বাংলা কবিতা : অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধান ~ তুষার গায়েন

বাংলা কবিতা : অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধান


Bengali Poetry: The Undifferentiated Search of Modernity ~ Tushar Gayen



দ্বিতীয় পর্ব : শেষ অধ্যায় [উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তি -৩ ] 
আজ দেখি, পাথরের মতো গড়িয়ে পড়েছে প্রেমিকের দল 
পাহাড়ের চূড়া থেকে, উপত্যকায় নিজের নারীকে দেখে; আর ঝরনায় 
বয়ে-যাওয়া নুড়ির ভেতরে বীজ, ঘুমন্ত শস্যের; ক্রমশ কঠিন হয়ে-ওঠা 
অববাহিকায়, শান্ত লোকালয়ে, ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে হ্রেষাধ্বনি 
শেষ হয়ে এলে ট্রেনের হুইসেল বাজে আর আন্তজেলা বাস
ছুটে চলে ধুলির সমুদ্র দিয়ে, বহু বছরের হাওয়ায় সেই পিষ্ট, 
সূক্ষ্ম ও উড়ন্ত কণারাশি বৃষ্টিতে জমাট,যখন হাঁটবে তুমি স্তব্ধতায়, 
দেখো,অজস্র পাথর এসে লাগছে শরীরে – ঠাণ্ডা, সুখকর, তুলতুলে 
         আর বুদ্বুদ হয়ে মুছে যাচ্ছে আকাশে 
[পাথর/ চঞ্চল আশরাফ] 
এ পোড়ামাটির কাজ কাদের যে; কারা এই মন্দির বানালো:
বলার আগেই চোখ বাইরে গিয়েছে সরে – লালমাটি ঢেউ 
দিকের শেষের দিকে নীল আকাশে ভেঙে গেছে। দেওদীন কেউ 
মন্দির গড়েছে নাকি; তারও সুতনুকা ছিল; সেদিনের আলো 
আজ মুছে গেছে কিনা – এ কোজাগরীতে সব ভুলে যাওয়া ভালো।
তবু কেন মনে হয় তোমার কি মনে আছে সেই দিন, সেই তোমাকেও।
[কোজাগরী /বীতশোক ভট্টাচার্য] 
অমরত্বেরও মৃত্যু হবে নালন্দা, জোছনার জলজ-অন্ধকারে। 
সোমরস পান করে ঈশ্বর নামছেন সোমেশ্বরী জলে 
আমি দশমাস আরাধনায় জাইগা থাকব সোমপুরে, 
    সোমেশ্বরী থেকে দূরে; 
তুমি আসবে তন্দ্রায়, চন্দ্রা নদীর ওপারে 
আমি ঘুম-মন্দিরায় সুর তুলবো বাকি কয়মাস 
টেরাকোটা শিল্পিত খোদাইয়ের মাঝে। 
[আবার নালন্দা/ শামীম রেজা]
তোমার রত্নগুহার ম্যাপ এখনও খুঁজে পাই নি 
       এদিকে শ্যাওলা জমে যাচ্ছে আমার শরীরে।
রাতের পর রাত ঘুরে বেরিয়েছি মৃত শহরের রাস্তায় 
... ... ... ... ... ... ... ... 
কিন্তু আজ সন্ধ্যার হঠাৎ আবছায়ায় তোমার ঠোঁটের 
       টেরাকোটা-রং দেখে আমি বুঝতে পারলাম 
তোমার রত্নগুহার কোনও ম্যাপ নেই, ছিলও না, কেবল 
       সংকেত ওই টেরাকোটা 
বাংলার হাজার হাজার মন্দিরের মধ্যে কোথায় সেই রত্নগুহা 
       যাকে পাহারা দেয় এক ভয়ঙ্কর সাপ
[ঠোঁটের রঙ টেরাকোটা/পিনাকী ঠাকুর]
শীলা অন্ধকার,শীলা দ্যুতিময় 
শীলা প্রস্তরীভূত 
ওহে শীলা জেগে ওঠো,শহর বিদীর্ণ করা 
স্বরে বলো তুমি আছো,অনুভূতিময় দীপ্যমান 
শীলা তুমি কি ভুলে গেছো 
দীর্ঘ যাত্রা আমাদের শীতাভ কুয়াশাময়! 
