মোল্লা কিছু বললে সে চুপ করে থাকে। জবাব দেয় না। 
আফসার মোল্লা তাকে জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তাররাও এক একজন হারামজাদা। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে তার থলের বেড়াল বের করে আনতে চায়। কিন্তু সে কি এতোই বোকা! সব হড়বড় করে বলে দেবে তাদের কাছে! এমনকী এই মেয়ের কাছেও! সে বলে, তোগো জন্যি চিন্তাভাবনা যে কিছুডা অয় না, তা তো না। কিছুডা তো অয়ই। মা অইছোস বুঝোস না? তয় এ কথা সত্যি, কদিন ধইরি ঘুম এট্টু কইমি গ্যাছে। ঘুমাবার তো চাই। কিন্তু ঘুম না আইলি আমি কী করুম? এখন হয়তো ঘুম আসতিছে না। কয়দিন পর ঠিকই চোখে ঘুম চইলি আইবো। আর ঘুম না আইলিই বা কী করুম? চিরকাল কি সবারই সমান যায়, মা? যায় না। আমার জন্যি এত চিন্তা করিস না। তুই কতদূর থেইকা আইছিস। যা যা হাত-মুখ ধুইয়ি নে। মুখে কিছু দে। ও শেফালীর মা, তোমার রান্নাবান্না কতদূর?
রান্নাঘর থেকে জবাব আসে, এই তো হইয়ি গিছে আম্মা। আপা অহন বইলেই পারে। 
 সে তাড়া দেয়, তোর পোলাডা কই গ্যালো, খোঁজ নে। খোঁজ নে। তোর বাপজান ইহানে ইভাবে ল্যাটা মাইরা বইয়ি রইলো ক্যা? নাতিনটার দিকে এট্টু নজর রাখলিও তো পারে। না আমারই উঠতি অইবি। চল চল তোগো খাবার দিই গা। কতদূর থেইকা আইছিস। কোথায় কী খাইছিস, না খাইছিস। চল চল। সকালের ট্রেন ধরার চিন্তায় রাতে তো ঠিক মতো ঘুমাসও নাই।
 সে উঠে বসে। জরিনা বলে, তুমি শুইয়ি থাকো আম্মা। তোমার শরীর খুব দুর্বল। আমাগো জন্যি এতো চিন্তা করতি অইবো না। আমরা ট্রেনে খাইয়ি নিছি সবাই।
ট্রেনে আর কী খাইছোস? কেক-বিস্কুট-চা। এ সবে কি প্যাট ভরে?
তুমি নিজের কথা ভাবো তো। আমরা খাইয়া নিবো নে।
আফসার মোল্লা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, ফুয়াদের খোঁজে। ছেলেটা ভারি চঞ্চল। গ্রামে এলেই কোনাকানছি, বনবাদাড় সব চষে বেড়ায়। একটুও ডরায় না। বাড়ির পাশে বড় বড় পুকুর আছে। মাছচাষ হয়। মাঝে মাঝে রুই-কাৎলা লাফ দিয়ে ওঠে। ফুয়াদ খুব মজা পায়। আহ ! কী সুন্দর মাছ! তবে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে মাছের এই লাফে মজে যাওয়ার পোলা সে না। সে নেমে পড়ে গ্রামের রাস্তায়, সরু হালটে। মানুষজনের চলাফেরা দেখে। গাছের দিকে তাকায়। ফুলের দিকে চায়। মাঝে মাঝে পাখি দেখে চেঁচিয়ে ওঠে, ওইটা বক না? ওইটা শালিক না? ওইটা ঘুঘু না? আরও কতোরকম প্রশ্ন। সঙ্গে যে থাকে জবাব দিতে দিতে বিরক্ত হয়। এখন ওই ছেলে পুকুরপাড়েই কিনা Ñ আফসার মোল্লা ভাবে। যদিও সেখানে বাড়ির লোকজন, চাকরবাকর কেউ না কেউ সব সময় থাকে, তারপরও তো বলা যায় না, যদি কারো অলক্ষ্যে নাতিটা পুকুরে নামে, পানিতে ডুবে যায়! ফুয়াদ তো সাঁতার জানে না। নাকি জানে? ধুর ঢাকা শহরে সাঁতারের জায়গা কই? মানুষই তো মাথা গুঁজার ঠায় পায় না। কোথাও নিয়ে ছেলেকে সাঁতার শেখাবে, সেই সময় কি জরিনা কিংবা জামাইর আছে? ঘর থেকে বেরিয়েই সে ডাকে, ফুয়াদ, নানা ভাই আমার, কোথায় তুমি?
ফুয়াদের কোনো সাড়াশব্দ নেই। আশপাশেও কোথাও দেখে না তাকে। না বাড়ির উঠোন, আমগাছ, কাঁঠালগাছের তলা, না পুকুর ঘাট। কই গেল নাতিটা! আফসার মোল্লার বুকটা ধ্বক করে ওঠে। 
ঘর থেকে জরিনা বলে, ও মনে অয় বাড়িতে নাই। এতক্ষণে বাড়ির বাইরে চইলি গ্যাছে। লাইলিরে তো ওর সঙ্গেই থাকতি কইছি। ও লাইলি, লাইলি...
লাইলির কোনো সাড়া নেই। তাহলে ও নিশ্চয় ফুয়াদের সাথে আছে। ও তো এ গ্রামেরই মেয়ে। বছরখানেক হলো ঢাকায় গেছে। ভালো খাবার আর সাবান-টেম্পুতে ওর চেহারা খুলেছে এখন। গ্রামে এলে লাইলি এ বড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। ওদের বাড়িতেও যায়। ফুয়াদকে নিয়ে মাঠঘাট চষে বেড়িয়ে আনন্দ পায় মেয়েটা। ফুয়াদও ওর সাথে থাকতে ভালোবাসে। লাগামহীন ঘুরে বেড়াতে পারে। বেড়াক, জরিনা বাধা দেয় না। খোলামেলা জায়গায়, প্রকৃতির উদ্দামতার মধ্যে ছেলেটা একটু গা ঝাড়া দিয়ে উঠুক। শহরে ওই ম্যাচবাক্সে ফার্মের মুরগির মতো থাকতে থাকতে ছেলেটার দম একেবারে বন্ধ হয়ে আসে। সেটা জরিনা বেশ হাড়ে হাড়ে টের পায়। এই গাঁও-গেরামে তাদের শৈশব-কৈশোর কী অন্যরকম ছিল! কী খোলামেলা! কতোরকম খেলাধুলা! আর স্বাধীনতা! ফুয়াদ তার কী-ই পেলো! মাঝে মাঝে তার ইচ্ছে করে গ্রাম-গঞ্জের কোনো কলেজে বদলি হয়ে চলে আসতে। কিন্তু তা আর পারে কই! জীবন এখন একেবারে শহর ঘেঁষা। কতোরকম পিছুটান। ও সব ছেড়ে আসতে পারা সম্ভব নয়। ছেলেটা গেল কই? যেখানেই যাক, তার খোঁজ তো থাকা চাই। আফসার মোল্লাকে সে তাড়া দেয়, আব্বাজান ওদের একটু খোঁজখবর ন্যান তো। কোথায় গেল ছেলেটা। 
তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে জরিনা বলে, আম্মা, ঠিক কইরি কও তো, তোমার কী হইছি?
 সে চমকে ওঠে? মেয়ে কি কিছু বুঝে ফেলেছে? না না, কী বুঝবে? সে কি কোনোদিন কাউকে কিছু বলেছে? সে মুখ কালো করে বলে, কী আর হবি? মানুষের অসুখবিসুখ কি হইতি পারে না? 
জরিনা আখতার মাকে দেখে। তাকে পড়ার চেষ্টা করে। সে হয়তো জুলেখা বিবির খোঁজ জানে। কিন্তু জ্যোতির্ময়ী দেবীর খোঁজ সে জানবে কী করে? সে তো যুগ যুগ ধরে, তার জন্মেরও আগে চাপা পড়ে আছে তার মনের অতল অন্ধকারে। সেই অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে তাকে দেখা কি এতোই সোজা! সে মৃদু হাসে। জরিনা বলে, তোমাকে খুব দুর্বল দেখাচ্ছে, আম্মা। তুমি শুয়ে থাকো। রেস্ট নাও। না হয় আমাদের সাথেই চলো যাই, কিছু মুখে দিয়ি নিও।
না না, আমার অহন কিছুই খাইতি ইচ্ছে করছে না, মা। 
তাহলে তুমি থাকো। আমি খেয়েদেয়ে আসি। তারপর তোমাকেও কিছু মুখে দিতি অইবি। না খাইয়ি থাকলি চলবি না নে। আমিই তোমাকে আজ খাইয়ে দেবো।
জরিনা ঘর থেকে বের হয়ে যায়। সে ম্লান হাসে, পাগলি একটা! মেয়েরা তো বাপের ভক্ত হয়। জরিনা হয়েছে উল্টো। ছোটবেলা থেকেই মায়ের প্রতি ওর খুব টান। শাহজাহান অবশ্য ওর বাপকেই বেশি ভালবাসে। বাপের কাছেই তার বেশি বায়না। তবে তাকেও ছেলে কম ভালবাসে না। এখনো বাড়ি এলে তার সাথে সেই ছোটবেলার মতো প্রায় লেপ্টে থাকে।
উঠতে চেয়েছিল সে। কিন্তু কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না। শরীরটা আসলেই খুব দুর্বল লাগছে তার। শুয়ে থাকাই ভাল। কিন্তু বেশিক্ষণ সে শুয়ে থাকতে পারে কই? ওই তো ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে মণীন্দ্র চ্যাটার্জি! সে মনে মনে বলে, এটা তো ঠিক না মণীন্দ্র! মন্দিরের উঠোন ছেড়ে তুমি এখন জুলেখা বিবির ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়তে চাইছো! কার খোঁজ করছো তুমি? জ্যোতির্ময়ী দেবীর? সে তো এখানে থাকে না। তবু জুলেখা বিবির ঘরে উঁকি দিয়ে কেন জ্যোতির্ময়ী দেবীর খোঁজ করো? অন্য কোথাও যাও। অন্য কোনোখানে। মন্দিরে, শান বাঁধানো পুকুরঘাটে, চ্যাটার্জি বাড়ির উঠোনে, কদমগাছের নিচে, দুয়ারে, একতলা পাকা ঘরের ভেতর খুঁজে দেখো তাকে। এখানে এসো না। এখানে জ্যোতির্ময়ী দেবী নামে কেউ থাকে না। এখানে আছে জুলেখা বিবি। জুলেখা।
দরোজার চৌকাঠে মণীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি নেই। হুট করে কই গেল লোকটা? যাক, ভাল হয়েছে। সে উঠে। আস্তে আস্তে হেঁটে যায় আয়নার দিকে। আসলেও কি চেহারা খারাপ অইয়ি গ্যাছে! কতোটা? 
বয়স বাড়ার সাথে সাথে আয়নার সামনে তার যাওয়া হয়ে ওঠে না। আগেই বা খুব বেশি যেত কোথায়? নাকি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেজেগুজে পরিপাটি থাকতো! কতোদিন পর এই ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়ালো সে, মনে পড়ে না। কী জন্যে সাজবে? বয়স কি সেই আগের মতো আছে? কার জন্য সাজবে? মণীন্দ্র তো নেই। মণীন্দ্র! নামটা কেন বারবার চলে আসে মনে! সে তো সাজবে আফসার মোল্লার জন্য। সে তাকে কতো ভালোবাসে! আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে একসময় কতো বলতো, তুমি আমার জুলেখা। এখন অবশ্য ওরকম করে অতোবার বলে না। বয়স হয়েছে তো, লজ্জা পায়। তবে মাঝে মাঝে নাম ধরে তো ডাকেই, জুলেখা, জুলেখা। এই নামের মাহাত্ম্য কি তার জানা ছিল আগে? নাকি তা জানবার কোনো আগ্রহ ছিল কোনোদিন? এ সম্পর্কে সে জেনেছিল বিয়ের পর। বাসর ঘরে। তার গায়ে লাল টুকটুকে জামদানি। আফসার মোল্লার শেরওয়ানি ছিল না। হয়তো তাড়াহুড়োর কারণে কোথাও থেকে জোগাড় করতে পারেনি। যুদ্ধের বাজার। ও সব কেনার সময় কোথায়? তার গায়ে শাদা পাজামা-পাঞ্জাবিই ছিল, যা সব সময় সে পরতো। যুদ্ধের বাজারে অতো সুন্দর জামদানিটা সে কোথা থেকে এনেছিল, বারবার তা জানতে ইচ্ছে করতো, কিন্তু কোনোদিন তাকে সে জিজ্ঞেস করেনি। আর জামদানিটাও বিয়ের পর আর কোনোদিন পরেনি সে। বাসর রাতের পর সেই যে ভাঁজ করে ট্রাংকে তুলেছে, আর কোনোদিন বের করেনি। আফসার মোল্লাও তাকে এ নিয়ে কোনো পীড়াপীড়ি করেনি। সে যাক, বাসররাতে কিংবা তার কয়েকদিন পরেও হতে পারে, আফসার মোল্লাই তাকে বলেছিল, আমি যে তোমার নাম জুলেখা বিবি রাখছি, এবং সব সময় তোমাকে এই নামেই ডাকি, কেন, জানো তো? 
