বাংলা সাহিত্যে সংকটের বাস্তবতা চল্লিশের বিচিত্র বৈভব ও আমাদের দিশা || রঘু অভিজিৎ রায়

 

The Reality of Crisis in Bengali Literature: The Diverse Richness of the Forties and Our Way Forward || Raghu Abhijit Roy

বাংলাদেশের কবিতা চিন্তায় গত শতকের চল্লিশের দশকটি বেশ গুরুত্ববহ ও প্রাসঙ্গিক। তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য শুধু কবিতায় নতুন বাঁকের জন্যই নয়, কবিতার প্রেক্ষিতটি বুঝার জন্যও। তাই তখনকার রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহও কী জাতীয়, কী বিশ^ পরিসরে, আলোচনার দাবি রাখে। বিগত শতকের তিরিশের দশকেও রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতায় একটা বিদ্রোহ ঘটে ছিল। তিরিশের কবিরা তার সূচনা করেছিলেন। তাদের রবীন্দ্র-উত্তরণের সচেতন প্রয়াস কবিতাকে একটা নতুন জমিনে দাঁড় করিয়েছিল। পাশ্চাত্যের কবিদের প্রভাব, সেখানকার রাজনৈতিক-সামাজিক আবহের অনুরণন, বোদলেয়ার-ইলিয়ট-ইয়েট-ভেলোরি-এর সম্মোহন, শেক্সপিয়র-মিল্টনসহ গ্রিক ও পাশ্চাত্যের মিথ ও ঐতিহ্যে বিচরণ তিরিশের কবিদের প্রত্যেককে নিজ নিজ স্বতন্ত্র পথ নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা তৎকালীন দেশীয় বাস্তবতায় যত না সম্পৃক্ত থেকেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পৃক্ত ছিলেন পাশ্চাত্যের। পাশ্চাত্যের কবিদের ন্যায় পাশ্চাত্যের সময়ের সংকট ও সম্ভাবনা তাদের যতটা নাড়া দিয়েছে, দেশীয় সংকট ও সম্ভাবনায় ততটা নয়। তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্যে যতটা সমুজ্জ্বল, যুগের যুথবদ্ধ কণ্ঠস্বর হিসেবে ততটা নন। চল্লিশের কবিরা ছিলেন তার ব্যতিক্রম।

বস্তু থেকেই চেতনা, আবার চেতনাও বস্তুকে পরিবর্তিত হতে প্রেরণা জোগায়। বস্তু ও চেতনার মধ্যে এ এক দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। তাই তিরিশের বাস্তবতা যেমন তিরিশের কবিদের ভিত্তিভূমি, চল্লিশের নতুন বাস্তবতায় নতুন উপলব্ধি চল্লিশের কবিকূলকেও তাদের কবিতায় নতুন ঝরনাধারার প্রেরণা দিয়েছে। তা শুধু কবিতায় নয়, শিল্প-সংস্কৃতির বিচিত্র শাখায় তা মূর্ত হতে দেখা গেছে। 

তিরিশের দশক থেকে কী এমন পরিবর্তন, যা চল্লিশের কবিদের তিরিশের থেকে থেকে ভিন্নতর বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তুলল, তা বুঝতে হলে আমাদের সে সময়ের দেশীয় ও বিশ^পরিসরের টালমাটাল রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে দৃষ্টি না দিয়ে উপায় থাকে না।

আমাদের উপমহাদেশে তখন ব্রিটিশ শাসন। জগদ্দল পাথর হিসেবে তাকে গণ্য করছিল বাঙলার নবশিক্ষিত যুবসমাজ। তাদের চিন্তার এ প্রভাব তখন ভারত জুড়েই ছড়িয়ে পড়ছিল। তার অত্যুঙ্গ প্রভাবে গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রাম বিদ্রোহ। তিরিশের দশক থেকেই সেই আগুনের ফুলকিতে ঝাঁপ দিচ্ছিল বাঙলার দামাল ছেলেরা। ‘অনুশীলন’ ও ‘যুগান্তর’-এ সমবেত সূর্যসন্তানদের এ মহান আত্মত্যাগের সময় অনেকের ফাঁসিতে-গুলিতে জীবন দান, দেশান্তরী হওয়া, আন্দামানে নির্বাসন দেশবাসীকে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় পাগল করে তুলে ফেলছিল। এ এক পাগলপারা সময়। এ সময়টা তিরিশের কবিদের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু তারা যেমন তা ছুঁতে পারলেন না, তেমনি এসব কবিদের নাগরিক প্রকরণ, পাশ্চাত্যের মিথ ও ইউরো-ঐতিহ্য সংলগ্নতাকেও বাঙলার মানুষের আকাক্সক্ষা ও রসাস্বাদনের বোধকে স্পর্শ করতে পারলো না। তার শৈল্পিক মূল্য যতই থাক না কেন, তা থাকলো সীমিত সংখ্যক নাগরিক বোদ্ধাদের অধিকারেই।   

