যাহিদ সুবহানের গল্প || ভেজাল মানুষ

A Story by Zahid Subhan || vejal manush


ত্রিশ বছর ধরে চালিয়ে আসা মুদি দোকানটা শেষমেষ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো জালাল বিশ্বাস। আর এক মুহূর্তের জন্যও এই দোযখখানায় বসতে চায় না সে। কীই বা দরকার আর। ত্রিশ বছর তো দেখা হলো। কামাইও তো কম হলো না। এই এক দোকানের উপর নির্ভর করে বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছে সে। ছেলেটা গত বছর পুলিশের হাবিলদার হয়েছে। খরচ হয়েছে ছয় লাখ টাকা।  জালালের ইচ্ছে ছিলো ছেলেটা দারোগা হবে। কাচা টাকা কামাবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। যা হোক পুলিশ তো হয়েছে। আধাপাকা বাড়ি হয়েছে। মাঠে বাপের দেয়া জমির সাথে আরেকটু যোগও হয়েছে। আর কত চাই। এবার নিয়্যাত পাকা, হজ্ব করা চাই। 

জালাল ইচ্ছে করলে আরো দশটা বছর দোকানটা চালাতে পারে। কী সুন্দর পজিশনে দোকানটা! ত্রিশ বছর আগে বাজারে যখন তিন-চারটা দোকান, তখন সে এই মোড়ে দোকানটা করেছিলো। করেছিলো বলতে বাপ জোর করে করে দিয়েছিলো। দোকানের একপাশে বড় বাজার। আরেক পাশে স্কুলের বিরাট মাঠ। তালগাছ, আমগাছ, জামগাছ, সুপারীগাছ ঘেরা এক মাঠে প্রাইমারী স্কুল, হাইস্কুল, মসজিদ। সব মানুষকে জামালের বুকের উপর দিয়েই যেতে হয়। গ্রামে গ্রামে এখন পাকা রাস্তা। এই বাজারটা এলাকার প্রধান বাজার। হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা। খদ্দেরের অভাব নেই। এতো ভাল দোকানটা তবু ছেড়ে দিতে চায় জালাল। তার মনোবেদনা আছে। দোকান দেয়ার কারণ অন্য।

জালালের নামে সাথে দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল শব্দটি যোগ হয়েছে। কোনভাবেই শব্দটা নাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাচ্ছে না। জালালের কিছু বদনাম আছে দীর্ঘদিনের। সে একজন ভেজাল কারবারী। মানুষ তাকে ভেজাল জালাল বলেই জানে। এতদিন জালাল এসব পাত্তা দেয় নি। বয়স হয়েছে। সমাজে একটা অবস্থান হয়েছে। এখন আর এসব সহ্য হয় না। 

জালাল বিয়ে করেছিলো পাশের গ্রামের সুরুজ মণ্ডলের ছোট মেয়ে হনুফাকে। জালালের বয়স তখন আঠারো-উনিশ হবে। সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। মানুষকে মিথ্যা বলে বলে টাকা ধার নেয়, ফেরত দেয়ার নাম নেই। হনুফা তখন ক্লাস নাইনের ছাত্রী। হনুফা প্রতিদিন জালালদের বাড়ির পাশ দিয়ে হাইস্কুলে আসতো। মেয়েটাকে দেখে নিজেকে সামলাতে পারে নি জালাল। হনুফা বড়ই সুন্দরী বালিকা। জালাল হনুফাকে নানাভাবে প্রস্তাব দেয়। মিথ্যা কথা একটার সাথে আরেকটা মিশিয়ে তাকে ভোলানোর চেষ্টা করে। জালাল বলে সে একজন ব্যবসায়ী। বাজারে তার বড় একটা কাপড়ের দোকান আছে। হনুফা এসব মিথ্যা কথাকে সত্য ভেবে একরাতে জালালের হাত ধরে অজানায় পাড়ি দেয়। জালাল হনুফাকে বিয়ে করে বাড়ি ফেরে তিনদিন পর। বিয়ের পর হনুফা বুঝতে পারে জালাল ওকে ধোঁকা দিয়েছে। মিথ্যা বলে ওকে বিয়ে করেছে। জালাল যা বলেছে সব মিথ্যা। সে কিছুই করে না। বরং জালাল একটা অকর্মা। তখন আর হনুফার ভুল শোধরানোর সুযোগ নেই, শুধু জালালকে ভেজাল সম্বোধন করা ছাড়া। সেই প্রথম জালালের নামের সাথে ভেজাল শব্দটা যোগ হলো। 