সাপের মতো শীতল দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে ছিল আফসার মোল্লার দিকে। কোনো জবাব দেয়নি। আফসার মোল্লা হেসে বলেছিল, তা তোমার না জানারই কথা জুলেখা বিবি। আমার জুলেখা বিবি। খাটে পা ঝুলিযে বসেছিল সে। তাইলে শোনো, হাত ধরে টান দিয়ে তাকে তার পাশে বসিয়ে সে বলেছিল সেই কিচ্ছা। 
কিনান নগরের নবী ছিলেন ইয়াকুব। তিনি তাঁর সব সন্তানদের মধ্যে ইউসুফকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন। এ কারণে তার সৎ ভাইয়েরা তাকে ভীষণরকম হিংসা করতো। একদিন ইউসুফ রাত্রে স্বপ্নে দেখেন, এগারটা নক্ষত্র এবং চন্দ্র ও সূর্য তাকে সেজদা করছে। পুত্রের কাছে এ স্বপ্নের কথা শুনে ইয়াকুব নবী চিন্তায় পড়ে যান। তিনি ইউসুফকে বলেন, খবরদার বাপ, এই স্বপ্নের কথা তুমি কাউকে বলবে না। 
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তার এ স্বপ্নের কথা সৎ ভাইদের কানে পৌছে। তারা হিংসায় রাতদিন জ্বলেপুড়ে মরে। এ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় দুনিয়া থেকে ইউসুফকে বিদায় করে দেয়া। তারা ইউসুফকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। 
একদিন তারা ইয়াকুব নবীর কাছে আবদার করে, তারা বেড়াতে যাচ্ছে একটা জায়গায়। ইউসুফকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। সেখানে সে অনেক আনন্দে থাকবে এবং ভালো ভালো খাবার পাবে। ইয়াকুব নবী রাজি হন না, তাঁর সন্দেহ হয়, ইউসুফকে তারা মেরে ফেলবে কিংবা তাকে বাঘে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু তারাও নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত তাদের সাথে ইউসুফকে যেতে দিতে বাধ্য হন তিনি। তারা তাকে অনেক দূরে নিয়ে হত্যা করতে উদ্যোত হলে তাদের এক ভাই বলে, হত্যা করা ঠিক হবে না। তারা তাকে জঙ্গলের ভেতরে একটা পরিত্যক্ত কূপে নিক্ষেপ করে। তারপর তার ছেঁড়াফাড়া জামায় রক্ত মাখিয়ে বাবার কাছে গিয়ে বলে ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। পুত্রদের কথা অবশ্য বিশ^াস করেন না ইয়াকুব নবী।
তিন দিন পর পথহারা এক বণিক কাফেলা সেই জঙ্গলের ভেতরে ঢোকে। সেই কূপ থেকে বালতিতে তাকে উপরে তুলে এনে মিশরে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। ভাগ্যক্রমে তার স্থান হয় স¤্রাট রাইয়ান ইবনে ওয়ালীদের অর্থ ও রাজস্ব মন্ত্রী ক্বিৎফির ঘরে। অর্থমন্ত্রীর উপাধি ছিল আজিজ মিসর। তার স্ত্রী জুলেখা। তারা নিঃসন্তান ছিলেন। দাস হিসেবে বিক্রি হলেও ইউসুফ তাদের ঘরে সন্তানের মতো প্রতিপালিত হতে থাকে। যখন সে যৌবন প্রাপ্ত হয় তখন জুলেখা বিবি ইউসুফের অপূর্ব রূপ-চেহারা দেখে তার প্রেমে পড়ে। তাকে ভালবাসার কথা জানায়। কিন্তু ইউসুফ ছিল খোদাভক্ত, নেক বান্দা। জুলেখার প্রস্তাব সে বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দেয়। এতে জুলেখা ক্ষুব্ধ হয়। রাজমহলে জুলেখার কলঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নারীরা তাকে ছিঃ ছিঃ দিতে থাকে। তাদের উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য একদিন জুলেখা মিশরের সম্ভ্রান্তঘরের নারীদের নিমন্ত্রণ করে। তারপর তাদের সামনে এনে দাঁড় করায় ইউসুফকে। তার সৌন্দর্য দেখে তারা হতবাক। জুলেখা তাদের অবস্থা বুঝতে পেরে প্রত্যেককে একটি লেবু কাটতে দেয়। ইউসুফের দিকে তারা এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিল যে লেবু কাটার পরিবর্তে তারা নিজেদের আঙুল কেটে ফেলে। তখন তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে।
ইউসুফ যখন জুলেখার প্রেম প্রস্তাবে কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না, তখন জুলেখা ষড়যন্ত্র করে, তার নামে কলঙ্ক রটিয়ে তাকে জেলে ঢুকায়। সাত বছর পর মিশর রাজা একটি স্বপ্ন দেখেন, সাতটি মোটা-তাজা গাভীকে সাতটি শীর্ণ গাভী খেয়ে ফেলছে। সাতটি সবুজ শীষ এবং অন্য শীষগুলো শুষ্ক। রাজা সভাসদদের কাছে এর ব্যাখ্যা জানতে চান। তারা অপারগ হলে ডাক পড়ে কারাবন্দী ইউসুফের। সে বলে, আমাগী সাত বছর মিশরে খুব ফসল হবে। তার পরের সাত বছর মিশরে কোনো ফসল হবে না। দুর্ভীক্ষ চলবে। সে সময় মিশরের সব খাদ্য মজুদ শেষ হয়ে যাবে। 
স¤্রাট ব্যখ্যা শুনে সন্তুষ্ট হন এবং ইউসুফকে জেল থেকে মুক্তি করে তাকে মিশরের অর্থমন্ত্রীর পদে নিয়োগ দেন। তারপর তার ওপর মিশরের শাসনভার অর্পণ করেন। এদিকে জুলেখা তার জন্য অপেক্ষা করে। সে যুবতী থেকে বুড়ি হয়। তার স্বামী আজিজ মিসর মারা যায়। জুলেখা কাঁদতে কাঁদতে চোখের জ্যোতি হারায়। তবু সে ইউসুফকে ভুলতে পারে না। শেষে আল্লাহপাকের ইচ্ছায় ইউসুফের মন নরম হয়। তার কোমল দৃষ্টি পড়ে অন্ধ ও বৃদ্ধা জুলেখার ওপর। সে তার চোখে হাত বুলিয়ে দেয়া মাত্র দৃষ্টি ফিরে পায়। সে আগের মতো আবার তরুণী হয়ে যায়। তারপর তাদের বিয়ে হয়। সুখের সংসার হয়। তুমি হইতিছো আমার সেই জুলেখা বিবি। তাকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে কপালে চুমু খায়। কিন্তু জুলেখা কিছুতেই উচ্ছ্বসিত হতে পারে না। হঠাৎ ধরা পড়া পাখির মতো ভয়ে ছটফট করতে থাকে। আফসার মোল্লা কি তখন বুঝতে পেরেছিল, এই কেচ্ছাটা তার স্ত্রী জুলেখা বিবির সাথে যায় না। বরং উল্টো হয়ে গেছে। জুলেখা নয় বরং সে-ই তাকে এক তরফাভাবে ভালবেসে ফেলেছিল মনে মনে। তার চোখের সামনে কি তখন ভেসে উঠেছিল এই জুলেখা বিবি নয়, বরং সেই জ্যোতির্ময়ী দেবীর মুখ! তাদের পাশের গাঁয়ের রায় পরিবারের মেয়ে। তখন শিক্ষা-দীক্ষায়, অর্থবিত্ত-প্রতাপে আশপাশে দশ গ্রামে রায় পরিবারের সুনাম ছিল অন্যরকম। এ তল্লাটে একমাত্র মোল্লারা ছাড়া তাদের সাথে কারো তুলনা চলে না। 
আফসার মোল্লা তখন জৈনপুর মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা শেষ করে রায় পরিবার থেকে মাইল খানেক দূরে নিযামিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেছে। তাদের বাড়ির সামনের হালট দিয়ে ফিনিক্স সাইকেলে চড়ে টুংটাং বেল বাজিয়ে যাওয়া-আসা করতো। সেই সময় তার সাথে প্রায় দেখা হয়ে যেতো জ্যোতির্ময়ী দেবীর। সে তখন মেট্টিক পাশ করে, নিযামিয়া মাদ্রাসা থেকে অল্প দূরে কায়েদে আজম কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়ে ক্লাশ শুরু করেছে। মাঝে মাঝে তাকে পথে দেখলেই আফসার মোল্লা কেমন জড়োসড়ো হয়ে যেতো। তা নিয়ে বান্ধবীদের সাথে মাঝে মাঝে হাসাহাসি করতো জ্যোতির্ময়ী দেবী। বান্ধবীরা বলতো, ওই হুজুর নিশ্চিত তোর রূপের আগুনে পুড়ে ছারখার অইতিছে।
 ইচ্ছে করলে তুই একটু বাজিয়ে দেখতি পারিস। কিন্তু এসব দেখার সময় কোথায় জ্যোতির্ময়ী দেবীর! সে তখন মণীন্দ্রনাথের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। বি এ ক্লাশের ছাত্র মণীন্দ্র। বাম রাজনীতিতে যোগ দিয়েছে। তুখোড় বক্তা। গলাও চমৎকার। যেমন গান গাইতে পারে, তেমনি কবিতাও আবৃত্তি করে সবাইকে মুগ্ধ করে ফেলে। কলেজের ছাত্রছাত্রীরা মণীন্দ্র দা বলতে পাগল। জ্যোতির্ময়ী দেবী আর বাদ থাকবে কেন? সেও প্রথমে তার দলে রাজনীতিতে নাম লেখায়। সমাজতন্ত্রÑ কার্লমার্ক্স, লেলিনবাদ, প্রলেতারিয়েত, শ্রেণিশত্রু, পূঁজিবাদ, বস্তুবাদ, বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম এ সব শব্দ সবেমাত্র সে মাথার ভেতরে ঢোকাতে চেষ্টা করছে। আর আশ্চর্য হচ্ছে, এ সব বিষয়ে মণীন্দ্রর গভীর জ্ঞান ও বলার ভঙ্গি দেখে। একের পর আরেক অনর্গল সে বলে যেতে পারে। একটুও আটকায় না। নতুন চেতনায় এ সব শব্দ মাথায় নিয়ে ফাঁকে ফাঁকে মণীন্দ্রনাথের আবৃত্তির ক্লাশে। এর আগে মণীন্দ্র কাউকে পাত্তা না দিলেও, তাকে দেখার পর, সে সহজে চোখ সরাতে পারে না। আবৃত্তিতে মাঝে মাঝেই ছোটখাটো ভুলচুক করে ফেলতো, আবার তাৎক্ষণিক শুধরেও নিতো। দুজনেই যখন পরস্পরকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত, তখন আর দেরি কেন? মণীন্দ্র একদিন গোপনে প্রেমপত্র গুঁজে দেয় জ্যোতির্ময়ীর হাতে। সেও পরদিন সাড়া দিয়ে চিরকুট লিখে দেয়। তারপর কথাবার্তায়, চোখে চোখে, ইশারায় বলা হয়ে যায় কত কথা! সবার কাছে তাদের প্রেমের ব্যাপারটা অনেকটাই খোলাসাও হয়। 
 দেশের রাজনীতি টালমাটাল। ৭ মার্চের ভাষণের পরও, শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করেই ইয়াহিয়া মিলিটারি লেলিয়ে দিয়েছে নিরস্ত্র ও নিরীহ বাঙালির ওপর। শেখ মুজিবকে ধরে নিয়ে গেছে úশ্চিম পাকিস্তান। রেডিওতে এসব খবর শুনে চমকে ওঠে সবাই। যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মণীন্দ্র যেতে যায় মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু জ্যোতির্ময়ী দেবী অনড় Ñ কিছুতেই তাকে যুদ্ধে যেতে দেবে না। যদি মণীন্দ্রর কিছু হয়ে যায়! কিন্তু মণীন্দ্র কি বাড়িতে বসে থাকার মতো ছেলে? সে জ্যোতির্ময়ীকে আড়ালে-আবডালে অনেকবার অনেক ভাবে বোঝায়। কিন্তু সে বুঝলে তো? মণীন্দ্রর খুব ইচ্ছা, যুদ্ধে সে যাবেই যাবে। এ সব করতে করতেই কয়েক মাস চলে যায়। আর এরই মধ্যে এলাকায় চলে আসে মিলিটারি। তারপরই চারপাশের দৃশ্যপট রাতারাতি কেমন বদলে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। রায় ও ব্যানার্জি পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তারা ওপারে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ওপারে গেলে এই ডামাডোলের মধ্যে কে কোথায় হারিয়ে যায় তার কি কোনো ঠিক ঠিকানা আছে? আর কি খুঁজে পাওয়া যাবে কাউকে। তাই মণীন্দ্র ও জ্যোতির্ময়ী বিয়েটা এখানেই সেরে ফেলতে চায়। তারপর যা হবার হবে। কিন্তু দুই পরিবার এসময় বিয়েতে রাজি হবে কিনা তা অনিশ্চিতই থেকে যায়। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় মন্দিরে গিয়ে কালিকে সাক্ষী রেখে জ্যোতির্ময়ীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেবে মণীন্দ্র। একদিন সন্ধ্যায় হয়ও তাই। আর তা কীভাবে যেন জানাজানি হয়ে যায় দুই পরিবারে। তারপর নিজেদের মানসম্মানের কথা বিবেচনা করে পুরোহিত ডেকে দুজনের বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক হয়ে যায়। আর সেই সময় খবর আসে, আজ রাতে হিন্দুপাড়া পোড়াতে আসছে মিলিটারি। এই আতঙ্কের মধ্যে বিয়ের আয়োজন কেমনে হয়? এখান থেকে তো আগে পালিয়ে জীবন বাঁচাতে হবে। কাজেই ওপারে যাওয়ার পর কিছুটা স্বস্তিতে বিয়ে-বাসর হলে মন্দ কী? জ্যোতির্ময়ী ভাবে, এটাই বরং ভালো। মণীন্দ্রনাথ ভাবে, বিয়ে-বাসর শেষ করে সে যোগ দেবে মুক্তিযুদ্ধে। জ্যোতির্ময়ী তখন রাজি না হলে সে পালিয়ে যাবে।
 তড়িঘড়ি করে সে-রাতেই তারা নৌকায় ওঠে। বড় দুটি ছইঅলা নাও। দুই পরিবারের লোকজন একটি ছইয়ের মধ্যে গুটিসুটি হয়ে বসে। আরেক নায়ে গ্রামের ধনঞ্জয় ও শীতলদের পরিবার। কয়েকটি শিশুও আছে। সবার চোখে-মুখে মিলিটারির আতঙ্ক, মৃত্যু ভয়। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কেউ কথা বলে না। যা বলার, দু একটি বাক্যতে, ফিসফিসিয়ে। ভগবান, হরিনাম ও দুর্গা দুর্গা জপে ছেড়ে দেয় নাও। অন্ধকার রাত। চারদিকে সুনসান নীরবতা। উপরে তারাভরা আকাশ। হু হু বাতাস। মাঝে মাঝে হাওয়া উঠে বুকের গহীন থেকেও। এতো সাধের বাড়িঘর, গাছগাছালি, জমিজিরাত, ধান-চাল, গরু-বাছুর, সহায়সম্পদ ফেলে কোথায় যাচ্ছে তারা! কোন অজানায়? সেখানে জীবন কেমন হবে? সাথে তো তেমন কিছু নিতে পারেনি। কিছু টাকাপয়সা, সোনাদানা আর কিছু কাপড়চোপড়। কতোদিনের কতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর ফেলে আসতে হলো। শুধু জীবন বাঁচাতে চলে যাচ্ছে ওপারে। যদিও এই যাওয়া শেষ যাওয়া নয়। যুদ্ধের পর কিংবা দেশের অবস্থা একটু ভালোর দিকে এলেই তারা ফিরে আসবে যার যার বাড়িতে। বিদেশ কোনো দেশ নাকি! সেখানে চিরকাল থাকা যায় নাকি! তবু বুকের থেকে দলা পাকিয়ে উঠে আসছে কষ্ট। চিৎকার ও কান্নায় রাতের এই গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে, বহুদূর বিস্তৃত নির্জনতা কাচের মতো খান খান করে ভেঙে দিতে ইচ্ছে করছে সবার। কিন্তু এই নদী পার না হয়ে, এই মায়াময়, হিমশীতল, নিষ্ঠুর মৃত্যুভূমি ছেড়ে ওপারে কোনো নিরাপদ জায়গায় না যেতে পারলে তারা কাঁদবে কীভাবে। সব বেদনা ও হতাশা বুকে চেপে চুপ করে তারা বসে থাকে নায়। বাতাস আরেকটু বেশি হলে ভাল হতো। বাদাম খাটতো ভালো। জলে কলকল ধ্বনি তুলে এগিয়ে যেতে পারতো নাও। এখন ¯্রােতে ভেসে যাচ্ছে নাও। জলে কোনো শব্দ হচ্ছে না। গ্রাম থেকে আরও কিছু দূর না গেলে, জলে দাড় ফেলাও যাবে না। দাড়ের শব্দ যদি কারো কানে গিয়ে পৌঁছে! মিলিটারির অনুচর রাজাকাররা কতো জায়গায় ঘাপটি মেরে আছে। তারা পলায়নরত হিন্দুদেরই বেশি খোঁজে। টাকাপয়সা, সোনাদানা হাতিয়ে নেয়া যায়। যুবতী নারীদের তুলে দেয়া যায় মিলিটারির হাতে। ইচ্ছে করলে নিজেরাও ভোগ করতে পারে। বয়স্ক ও শিশুদের হয় মেরে ফেলো, না হয় গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দাও। কোনোমতে জানটা নিয়ে ও পারে যাওয়ার সুযোগ দাও। তাতেই তারা আপাতত কিছুটা স্বস্তি পায়। এই গ্রাম থেকে অনেকটাই দূরে ঘটে যাওয়া এমন দুই চারটি ঘটনার কথা তারা শুবেনছে। শুনেই বিস্ময় ও ভয়ে গা একেবারে কাটা দিয়ে উঠেছে। যারা এসব ভয়ঙ্কর অপকর্মগুলো করে, তারা নাকি এলাকারই, তাদের প্রতিবেশি। যুদ্ধে, রাজাকারের দলে নাম লেখানোর পর তাদের চোখের পর্দা একবারে তুলে ফেলেছে। কাউকে চেনে না। কারো কাকুতি-মিনতি কিচ্ছু শোনে না। চারদিকে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। মুসলমান কাউকে আর বিশ্বাস করা যায় না। তা সে যতোই আপন হোক, যতোই কাছের হোক। অবিশ্বাস, সন্দেহ আর আতঙ্ক তাদের সবাইকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। এখান থেকে ভালোয় ভালোয় পালাতে পারলেই এখন স্বস্তি। নাও তো চলছে ঢিমে তালে। কতোটুকুই বা এগোলো এতোক্ষণে! 