এদিকে ১৯১৭ সালেই রুশ বিপ্লব হয়ে গেছে। তারপর থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সব যুগান্তরকারী সফলতার খবর এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ তথা পুঁজিবাদের ক্রমাগত পশ্চাদপসরণ এদেশে শুধু স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা নয়, সাথে মুক্তির স্বপ্নের নতুন আশাবাদ ও উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটাতে থাকে। যে কংগ্রেস ছিল ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় এলিটদের একটি ক্লাব বিশেষ, তাও সর্বভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসতে লাগলো সোভিয়েত প্রভাবিত বিপ্লববাদী ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের কারণে। ব্রিটিশদের প্রতি আপসকামিতার যে স্রোত তা ক্রমশ অপসারিত হয়ে বামপন্থীদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে চললো। কমিউনিজম তথা বামপন্থা ইংরেজ শাসকদের কাছে হয়ে উঠলো এক আতঙ্কের নাম। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া সফর ও সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার অভূতপূর্ব সাফল্য তাকে অভিভূত করে ফেলে। এসব কথা রবীন্দ্রনাথের লেখায় উঠে আসতে লাগলো।

এ দশকের ’৩৪-এ জার্মানিতে হিটলারের ক্ষমতা দখল ও ’৩৫-এ মুসোলিনির আফ্রিকার আবিসিনিয়া তথা ইথোপিয়া অঞ্চল দখল এবং একই বছর হিটলার ও মুসোলিনির সমর্থনে স্পেনের গণতান্ত্রিক সরকারকে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে উচ্ছেদ করে ফ্রাঙ্কোকে ক্ষমতায় বসানো ও ফ্যাসিবাদের উগ্র উত্থান ও সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে পারস্পরিক যুদ্ধোন্মাদনা সমগ্র মানবজাতিকে এক চরম নৈরাজ্যিক অবস্থায় ফেলে দেয়। প্রথম বিশ^যুদ্ধের পর থেকে যুদ্ধবিরোধী মানবিক মানুষ শান্তির সপক্ষে সংগঠিত হতে থাকে। গঠিত হয় যুদ্ধবিরোধী বিশ^মানবতা ও শান্তির সপক্ষে সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ কারাইট’। উদ্যোক্তা ছিলেন বারব্যুস, রোমাঁ রোল্যাঁ, হার্জিগ, নিকোলাই প্রমুখ ফরাসি, জার্মান, অস্ট্রীয়, হাঙ্গেরীয় ও ইংরেজ বিবেকবান মানুষ তথা প্রগতিবাদী সাহিত্যচিন্তক ও বুদ্ধিজীবীগণ। তাদের ঘোষণাপত্রে দার্শনিক বার্নার্ড শ, সমাজবাদী ও শান্তিবাদী লেখক এইচ জি ওয়েলস প্রমুখ স্বাক্ষর করেন। মানবতা ও শান্তির সপক্ষে অবস্থানের কারণে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে জার্মানিতে নিগৃত হতে হয়েছে। ১৯৩২ সালে ফরাসি খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও মানবতাবাদী রমাঁ রল্যাঁ ও আঁরি বারব্যুস যৌথভাবে আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরোধী সমাবেশের ডাক দেন। ফ্যাসিস্ট হিটলার, মুসোলিনি ও ফ্রাঙ্কোর যুদ্ধ-উন্মাদনার বিরুদ্ধে রোমাঁ রোল্যাঁ প্রমুখের উদ্যোগে ইউরোপে কয়েকটি যুদ্ধবিরোধী শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশে^র বিবেকবান মানবিক মানুষ, শিল্পী, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীগণ তা সমর্থনে এগিয়ে আসেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ প্রক্রিয়ার সমর্থনে এগিয়ে আসেন নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানী জুলিও ক্যুরি। মানবজাতির সংকটের কালে লেখকদের এ বীরোচিত অংশ গ্রহণ চল্লিশের দশকটি হয়ে ওঠে সারা বিশে^ প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ও সাহসের এক উজ্জ্বল কাল। জাপ-বিরোধী যুদ্ধে চীনের সমর্থনে রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখেছেন জাপানি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে।

দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের কালে যুদ্ধবিরোধী ও মানবতার শক্তির উত্থানে উপমহাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের ছিল সরব উপস্থিতি। প্রগতি লেখক সংঘের পতাকাতলে প্রগতিবাদী লেখকদের সাথে নিরপেক্ষ লেখকগণও সমবেত হন। ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘে সংগঠিত হন রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, অচ্যুত গোস্বামী, নৃপেন গোস্বামী ও সম্ভাবনাময় তরুণ লেখক সোমেন চন্দ। ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে শহিদ হন এই তরুণ কমিউনিস্ট গল্পকার। 

১৯৩৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সম্মেলন। রবীন্দ্রনাথ সেখানে শুভেচ্ছা বাণী পাঠান। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নানা মতের লেখক-সাহিত্যিক-সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীগণ। মুলুক্রাজ আনন্দ, সাজ্জাদ জহীর, সুরেন্দ্র নাথ গোস্বামী, হিরণকুমার সান্যাল, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কথাসাহিত্যিক শৈলজান্দ, কবি মাজাজ, সর্দার আলী জাফ্রি, আহমদ আলী, কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, অভিনেতা বলরাজ সাহানী, হীরেন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের সাথে ভিন্ন চিন্তার সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। পূর্ববাঙলার ঢাকা, কুমিল্লা, যশোরে প্রগতিবাদী সাহিত্য চর্চা ও একাধিক সাময়িকী প্রকাশ শুরু হয়। এসময়ে প্রগতিশীল সাহিত্যপত্রিকা ‘অগ্রণী’ ও ‘অরণি’ আত্মপ্রকাশ করে। 

‘ফসিল’ লেখক সুবোধ ঘোষ, কবি অরুণ মিত্র, বিষ্ণু দে, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, দিনেশ দাশ যেমন এ দশকের উজ্জ্বল মুখ, তেমনি এ দশকের শুরুতেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রারম্ভ তার প্রথম কবিতার বই ‘পদাতিক’ দিয়ে। ’৪২-এ কবি বিষ্ণু দে ও সুভাষ সদ্যগঠিত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক সংঘের যুগ্মসম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৪৭-এর ‘ভারতের স্বাধীনতার পর তিনি ’৪৮-এ কারাবরণ করেন। রাজনৈতিক কারণে তাকে পরবর্তীতে আরো কারা ভোগ করতে হয়। নাজিম হিকমত, পাবলো নেরুদা, হাফিজের কবিতার অনুবাদ একদিকে উদার ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত ও অন্যদিকে বিপ্লবী প্রগতিবাদী বিদেশী সাহিত্যের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। গোর্কির ‘মা’ উপন্যাস নৃপেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনুবাদ করেন। ইংরেজ মার্কসবাদী সাহিত্য বিশ্লেষক ক্রিস্টোফার কডওয়েলের কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ ‘ইলিউশন এন্ড রিয়েলিটি’, সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ ‘ডায়িং কালচার’ ও রুশ সাহিত্য, রাল্ফ ফক্সের উপন্যাস বিষয়ক রচনার পাশাপাশি স্পেনীয় কবি লোরকা, ক্রিস্টোফার কডওয়েল ও রাল্ফ ফক্স, স্পেনে ফ্যাসিস্ট বিরোধী লড়াইয়ে শহিদ হওয়ার প্রভাবও ব্যাপক চল্লিশের কবিকূলে। এসময়ে অনেক বিদেশী বিপ্লব ও প্রগতিবাদী সাহিত্য অনূদিত হতে থাকে। সাহিত্যে নতুন সুর-স্বর ও উন্মাদনার খুঁজ পায় বাঙালি পাঠক। এসব ব্রিটিশদের কমিউনিস্ট ভীতি তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলতে থাকে। আর ঔপনিবেশিক শাসকদের নিপীড়নও সেইসাথে বাড়তে থাকে।