আজ তুমি আমি সংসারাকীর্ণ প্রস্তরীভূত, 
... ... ... ... ... ... ... 
আমাকে জাগাও, পুনরুজ্জীবিত করো 
প্রাণ দাও আমার শব্দের প্রতিটি রন্ধ্রে 
আমি কামার্ত, শব্দের আঘাতে আঘাতে 
তপ্ত করো ও প্রস্তরীভূত শীলা 
জেগে ওঠো। 
[শীলা দ্যুতিময়/ আয়শা ঝর্না]
এখনই নাচবো আমি – এসো সিনীবালি, আমি অমা 
তুমি সা, সা তুমি, আমি সাম, তুমি ঋক – সিনীবালি, 
আমার নাচন ধরো ওষ্ঠে, ঊরুদ্বয়ে ধৃত করো 
নৃত্যরত আমার আগুন, অরণিমন্থনে জেগে 
উঠুক প্রাণের বীজ –এখনই নাচবো আমি, প্রাণে 
ধরো এই নাচের নিয়ম, উল্লসিত হও তুমি 
সিনীবালি, পৃথুষ্টুকা হও তুমি গর্ভের দাবিতে – 
[সিনীবালি: ০১/ বায়তুল্লাহ কাদেরী] 
নষ্ট হও,গাঢ় জাল,প্রতিযোগিতার ঘুঁটি ভেবে 
সিন্দুকে গোপন মাছ, আমি নীল স্নান শেষে ঘুমিয়েছি 
               লাল পাটাতনে 
গোলাকার কৌটা তুমি;বেড়ে ওঠো;আর কত নিরলস 
              বুনবে বসন? 
নিয়ত বাতাস ওড়ে তবে স্পর্শহীন;শান্ত মনে শুনি স্রোত 
জেগেছে যা কাসকেটে,অন্ধের নৌকায়। 
[স্রোত /সিদ্ধার্থ হক] 
উজ্জ্বল শাড়ির মধ্যে তোমাদের খুঁজে পাব ব’লে 
বিবাহমন্দিরে আসি, হে রহস্যময়ী 
হে চিররহস্য তুমি মাতালের নৈশ গান 
উন্মাদের সরল সন্দেহ
গন্ধর্বকুমারী তুমি ডাকিনী প্রজ্ঞার পাশে 
খুলে দাও তোমার বিন্যাস 
অবিশ্বস্ত পৃথিবীর মুদ্রাদোষ জেনে গেছ তুমি 
জেনে গেছ ইন্দ্রিয়সুখের সব ব্যাপ্ত আয়োজন 
মহামায়াভ্রম তবে তুমি সেই কৃষকরমনী 
[হে রহস্যময়ী/ মিতুল দত্ত] 
সন্ধ্যার পেয়ারা গাছে আরও একটা পেয়ারা উঠেছে। 
ডাগর, মাঝারি পোক্ত পেয়ারার ভার 
চিমড়ে ডাল নুয়ে প্রায় ছুঁয়ে দিচ্ছে মাটি,মুঠ ঘাস। 
পেয়ারার দুই মেয়ে, দশটা-পাঁচটা স্বামীর বরাত !
মেয়েরা গাছের নিচে পাখির ছানার মতো ডাকছে নেচে নেচে :
'মা আমাকে, মা আমাকে ... ওই যে বড়টা ওই বড়টা আমার।'
ও-সব কাতরধ্বনি কানে যাচ্ছে ঠিকই,কিন্তু ঘাড়ে লাগছে 
            সন্ধ্যার বাতাস --
সন্তষ্ট অধরে-ওষ্ঠে লুকানো মাড়ির অঙ্গীকার ! 