আরও কিছুদূর যাওয়ার পরই, হঠাৎ অন্ধকার ভেদ করে, পাড় থেকে তাদের নায়ের ওপর পড়ে টর্চের আলো।
কিনারে নাও ভিড়াও মাঝি। নইলে গুলি কইরি দেমু। আমরা জানি কারা আছে এই নায়।
আতঙ্কে তাদের চেহারা কালো হয়ে অন্ধকারে যেন আরও মিশে যায়। কেউ মাঝিকে সাহস করে বলতে পারে না, নাও ভিড়াইও না। চালাও। এমনকী বিপ্লবের খোয়াব দেখা জ্যোতিন্দ্রও ভয়ে একেবারে জড়োসড়ো। সে একা হলে কোনো কথা ছিল না। জ্যোতির্ময়ী আছে। আছে, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন। পাড়াপ্রতিবেশি। নারী-শিশু। এতোগুলো মানুষের জীবন নিয়ে তো ছিনিমিনি খেলা যায় না। কোনো ঝুঁকিও নেয়া যায় না। কী আর করা! মাঝিরা নৌকা তীরে ভেড়াতে বাধ্য হয়। তারা লাভ দিয়ে নৌকায় ওঠে। দশ বারজন যুবক। প্রত্যেকের হাতে রাইফেল, বেয়নেট। তাদের দিকে তাক করা। তার মধ্যে আফসার মোল্লা! নিজের চোখকে তারা বিশ^াস করতে পারে না। আফসার মোল্লার চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই। বরং সে খুব উত্তেজিত। তার চোখমুখ লাল। কখন কী করে বসে ঠিক নেই। সবাই ভয়ে আরও জড়োসড়ো। আফসার মোল্লা এগিয়ে যায়, জ্যোতির্ময়ী দেবীর কাছে। দুই নায়ের সবাই পালিয়ে যেতে পারবে ওপার। তোমাদের টাকাপয়সা, সোনাদানায় কেউ হাত দিবে না। প্রয়োজনে আমার লোকরা কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে আসবে। কিন্তু শর্ত একটাই, জ্যোতির্ময়ী যেতে পারবে না।
মণীন্দ্র সে সময় ফুঁসে উঠেছিল। সাথে সাথে তার ঘাড়ের খুব কাছে একটা রাইফেলের নল তাক হয়ে যায়। কণ্ঠনালীর খুুব কাছে বেয়নেটের ধারালো ফলা অন্ধকারেও চকচক করে যেন।
 জ্যোতির্ময়ী দেবী তাকে হাত ধরে থামিয়ে দেয়। তার পাশে বসা আরও কেউ কেউ মণীন্দ্রকে ফিসফিস করে শাঁসায়, চুপ, চুপ।
 কেউ কোনো কথা বলে না। বউ-ঝিদের কেউ কেউ চাপা স্বরে হু হু করে ওঠে। আফসার মোল্লা বলে, আমাদের হাতে সময় বেশি নাই। যা করার তাড়াতাড়ি করবে জ্যোতির্ময়ী। এই খবর যদি আবার ক্যাম্পে চলে যায়, তাহলে আমি কাউকে বাঁচাইতে পারবো না নে। তোমরা সবাই লাশ হয়ে যাবে।
 জ্যোতির্ময়ী দেবী বলতে চায়, তাই করেন, সে-ই ভালো। মাইরা ফেলেন আমাদের সবাইকে। কিন্তু বলতে পারে না। তার সামনেই তার বাবা-মা। আরও কতো আত্মীয়-স্বজন। সবারই প্রাণ যাবে! কিছুক্ষণ ভাবে সে। তারপর উঠে দাঁড়ায়। অন্ধকারে সবগুলো ভয়ার্ত চোখ তার দিকে যেন জ¦লে ওঠে। জ্যোতির্ময়ী দেবী বলে, তোমরা চইলি যাও। আমার কথা কেউ ভাইবো না। আমি চললাম।
আফসার মোল্লা ও তার সঙ্গীদের সাথে সে নায় থেকে নেমে যায়। নামার সময় তার মা শুধু একবার ডুকরে ওঠে, যাসনে হতভাগী!
 সে কি এতগুলো মানুষকে লাশ করার জন্য আবার নায় উঠতে পারে? পারে না। তার একার জীবন গোল্লায় যাক। তবু বেঁচে যাক সবাই। সে তীরে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেড়ে দেয় নাও। সেখান থেকে আফসার মোল্লা তাকে নিয়ে যায় একটা গোপন আস্তানায়। 
আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
আমার তো বিয়ে হয়ে গেছে মণীন্দ্রর সাথে আজই। সিঁথিতে সিঁদুর।
সব জানি আমি। অতীত ভুইলি যাও। আজ থেকে তোমার নতুন জন্ম হইবি। কলেমা পড়ে মুসলমান হইয়ি যাও। তোমার নাম হবে জুলেখা বিবি। আমার শাদি করা স্ত্রী। যদি অমত করো, তাইলি...
 জ্যোতির্ময়ী দেবী ভাবে, এখন তো নৌকা দুটো বেশিদূর যায়নি। সে কীভাবে অমত করবে? এ যে তার নিয়তি! নিয়তিকে ভবে এড়াতে পারে কে? কেউ না। 
আফসার মোল্লার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে তার উপায় কী? লোকজন সাক্ষী রেখে জ্যোতির্ময়ী দেবী হয়ে যায় জুলেখা বিবি। সে রাতেই আফসার মোল্লা তাকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে বলে, জুলেখা, আমার জুলেখা। তোমার জন্য আমি সব করতে পারি। আগুনে ঝাপ দিতি পারি। যে কারো বুকে বন্দুক চালায়ি দিতি পারি। আমার একটুও হাত কাঁপবি না। তোমাকে প্রতিবার দ্যাহার পর বুকের মধ্যি জিয়ল মাছের কাঁটার মতো কেমন পাড় দিয়ে উঠতো। তোমার জন্যি রাইতির বেলা ঘুমাইতি পারতেম না। পাঁচওক্ত নামাজ পইড়ি মোনাজাতে কতোবার খোদারে কইছি, তোমারে যানি পাই। শেষমেশ খোদা আমার কথা শুনছে। তুমি তো জানো না জুলেখা বিবি তোমার জন্যি আমার এই বুকের মধ্যি কতো ব্যথা। এই শরীরের মধ্যি কতো আগুন। কতো জ¦ালা। সারাক্ষণ আমারে জ¦ালায়েপুড়ায়ে একেবারে শ্যাষ কইরি দিতিছে। আইজ তুমি আমার সব বেদনা নিমিষি শ্যাষ কইরি দ্যাও। সব আগুন নিভায়ে একেবারে পানি কইরি দ্যাও।
তার চোখ থেকে নিঃশব্দে ঝরে পড়ে অশ্রু। আফসার মোল্লা হাতের তালুতে তা মুছে দিয়ে বলে, জানি, তোমার খুব কষ্ট অইতিছে। কিন্তু আমার কষ্টটাও এট্টুখানি বুঝার চেষ্টা করো জুলেখা। তোমারে ছাড়া আমার পরাণ যানি কেমন করে। ঠিক মতো তোমারে বুঝাইতি পারুম না। অনেক ভাইবি দেখছি, তোমারে ছাড়া আমার চইলবি না। তোমারে পাওয়ার জন্যি এছাড়া আর কী-ই বা করতে পারতাম আমি! মণীন্দ্রর কথা ভুইলি যাও। ও একটা আস্ত নাস্তিক। আল্লাহপাক তো দূরের কথা, হিন্দু হইয়ি হিন্দুর দেবদবীর ওপরও তার বিশ্বাস নাই। তোমারেও ও নাস্তিক বানাইতে চাইছিল। খোদার অশেষ রহমতে তুমি বাঁইচি গ্যাছো। ইসলামের আলোতে পথ চলো। ইসলামের হুকুম-আহকাম যদি মাইনি চলতে পারো, তোমার জন্য বেহেশত নিশ্চিত। মন থেকে মুইছি ফেলো মণীন্দ্রকে। সেই জায়গায় আমারে বসাও। দেখো, আমি মানুষটা একেবারে খারাপ না। তোমার কোনো অমর্যাদা অইতি দিমু না। আমার কাছে অনেক সুখে থাকবা তুমি। শুধু একবার আমাকে ভালবাইসি দেখো। 
জ্যোতির্ময়ী তবু কান্না থামাতে পারে না। যে রাত্রি হওয়ার কথা ছিল মণীন্দ্রের, সেই রাত এখন আফসার মোল্লার। এই রাতে তার থেকে মণীন্দ্র ক্রমশ সরে যাচ্ছে দূরে, আরও দূরে। 
তারপরও জ্যোতির্ময়ী ভাবছিল, সুযোগ পেলে একদিন ঠিকই পালিয়ে যাবে ওপারে। মণীন্দ্র কিংবা তার বাবা-মাকে খুঁজে বের করবে। কিন্তু সেই সুযোগই বা তার আসে কই! তার আগেই আফসার মোল্লা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে জীবনে। পালাবার কোনো পথ রাখে না। পরের মাসে তার মাসিক হয় না। সে বুঝে ফেলে, দেহের মধ্যে আফসার মোল্লার ভ্রণ বেড়ে উঠছে। এ অবস্থায় পালিয়ে গেলে কী হবে? ও পারে গিয়ে, এতো ভিড়ের মধ্যে তাদের কি সে খুঁজে পাবে। আর খুঁজে পেলোই বা। মণীন্দ্র কিংবা তার পরিবার কি তাকে গ্রহণ করবে? অস্পৃশ্য, অশুচি, ম্লেচ্ছ বলে কি গালি দেবে না? এ সমাজকে তো সে ঢের চেনে Ñ মনে-প্রাণে তারা ম্লেচ্ছকে কতোটা ঘৃণা করে। তাছাড়া এই যে ভ্রণ, তার শরীরে দ্রুত বেড়ে উঠছে, রক্তপি- থেকে মাংসপি-, তারপর এক মানবদেহ, দেবদূতের মতো এক নিষ্পাপ শিশু, তার কী অপরাধ? কী হবে তার পরিচয়? প্রথমে এই ভ্রণকে নিশ্চয় তারা হত্যা করতে চাইবে। তারপর সেই সমাজে তার ঠাঁই হবে কি হবে না, সেটা পরের ব্যাপার। কিন্তু সে কী এই ভ্রণ হত্যা করতে পারবে, যা তারই দেহের অংশ, তার দেহের রক্ত শুষণ করে বেড়ে উঠছে। সে আশ্চর্য হয়ে যায়, আফসার মোল্লার ওপর তার অনেক রাগ, কোনোদিন হয়তো কমবে না ভেতরের এই চাপা ক্রোধ, হয়তো তাকে কোনোদিন ক্ষমাও করতে পারবে না সে, অথচ তারই বীর্যে তৈরি ভ্রণ Ñ অনাগত এক শিশুর জন্য তার মনে বড্ডো মায়া। পরাণ যেন কেমন উথালপাথাল করে এখনই। 
 আর মণীন্দ্র, সে কি তাকে আগের মতো ভালোবাসতে পারবে? মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারবে? তার মধ্যে কি একটুও দ্বিধার জন্ম নেবে না। ধর্মের কথা না হয় বাদই দিলাম, তার চেতনার বিরোধী এক ম্লেচ্ছ জ্যোতির্ময়ীকে স্পর্শ করেছে, শরীরে ঢুকিয়ে দিয়েছে এক আগুনের বীজ Ñ ভ্রুণ, যা সে কোনোদিন হত্যা করতে পারবে না, এ তার জমিনের প্রথম ফসল, বীজের উৎস মূল যা-ই হোক, সে তাকে রাখতে চাইবে পরম যতনে, শত ঝড়ঝাপ্টার মধ্যেও। তার মহীরূহ হয়ে ওঠা কি মণীন্দ্র সহ্য করতে পারবে? মেনে নিতে পারবে? বাইরে মুখ বুঁজে মেনে নিলেও ভেতরে তার বয়ে চলবে অনবরত এক রক্তক্ষরণ, যা হয়তো কোনোদিন বন্ধ হবে না। ভালোবাসার জন্য ভেতরে-বাইরে সবকিছু মেনে নেবার শক্তি মণীন্দ্রর কেন, কোনো মানুষেরই তা থাকতে পারে না। সব কিছু পাওয়া হয়ে গেলে, মোহ কাটতে শুরু করে। কাছাকাছি থাকলেই অপরের দোষত্রুটিগুলোর চোখে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। এ সব সে নাটক নবেল পড়ে যেমন বুঝেছে, তেমনি এ সমাজের মানুষের দিকে তাকিয়েও। সেই মানুষ, সেই সমাজ, এতোদিন যা তার ছিল, কিংবা তার চেয়েও বেশি কিছু তার হতে পারতো, সেই রাতে তা তো সে বিসর্জন দিয়েই এসেছে। বিসর্জনের দেবী কি পুণরায় পূজার মন্দিরে উঠেছে কোথাও? নাকি উঠতে পেরেছে কখনো? সেই ক্ষমতা দেবীর যেমন নেই, তারও নেই।
আফসার মোল্লাকে একদিন অবাক করে দিয়ে সে বলে, আমি কুরান পড়া শিখতে চাই। তাতেই লোকটা কী যে খুশি! তাকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে বলে, জুলেখা, আমার জুলেখা। সত্যি কইছো তো বিবি? 