‘পদাতিক’ আধুনিক বাংলা কবিতায় নতুন সুর নিয়ে হাজির হয়। মেহনতি মানুষের সপক্ষে মানবিকবোধ ও শ্রেণিশোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দ্রোহের রাজনৈতিক বক্তব্য সুভাষের কবিতার মূল সুর। মানুষের সাধারণ কথাবলার ঢঙে লেখা তার কবিতা ও বক্তব্যের সহজবোধ্যতা ও পাঠকসংলগ্নতা পাঠক সমাজে তিরিশের কবিতার দুর্বোধ্যতা ও জনবিচ্ছিন্নতার বিপরীতে বাঙলা কবিতাকে ব্যাপক জনসংলগতার জমিনে দাঁড় করায়। ‘পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থে তার প্রথম কবিতায় বলেন, 

 ‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

                                   ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা

চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য

কাঠফাঁটা রোদ সেঁকে চামড়া।’

তার অ-রোমান্টিক ও কবিতায় গদ্যপ্রধানভঙ্গী পরবর্তীকালের কবিদের প্রভাবিত ও অনুসরণ করতে দেখা যায়। তিরিশের কবিদের কবিতা যেখানে বিদেশী প্রকরণ, প্রতীক ও মিথকে দেশীয় প্রেক্ষিতে ব্যবহার না করে এক উন্মূল ও বিচ্ছিন্নতার খোলসে থেকে গেছে, চল্লিশের কবিদের কবিতা তাকে অতিক্রম করে অনেক বেশি জনসম্পৃক্ত, জনআকাক্সক্ষার অনুবর্তী হতে পেরেছে। সুভাষের ‘ঘোষণা’ কবিতায় তাই দেখি ভলগা ও গঙ্গাকে কীভাবে একাকার করে ফেলেন এদেশের মানুষের আশা ও স্বপ্নকে প্রতিফলিত করে।

                                    ‘গঙ্গার জোয়ার এসে লাগে

                                       ভল্গার তীরের স্পর্শ,

চোখে নব সূর্যোদয় জাগে;

                                      মুক্তি আজ বীরবাহু

                                      শৃঙ্খল মেনেছে পরাভব:

                                      দিগন্তে দিগন্তে দেখি

বিস্ফারিত আসন্ন বিপ্লব।’