হনুফাকে বিয়ের আগে থেকেই জামালের স্বভাব-চরিত্রে ক্ষিপ্ত ছিলো তার বাবা। যখন হনুফাকে বাড়িতে এনে তুললো বাপের মেজাজ আরো বেড়ে গেল। সত্যি সত্যি জালালকে দোকান করে দিলেন বাবা। সেই থেকে জালাল মুদি দোকান্দার। দিন দিন ব্যবসার পরিসর বাড়তে থাকে কিন্তু পুরোনো সে স্বভাব আর পাল্টায় না। দুনিয়ার পঁচা, নষ্ট চাল-ডাল খদ্দেরের ঘাড়ে চাপানোই তার কাজ। কমদামী জিনিস কিনে বেশী দামে বিক্রি করাই তার কাজ। কেউ বাকী নিলে বেশী করে লিখে রাখা,কোন কথা বলার উপায় নেই। কোন প্রতিবাদ করা যাবে না। নিলে নাও না নিলে নাই। বাজারে যেহেতু অন্য কোন দোকানে এতো জিনিস পাওয়া যায় না তাই জালালের দোকান ছাড়া কোন উপায় নেই। এলাকার মানুষও নিরুপায়। স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারাও লোকটার উপর ক্ষ্যাপা। বিস্কুট-কেক-চকলেট-ললিপপ-জুস-আইসক্রিম সবকিছুই নিম্নমানের অথচ দাম চড়া। আবার বেশীরভাগ পণ্যেরই মেয়াদ থাকে না। ছোট বাচ্চারাও জালালকে গালি দেয়। হয়তো সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারে না। বাড়িতে গিয়ে বাবা-মায়ের কাছে নালিশ দেয়। বাবা-মা ক্ষেপে গিয়ে বলে ওঠে, ‘ভেজাল জালালের দোকানে যাস ক্যান!’ পরদিন হয়তো ক্লাসে বা স্কুল মাঠের আড্ডায় বসে সহপাঠীরা আলোচনা করে যার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ভেজাল জালাল।

এসব ঘটনার পরও জালালের মনে কোনদিন অপরাধবোধ জাগ্রত হয় নি। সে যে মানুষ ঠকানো কাজ করে তা কোনদিনও মনে করে না। জালাল নিয়ম করে নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে আস্তাগফিরুল্লাহ্ পড়ে শব্দ করে। ব্যবসাকে সে হালাল উপার্জন বলে মানে। মাঝে মাঝে শুক্রবারে মসজিদে মিলাদ দেয়, শিরনি দেয়। মুসল্লিরা মিলাদ-শিরনি অপছন্দ না করলেও জালালকে এড়িয়ে চলে। মসজিদ থেকে বের হয়ে কেউ কেউ বলেই ফেলে, ‘ভেজাল জালালের শিরনিতে ভেজাল নাই তো!’ 