জুলেখা ভাবে, আমার জাতধর্ম গেছে যাক, যে আসছে, তার ধর্ম তো থাক। আফসার মোল্লাই তাকে এক এক করে আরবী বর্ণ চেনায়। তারপর আমপাড়া, সিপারা, কুরান। বড় ছেলে শাহজাহান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই তো সে নামাজ-রোজা শুরু করে।
যুদ্ধের দিনগুলোতে আফসার মোল্লা তাকে সব সময় বাড়ির ভেতর লুকিয়ে রাখতো। বাইরে বের হতে দিতো না। কিছুদিন এক বাড়িতে, আবার কিছুদিন অন্য বাড়িতে। সবই তার আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি। নিরাপত্তা বেষ্টনী যতো দৃঢ়ই হোক, কোনো বাড়িতে তাকে এক দেড় মাসের বেশি রাখতো না। প্রায় সময় সে তার পাশেই থাকতো। এভাবে পালিয়ে থাকতে তার মোটেও ভাল লাগতো না। সে খুব অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। একদিন সাহস করে সে আফসার মোল্লাকে বলেছিল, আপনি তো মিলিটারির লোক। কতো ক্ষমতা আপনার। তয় আমারে এতো লুকিয়েচুরিয়ে রাহেন ক্যা?
যদি তোমার ওপর ওগো বদনজর পড়ে!
আপনার বিবির ওপরও ওরা বদনজর দিবে!
তাইলি কী কই তোমারে? ওরা তো মানুষ না। আস্ত এট্টা জানোয়ার!
 সে বলতে চেয়েছিল, তাইলি ওদের দলে নাম লিখাইছেন ক্যান? কিন্তু সাহসে কুলায়নি তার। তবে কিছুক্ষণ পর, আফসার মোল্লাই তাকে বলেছিল, সময়ের সাথি খাপ খাওয়াতি অয়। নইলি মরতি অয়, আর নইলি ভাসি যাতি অয়। অহন সময় আইছ ওদের, এট্টু চালাকি কইরি না চললি, কী অইবো জানো? তুমি ভাবতিই পারবা না।
 ক্যাম্প থেকে ডাক পড়লে সে ভয়ে ভয়ে যেতো। কখনো কখনো অবস্থা বুঝে নিজে গিয়েই ক্যাপ্টেন জামশেদের সাথে দেখা করে আসতো। সেখানে সে কী কী কাজ করতো, সেই সময় তার কাছে তা স্পষ্ট ছিল না। এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহসও পেতো না সে। তবে কোনো কোনোদিন বাইরে থেকে ফিরে এসে সে খুব খুশ মেজাজে থাকতো। কোনো কোনোদিন চোখ-মুখ খুব গম্ভীর। তার সাথে সেদিন আফসার মোল্লা ভাল করে কথাও বলতো না।
 স্বাধীনতার পর আফসার মোল্লার অনেক কুকামের কথা সে শুনেছে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে হিন্দুদের ধরে নিয়ে জোর করে মুসলমান বানানো। এ কাজে সে নাকি খুব আনন্দ পেতো। সে হয়তো ভাবতো, খুব নেক কাম কইরি ফালাইছে। বেহেশতি যাইতি অসুবিধা হবে না। যারা তার কথা শুনতো না, তাদের নাকি সে ক্যাপ্টেন জামশেদের হাতে তুলে দিতো। তবে তাদের সংখ্যা কতো তা সে জানে না। দশ পনের বিশ তো হবেই। তাদের কার কী পরিণতি, তা সে প্রত্যক্ষ করতে না পারলেও, অনুমান করতে তো অসুবিধা হয়নি। তাদের মেরে ফেলা হয়েছে, নয়তো পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে। এ কারণে আফসার মোল্লার প্রতি তার ভীষণ ক্ষোভ ও ঘৃণা। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে সাহস পেত না। তবে সে মনে মনে কিঞ্চিৎ স্বস্তি পায় এই ভেবে যে, হিন্দুগো সোনাদানা, টাকাপয়সা হাতিয়ে নেয়া কিংবা বাড়িঘর দখল করার লোভ নেই তার। আর কোনো নারীর ওপর লালসার আগুনও তার চোখে জ্বলে উঠতে দেখেনি সে। যদি এসব বদ অভ্যাস তার থাকতো, তাহলে, যুদ্ধের পর তার চরম শত্রুরাও বসে থাকতো না। গ্রামগঞ্জে, এ সব কুকথা তার বিরুদ্ধে ছড়িয়ে ফায়দা লুটতো। তাছাড়া তার কাছে পেটে সন্তান আসার কথা শুনে খুব খুশি হলেও, মুহূর্ত পর, কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে আফসার মোল্লা বাইরের কাজকর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিল। সব সময় তার কাছেই পড়ে থাকতো বেশি। তার অনুগত অনুচরদের মাধ্যমে শুধু যুদ্ধের খোঁজখবর নিতো, ক্যাম্পের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতো, কথাবার্তায় মেজরের মানসিক অবস্থা যাচাই করার চেষ্টা করতো। কেউ তার খোঁজে বাড়িতে এলে তার সাথে পাশের রুমে ফিসফিস করে আলাপ করতো আফসার মোল্লা। তবে তাকে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখতো না। আলাপ সংক্ষিপ্ত করে তাকে তাড়াতাড়ি বিদায় করে দিতো, না হয় নিজেই কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে আসতো। কখনো কখনো হয়তো তার সঙ্গেও যেতো।
যুদ্ধ থামার আগেই হয়তো আফসার মোল্লা বুঝে ফেলেছিল দেশের অবস্থা কী হবে? দেশ আসলে কোনদিকে যাচ্ছে। বিজয়কে কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। সে সময় তাকে খুব মনমরা ও অসহায় দেখাতো। পাকিস্তান ভেঙে যাচ্ছে, এ কারণে, নাকি নতুন দেশে তার অবস্থা কী হবে, সে কথা বিবেচনা করে, তা জ্যোতির্ময়ী বা জুলেখা বুঝতে পারতো না। ক্যাপ্টেন জামশেদ তার বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কোরবান মোল্লার হাতে নিহত হওয়ার কদিন আগেই আফসার মোল্লা এলাকা থেকে পালিয়ে চলে গিয়েছিল তার নানার বাড়ি, মাইল দশেক দূরে এক ভিন গাঁয়ে।
বিজয় অর্জনের পরও সে ডরে ঘর থেকে বের হতো না। তাকেও ঘর থেকে বের হতে দিতো না। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, অন্যায় তো সে কম করেনি। গ্রামের কয়েকজন হিন্দুকে জোর করে মুসলমান বানিয়েছে, মুসলমান না হতে চাওয়ার অপরাধে কয়েকজন হিন্দু নরনারী তার সাঙ্গপাঙ্গ ও মিলিটারির হাতে নির্যাতিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। কেউ কেউ পঙ্গু হয়ে বসে আছে ঘরে। আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের অপরাধের তো কোনো সীমাপরিসীমা নেই। তারা অনেকেই এখন এলাকা ছাড়া। কোথায় গেছে কেউ জানে না। হিন্দুকে জোর করে মুসলমান বানানো ছাড়া যদিও আর কোনো অপরাধে আফসার মোল্লার সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই, তাতে কী, সে তো রাজাকারদলের স্থানীয় কমান্ডার, তার চেয়ে তার সাঙ্গপাঙ্গদের অপরাধ যত বেশিই হোক, সব অপরাধ, অপকর্মের দায়ভার তো এখন তার ওপরই বর্তায়। তার ওপর এলাকার মানুষ খুব ক্ষেপে আছে। একবার নাগালে পেলে আর ছেড়ে দেবে না। একেবারে জানে মেরে ফেলবে। তার মুক্তিযোদ্ধা বড় ভাই কোরবান মোল্লাও কি মানুষের ক্ষোভ থেকে তাকে বাঁচাতে পারবে? যুদ্ধ শেষ হয়েছে। মানুষ বিজয়োল্লাসে মেতে উঠেছে। কিন্তু তার তো দেখাই নেই। বেঁচে আছে না মরে গেছে, এলাকার কেউ বলতে পারে না। 
বিজয় অর্জনের তিন চারদিন পর, এক সন্ধ্যায় তার বড় ভাই কোরবান মোল্লা হাজির নানা বাড়ি। তার গলায় একটি স্টেনগান ঝোলানো। অনেকদিন পর ভাইকে দেখে আফসার মোল্লা ডরে কিংবা আবেগে হাউমাউ করে ওঠে, মিয়া ভাই, আমারে বাঁচাও। 
 কোরবান মোল্লাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। অনেক আদরের ছোট ভাই তার। জৈনপুর মাদ্রাসা থেকে আলেম বানিয়ে এনেছে। সে লোক রাজাকার বাহিনিতে নাম লেখায়ে জালেম হয়ে গেছে! হিন্দু মেয়েকে জোর করে মুসলমান বানিয়ে বিয়ে করেছে। লোকে তো তাই বলে। আর এখন সেই বউ তো তার চোখের সামনেই! সে শুধু আফসোস করে, ইশ কেন যে ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম না যুদ্ধে! তাইলে ও মুক্তিযোদ্ধাই থাকতো এখন! সে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, তুই এসব কী করছিস হারামজাদা! আমার মানইজ্জত একেবারে ধূলায় মিশায়া শ্যাষ কইরা দিছিস।
আফসার মোল্লা বলে, আমি তো কিছু বুঝতি পারি নাই, মিয়া ভাই। অহন কী অইবি?