প্রশ্ন উঠতেই পারে কবিতা নিয়ে এত রাজনীতির কথকতা, এত দেশকাল নিয়ে কথা কেন। এখানে ‘নির্মল আনন্দ’, ‘শুদ্ধ শিল্প’, সময়ের তথা দেশকালের দাবির পরিবর্তে শিল্পের দোহাই দিয়ে চিরকালীন আবেদনের কথাটি অনেকেই সামনে নিয়ে আসতে চাইতেই পারেন। মনে রাখতে হবে সর্বকালে সর্বযুগেই কবিতায় লেগে থাকে দেশকালের জন্মদাগ। স্থান-কাল-পরিবেশ যুগের আবেদন-আকাক্সক্ষাকে অস্বীকার করে কখনো কবিতা হয়নি, হতে পারে না। স্থানকালের ও নান্দনিকতার দাবি পূরণ করেই কবিতা চিরকালীন হয়ে ওঠে। অন্যভাবে বলতে গেলে তিরিশির কবিতার বিদেশমুখীনতা, জনবিচ্ছিন্নতার উৎসমূলটি বিচার করলে দেখা যাবে তিরিশের উত্তাল তারুণ্যের যুগধর্মটি ছিল নতুন ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তারুণ্যকে ঘিরে। তার এক ধারা ছিল স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় উন্মাতাল, আর একদল পশ্চিমা সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ফসলগুলি আত্মস্থ করে পশ্চিমের তৎকালীন সংকট ও সম্ভাবনায় আলোড়িত হয়েছেন। এদেশের ব্যাপক গণমানুষের সমস্যা-সংকট তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। তারা পশ্চিমের ঐতিহ্য, মিথ ও প্রকরণে থেকেছেন সচ্ছন্দ। রাজনীতিতেও সূর্যসেন তথা ‘অনুশীলন’ বা ‘যুগান্তর’ সমগ্র দেশবাসীকে সাথে নিয়ে তাদের কর্মকাণ্ডকে পরিচালনার কথা চিন্তা করেন নাই, নির্ভর করেছেন কতিপয় দুঃসাহসী ও ত্যাগী তরুণ যুবক-যুবতীর ওপর। তাদের নিয়েই সংগঠন গড়েছেন, জীবন দানে উদ্বুদ্ধ করেছেন। চল্লিশের দশকে কমিউনিস্ট-বামপন্থী মার্কসবাদী আদর্শে রাজনীতিতেও গুণগত পরিবর্তনের তথা জনমানুষের ব্যাপক সম্পৃক্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি চলে আসে। তিরিশের দশকের সেইসব মহান আত্মত্যাগী যোদ্ধারা মার্কসবাদে দীক্ষিত হতে থাকে। তিরিশের রাজনীতি যেমন সংখ্যাল্প তারুণ্যের চর্চিত, কবিতাও সংখ্যাল্প রসগ্রাহী ইংরেজি শিক্ষিত নাগরিকদের কাছে তার ভিত্তিটি খুঁজে পেল। তাই বলা যায় তিরিশের কবিতা তিরিশের দেশকালের জন্মদাগ যেমন মুছে ফেলতে পারে না, চল্লিশেও তার সময়ের স্থানিক, বৈশি^ক ঘটনাবলী, পরিবেশ, পরিস্থিতিকে ধারণ করেছে।

চল্লিশে তাদের রূপে ও চারিত্র্যে প্রধানত রাজনৈতিক চেতনানির্ভর সমকালীন আর্থ-সামাজিক প্রভাবে জাড়িত আদর্শভিত্তিক সচেতন-সংঘবদ্ধ নবসৃজনের এই উল্লাসে শরিক হয়েছেন মননশীল প্রবন্ধ, কথাসাহিত্য, চিত্রশিল্প, সংগীত, নাটক, সাংবাদিকতাসহ শিল্পের বিচিত্র ধারার কুশীলবগণ। শুধু নির্দিষ্ট আদর্শের অনুসারীগণই নয়, মানবিক ও যুদ্ধবিরোধী সকল উদার বিবেকবান মানুষ এ কাফেলায় একসাথে হাঁটতে সমবেত হয়েছেন। তারা প্রবীন, নবীন নানা বর্ণ, গোত্র ও মতের মানুষ, শিল্পের বিচিত্র শাখার কারিগর। 

এ কাফেলায় ছিলেন বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি ভিক্টর হোগোর অনুবাদ যেমন করেছেন, ম্যাক্সিম গোর্কিকেও পরিচিতি করেছেন বাঙালি পাঠকদের কাছে, ছিলেন প্রগাঢ় পাণ্ডিত্যের অধিকারী ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সুশোভন সরকার, পরিচয় পত্রিকার হিরন্ময় সান্যাল, সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, যিনি যুগান্তর, বসুমতি, ভারতকথা, সত্যযুগ পত্রিকার কৃতি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন, কথা-সাহিত্যে মানিক বন্দোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, শওকত ওসমান, চিত্রনাট্যকার নবেন্দু ঘোষ ও গল্পকার সুশীল জানা, সাহিত্যিক-সাংবাদিক-অনুবাদক ননী ভৌমিক। 

চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন, গোপাল ঘোষ, নীরদ মজুমদার। এদের সাথে ছিলেন কাঠ খোদাই শিল্পী চিত্তপ্রসাদ। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। গ্রামের প্রান্তিক মানুষ আর কৃষকদের সাথে তার ছিল নিবিড় বন্ধন। চিত্তপ্রসাদ, প্রান্তিক কৃষক ও তাদের নানান অভিব্যক্তির চিত্রণ যেন একাত্মায় মিলে যেতো। কৃষক সম্মেলনগুলোতে কৃষকরা চিত্তপ্রসাদকে শুধু এক নজর দেখতে নাকি অপেক্ষায় থাকতো। 