মানুষ যে জালাল বিশ্বাসকে দেখতে পারে না তা সে নিজে বুঝতে পারে। মানুষ তাকে প্রকাশ্যে কিছু বলে না। আড়ালে গেলেই গালি দেয়। ইদানিং বিষয়টা তার খারাপ লাগে। বিষয়টা এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে যে, যদি কোন মানুষ গালি নাও দেয় জালাল ধরে নেয় তাকে গালি দিচ্ছে। মানুষের মুখের দিকে তাকালেই জালালের কেমন যেন লাগে। মনে হয় এই বুঝি লোকটা গালি দিচ্ছে আর ওর দিকে আঙুল তুলে বলছে, ‘ঐ দেখ ভেজাল জালাল যাচ্ছে।’

ছেলের পোস্টিং এখন ঢাকায়। হজ্বে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা একরকম পাকাই করে ফেলে জালাল বিশ্বাস। বউ-ছেলের সাথে পরামর্শ করে একদিন টাকার বান্ডিল ব্যাগে ভরে চলে যায় ঢাকায় হজ্ব অফিসে। পাসপোর্টটা আগেই করা ছিলো। ছেলেটা ছুটি নেয় বাপকে সময় দেয়ার জন্য। হজ্ব অফিসে খুব চাপ। নিজের নামটা অন্তর্বূক্ত করার কোনো সুযোগই হয় না। এমনকি ছেলের পুলিশে চাকরি নেওয়ার মতো দু’চারজনকে ঘুষ দেয়ার চিন্তাও করে। নানা অনিয়মে জর্জরিত সরকারি হ্জ্ব অফিস। আবার সিদ্ধান্ত পাল্টায়। না জীবনে আর ভেজাল কাজ করবো না! হজ্বটা অন্তত সহীহ করা দরকার। সরকারি অফিসে পাত্তা না পেয়ে এক ট্রাভেল এজেন্সিতে যোগাযোগ করে বাপবেটা। বেশী টাকা দিয়ে সব ঠিকঠাক করে। সব পাকা হয়ে যায়। পাসপোর্ট জমা দেয়। হজ্বে এবার যেতেই হবে। জালাল ছেলেকে ঢাকায় রেখে রাতের বাসে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফেরে।


বাড়িতে ফিরে জালাল পূরোদস্তুর ধার্মিক মানুষ হয়ে যায়। দাড়িটা আরো বড় করে। জুব্বা পাঞ্জাবী পরে দোকান চালায়। নিয়ম কের জামাতে নামাজ পড়ে। দিন পনেরো পরে পরে সরকার এবারের হজ্বযাত্রীদের তালিকা প্রকাশ করে। সরকারী তালিকা আর বে-সরকারী তালিকা। তালিকায় খোঁজ করতে গিয়ে আহত হয় জালাল বিশ্বাস। কোথাও তার নাম নেই। রাজ্যের চিন্তা মাথায় নিয়ে সে ঢাকায় ছোটে। ট্রাভেল এজেন্সীর অফিসে খোঁজ করে। অফিসে ঝুলে আছে ইয়া বড় সাইজের তালা। ভ’য়া ট্রাভেল এজেন্সী জালালের সব টাকা মেরে পালিয়েছে। ওদের কোন নাম গন্ধও খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু জালাল নয় আরো অনেক মানুষের সাথে এই প্রতারণা করেছে এই ভ’য়া ট্রাভেল এজেন্সী। ছেলেকে নিয়ে অনেক খোঁজ করেছে, সবশেষে ব্যর্থ হয়েছে। জালাল মনে মনে ভাবে, মানুষ কীভাবে এতো ঠকবাজ হতে পারে! হজ্ব নিয়েও প্রতারনা! হায় আল্লাহ মাফ করো! 

অনেক রাত হয়েছে। বাসস্ট্যান্ডে যেতে হবে। একদম ফাঁকা ফুটপাত। রাতের গাড়িতে চড়ে নিজের শহরে যখন নামে তখন ফজরের আযান দেয়ার সময়। রাস্তাগুলো একদম ফাঁকা। কোন মানুষ নেই। কিন্তু জালালের মনে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। জালাল বিশ্বাসের দিকে হাজার হাজার হাত আঙুল তুলে যেন বলছে, ‘ঐ দেখ ভেজাল জালাল যাচ্ছে।’  

Post a Comment

0 Comments