তুই আরও কিছুদিন নানাবাড়িত লুকায়া থাক। লোকজন ঠা-া অইক। তারপর যা করার আমিই করুম নে।
আরও প্রায় মাস তিনেক সে লুকিয়ে থাকে নানা বাড়ি। জুলেখার তখনো বাচ্চা প্রসবের সময় হয়নি। আট মাস চলছে। বাচ্চার জীবন নিয়ে সেও খুব শঙ্কিত। কী হবে, না হবে, সবই অনিশ্চিত। সামনে ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া সে কোনো আলো দেখতে পায় না। হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়া যতখানি দুঃখকষ্টের, তার চেয়েও অনেক বেশি কষ্টের, একজন রাজাকারের স্ত্রী হিসাবে তাকে বেঁচে থাকতে হবে। এ গ্লানি সে মেনে নিতে পারে না। কিন্তু কী করার আছে তার! সে দাঁড়াবে কোথায়? কার কাছে যাবে? এ সন্তানেরই বা ভবিষ্যত কী? গোপনে কান্না ছাড়া সে আর কিছুই করতে সাহস পায় না। আফসার মোল্লার দিকে সে চোখ তুলে তাকায়ও না। লোকটাও যেন অনুশোচনা আর অস্বস্তিতে ভোগে। একদিন তো সে মিনমিন করে বলেই ফেলে, সুযোগ পেয়ে লোকে আমার নামে বদনাম বেশিই করতিছে। আসলে এতো কিছু আমি করি নাই জুলেখা বিবি। তিনজন মুক্তিযোদ্ধা আমার লোকজনের হাতে ধরা পড়ছিল। ক্যাপ্টেন জামশেদ তাদের খুঁজছিল। ধরা পড়ার পর আমার লোকজন তাকে তুলে দেয় জামশেদের হাতে। সেখানে আমি কী-ই বা ভূমিকা নিতে পারতাম, কও। তাদের তো আমি বাঁচাতে পারতাম না। একটুও যদি পক্ষপাতিত্ব করতি যেতাম, তাইলে জামশেদ আমাকেই সন্দেহ করতো। এমনকী গুলি কইরে মাইরে ফেলতেও দ্বিধা করতো না। কিন্তু তাদের ছাড়া অনেক নিরীহ মানুষকে তো আমি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ি ক্যাপ্টেন জামশেদের সাথে বাতচিত কইরি ছাড়িয়ে এনেছি। তাদের প্রায় সবাই আমাদের লোকজন এবং আমাদের লোকজন ছাড়াও অনেকের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হইছিলে। তারা মুক্তিযোদ্ধা, পাকিস্তানের শত্রু এসব অভিযোগে তাদের ধরা হইছিল। আমি ক্যাপ্টেনকে অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে বিশ^াস করাতে পারছিলাম যে তারা কেউই মুক্তিযোদ্ধা বা পাকিস্তানের শত্রু নয়। একেবারে নিরীহ মানুষ। তাই তারা প্রাণে বেঁচে গেছে। তখন তারা আমাকে কী সম্মান করতো! রাস্তাঘাটে যদি হঠাৎ দেখা হইয়ি যেতো তাদের কারো সাথে, দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতো, আপনার জন্য সেদিন ধড়ে প্রাণ ফিইরি পাইছি। তাই আইজও বাঁইচা আছি। নইলে ক্যাপ্টেন সাব সেদিনই আমাদের গুলি কইরি মাইরে ফালাইতো। কিন্তু কী আফসোস, তারাই আজ মুখে কুলুপ আইটে বইসে আছে। আমার পক্ষে একটি কথাও বলছে না। বাগে পেলে, তারাও হয়তো আমাকে ছাড়বে না। মাইরে ফেলবে। ক্যাপ্টেন জামশেদের ওপর তাদের যেমন ক্ষোভ, তেমনি ক্ষোভ হয়তো আমার ওপরেও। হায় রে সময়! ভাগ্যের চাকা কতোভাবেই না উল্টে যায় মানুষের!
তবে এ কথা ঠিক, ক্যাপ্টেন জামশেদ আমাকে একটু বেশিই গুরুত্ব দিতো, ভালবাসতো কিনা আমি জানি না। তাকে আমি পুরোপুরি বিশ^াস কইরতে পারি নাই কখনো। দুর্বোদ্ধ, কঠিন আর নিষ্ঠুর একটা লোক। তার মধ্যে মায়ামমতা, ভালবাসা থাকার কথা নয়। এ ধরনের লোক স্বার্থের জইন্যি সবকিছু করতে পারে। তবে আমাকে যে সে কিছুটা গুরুত্ব দিতো, তার মূল কারণ হয়তো আমি লেখাপড়া জানা মানুষ। মাদ্রাসার শিক্ষক। উর্দু জানতাম। আমার সাথে সে মন খুলে কথা বলতে পারতো। এর চেয়ে বেশি কিছু আমার মনে হয় না। 
আপনি তো অনেককে জোর কইরে মুসলমান বানাইছেন!
হঁ। ই এলাকার মোট চৌদ্দজন হিন্দু নারী-পুরুষকে আমি মুসলমান বানাইছি। তোমাকে সত্যি কইরে কই, এই একটা মাত্র কাজ কইরি আমি খুব আনন্দ পাইছি। আমি খুব খুশি। তারা পাপাচারে লিপ্ত ছিল। শেরেক, বিদআত করতো। আমি তাদের আলোর পথ দেখাইছি। কারণ ইসলাম হইতিছে দুনিয়ার সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। এই ধর্ম আসার পর সব ধর্ম বাতিল হইয়ি গেছে। 
কিন্তু জোর কইরি কি মানুষকে ধর্মান্তরিত করা ঠিক?
ঠিক না বেঠিক তা জানি না। আমার কাছে সঠিক মনে অইছি তাই কইরছি। আমার কাছে খবর আছে, যুদ্ধের পর পাঁচজন তো আবার আগের ধর্মে ফিইরি গেছে। তারা শেরক করতিছে। তাগো জন্যি আমার আফসোস অইতিছে। তবে নয়জন যে এখনো ইসলামের পথে আছে এইটা শুইনি আমার খুব ভাল লাগছে। যুদ্ধের সময় এইরম কিছু ছওয়াবের কাম তো আমি করছি। কিছু পাপ কইরি থাকি অজ্ঞানে, তাইলি আল্লাহপাক আমারে নিশ্চয় ক্ষমা কইরি দেবে। 
এমন আত্মবিশ^াসী, ধর্মান্ধ মানুষকে কী-ই বা বোঝাবে সে? সে চুপ করে থাকে। মাসখ তিনেক পর মুক্তিযোদ্ধা কোরবান মোল্লা এসে নিয়ে যায় তাদের। না, এলাকায় পাকাপোক্ত ব্যবস্থাই সে করে এসেছে। যারা গ্যাঞ্জাম পাকাতে পারে, তাদের সে সোজাসাপ্টা কথা বলে দিয়েছে, আফসার মোল্লা আমার ছোট ভাই। কেউ তার ক্ষতি করলে আমি তাকে ছেড়ে দেব না। যুদ্ধের সময় কিছু কিছু ভুল কাজ হয়তো সে করেছে। কিন্তু কিছু ভাল কাজও তো সে করেছে। ক্যাপ্টেন জামশেদের সাথে সম্পর্ক করে অনেক মানুষকে প্রাণে বাঁচিয়েছে। যুদ্ধের শেষ দিকে তার ভুল ভাঙে। পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে সে দেশের জন্য আত্মনিয়োগ করে। 
মুক্তিযোদ্ধা কোরবান মোল্লার কথার ওপর কথা রাখবে কে? এমন বুকের পাটা এ তল্লাটে কয়জনের আছে? সুতরাং আফসার মোল্লা পার পেয়ে যায়। যারা ক্ষুব্ধ ছিল, কমান্ডার কোরবান মোল্লার ডরে আফসার মোল্লার বিরুদ্ধে তারা কোনো পদক্ষেপ নিতে সাহস পায় না। মাসখানেক পরই সাইকেল চালিয়ে মাদ্রাসায় যাওয়াআসার শুরু করে আফসার মোল্লা। প্রথমে একটু আধটু ভয় পেলেও, কিছুদিন পর সে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা শুরু করে।
অতি আদরের ভাই আফসার মোল্লা যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিপদে না পড়ে, সেকারণে তার নামে একটা মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটও যোগার করে রেখে দেয়। রাজাকার থেকে সে রাতারাতি হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা! 
বাচ্চা প্রসবের সময় হয়ে এসেছে। আফসার মোল্লা যতক্ষণ বাসায় থাকে তার যতœ নেয়। সে একটু উহু করলেই তার চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছায়া পড়ে। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে স্ত্রীর জন্য প্রার্থনা করে। তাকে কোনো কাজই করতে দেয় না। মাঝ বয়সী একজন কাজের মহিলা তার পাশে থাকে। যখন যা দরকার, করে দেয়। তাছাড়া বাড়ির লোকজনও সব সময় তাকে সহযোগিতা করে। 
কোরবান মোল্লা বিয়ে করেছে যুদ্ধের আগে। এখনো তার কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। যুদ্ধের পুরোটা সময় তার বড় ভাবি বাপের বাড়ি ছিল। যুদ্ধের পর দেবরের বউকে পেয়ে সে খুব খুশি। শ^শুরশাশুড়ি মারা গেছে বছর তিনেক আগে। অনেকদিন এ বাড়িতে কোনো নতুন মুখ আসেনি। তার বাচ্চা হবে চারদিকে যেন একটা উৎসব উৎসব ভাব। বড় হলেও সব সময় সে তার সাথে দুষ্টুমি-ফাজলামি করে ঘনিষ্ঠ বিয়ান কিংবা বান্ধবীর মতো। মনে কষ্ট যতই থাক, তাকে হাসিখুশি থাকতে হয়। তাছাড়া সে তো এ পরিবারে নিজেকে মানিয়েই নিয়েছে।
দু একদিন পর হাসপাতাল থেকে মহিলা ডাক্তার এসে দেখে যায় তাকে। সে তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বলেছে, এখনো সবকিছু স্বাভাবিক আছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই আশা করা যায় প্রসব হয়ে যাবে। ব্যথা উঠলেই যেন তাকে খবর দেয়া হয়। সে নার্স ও আয়া নিয়ে চলে আসবে। এখানেই প্রসব করানোর চেষ্টা করবে। না হলে হাসপাতালে। কিন্তু আফসার মোল্লার খুব ইচ্ছা এখানেই প্রসব হোক বাচ্চা। হাসপাতালে নানা ঝামেলা। টানাহেঁচড়া তো কোনো ব্যাপার না। কিন্তু লোকজন তাদের বিষয়টা নিয়ে কানাঘুষা করবে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানা কথা বের করার চেষ্টা করবে। জুলেখার মন ভারি হয়ে যাবে। কষ্ট পাবে। জুলেখার কষ্ট সে সহ্য করতে পারে না।
যুদ্ধের সময় যারা পালিয়ে গিয়েছিল, তারা এখন আস্তে আস্তে ফিরে আসছে। ভারত থেকে হিন্দুরাও বাড়িঘরে দু একজন করে ফেরা শুরু করেছে। মণীন্দ্র ফিরে এসেছে। গ্রামের রাস্তায় তাকে দেখা গেছে। অন্দরমহলে তার কানেও এখবর পৌঁছে। রোমেছা বানুই তাকে জানায় সব। তার বাড়ি তো মণীন্দ্রদের বাড়ির কাছেই। সে গম্ভীর হয়ে যায়। কেমন আছে মণীন্দ্র, জানতে ইচ্ছে করে কিন্তু সে জিজ্ঞেস করতে পারে না। রোমেছা বানুই ফিসফিস করে বলে, একেবারে শুকিই গ্যাছে লোকটা। চিনাই যায় না, ওই আমাগো মণীন্দ্র দাদা।
বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। কিন্তু তা তো সামাল দিয়ে রাখতে হবে। সে পাশ কেটে অন্য দিকে মোড় নেয়, আর কেউ কি এসেছে? আমার বাবা-মা? কিংবা মণীন্দ্রর?
 রোমেছা বানু বলে, না, তাগো কাউরে দেহি নাই। তয় না আসলেও আসপি। যুদ্ধ শ্যাষ অইলো সবে। ইহানে বাড়িঘর, জায়গাজমি রাইখি কলকাতায় পইড়ি থাকপি ক্যান? ওইটা কি নিজের দ্যাশ?
 সে চুপ করে থাকে, ভাবে, যুদ্ধ হয়তো আপাতত শেষ। এই য্দ্ধুবিধ্বস্ত দ্যাশও একদিন ঠিক অইবি। ভাঙা সংসারও জোড়া লাগবে মানুষের। কিন্তু ভাঙা মন কি কোনোদিন আর আগের মতো হইবি? বুকের গভীর থেকে একটা নিয়াস বেরিয়ে যায় তার।
পরদিন রোমেছা বানু বলে, আইজ মণীন্দ্র দাদা বাড়ির সামনের এই হালট দিয়ি কমছে কম চাইর পাঁচবার আইছে গ্যাছে। এই বাড়িটার মিহি সে কেমন কইরি যানি তাকাই থাহে।
কথা তো সত্যিই। এ ঘরের খোলা জানালা দিয়ে ব্যাপারটা তার চোখেও দুইবার পড়েছে। একবার যেতে এবং আরেক আসতে দেখেছে তাকে। কেন ফিরে এসেছে মণীন্দ্র? কেনই বা এই হালট দিয়ে বারবার যাওয়া-আসা করে? তার কাছে কী চায় সে? তাকে দেবার মতো আর কী আছে তার? তার চোখে জল চলে আসে। আঁচলে তা আড়াল করে সে রোমেছা বানুকে কাজের কথা বলে সরায়। সন্ধ্যা তো হইয়ি গ্যালো। কবুতরের খোপটা কি লাগানো হইছি? সব কবুতর কি খোপে ফিরেছে?
 রোমেছা বাইরে গেলে সে ছোট্ট একটা চিরকুট লেখে, এদিকে আর এসো না। নামধাম কিছুই লেখে না। রোমেছার হাতে পাঁচটি টাকা ধরিয়ে দিয়ে চুপি চুপি বলে, কাল একবার তার হাতে পৌঁছে দিও।
আঁচলে এককোণে গিট্টি বেঁধে সে বলে, তা আর কইতি হবি না। বুঝছি।
কোরবান মোল্লা তো এদিক ওদিক নানা কাজে ঝাপিয়ে পড়েছে। বাড়ি সে কখন ফিরে না ফিরে তার কোনো ঠিক নেই। কিন্তু আফসার মোল্লা কোথাও দেরি করে না। মাদ্রাসায় যেটুকু কাজ, তা সেরেই চলে আসে। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যার অনেক পরে সে বাসায় ফেরে। তখন তার প্রসব যন্ত্রণা ধীরে ধীরে উঠে গেছে। ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বড় জা তার পাশে। রোমেছা ছুটে গেছে ডাক্তার ডাকতে। আফসার মোল্লা নিজেকে কিছুটা অপরাধীই ভাবে। স্ত্রীর অবস্থা দেখে সে খুব চিন্তিত। ডাক্তারের কাছে নিজেই ছুটে যাবে কিনা ভাবে। আর সে সময় রোমেছা বানু ডাক্তার নিয়ে বাড়িতে ঢোকে।
তখন তার ব্যথা চরমে। ডাক্তার তার নাড়ি পরীক্ষা করে। প্রেসার মাপে। স্টেথেসকোপ দিয়ে বুক, পেট পরীক্ষা করে। ব্যথা আর সহ্য করতে পারে না সে। কঁকিয়ে ওঠে। আফসার মোল্লা স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে মুষড়ে পড়ে, তার চোখে-মুখে অন্ধকার, করুণ। ব্যথাটা যেন জুলেখার নয়, তারই। উদ্বিগ্নকণ্ঠে সে বলে, হাসপাতালে নিতি হবি? তাইলি নিয়ি চলেন। অবস্থা তো বেশি ভাল ঠেকতিছি না। যদি কিছু হইয়ি যায়!
