বিশ্বজিৎ মণ্ডল এর ছোটগল্প: 'সহধর্মিনী'

Short story by Biswajit Mandal: 'Sahadharmini'



পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার কোন শব্দ হয় না।

মানুষ হঠাৎ করে বুঝতে পারে না—কখন তার এতদিনের নিশ্চিন্ত জীবনটুকু একটু একটু করে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে, পরিচিত পথটাই অচেনা। যে দরজায় প্রতিদিন নিশ্চিন্তে কড়া নেড়েছে, সেই দরজার ওপাশে আর তার জন্য কোনো জায়গা নেই।

অরিন্দমেরও তেমনই হয়েছিল।

সেদিন দুপুরে অফিসের ঘড়িতে একটা বেজে পঁয়তাল্লিশ। কম্পিউটারের সামনে বসে সে একটি হিসেব মিলাচ্ছিল। হঠাৎ পিয়ন এসে বলল,

—স্যার আপনাকে ডাকছেন।

অরিন্দম উঠে ম্যানেজারের ঘরে গেল।

ম্যানেজার চেয়ারে বসেছিলেন। সামনে কয়েকটি কাগজ। মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর।

—বসো, অরিন্দম।

অরিন্দম বসল।

ম্যানেজার কিছুক্ষণ কাগজের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

—তোমাকে একটা কঠিন কথা বলতে হবে।

অরিন্দম হেসে বলল,

—কোম্পানির অবস্থা কি আরও খারাপ হলো?

ম্যানেজার হাসলেন না।

—হ্যাঁ।

তারপর খুব ধীরে বললেন,

—কোম্পানি কিছু কর্মী ছাঁটাই করছে। তোমার নামও সেই তালিকায় আছে।

অরিন্দমের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।

—কিন্তু স্যার, আমি তো...

—জানি। তোমার কাজ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।

—তাহলে?

—এটা কাজের প্রশ্ন নয়, অরিন্দম। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা।

কিছুক্ষণ ঘরে নীরবতা।


অরিন্দম নিচু গলায় বলল,

—আমি এখন কী করব?

ম্যানেজার কোন উত্তর দিতে পারলেন না।

সেদিন অফিস থেকে বেরিয়ে অরিন্দম অনেকক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মানুষের ভিড় তার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। বাস আসছে, যাচ্ছে। দোকানের সাইনবোর্ডে আলো জ্বলছে। কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ হাসছে।

সবাই যেন কোথাও যাচ্ছে।

শুধু সে দাঁড়িয়ে আছে।

তার মনে হচ্ছিল, সে যেন একটা অদৃশ্য গর্তের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। এক পা বাড়ালেই নিচে শুধু শূন্যতা।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।


দরজা খুলে মাধুরী বলল,

—এত দেরি হলো?

অরিন্দম জবাব দিল না।

মাধুরী একবার তার মুখের দিকে তাকিয়েই থেমে গেল।

—কিছু হয়েছে?

অরিন্দম জুতো খুলতে খুলতে বলল,

—চাকরি নেই।

শব্দ দুটো খুব সাধারণ।

কিন্তু সেই দুটো শব্দ যেন ঘরের বাতাসটাকে বদলে দিল।

মাধুরী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বলল,

—ভিতরে এসো।

অরিন্দম ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে পড়ল।

—সব শেষ।

—কী শেষ?

—সব। সংসার। তিথির পড়াশোনা। বাড়িভাড়া। বাজারের দেনা। তোমার ওষুধ। সব।

মাধুরী শান্ত গলায় বলল,

—চা দেব?

অরিন্দম বিরক্ত হয়ে তাকাল।

—চা?

—হ্যাঁ।

—তোমার কাছে ব্যাপারটা এত সহজ?