[পেয়ারাপ্রতিমা /বদরে মুনীর] 
এ বেলা হবে না নাওয়া 
জল পতনের শব্দে মূর্চ্ছা যাই 
সাজানো বাসরে কালনাগিনীর ফণা 
তবু এসো ভাত খেয়ে নিই ভাত 
খিড়কি দুয়ার নড়বড়ে ঝড়ে কাঁপা ও শিথিল 
চেঙমুড়িকানি অট্টহাস্যরত 
ডিঙা ডুবে যাক মান যেন থাকে জিতে 
যে ফণা নামে না তাকে বড় ভয় 
কালবৈশাখী তেড়ে আসে বন্দরে 
ষড়সন্তান মৃত্যুকবলে ডিঙা বাও মাঝি ডিঙা 
এ বেলা হবে না নাওয়া 
[জলপতন/ জিললুর রহমান] 
এত বিষ দেহকাণ্ডে, দেহে 
আজ আমি সংলগ্নজনেরে বড়ো দূরে যেতে বলি 
সকলেই একথা বোঝে আমি কভু ডুবি নাই জহরের জলে 
দেহকাণ্ডে তবু এত বিষ ... ভাবি তাই 
প্রাণের মধ্যে কোন সর্প ঢুকে গেছে ঘুমে?
এ সন্দেহমুক্ত হতে বংশকাহিনী যারা পথ করে গেল 
তারা দেখে, পিতা বা প্রপিতামহ আলস্য করে নি কেউ 
           মনসা পূজায় 
[বিষ/ মোস্তাক আহমাদ দিন] 
তোমাকে বিস্মরণে মদালস্যে যাই। এ বড়ো প্রেমের কথা হলো বলো। তবু কেন পার্বতী শিয়রে চাঁদ পোড়ামুখী। তাই বলে দেবতার দাস কস্মিনকালেও নয়। এ রটনা দেহে দেহে সঞ্চারিত হলে দেহের দেহলী জুড়ে শোর পড়ে। সাপ সাপ নাকি বাঁশি, নাকি সেই অভিশাপ। এভাবে রাত্রি যায় জাগরণে দিন আসে নিদ্রা সমীরণে, খড়ের গাদায়। তোমাকে যে ভুলে থাকা দায়, তাই শুনে শীত নামে পাড়ায় পাড়ায়। তাই ক্ষণে ক্ষণে রাই নাম জপি। কল্পযমুনায় নেমে কর্ণফুলী তীরে বসে থাকি প্রতীক্ষায়।এসো নিশি এসো রাত ত্বরা, ব্রজগোপালের বেশে, কাটবে কণ্ঠের খরা। তোমাকে বিস্মরণে মদালস্যই তৃষ্ণামন্ত্রমালা। 
[অনিবার্য স্মৃতি/ পুলক পাল] 
প্রণম্য মাটিরে বলি মা, 
নাড়িছেঁড়া চিৎকার মা – তুমি 
কোন নৈঋত প্লাবনের ফেনায় মাখা 
শিখরের সুখ? 
কালোহাঁস পাখনায় মেখে ভেসে এলো 
পাখিরাজ ডিম্বের উত্তাপ 
নেইখান থেকে ফেটে – ছুটে আসে রশ্মির 
জ্যোতি। সেইখান থেকে হিজলের তলায় 
ব্রীড়ানত কৃষ্ণের ছায়া। 
        তারপর সুখ 
তারপর শীৎকারের বৈয়াম ভেঙ্গে 
চক্রের শেষ, চক্রের শুরু ...
[প্রণম্য মাটিরে বলি মা / কবির হুমায়ুন ]
মানুষের চোখের জলে কোনো শ্যাওলা থাকে না 
চোখের কাছে প্রার্থনা করি বিশুদ্ধ জল 
নির্ভেজাল অন্ধকার দেখবো বলে 
       ফস্‌ করে দেশলাই জ্বালি। 
আর কিছুটা গোয়ার্তুমিসহ 
হৃদ-কম্পনের জন্য হাত রাখি মৃত তরুণীর বুকে। 
মা,আমাকে কি পুনরায় তুমি স্থান দেবে জরায়ুতে? 