ডাক্তার হেসে বলে, মা হতে গেলে এটুকু কষ্ট সহ্য করতেই হয়। আপনি এতো চিন্তা করবেন না। এখন বাইরে যান, যদি হাসপাতালে নিতে হয়, জানাবো আপনাকে।
 তবু কি সে যেতে চায়! কিন্তু না গিয়েই বা উপায় কী? বড় ভাবি যে ভাবে ফোঁড়ন কাটে, ব্যথা জুলেখার, আর কাতরাইতেছি তুমি। ও জুলেখা, এতো প্রেম তোমরা রাখো কই? 
তীব্র ব্যথার মধ্যেও কি জুলেখার শিরা-উপশিরায় খানিক আনন্দ বয়ে যায়! মৌলবী হয়েও তার যেন কোনো সংকোচ নেই। বাইরে যাওয়ার আগে জুলেখার দিকে গভীর যাতনা ও মায়াময় দৃষ্টিতে তাকায়। জুলেখার মনে হয়, তার এ যন্ত্রণার জন্য আফসার মোল্লা হয়তো নিজেকেই অপরাধী ভাবছে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সে বলে, আমি কিন্তু পাশেই আছি। কিছু দরকার লাগলে আমাকে সাথে সাথে জানাইও ভাবি। 
ডাক্তার মুখ টিপে হাসে। তার ভাবিও, ও জুলেখা, তুমি কতো ভাগ্যবান, স্বামীর এমন ভালোবাসা কয়জনে পায়, বলো? তোমার ভাসুর তো এতোদিনেও আমার জন্য এমন একটু দরদ দেখাতি পারলো না।
ছেলে হওয়ার পর কিছুক্ষণ জ্ঞান ছিল না তার। তবে সে জায়ের মুখেই শুনেছে, ছেলে হওয়ার খবরে যতোটা না সে আনন্দিত, তার চেয়েও অধিক উদ্বিগ্ন জুলেখার বিষয়ে। ও ভালো আছে তো ভাবি?
আছে আছে, চিন্তা করো না। এবার আনন্দে আজান দ্যাও গি, যাও। 
তারপরই তার চোখে-মুখ নাকি আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আর সে আজান দিতে যায়, আল্লাহু আকবার... 
চোখ খুলে ছেলের মুখ দেখার পর কী প্রশান্তি! কোনো কষ্টই আর মনে থাকে না। তার মনে হয়, এমন একটা ফুটফুটে শিশুর জন্য এরচেয়ে অনেক বেশি যন্ত্রণা সে সহ্য করতে পারে।
 তারপর তো ছেলে নিয়েই ব্যস্ত। এর ফাঁকেও কি মণীন্দ্রর কথা তার মনে পড়েছিল? একদিন রোমেছা বানুকে সে জিজ্ঞেস করে, আমার চিরকুট?
 সে মুখ গম্ভীর করে বলে, ওহ্, আপনাকে তো বলতি ভুলেই গেছি।
চিরকুটটা সে আঁচলের গিট্টি খুলে হাতে ধরিয়ে দেয়।
দ্যাও নাই তারে?
দিতিই তো গেছিলাম। গিয়ি হুনলাম মণীন্দ্র দাদা নাই। চইলি গেছি। যে-রাতে বাবু অইলি না? হেই রাইতি কোরবান ভাই গিয়ি নাকি তাকে খুব শাঁসাই আইছে। তারপরও হে ছিল। পরদিন বিয়ানেও তারে বাড়িত দ্যাহা গ্যাছে। তারপর হে বাড়িত থেইকি বাইরে গ্যাছে। আর ফিইরি আহে নাই।
 সে আবেগে মুখ ফসকে বলে ফেলে, কেন?
 রোমেছা বানু বলে, তা আমি কী কইরি কমু?
তা তো সত্যি। সে ভাবে, সে কি তাইলি চইলি গ্যাছে। আর আসপি না কোনোদিন?
 কোরবান ভাইকেই বা কী বলবে সে? মোল্লা বাড়ির বউয়ের দিকে মণীন্দ্র চোখ দিবে, তার জন্য বারবার বাড়ির সামনের হালট দিয়ে ঘুরবে, তাতো হতে পারে না। দুই তিন পুরুষ ধরে এ তল্লাটে মোল্লাবাড়ির সম্মান ও সুনাম উজ্জ্বল। প্রভাব-প্রতিপত্তি কম নেই তাদের। যেমন লোকবল, তেমনি লাঠিবল।
 কান্না লুকাতে সে বলে, বাবুর কাঁথাগুলো ধুয়ে রোদে দ্যাও।
 রোমেছা আঁচলে খুঁট থেকে টাকা বের করে তার সামনে দিয়ে বলে, আমি তো গেছিলামই। কিন্তু পাইনি। ন্যান ভাবী, আপনার ট্যাহা।
 সে বলে, লাগবে না। ওটা তোমার বকশিসই। থাক।
মণীন্দ্র আর আসেনি। তার কোনো খোঁজও জানে না সে। মাস ছয়েক পর জ্যোতির্ময়ীর বাবা এসেছিল গ্রামে। জ্যোতির্ময়ীর ছেলে হয়েছে, এ সংবাদ নিশ্চয় কেউ না কেউ তার কানে পৌঁছে দিয়েছে। তার বাবা যেরকম গোড়া হিন্দু, রাগী আর কঠিন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ, এদিকে তার না আসারই কথা। তবু তার কেন যেন মনে হতো, বাবা, হয়তো একবার আসবে। জমিজমা সব বিক্রি করে দিচ্ছে, এদেশে আর থাকবে না। চলে যাবে ভারতে। কলকাতায় বালিগঞ্জে মামারা থাকে। সেখানেই সেটেল্ড হবে, নিশ্চিত। যুদ্ধ তার মনকে একেবারে ভেঙে দিয়েছে। সুখ-শান্তি ও মর্যাদা সব নষ্ট করে দিয়েছে। এদেশে সে থাকবে কেন? দেশভাগের আগের বাংলা, দেশভাগের পরের বাংলা আর মুক্তিযুদ্ধের পরের বাংলা বা বাংলাদেশ তো এক নয়। বিস্তর পার্থক্য। কোনো কিছু আর আগের মতো নেই। কতো বদলে গেছে চারপাশ! চারদিকে মানুষের মুখের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়। এই বদলে যাওয়া পরিবেশের সাথে সে খাপ খাওয়াতে পারবে না। চলে যাবে। যাওয়ার আগে বাবা হয়তো একবার আসবে। না এসে কি পারবে? বাবা তাকে কতো ভালবাসে! কোনোদিন তার কোনো আবদার কি সে ফেলে দিয়েছে? বাবা কি জানে না, জ্যোতির্ময়ীও তাদের কতোটা ভালবাসে। হৃদয় দিয়ে কতোটা অনুভব করে। তার জন্য কতোটা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এখন। মুসলমান হয়েছে, ম্লেচ্ছর সংসার করছে, তাতে কী? সে তো আর ইচ্ছে করে এসব করেনি। আর করলোই বা, একটা রেখা কি পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে সম্পর্ককে চিরতরে বিভাজন করে ফেলতে পারে? ভাবাবেগের কাছে মাঝে মাঝে এসব ভেদরেখা ক্ষণিকের জন্য হলেও মুছে যায়। সামাজিকতা ও চক্ষুলজ্জার ভয়ে বাবা যদি নাও আসতে পারে, তাহলে, সে হয়তো কাউকে দিয়ে তাকে খবর পাঠাবে। জ্যোতির্ময়ী দেবী কি যাবে না? না গিয়ে থাকতে পারবে? মনে মনে সে প্রস্তুত হয়েই ছিল, বাবা খবর পাঠালে আর দেরি করবে না। এ বাড়ির কেউ যদি তাকে নিষেধ করে, তাও সে শুনবে না। ছুটে যাবে বাবার কাছে। তারপর যা হবার হবে। সব সময় হালটের দিকে, এই উঠোনের দিকে তার কান খাড়া হয়ে থাকতো, এই বুঝি বাবা এলো।
তার এই হাঁসফাঁস ভাব আফসার মোল্লা হয়তো টের পেয়েছিল। একদিন রাতে সে বলেছিল, তোমার বাবা যদি এ বাড়িতে আসে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। ইচ্ছে করলে বাড়ি গিয়ে তুমি তোমার বাবার সাথে দেখা করেও আসতে পারো। লোকে হয়তো কয়দিন একটু কানাঘুষা করবে, তারপর থেমে যাবে। ও সব আমি পরোয়া করি না।
 সে অবাক হয়ে অন্ধকারে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। এই লোকটা আসলে কী? এমন লোক কেন রাজাকার হলো? কেন? 
বাবার ওপর তারও তো অভিমান কম না। অভিযোগও কম না। আমি কেন আগে যাবো? বাবা আসতে পারে না? না আসতে পারলে কাউকে দিয়ে আমাকে খবর পাঠাতে পারে না? না, এ দুটোর একটিও সে করেনি। শেষে ধৈর্যের বাঁধ একেবারে ভেঙে গেলে একদিন রোমেছা বানুকে গোপনে পাঠায় বাবার খোঁজখবর আনতে। সে ঘুরে এসে বলে, সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আজ সে চলে গেছে।
 সে অবাক হয়, জ্যোতির্ময়ীর কথা সে একবারও ভাবে নি! তার সাথে দেখা না করে কীভাবে চলে যেতে পারলো সে! এ জগত কি তাহলে এমনই নিষ্ঠুর! ধর্মের সাথে সাথে মানুষের সব সম্পর্কও চলে যায় বা মুছে যায়! পারিবারিক সম্পর্ক কি তাহলে শুধুই পেন্সিলের একটা দাগ, ধর্মের ইরেজার দিয়ে যা এক ঘঁষাতেই মুছে ফেলা যায়! সেখানে অতীতের কোনো চিহ্ন থাকে না! সে বুঝতে পারে না। মুহূর্তে তার নিজেকে খুব নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ লাগে। আজ থেকে তার কেউ নেই! কোথাও কেউ কোনোদিন ছিল না তার! চোখের অশ্রু সে খুব কঠিনভাবে সংবরণ করে রাখতে চায়। কিন্তু টুপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ে কোলে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত ছেলের ওপর। বেঁচে থাকার জন্য এই তার এক নতুন ভূবন!
তারপর থেকে সে নিয়মিত নামাজ পড়ে। রোজা রাখে। বাইরে বের হলে বোরখা পরে। পর্দার ভেতরে নিজেকে কী সুন্দরভাবেই না লুকিয়ে ফেলা যায়! তুমি বাইরের সবকিছু দেখো, তোমার ভেতরের কিছু কেউ দেখতি পাবি না! তাছাড়া আফসার মোল্লাও কী খুশি! তাকে খুশি রাখার জন্যই সে এ সব করে কিনা, কোনোদিন ভেবে দেখেনি। তবে সে লক্ষ্য করেছে বোরখা পরা শুরু করায় শুধু আফসার মোল্লা নয়, তার চারপাশের মুসলমানরাও খুশি। তাদের মধ্যে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে, খুব ভাল মেয়ে। একেবারে সাচ্চা মুসলমান অইয়ি গেছি। আল্লাহপাক চাইলে সবই তো পারে। পাহাড়কে সাগর, সাগরকে পাহাড় বানায়ে ফেলতি পারে।
চার বছর পর জরিনা আসে। তখন চুয়াত্তর সাল। দেশে দুর্ভীক্ষ চলছে। না, দুর্ভীক্ষের কোনো আঁচ এ পরিবারে লাগেনি। আগে থেকেই তারা বনেদি পরিবার, স্বচ্ছল। মানুষের অভাব অনটনে তাদেরও মন কাঁদে। প্রতিবেশিদের খোঁজখবর নেয়। কেউ না খেয়ে থাকলে খাবার দেয়। চালডাল দিয়ে সাহায্য করে। আফসার মোল্লা বলে, জুলেখা, ঘরে খাবার থাকলে ক্ষুধার্তকে খাবার দিও। খাবার চাইয়ি কেউ যানি ফেরত না যায়। তোমার ঘরে খাবার থাকার পরও যদি না খাওয়া মানুষকে ফিরিয়ি দ্যাও, তাইলে আল্লাহপাক ব্যাজার অইবি। 
 সে খবর নিয়ে দেখেছে, এ এলাকায় কেউ না খেয়ে থাকে না। রুটি, ডাল, মিষ্টি আলুর অভাব নেই। শুধু ভাতই পাওয়া যায় না। দেশে চালের বড় অভাব। এ দুর্ভীক্ষ কতোদিন স্থায়ী হবে, তা কেউ জানে না। বড় ভাই কোরবান মোল্লা বন্ধুবান্ধব নিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু কিছু ধানচাল যোগাড় করে মানুষকে দেয়। মাঝে মাঝে তারা খিচুড়ি রান্না করে ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ায়। অস্থায়ী লঙ্গরখানা। আফসার মোল্লাও তাদের সাথে কাজ করে। মানুষকে তো বাঁচানো দরকার।
 কোরবান মোল্লা শেখ মুজিব বলতে অন্ধ। আফসার মোল্লা কতোটা ভক্ত তা বোঝা যায় না। বড় ভাইকে সে মান্য করে খুব। তার কোনো কথা সে ফেলতে পারে না। সে যেখানে ডাকে, সেখানেই যায়। আবার কোনো ওয়াজ মাহফিলে ডাক পড়লে সে বয়ান করে আসে। মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝায়। নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত সম্পর্কে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। বক্তা হিসাবে সে খারাপ না। 
পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার পরিজন হত্যার খবর রেডিওতে ছড়িয়ে পড়লে চারদিকে থমথমে অবস্থা! কোরবান মোল্লাও একটা প্রতিবাদের মিছিল বের করতে সাহস পায় না। নানা জায়গায় কদিন লুকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে ঘরে এসে ফুসফুস করে। 
আফসার মোল্লাও খুব ভয়ে ভয়ে ছিল। কয়েকদিন মাদ্রাসায় যায় নি। তারপর আবার যাতায়াত শুরু করে। 
ছিয়াত্তরের শুরুতেই আমজাদ মিয়া ফিরে আসে এলাকায়। যুদ্ধের পর সে পালিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা তখন তাকে পেলে মেরে ফেলতো। এখন সে বেশ হাসিখুশি। একদিন তার মাদ্রাসায় এসে বলে, আফসার ভাই, আপনি তো আমাদেরই লোক। শুধু ভাইয়ের কারণে কয়দিন ওদিকে ভিড়ে ছিলেন। এবার মায়ের ছেলে মায়ের কোলে ফিরে আসুন। আমাদের সাথে কাজ করুন।
আফসার মোল্লা বলতে চায়, আমি এখানে যেভাবে আছি ভাল আছি। ওখানে গিয়ে আর দুর্নাম কুঁড়াতে চাই না। 
কিন্তু তা না বলে সে মিটিমিটি হাসে। আমজাদ মিয়া বলে, শেখ মুজিব শ্যাষ। আওয়ামী লীগ আর সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। এখন আমরাই ক্ষমতায়। যদিও আমাদের কেউ সরাসরি পাওয়ারে নেই। তবে আস্তে আস্তে ঢুকে পড়বে পাওয়ারে। সেই পথ আমরা তৈরি করে ফেলছি। 
আফসার মোল্লা হ্যাঁ বা না কিছুই বলে না। আমজাদ মিয়ার তখন বোধ হয় রাগ হয়, সে বলে, মোল্লা বাড়ির ছেলে অইয়ি হিন্দু মাইয়া বিয়ি করলেন। তারপর থেইকি আপনার মনটাই কেমন বদলায়া গেছে।
আফসার মোল্লারও রাগ হয়, সে বলে, অহন আর সে হিন্দু নাই। মুসলমান বানায়েই তারে শাদি করছি। সে এখন পাঁচওক্ত নামাজ পড়ে। রোজা রাখে। ইসলামের হুকুম-আহকাম সব মেনে চলে। পর্দাও করে।
তা করে শুনছি। কিন্তু সেটা কতোটা বাইরে কতোটা ভেতরে, তা ক্যাডা জানে। ব্রাহ্মণের মাইয়া। এতো সহজে কি সবকিছু ছাইড়া দিতে পারবো? আচারেবিহারে মুসলমান অইলিও ভেতরে সে হিন্দুই থেইকি যায়।
কী যে কন আপনি! আপনি মুসলমানদের ইতিহাস ভুলে গেছেন মনে হয়। ভুঁই ফুড়ে তো ইসলাম হয়নি। নবীজির সাহাবীগণ তো অন্য ধর্ম থেকে আইছিলে। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তারা কী করতো? শেরক, বিদআতে লিপ্ত ছিল না! এদেশে যখন ইসলাম প্রচার হয়, তখন কারা মুসলমান হইছিলে, হিন্দু, বোদ্ধ, চ-ালরাই তো। 
কিয়ের সাথে কী মিলাচ্ছেন আপনি! সেই যুগ আর এই যুগ কি এক অইলি? আমার তো মনে অয় শুধু ওই জ্যোতির্ময়ীরে বিয়ি করার লাইগিই আমাগো দলে নাম লিখাইছিলেন? আর...