—না। একদমই সহজ নয়। কিন্তু তুমি এখন খালি পেটে বসে থাকলে সমস্যাটা আরও বড় দেখাবে।

অরিন্দম আর কথা বলল না।


মাধুরী চা করে আনল।

কাপটা হাতে দিয়ে বলল,

—খাও।

অরিন্দম কাপের দিকে তাকিয়ে রইল।

—মাধুরী, আমি ব্যর্থ হয়ে গেলাম।

মাধুরী এবার তার সামনে বসে পড়ল।

—চাকরি হারিয়েছ। আবার কোন নতুন কোম্পানিতে জয়েন করবে । ব্যর্থ হওনি।

—একই কথা।

—না। চাকরি একটা কাজ। মানুষ তার চেয়ে অনেক বড়।

অরিন্দম মৃদু হেসে বলল,

—তুমি এসব কোথা থেকে শিখলে?

—তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে।


রাত গভীর হল ।

তিথি ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরের আলো নিভিয়ে দুজনে পাশাপাশি শুয়ে আছে। অরিন্দমের চোখে ঘুম নেই।

মাধুরী বুঝতে পারছিল।

—ঘুমাওনি?

—না।

—কী ভাবছ?

—কিছুই বুঝতে পারছি না।

—একটা কথা বলব?

—বলো।

—আমাদের বিয়ের প্রথম বছরটা মনে আছে?

—আছে।

—তখন তোমার বেতন কত ছিল?

অরিন্দম হেসে বলল,

—এখনকার তিথির হাতখরচের চেয়েও কম।

—তবু তো সংসার চলেছিল।

—তখন এত দায়িত্ব ছিল না।

—দায়িত্ব ছিল না, মানুষ ছিল।

অরিন্দম চুপ করে গেল।

মাধুরী বলল,

—সংসার বড় হলে খরচ বাড়ে। কিন্তু মানুষ যদি ছোট হয়ে যায়, তখনই সংসার ভেঙে যায়।

পরদিন ভোরে অরিন্দম ঘুম থেকে উঠে দেখল, মাধুরী আলমারি খুলে বসে আছে।

তার হাতে একটা ছোট মখমলের বাক্স।

অরিন্দম চিনতে পারল।

—ওটা বের করেছ কেন?

—এটা?

—হ্যাঁ।

মাধুরী বাক্স খুলল। ভেতরে তার বিয়ের সময় মায়ের দেওয়া সোনার কানের দুল।

—বেচে দেব।

অরিন্দম যেন চমকে উঠল।

—না।

—কেন?

—ওগুলো তোমার মায়ের স্মৃতি।

—স্মৃতি দিয়ে তো বাজার হয় না।

—তবু ওগুলো বিক্রি কোরো না।

মাধুরী স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি কি জানো, মা আমাকে বিয়ের দিন কী বলেছিলেন?

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

—বলেছিলেন, “সংসার মানে শুধু স্বামীর বাড়িতে যাওয়া নয়। তার সুখ-দুঃখ নিজের করে নেওয়া।”

মাধুরী একটু থামল।

—আজ যদি সংসারের প্রয়োজন হয়, তাহলে তাঁর দেওয়া জিনিস আঁকড়ে ধরে বসে থাকব কেন?

অরিন্দম কোন উত্তর দিতে পারল না।

সেদিন দুল দুটো বিক্রি হল ।

টাকা খুব বেশি নয়। তবু কয়েকদিনের বাজার হল । তিথির স্কুলের ফি মিটল।

তারপর মাধুরী বাড়িতে কেক বানানো শুরু করল। প্রথমে পাড়ার দু-একটি বাড়িতে দিল । তারপর পরিচিতদের মধ্যে।

অরিন্দম বলল,

—মানুষ কী বলবে?

মাধুরী অবাক হয়ে তাকাল।

—মানুষ আমাদের সংসার চালাবে?

—না।

—তাহলে মানুষ কী বলল, সেটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

অরিন্দম চুপ।

—শোনো, অভাব লজ্জার নয়। অন্যায় করে বাঁচা লজ্জার। কাজ করে খেলে লজ্জা কোথায়?