[চোখের জলে শ্যাওলা থাকে না/ সরকার আমিন] 
শোন – হেমন্ত রঙের আলো 
সকলের চোখে তাই চোখে যার ধানের বন্দনা 
            মেয়ে ভালো। 
আজ বিবাহ বাতাস 
বাতাসের উত্থানে মিলনে ভয় ধানের পাতায় 
মাঝি নেই, মন্ত্র নেই, কাঠের নৌকায় 
 আর চোরের সীমানা শুধু ধান 
দেখি এক জমি; শুনি এই জমি; 
বিগত কালের চরবাসী; আজ ডাকাতের বিবিজান। 
[ধানের রচনা দিলে পত্রে -২০/ শিবলী মোকতাদির] 
পিছনে জমিন যায় সোহাগী বিহান যায় 
হাটিয়ার সুখ আর মুলিয়ার বাঁশি 
সাগরগঞ্জের আলু যায় বেহাগ যায় 
      বিবাগী বৈকালী 
তাই বটে বসে আছে 
জীবন বিছায়েছে 
    পাড়ে নদীয়ার 
নির্জনে বাজিয়ে মঞ্জরী ধূপরেণু করেছ আরতি 
রাখো গো গঙ্গা মাতা, রাখো মা এ মিনতি 
আমার রক্তের রেণু বিছায়েছি পদে গো তোমার 
[ধানসত্য-১/ খলিল মজিদ] 
রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; সঙ্গে ইলিশ পোড়ার ঘ্রাণ,কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস ৃ এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল ─ এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত।আর তাতে বনমরিচ, বুনো বিছুটির মতো টগবগ করে ছুটে যায় ট্রেন উত্তরের দিকে। আর আমি দুধভরা গাভীর ওলান ভেবে দুই হাতে খুঁজে পাই পুরু ফ্রেমের তলে ফোলা ফোলা চোখের অসুখ। 
[রূপনগর/ ওবায়েদ আকাশ] 
নিজের কোচর থেকে 
সঞ্চয়ের বঙ্গাব্দ বীজ 
অনাগত অব্দের দিকে 
ছড়িয়ে ছিটিয়ে, আজ চাও 
সংগ্রহে তুলে নিতে 
ক্ষুধার খনিজ 
তোমার কাস্তে বাঁকা 
যেভাবে মনের ওজনে 
অবনত, বাঁকা মঞ্জুরী 
ঘিরে, তোমার সম্পর্কের নারী 
বাঁকা বাতাসে ওড়ায় আঙরাখা! 
[কাস্তে নিয়ে/ জেনিস মাহমুন] 
মথুরায় গিয়ে কাজ নেই –
আমার মথুরা থাকে খাগড়াপুর গ্রামে 
মথুরার রক্তে মিশে আছে ত্রিপুরার ঘ্রাণ 
চতুর্দিকে সবুজ পাহাড়,উঁচু নিচু পথ,বাঁশের দোতলা বাড়িতে 
মথুরার বন্ধু-অন্ত প্রাণ আমাদের ঘিরে রাখে মোহময় জালে; 
... ... ... ... ... ... ... 