আর কী?
মুক্তিযোদ্ধাগো গুপ্তচর আছিলেন আপনি। এই কথা আমার পরে মনে অইছিলে। আপনার কাজকর্ম দেইখিই বুঝছিলাম। মেজর সাবরে বইলি মুক্তিযোদ্ধা রফিক আর সালামরে ছাইড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করছিলেন আপনি। আরও কয়েকজন...
আমি যা ভালো মনে অয় কইরিছি।
আমজাদ মিয়া আর কথা বলে না। রাগ করে উঠে পড়ে সেখান থেকে। আফসার মোল্লাও তাকে আর বসতে বলে না। তারপর থেকে রাস্তাঘাটে দেখা হলেও তেমন কথা হতো না দুজনের। একজন আরেকজনকে এড়িয়ে যেতো। প্রায় ত্রিশপয়ত্রিশ বছর তো আমজাদ মিয়া বেশ দাপটেই ছিল। জামাতের কেন্দ্রীয় শূরা কমিটির সদস্য। নানাদিকে তার ব্যবসা-বাণিজ্য। টাকাপয়সার কোনো অভাব নেই। তার মধ্যে কেমন অহঙ্কারভাব চলে এসেছিল। টাকাপয়সা ও ক্ষমতা থাকলে যা হয় আর কি! কিন্তু এখন সে জেলে পচে মরতিছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী কর্ম কা-ে লিপ্ত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়ে গেছে। কবে রায় হয় ঠিক নেই। রায়ে নিশ্চয়ই ফাঁসি হবে, সবাই তো তাই বলাবলি করছে। কাদের মোল্লা, কামরুজ্জামান, কাসেমের ফাঁসি হয়ে গেছে। তাদের সাথে আফসার মোল্লার কোনো যোগাযোগ ছিল না। শুধু আমজাদ মিয়ার প্ররোচনায় পাকিস্তান ও ইসলাম রক্ষার জন্য সে একাত্তরে রাজাকার দলে নাম লিখিয়েছিল। নাকি জ্যোতির্ময়ীর জন্য? মুক্তিযোদ্ধাদেরই কেন বাঁচাতে গিয়ছিল সে। জেনেশুনে এতো বড় ঝুঁকি কেন নিতে গিয়েছিল? সে কি তার ভাইয়ের টানে? এ সব প্রশ্ন সে নিজেকে নিজে অনেকবার করেছে। কোনো সুরাহা হয়নি। 
আমজাদ মিয়ার সুপারিশেই তাকে তার এলাকার দায়িত্ব দিয়েছিল ক্যাপ্টেন জামশেদ। তাও সে ঠিক মতো পালন করতো না। বিয়ের পর তো সে অনেকটা ঘরকুনো হয়েই পড়েছিল। এ নিয়ে একদিন বিকালে আমজাদ মিয়ার সাথে তার কথা কাটাকাটি হয়। মুক্তিযোদ্ধা রফিক ও সালামকে কেন ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেছে, সেই কৈফিয়তও চায় আমজাদ মিয়া। আফসার মোল্লা বলে, আমি জানতাম, তারা নিরীহ। এই গ্রামের বাসিন্দা। 
আমজাদ মিয়া কিছুতেই তা বিশ্বাস করে না। একটা সন্দেহের ছুরি চোখে নিয়ে চলে যায় ক্যাম্পের দিকে। আর সেদিন সন্ধ্যায় তার দলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মী লিয়াকত এসে বলে, ক্যাপ্টেন সাব আপনারে যাইতে কইছে?
কেন?
জানি না। তয় তার মেজাজ খারাপ। আপনার ওপর রাইগি আছে।
কারণ?
কোরবান ভাই যে মুক্তিযোদ্ধা, এইটা মনে অয় সে জাইনি গ্যাছে? তাছাড়া...
তাছাড়া কী?
রফিক ও সালাম ভাইর ব্যাপারেও কথা অইছি মনে অয়। আপনি নাকি জাইনি শুইনিই?
সব মিথ্যা কথা। কে বললো তাকে?
লিয়াকত মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে। 
আমজাদ মিয়া গিয়েছিল আজ?
হ, ক্যাপ্টেন সাবের সাথে আলাপ কইরিছে? আমাকে কইলি আপনাকে ডাইকি নিয়ে যাইতি।
 আমজাদ মিয়া তাহলে তাকে ফাঁসায়ে দিতে চায়? হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার পর তাকে বিশ^াস করতে পারছিল না সে। তারপর রফিক ও সালামকে ছাড়িয়ে দেয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের চর ভাবছে? যদি তাই ভেবে থাকে, তাহলে তো ওদিকে যাওয়া এখন মোটেও নিরাপদ নয়। এখানে থাকাও তার জন্য বিপজ্জনক। এখন এ কথা লিয়াকতকে বলাও যাবে না। সে বলে, লিয়াকত, তুমি ওই পাকুড় গাছের নিচে খাড়াও, আমি এক্ষণি বাড়ি থেইকি আসতেছি। 
লিয়াকত বলে, ঠিকাছে।
বাড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে সে ভাবে, বিভিন্ন জায়গায় পাক বাহিনির পরাজয় হচ্ছে। এ মুহূর্তে ওদের মাথার কোনো ঠিক নেই। জামশেদ হয়তো তাকে স্বার্থের জন্য ভালবাসে। কিন্তু বিশ^াস করে কতোটা? এখন গেলে হয়তো সে আর ফেরত নাও আসতে পারে। জুলেখার কী হবে?
আলগোছে তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। সে বাড়িতে ঢুকে জুলেখাকে ফিসফিস করে বলে, শুধু বোরখাটা পইরি লও। বেশি দেরি করা যাবে না। এক্ষণি এখান হতি পালাতি হবি।
বাড়ির পেছন দিক থেকে বের হয়ে ঝোপঝাড় ঠেলে, ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে ছুটে। খাল পার হয়ে চলে যায় নানাবাড়ি। জুলেখার খুব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু বাঁচার জন্য মানুষ কী-ই না করে।
তিনদিন পর কোরবান ভাইদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে নিহত হয় ক্যাপ্টেন জামশেদ। তার কোম্পানি বিধ্বস্ত। পরাজিত। সারেন্ডার করা সেনাদের পিছ মোড়া করে বেঁধে রোদের মধ্যে রাখে স্কুল মাঠে। রাতের স্টিমারে তুলে পাঠিয়ে দেয় ঢাকায়। আমজাদ মিয়া পালিয়ে যায়। পরে শুনেছিল, পাকুড় গাছের নিচে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও যখন আফসার মোল্লা আসে না, তখন লিয়াকত বাড়ির উঠোনে গিয়ে ডাকাডাকি করে। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বাড়ির ভেতর ঢোকে। কেউ নেই। কাঠের জানালার ফুটো দিয়ে ঘরের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখে খালি, অন্ধকার। নিশ্চয় সে ভাবে নিশ্চয় আফসার মোল্লা পালিয়ে গেছে। যাক গে। কিন্তু ক্যাম্পে গিয়ে সে কী বলবে? তার কথা যদি তারা বিশ্বাস না করে। উল্টো যদি ভাবে, সে-ই আফসার মোল্লাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে, তাহলে তার কী হবে? তখন সে খুব ভয় পায় ক্যাম্পে ফিরে যেতে। রাগের মাথায় জামশেদ যদি তাকে গুলি করে দেয়! তাই সেখান থেকে সেই রাতেই সে পালিয়ে যায়।
সেই একাত্তর থেকে আমজাদ মিয়া সব সময় তাকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। ছিয়াত্তর কি সাতাত্তর সালে একদিন সে বলেছিল, আপনি মোল্লা ঠিকই, কিন্তু কোনোদিন পাকিস্তান চান নাই। একাত্তরে আমাদের সাথে মিশে ভাইয়ের গুপ্তচর হয়ে কাজ কইরিছেন। 
সেই দুঃসময়ে আফসার মোল্লা যাতে জামাতে ঢুকে, ক্ষমতাসীনদের কোনো সুবিধা ভোগ করতে না পারে, সেই জন্য তার এই পাকাপোক্ত ব্যবস্থা! এ কথা সে জামাতের লোকদের কাছে বলে বেড়াতো। এ কারণে তার মাদ্রাসায় জামাতপন্থি শিক্ষকরা কখনো তাকে ভাল চোখে দেখতো না। তার সাথে মিশতেও চাইতো না। বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগার, তাই আওয়ামী লীগের গুপ্তচর হিসেবে তখনো যেন তাকে সন্দেহ করতো। সব সময় তার দোষ ধরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতো। জামাতিরা ইসলামের কথা বলে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার খোয়াব দেখে বলে সেও কি কোনোদিন জামাতে যোগ দিতে চেয়েছিল? চায়নি। ইসলামের প্রতি তার দরদ আছে সত্য কিন্তু জামাতিদের আচরণে সত্যি সে খুব রুষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাদের প্রতি ভেতরে একটা ক্ষোভও তৈরি হয়েছিল। তাই স্বাধীনতার পর আস্তে আস্তে সে ঝুঁকে পড়েছিল আওয়ামী লীগের দিকেই।
কিন্তু প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসাবে যখন সে পা ফেলে, সামনে একটু একটু করে এগোয়, অনেক পরে উলামা লীগের স্থানীয় নেতা মনোনীত হয়, তখন তার প্রতিপক্ষ, উলামা লীগের নেতা হওয়ার জন্য যাদের খুব খায়েস ছিল, তারা, সেই খোদ উলামাদের অনেকেই তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে, চারদিকে প্রচার চালায়, একাত্তরে সে তো আছিল একটা রাজাকার। ভাইয়ের কারণে প্রাণে বাঁইচে গ্যাছে। এখন এ দল করে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জামাতের সাথে তার আঁতাত আছে। জামাতিরা কোনোদিন ক্ষমতায় আইলি দেখবা সে পক্ষির মতো ফুড়–ত কইরি উড়াল দিবে। মায়ের ছেলে ফের মায়ের কোলে ফিইরি যাবি।
রাগ করে সে ইদানিং কোথাও যায় না। আগে মাহফিলে ওয়াজনসিহত করার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তার ডাক পড়তো। ওয়াজ সে খারাপ করতো না, গলা ভালো, বলার ভঙ্গিও চমৎকার। লেগে থাকলে আস্তে আস্তে এখানেও সে বেশ নাম করতে পারতো। কিন্তু কেন যেন এখান থেকেও তার মন উঠে গেছে। অনেক বছর হলো এসব মাহফিলও সে বাদ দিয়েছে। কী দরকার, বাড়িতে চুপ করে বসে থাকাই ভাল। নামাজ-রোজা করো। খোদা তা আলার নাম জপো, ঢের ভালো। ও সব তার দরকার নেই। জুলেখা বিবিও লোকটাকে ঠিকমতো চিনতে পারে না, এত বছর সংসার করার পরও। সে ভাবে, লোকটা তো এদিকেও নাই, ওদিকেও নাই। সব রকম ঝৈ-ঝামেলা এড়িয়ে চলে। এ কারণে বাইরে কোথাও তার জায়গা নেই। এমনকী এই সংসারেও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সে অনেক বেশি নমনীয়। জুলেখা যা বলে তাই যেন ঠিক, তার কথার বাইরে সে যায় না। সে কি রাজাকার, নাকি মুক্তিযোদ্ধা পক্ষের শক্তি, বোঝা কঠিন। সে আসলে কী?