কথাটা অরিন্দমের মনে গেঁথে গেল।

মাধুরীর কাজ বাড়তে লাগল।


ভোরে উঠে রান্না। অর্ডার তৈরি। দুপুরে খাবার পৌঁছে দেওয়া। বিকেলে আবার ঘরের কাজ। রাতে হিসেব।

অরিন্দমও বসে থাকল না। প্রতিদিন নতুন কাজের খোঁজে বেরোতে লাগল।

কিন্তু কাজ পাওয়া সহজ ছিল না।

একটি অফিসে সাক্ষাৎকার দিয়ে বেরিয়ে এসে সে শুনল,

—আপনার অভিজ্ঞতা ভালো, কিন্তু আমরা কম বয়সী কাউকে চাইছি।

আরেক জায়গায় বলা হল,

—বেতন আপনার আগের বেতনের অর্ধেক।

অরিন্দম রাজি হয়েছিল।

তবু কাজ হল না।

দিনের পর দিন প্রত্যাখ্যান তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল।

এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে দেখল, মাধুরী রান্নাঘরে বসে কেক বানাচ্ছে। হাতের আঙুলে ময়দা লেগে আছে। চোখেমুখে ক্লান্তি।

হঠাৎ অরিন্দম বলে উঠল,

—আর কত করবে?

মাধুরী তাকাল।

—কী?

—এইসব।

—কাজ?

—হ্যাঁ।

—যতদিন দরকার।

অরিন্দম গলা উঁচু করল,

—তুমি বুঝতে পারছ না, আমি কেমন লাগছে?

—বুঝতে পারছি।

—না, তুমি বুঝতে পারছ না। তুমি সংসার চালাচ্ছ। পাড়ার লোক তোমার প্রশংসা করছে। সবাই বলছে, মাধুরী কত সাহসী! আর আমি?

মাধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

—তুমি কী?

—আমি কিছুই করতে পারছি না।

—এই কথাটা আর একবার বলবে না।

—কেন?

—কারণ তুমি পারছ না—এটা সত্যি নয়। তুমি চেষ্টা করছ। প্রতিদিন চেষ্টা করছ। চেষ্টা আর সাফল্যের মাঝখানে যে সময়টা থাকে, সেই সময়টাকে ব্যর্থতা বলা যায় না।

অরিন্দমের চোখ নেমে গেল।

মাধুরী বলল,

—তুমি কি জানো, আমি কেন এত কাজ করছি?

অরিন্দম চুপ।

—তোমাকে হারিয়ে ফেলব বলে ভয় হয়।

অরিন্দম মাথা তুলল।

—মানে?

—তুমি যদি প্রতিদিন নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে থাকো, একদিন হয়তো তুমি নিজের কাছেই হেরে যাবে। আমি সেটা হতে দেব না।

এই প্রথম অরিন্দম বুঝল, মাধুরী শুধু সংসারের খরচ জোগাড় করছে না। সে তার স্বামীর ভিতরের ভাঙনটাকেও দুহাতে ধরে রেখেছে।

সেই রাতে অরিন্দম অনেকক্ষণ স্ত্রীর পাশে বসে ছিল।

কিছু বলেনি।

শুধু তার হাতটা ধরে রেখেছিল।


কয়েক মাস পরে মাধুরীর কাজ এত বেড়ে গেল যে একা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ল। সে পাড়ার আরও দুজন মহিলাকে কাজে নিল।

অরিন্দম খাতা খুলে হিসেব করতে শুরু করল।

—দেখো, এখানে খরচটা কমানো যায়।

মাধুরী বলল,

—তুমি তাহলে আমার ব্যবসায় নামলে?

—তোমার ব্যবসা নয়।

—তাহলে?

—আমাদের।

মাধুরী হেসে বলল,

—বেশ। তাহলে তুমি হিসেব করবে, আমি রান্না করব।

—আর তিথি?

—সে পড়াশোনা করবে।

—আর সংসার?

মাধুরী বলল,

—সংসার আমরা দুজনে করব।

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে লাগল।


একদিন অরিন্দম একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে কাজ পেল। বেতন আগের চেয়ে কম, কিন্তু নিয়মিত।

প্রথম বেতন হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় তার মনে হচ্ছিল, সে যেন দীর্ঘ অন্ধকারের পর আবার আলো দেখেছে।

বাড়ি ঢুকে সে মাধুরীর হাতে টাকাটা দিল।

মাধুরী বলল,

—এটা তোমার।

—না।

—কেন?