আগামী বৈসুতে আমাকে দেখতে পাবে গোপীদের বেশে 
চক আর শুকুরের অত্যধিক ঝালে 
জ্বলে উঠবে সমস্ত গ্রাম 
পূর্ণিমায় জেগে থাকা রাত বোতল নৃত্যের তালে তালে 
[মথুরা ত্রিপুরা /অলকা নন্দিতা] 
জাফলঙে রাত নামে ধীরে,পাথরপ্রপাত 
উদার পাথরেরা জেগে জেগে পাহারায় থাকে 
পাহাড়ের খাড়ি ভেঙে হেঁটে আসছে সাত বোন চাকমা নারী 
বোনদের চোখে ভাসে পাথর ─ আকাশ, পাহাড়ি-পাখিকথা, বনকাতর-মায়া 
রূপকথা যাদু পাহাড়ের রাণী রঙের উৎসব টোটেম সকাল 
ট্যাবুহৃদকথা গাথা হলে হৃদে ও মেয়ে যিশুর চোখের মতো 
মায়া ভেসে ওঠে দিগন্তে দিগন্তে 
আমি দিগন্ত বরাবর হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবো একদিন গৌতম পাহাড় 
[সাতবোন চাকমা নারী/ শিমুল মাহমুদ]
রিনাই খুলেছ বটে মন তো খোলো না 
অনার্য পুরুষ হই বুরাসা তুলনা 
হরিৎস্যের পাতে হৃদয় রক্তিম দোলে:
মাইলাঙ্মা মাইলাঙ্মা বলে 
অক্ষতযোনির বিশ্বাসে যুবতী অনাঘ্রাত তুমি 
আমিও নতুন পুরুষ – নতুন জীবনের কার্পাসভূমি ...
[আদিবাসী কবিতাগুচ্ছ/ হাফিজ রশিদ খান] 
বুনে উঠি এক সুতায় ম্যানগ্রোভ মনে
নানা ধর্মে হলে ভাগ ভূমিপুত্রগণে
বনবিবি-বনদেবী মানে সর্বজন,
বাঘের দেবতা গাজী গঙ্গার বোনপো −
শ্বশুর মুকুট রায় চম্পার বাজান
মিলেমিশে একাকার হিন্দু মুসলমান
নানা ধর্মে হলে ভাগ ভূমিপুত্রগণে
বুনে উঠি এক সুতায় ম্যানগ্রোভ মনে।
[ম্যানগ্রোভ মন / রাজু আহমেদ মামুন] 
বিকেলের রৌদ্র অতোটা বিপ্লবী নয়, 
গাঢ় লাল জবা – পুকুরের জল ...
খালের জোয়ারে বয়ে যাচ্ছে রক্তাভ হিজল 
জানলার এতো কাছে! 
তবু – ফুল দেখি না, 
দেখি! রক্তের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে 
ছটফটে স্রোতে ...
যে ঘরের দেয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তি 
টাঙিয়ে রেখেছি; 
আমাদের আলিঙ্গনে ভেজা 
পরিচ্ছদ কতোটা শুকাবে প্রার্থনায় জপে? 
[ভেজা পরিচ্ছদ যতটা ছড়াবে/ হেনরী স্বপন] 
কাশের বনে রক্ত লেগে আছে 
ছিটেফোঁটা নিরন্ন অঞ্চলে; 
(মেঘের) চোখ জ্বলে যায় জলে
 
চরের পাশে হাঁটুর সমতলে 
মৃতমানুষ এবং ঝাঁকের মাছে 
যুদ্ধ শেষে ছড়ায় নাড়িভুঁড়ি 
নদী দাঁড়ায় হাঁটুর সমতলে 
আমরা চরের বালুই কেবল খুঁড়ি! 
কাশের বনে রক্তজমাট ─ কালো-
চিহ্ন কিছু মুখর হয়ে আছে;
ভাষাই কি আর সকল কথা বলে? 
(সুরতহাল রিপোর্ট / রহমান হেনরী)
পুতুল নাচের আগে ও পরে পুতুলের রক্তবমি হয় 
ক্ষেত-কারখানায় পুতুলের নাচ পুতুলগামী সুতার 
কপালের ভাঁজ তবু 
   করুণ শুকনো পাতাটিরে মোচড়ায় না ...
পিচকিরীর রঙ্গে মুছে ফেলে বিদ্যুৎ-সভা 
শীতল বৃষ্টি ফোঁটও এখানে নিরস্ত্র নয় ─
রাজনীতির গভীরেও প্রবেশ ক’রে জেনেছি 
সে একচোখা পৌরাণিক ধনুক 
কেবল খুনির বিপক্ষ-উকিলের কালো কালো গাউন ...