তারই মতো দ্বৈত সত্ত্বা নিয়ে কি সে বেঁচে আছে? কই, এত বছর পরও তো জুলেখাও পারেনি শুধু জ্যোতির্ময়ী হয়ে থাকতে, কিংবা জুলেখা? অন্তরে-বাইরে কি তার দুটি সত্ত্বা নয়? জ্যোতির্ময়ী ও জুলেখা? একই খোলসের মধ্যে চিরকাল পাশাপাশি বাস করে গেল দুজন মানুষ বা দুজন নারী, দুটি ভিন্ন রূপে, চুপচাপ, সব কিছু মেনে নিয়ে, নানা অদৃশ্য দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ভেতর দিয়ে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে সে। জীবন তো ফুরিয়ে এলো। ত্বকের ঔজ্জ্বলতা মরে যাচ্ছে দিন দিন। চামড়ায় ভাজ পড়ে যাচ্ছে। আগের সেই টানা টানা চোখ কই? যা দেখে মণীন্দ্র একদিন বলেছিল, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ! আফসার মোল্লাও তো কম বলেনি কিছু, এ দুনিয়াতে তুমিই আমার হুর, জুলেখা, আমার জুলেখা বিবি। তুমি পাশে থাকলি নিজেকে আজিজ মিসরের মতো লাগে। কিংবা কখনো কখনো মনে অয় আমি নিজেই ইউসুফ। তওবা তওবা, লোকে শুনলে আবার নামে আবার নানা কুকথা ছড়াবে। কিন্তু তারা তো জানে না, তোমার রূপের আগুনে, তোমার চোখের আগুনে পুইড়ি পুইড়ি আমার ভেতরটা ছাই হইয়ি গেছি সেই কবে। তুমি কি আমাকে দেখে বুঝো না জুলেখা বিবি? নাকি আমার কথা তোমার বিশ্বাস অইতি চায় না। তার কণ্ঠে আবেগ, ভরা নদীর মতো থৈ থৈ করে ওঠে। তবু সে নির্মোহ থাকে আর ভাবে, আমি কি বুঝতে চেয়েছি মণীন্দ্র কিংবা আফসার মোল্লার ক্ষয় ও ক্ষতি কোনোদিন! নাকি তারা আমাকে বুঝতে চেয়েছে? আফসার মোল্লা কি জানে, এই একজন জুলেখা বিবির মধ্যে কীভাবে চুপ করে আছে একজন জ্যোতির্ময়ী দেবী? কিংবা মণীন্দ্র কি কোনোদিন জানতে পারবে, এই একজন জুলেখা বিবির মধ্যেও তার জন্য জেগেছিল, তার জন্য গোপনে, নীরবে নিভৃতে হু হু করে কেঁদেছিল একজন জ্যোতির্ময়ী দেবী। কিংবা এই জ্যোতির্ময়ীর মধ্যেই আফসার মোল্লার জন্য কামনা-বাসনায় অপেক্ষা করে একজন জুলেখা বিবি! আজানের সুরে যেমন সে মুগ্ধ হয়, তেমনি শাখশঙ্খের ধ্বনিতেও তার ভেতরে অনুরণন তোলে। তাহলে সে কী? সে কি একান্তভাবে কখনো কারও হতে পেরেছে, না মণীন্দ্রের, না আফসার মোল্লার, না আল্লাহর, না ভগবানের! সে তো সবার। কাউকে সে ত্যাগ করতে পারে না।
এই প্রায় নিভে যাওয়া বিকালের আলোয় তুমি কেন সামনে এসে দাঁড়াও মণীন্দ্র! আফসার মোল্লার মতো যাকে তুমি ছিনতাই করে জীবনে নিতে পারে নাই, তার জন্য জৌলুসহীন আবছা আলোয় কেন অপেক্ষা করো?
তার বাবা-মা বেঁচে নেই। মণীন্দ্রর বাবা-মাও বেঁচে থাকার কথা নয়। মণীন্দ্র কি বেঁচে আছে? এই তো দশ বারদিন আগে তার পিশাতো ভাই হেমন্ত এসেছিল কলকাতা থেকে। তার চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়ই হবে। দেশ ত্যাগের পর সেই ওপারে চলে গিয়েছিল আর ফিরে আসেনি। এখন বাস্তুভিটার জন্য তার নাকি খালি মন কাঁদে। কোনদিন মরে যায় তার তো ঠিক নেই। মরার আগে নিজের জন্মভূমি আরেকবার মনভরে দেখে নেয়া। আগের মতো কিছু তো আর নেই। চারপাশের সবকিছু কতো বদলে গেছে। লোকের কাছে জিজ্ঞেস করে এসেছিল সে এ বাড়ি। কতো কথা, কতো স্মৃতিচারণ তার সাথে। কে কেমন আছে, কী করছে, জেনে নিয়েছিল সে। তার কাছেই শুনেছিল বাবা-মা মারা গেছে। কিছুক্ষণ সে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। নৌকার ভেতর সেই আলোআঁধারে তাদের ভয়ার্ত মুখ চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে উঠেছিল, মায়ের ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর যেন তার মনে কানে বেজে উঠেছিল, যাস নে জ্যোতি! যা হবার, হবে। 
মণীন্দ্রর কী খবর? 
মাস ছয়েক তার কোনো খবর নাই। কোথায় গেছে, কী করছে, জানি না। তোর জন্য তো সে আর বিয়েই করলো না। সংসার হলো না। আজব মানুষ।
 জ্যোতির্ময়ীর বুকের ভেতর নোনাজলের ঢেউ ওঠে। 
 তোমরা ভাল আছো তো?
আমাদের আর থাকা, না থাকা। দেশ ছাইড়ি গেলি, অন্যদেশ কি দেশ অয় কোনোদিন? ওখানকার মানুষ কেমন তাচ্ছিল্য কইরি যে তাকায় আমাগো দিকে! যাইক, আমাগো জীবন তো পার অইয়িই গেল। পোলাপানগুলি অহন দাঁড়াইতি পারলেই অয়। পায়ের তলায় ঠিক মতো মাটি পাইলিই অয়।
খাওয়াদাওয়া হেমন্ত বাবু করতে চায় না। কিন্তু সে তো নাছোড়বান্দা, এতদিন আইছেন। কিছু মুখে না দিয়িই যাইবেন কোথায়? 
অগত্যা হেমন্ত বাবুকে বসতেই হয়। জ্যোতির্ময়ীর হাতেরই তো রান্না, কোনো মাংস নয়, ভাত-তরকারি-মাছ। তবু ভাত খাওয়ার সময় হেমন্ত বাবুর অস্বস্তিকর ভাব তার নজর এড়ায় না। এটা কি ম্লেচ্ছ বাড়ির জন্য? জ্যোতির্ময়ী তো এখন আর জ্যোতির্ময়ী নেই, খাঁটি ম্লেচ্ছ হয়ে গেছে! কতো আগে থেকেই তো সে জুলেখা! 
 হেমন্ত বাবুকে থাকার জন্য সে আর অনুরোধ করে না। যদিও সে জানে, হেমন্ত বাবু এখানে কিছুতেই থাকবে না, আর থাকলেও এ বাড়ির মান-সম্মান আর আগের মতো ধুয়েমুছে বা ধূলোয় মিশে যাবে না। অবস্থা সেই আগের মতো নেই, বদলেছে অনেক। তারপরও, তার মুখ দিয়ে কিছুতেই বেরোয় না, এতদিন পর আইছেন, দাদা, কয়টা দিন থাইকি যান। কেউ কিছু মনে করবি না। 
তার মধ্যেও বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো কেমন এক অস্বস্তি। হেমন্ত বাবু চলে গেলেই যেন সে বাঁচে। তবে সে সময় কেন যে আবার তার মণীন্দ্রকে মনে পড়ে! হেমন্ত বাবু ঘর থেকে বেরিয়ে যখন দুয়ারে, দুয়ার থেকে হালটে নামার আগে তার বুকের ভেতর একটা ব্যথা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে। সেটা কি, বাবা-মার সাথে জীবনে আর দেখা হল না, এই যে পিশাতো ভাই হেমন্ত বাবু চলে যাচ্ছে, এটাই হয়তো শেষ, আর কোনোদিন তার সাথে দেখা হবে না, তার যা বয়স, তাতে সে কি আর এদেশে আসার সুযোগ পাবে কোনোদিন! সেই ইচ্ছে কি তার হবে? শুধু এ কারণে? নাকি মণীন্দ্রর কথা তার মনে পড়ে যাওয়ায়? সে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। তবে হেমন্ত বাবু হালটে পা দেয়ার সময় সে তার পাশে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, যদি তার সাথে দেখা হয়, তাকে বলো, আমি ভুইলি যাইনি একেবারে।
 হেমন্ত বাবু সে কথা শুনেছে কি শোনেনি, বোঝা যায় না, সে কথার কোনো জবাব দেয় না। হালটে পা ফেলে সে বলে, আর হয়তো দেখা হইবি না। ভাল থাকিস জ্যোতি। 
তার কণ্ঠ কেমন বুঁজে আসে। জ্যোতির্ময়ী আর এগোয় না। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে। হেমন্ত বাবু বাড়ি থেকে এক চিলতে হালট পার হয়ে পাকা সড়কে ওঠে। সেখান থেকে একটা বাসে উঠে পড়ে। এর মধ্যে একবারও সে আর পেছন ফিরে তাকায় না।
 জ্যোতির্ময়ী ঘরে ফেরে, তবে সে যেন একা নয়, সাথে আসে মণীন্দ্র চ্যাটার্জি। রোগা, পাতলা। উস্কোখুস্কো চুল। গায়ের জামাকাপড় ময়লা। চেখের গর্তের মধ্যে ডেবে গেছে মণি। ক্ষীণ দৃষ্টি। বয়সের তুলনায় সে যেন আরও বুড়িয়ে গেছে। এই বয়সে, সে তাকে নিয়ে যেতে চায়। এই বাড়ির ভেতর থেকে, জুলেখার ভেতর থেকে তাকে টান দিয়ে বের করে কোথায় নিয়ে যাবে সে? এই গ্রামের পথ-ঘাট-মাঠ ভুলে গেছে জ্যোতির্ময়ীকে। কাঁটাতারের সীমানা পার হয়ে, কোলকাতায় গেলেই কি সে কোনোদিন আর জ্যোতির্ময়ী হয়ে উঠতে পারবে? পারবে না। তবে এই বয়সে, মণীন্দ্রর জন্য কেন তার মধ্যে এক অদ্ভুত ঘোর কাজ করে? মণীন্দ্র কি সত্যি বিয়ে করে সংসার পাতেনি? সারাটা জীবন তার জন্য অপেক্ষা করেছিল? সে চলে গেলে কি সত্যি গ্রহণ করে নিতো? এতোই যদি তার ইচ্ছে ছিল, তাহলে, স্বাধীনতার পর যখন সে ফিরে এসেছিল, তখন সে একবারও তার মুখোমুখি দাঁড়ায়নি? নাকি তার মনে প্রচ- দ্বিধা ছিল, জ্যোতির্ময়ী যদি রাজি না হয়! সে কি তখন সত্যি মণীন্দ্রর সাথে এ সংসার ফেলে পালিয়ে যেতে পারতো? এই জায়গায় সে দৃঢ়তা নয়, গভীর এক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে। নিজেকে খুব অচেনা লাগে। 
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মলিন চেহারার দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলে, তুমি তাকে কী দিতে পারতে? তবু সে আজও কেনই বা অপেক্ষায় থাকে? কিসের মোহে, কিসের ঘোরে?

তার চোখ প্রায় ভিজে ওঠে। আর সে সময় তার মেয়ে জরিনা ঘরে ঢুকে বলে, ও মা তুমি এখানে? এবার আমার কথা বিশ্বাস অইলি তো। আয়নায় দেখতি পাইছো তো তোমার কী চেহারা কী অইয়ি গ্যাছে? 
 সে কোনো জবাব দেয় না। বাইরে ফুয়াদের সাথে আফসার মোল্লার খুনসুটি, ওতো দূর চইলি গেছিলা কার খুঁজে? যদি হারায়ে, যাইতা?
হারাবো কেন? লাইলি আছে না? ও তো এই এলাকার সব চেনে। আগামী কাল কিন্তু আমি নদী দেখতে লাইলির সাথে সকালে যাবো।
ঠিকাছে, নানা ভাই, আমিও সাথে যাবো নে।
ফুয়াদ ঘরে ঢুকে নানিকে জড়িয়ে ধরে। ও নানি, তোমার কী অইছে? তুমি নাকি অসুস্থ?
 সে হাসে। ক্রমে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে সেই হাসি খুব উজ্জ্বল দেখায় না। জরিনা বলে, ফুয়াদ, নানিকে নিয়ে খাটে গিয়ে বসো। 
আফসার মোল্লা দুয়ার থেকে বলে, জরিনা মা, সন্ধ্যা নাইমা গ্যাছে। ঘর তো আন্ধার। সুইচ দ্যাও।
জরিনা লাইটে সুইচ দিলে আলো জ্বলে ওঠে ঘরে। আফসার মোল্লা ঘরে ঢুকে বলে, টুপিটা কই? মসজিদে যাই। একটু পরই তো আজান পড়বে।
 সে চারপাশে সবাইকে দেখে। তার মনে হয় এদের মধ্যে আরও একজন তার আশপাশে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ হয়তো তাকে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু সে তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছে। তার গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। জুলেখার মধ্যে জেগে আছে জ্যোতির্ময়ী কিংবা জ্যোতির্ময়ীর মধ্যে জেগে আছে জুলেখা।







Post a Comment

0 Comments