দেবব্রত বিশ^াস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখে গণচেতনার উদ্ভাস, সাথে গণনাট্য সংঘসহ একঝাঁক শিল্পীর গান সংগীতকে এ দশকে শহর-বন্দর পেরিয়ে গ্রামে-গঞ্জে জনমানসের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে শুরু করে। হেমাঙ্গ বিশ^াস ও সলীল চৌধুরী গণসংগীতে জোয়ার আনেন। শহরের তরুণ-যুবা-শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি ও গ্রামেগঞ্জের মানুষের কাছে কেবল গণসঙ্গীতের নবযুগ নয়, ঐতিহ্য চেতনায় কবিগান, জারি-সারি, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা ও ভাওয়াইয়ার সুর সারা বাংলাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে চলছিল।

এতকাল গাঁয়ের কৃষকের আনন্দ-বিনোদনের জন্য যাত্রা-পালা হতো জমিদারদের নাটমন্দিরে। এবার গ্রামবাংলার কৃষকের ফসল তোলার পর খোলা মাঠে গণনাট্য সংঘের আয়োজন সারা বাঙলার কৃষক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। যে নাট্য আন্দোলনে সৃষ্টি হয় সুধী প্রধান, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, উৎপল দত্তের মতন কালজয়ী নাট্যশিল্পী। ঢাকায় স্বাধীন বাংলাদেশে নাট্য আন্দোলনের বিশেষ ব্যক্তিত্ব থিয়েটার (আরামবাগ)-এর কর্ণধার আরিফুল হকও ছিলেন গণনাট্য সংঘের তৎকালীন কর্মী। বর্তমান লেখকের সাথে সাপ্তাহিক গণশক্তির জন্য তিনি একটি অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকার দেন। তার মুখে গণনাট্য সংঘের সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতার বর্ণনাটিতে তাঁদের গান ও যাত্রাপালার দল নিয়ে দূরদূরান্তে চলে যাওয়া ও গ্রামীণ কৃষকদের চাতালে গান ও যাত্রাপালায় একাত্ম হয়ে যাবার বিষয়টি লেখককে অভিভূত করে ফেলে। 

সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, মঙ্গলাচরণ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কৃষ্ণ ধর, আবুল হোসেন, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, সানাউল হক, সিকান্দার আবু জাফর, ফররুখ আহমদ ও গোলাম কুদ্দুসেরা ছিলেন কবিতার উজ্জ্বল মুখ। তিরিশের বিষ্ণু দে, সমর সেন চল্লিশের কাব্যধারায় সমর্পিত হলেন। সমর সেনের নিরাভরণ-অলঙ্কারহীন কবিতায়ও দেখা মিলল ঋজু বক্তব্যের সাথে আশ্চর্য শানিত শৈল্পিক সুষমার।  

সমর সেনের কবিতার একটি লাইন:

বিধ্বস্ত মাটিতে আনে ট্রাক্টরের দিন

জোসেফ স্টালিন।

মননশীল প্রবন্ধে একদল সেনাপতি অতুল গুপ্ত, গোপাল হালদার, বিনয় ঘোষ, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ রায়, অবন্তী সান্যাল, নরহরি কবিরাজ, সরোজ দত্ত প্রমুখ পুরানো চিন্তাচেতনার খোলনলচে পালটে দিতে থাকলেন। 

এ যেন এক মহাযজ্ঞ শুরু করেছিলেন চল্লিশের কুশীলবেরা রাজনীতি ও শিল্প-সংস্কৃতির বিচিত্র শাখায়, এমনটি আর কোনো দশকে দেখা যায়নি। তবে পরবর্তী সময়ের রাজনীতি সেই সংস্কৃতির এই নব ঝরনাধারাকে এগিয়ে নিতে পারেনি, কেন পারেনি আজকের তরুণ লেখক-কবি-প্রগতিমনস্কদের তার কারণ ও সীমাবদ্ধতাকে খুঁজে বের করতে হবে। এটাই আমাদের দায়। তবেই আমরা পুরানো অচলায়তন ভেঙে নতুন শিল্পের দিশা দিতে পারবো।

Post a Comment

0 Comments