[নিজস্ব খড়কুটা / শওকত হোসেন]
... নদী এক স্পর্ধিত কুমারী 
নদীর ভিতরে জলের সম্ভ্রম। পাললিক স্পর্শ। 
বর্ষার অস্থিত জলে সোহাগসঞ্চয়ন। 
আর শরীরে মাছগন্ধী লোভ। 
বনে হাঁটতে হাঁটতে সহসাই নদী তীরে পথ বসে থাকে। যেন 
আঙুলে সমুদ্র পরাগরেণু মেঘ, চির অচেনায় শৈশব পাঠিয়ে দেয়। 
উত্তরের পাহাড় গর্বিত মনে নীল সমুদ্দুরে অতীন্দ্রিক জলের চিঠিতে 
বিস্মরণের পেখম মেলে রাখে ...
জল। জলের নিচে নদীর প্রাণাঙ্কুর। 
[নদী/ আশরাফ রোকন]
আমি আর লীথি হাঁটছি বালুতে শিরশির দেহে 
আমি আর লিথি খুব কাছাকাছি আমি আর লিথি 
সারবেরাসের পদচিহ্ন হঠাৎ ডাকিল কে হে ...
... ... ... ... ... ... ... ... 
নদী দ্বারা নদী পথ, পীড়ন পীড়িত করতোয়া। জলের যন্ত্রণা বয়ে নদী 
বাষ্পময় পুচ্ছ বাড়াই – 
এ নদী হবে না আর সুরনদী, শিশুসার ভাসবে না ঝিলিমিলি লঘুচাঁদ জলে 
নদীরা নদীকে কেন, শোষক পেয়ালা ভরে রাখে 
... ... ... ... ... ... ... ... ... 
আমি ও লীথি, চরে হাঁটছি সদরে 
লীথি বলে, তোমার বিরহভারে আমিই নদী, নারী ও নন্দিনী, রূপময়ী। 
[নদী/ রণক মুহম্মদ রফিক] 

বাংলা কবিতায় অধুনান্তিকতার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে দুই পর্বে বিভিন্ন প্রসঙ্গ এসেছে। এর সাথে বাংলা কবিতার আগাম দিনের রূপরেখা কেমন হবে তার সম্পর্ক রয়েছে। আমার বিবেচনায় পাঠক শেষ পর্যন্ত কবিতা পড়তে চায় এবং পাঠক সেই কবিতার জন্যই অপেক্ষা করে আছে যা জীবনের বিবিধ স্পন্দন, অনুভব, আনন্দ, বেদনা, সংকট, সংগ্রাম ও উপলব্ধিকে গভীরভাবে স্পর্শ ও প্রকাশ করে। এটা অনস্বীকার্য যে সময়ের সাথে সাথে ভাষা ও আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কবিতায় অনিবার্য এবং এব্যাপারে কোনো পক্ষই অপ্রতিভ নন ; কিন্তু ভাষা ও আঙ্গিককে শিরোধার্য করে শব্দের ভিতরে জগত খুঁজতে গিয়ে যদি জীবনকেই হারিয়ে ফেলার আয়োজন হয়, তবে তা কবিতার জন্য সুসংবাদ নয়। নব্বই পরবর্তী দশকগুলোতে কবিদের ভিতর এই প্রবণতার আধিক্য চোখে পড়ে যা কবিতার জন্য অশনিসংকেত বলে আমার মনে হয়েছে এবং তা কবিতাকে পাঠক থেকে আরো বেশি বিচ্ছিন্ন করবে বলে আমার বিশ্বাস। আমার বিবেচনায় কোনো ফ্যাশনে নিজেকে সপ্রতিভ দেখার অগভীর আকাঙ্ক্ষা থেকে একটু সরে এসে, জীবনের দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালে কবিতা বিচিত্র আঙ্গিক ও সম্ভাবনায় কবি সকাশে উন্মোচিত হবে, এ আশা নিশ্চয়ই ব্যক্ত করতে পারি। 
বাংলা কবিতার জয় হোক !! 
--------------------------------------------------------------------------------------------------

Post a Comment

0 Comments