—এই টাকা আমার একার নয়।

মাধুরী কিছু বলল না।

সেদিন রাতে খাওয়ার পর দুজনে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

শীতের রাত। আকাশ পরিষ্কার। দূরে একটা বড় গাছের ডালে কয়েকটি রাতপাখি পাশাপাশি বসে আছে।

অরিন্দম বলল,

—মনে আছে, একদিন বলেছিলাম আমার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে?

—মনে আছে।

—আজ বুঝতে পারছি, মাটি পুরোপুরি সরে যায়নি।

—কেন?

—কারণ তুমি ছিলে।

মাধুরী হেসে বলল,

—আমি না থাকলে?

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তাহলে হয়তো আমি পড়ে যেতাম।

মাধুরী মাথা নাড়ল।

—না। তুমি পড়তে। আবার উঠতেও। আমি শুধু তোমার পাশে থাকতাম।

—এটাই তো বড় কথা।

মাধুরী আকাশের দিকে তাকাল।

—সবসময় কাউকে টেনে তুলতে হয় না। কখনও কখনও শুধু পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটাই যথেষ্ট।

অরিন্দমের চোখ চলে গেল উঠোনের কোণে রাখা ছোট প্রদীপটার দিকে। বাতাসে শিখাটা বারবার কেঁপে উঠছে, কিন্তু নিভছে না।

তার মনে হল , তাদের সংসারও ওই প্রদীপের মতো।

ঝড় এসেছে।

অন্ধকার এসেছে।

অভাব এসেছে।

কতবার যে আলোটা নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে!

তবু কেউ একজন দুহাত দিয়ে তাকে আড়াল করে রেখেছে।

সে বলল,

—মাধুরী।

—হুম?

—সহধর্মিনী কথাটার মানে আজ বুঝলাম।

মাধুরী মৃদু হেসে বলল,

—কী বুঝলে?

অরিন্দম উত্তর দিল,

—যে মানুষ সুখের দিনে পাশে থাকে, সে সঙ্গী। কিন্তু যে পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার সময়ও হাতটা ছাড়ে না, সে শুধু স্ত্রী নয়—সে সহধর্মিনী।

মাধুরী কোনো উত্তর দিল না।


শুধু ঘরের দিকে চলে গেল।

অরিন্দম তার পেছন পেছন হাঁটল।

সামনে ছোট্ট ঘর। ঘরের ভিতর তিথি পড়ছে। রান্নাঘরে ভাতের গন্ধ। দেওয়ালে পুরোনো ক্যালেন্ডার। আলমারির ওপর কয়েকটি বই।

কিছুই অসাধারণ নয়।

তবু অরিন্দমের মনে হল—এই তো তার মাটির বৃন্দাবন।

অভাবের মধ্যেও যেখানে মানুষ বেঁচে থাকে।

পরাজয়ের মধ্যেও যেখানে আশা জন্ম নেয়।

আর যেখানে একজন নারী, অনির্বাণ প্রদীপের মতো, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু সংসার নয়—একটি মানুষের ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাসটাকেও আলো দিয়ে যায়।

সেদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অরিন্দম জানলার পাশে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকাল।

দূরে কয়েকটি রাতপাখি অন্ধকার কেটে উড়ে গেল।

তার আর তাদের মতো উড়ে যাওয়ার সামর্থ্য নেই—এ কথা সে জানে।

তবু তার আর উড়ে যাওয়ার প্রয়োজনও নেই।

কারণ সে জেনে গেছে—

কখনও কখনও ডানা মেলে আকাশে উড়ে যাওয়ার চেয়ে, মাটিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা অনেক বড় বেঁচে থাকা।

আর সেই বেঁচে থাকার পাশে যে নারীটি থাকে, তার নাম মাধুরী ওরফে সহধর্মিনী।


_____________________________________


বিশ্বজিৎ মণ্ডল

এন০০১৯, বেলপুকুর, পোস্ট বলরামপুর কলোনি ,বহরমপুর , মুর্শিদাবাদ ৭৪২১৬৫, পশ্চিমবঙ্গ।

Post a Comment

0 Comments