ফারজানা অনন্যা'র গল্প 'জলরাক্ষস '

 



Farzana Ananya's story 'Jalrakshas'


আপন অস্তিত্বের এক অস্পষ্ট ছায়াকে এত জীবন্ত মূর্তিতে মুখোমুখি দেখে বিব্রত ও শঙ্কিত হয় মতিয়ার। আত্মপ্রকৃতির ছায়া যেন ভয়ানক বিদ্রূপ করছে ওর সাথে। নির্দয় হিম শীতকালে ঘন কুয়াশায় চাঁদের দিকে মুখ তুলে পথ হারানো শেয়ালের মতো ক্রমাগত এলোপাথারি পদক্ষেপে হাঁটতে থাকে ঘরের ভেতর। ঘোলা দুধের মতো ফ্যাকাসে চোখ নিয়ে এধার-ওধার তাকায়। আবছা আলো, চাপা হাসি। ধ্বনি এখানে শুধু ফিসফিস, শব্দ এখানে শুধু গুঞ্জন। সবই অস্পষ্ট। মতিয়ারের জগৎ যেন কারো লাথির আঘাতে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মতো কালো দুটো শীর্ণ অচঞ্চল চোখ ওকে নির্নিমেষ দেখছে। হতবিহ্বল ভঙ্গিমায় হুট করে দাঁড়িয়ে পড়ে। জিভটা যেন কষ্টে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। দেখলে দাঁতের ফাঁক দিয়ে মনে হবে জিভটা যেন চিৎকার করে বলতে চাইছে - একফোঁটা জল! একফোঁটা জল! আত্মপ্রতিকৃতির ছুঁড়ে দেয়া শব্দের মধ্যে এতবড় সত্য লুকিয়ে ছিলো, জীবনের এই মোহমুগ্ধতার মধ্যে এতোটা অসততা ছিলো, এইসব মেনে নিতে দমবন্ধ লাগে মতিয়ারের। চল্লিশ বছরের নাতিদীর্ঘ জীবনের সমস্ত স্মৃতিকে নোংরা কুৎসিত ন্যাকড়ার মতো ছিঁড়ে ফেলে অসীমে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে মতিয়ারের ঘৃণাভরা মন। অথচ মতিয়ারের ইচ্ছে ছিলো তিনি শতবর্ষী হবেন। শুধু শতবর্ষী নয়, মতিয়ারের বারবারই মনে হতো দেবতাদের মতো যদি অমর জীবন পাওয়া যেত! এতো সহজে এতো সম্মান পেয়েছেন মতিয়ার, প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে জিতে যাওয়ার মধুবর্ষী আনন্দে বারবার স্নাত হয়েছেন। জীবনের এমন সহজ জয়জয়কারে অমরত্বের প্রত্যাশা জন্মানো অস্বাভাবিক নয়। এত দ্রুত জীবনের প্রতি এমন ঘৃণা জন্মাবে? মতিয়ার আর ভাবতে পারেন না। কার কাছে সাহায্য চাইবেন? মতিয়ার রহমান। এ গল্পের নায়ক। 


মতিয়ার রহমানের মুখে সবসময় একটা হাসি ঝুলে থাকে, যেন তিনি নিজের ছায়ার প্রেমে পড়েছেন। কিন্তু হাসিটা কখনো চোখে পৌঁছায় না। যেসব মানুষেরা একটু পর্যবেক্ষণশীল তারা হুট করে সহসা ধরে ফেলে বহিরঙ্গে মতিয়ার সাহেব একটা খোলা বইয়ের মতো সহসা নিজেকে মেলে ধরলেও, বইটা যেন ধাঁধার বই। তিনি যেন স্পষ্ট কী একটা লুকোতে চান। একটা ভয় মিশে থাকে তার চোখের তারায়। অবশ্য যারা বুঝতে পারেন, তারাও কখনো তাকে ঘাটান না। ঘাটায় না এই কারণে যে সমাজে তিনি নিজেই নিজের একটা দুর্ভোদ্য প্রাচীর তৈরি করে রেখেছেন। জনপ্রিয়তা এবং কৌশলাভিজ্ঞতার যুগলকে তিনি সমান্তরালে টেনে নিয়ে গিয়েছেন সমস্ত জীবনব্যাপী। প্রয়োজনে মুহূর্তেই চরিত্রের একমুখীনতাকে বদলে ফেলেন বহুমাত্রিক সত্তায়। এইসব কারণে বন্ধু ও পরিচিত মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক। নিজের প্রশংসায় তিনি নিজেই সহসা পঞ্চমুখ। মি.পারফেক্টশনিস্ট হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন মতিয়ার রহমান। 


মতিয়ার সাহেবের বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। পেশায় সাংবাদিক ও গবেষক। শহরের একটি নামকরা সংবাদপত্রের সম্পাদক। তার কলমে আগুন জ্বলে আর কথায় ছড়ায় বিদ্রোহ। অন্তত তিনি নিজে তা দাবি করেন। মতিয়ার নিজেকে মনে করেন তার স্বদেশের আধুনিক রাজনীতির অগ্রদূত। তার হাত ধরেই সমাজের কালো পর্দা ছিঁড়ে আলো ঢুকবে এই নিকষ কালো ধু ধু বিমুখ প্রান্তরে। প্রতি বছর বইমেলায় দু-চারটা বই বের হয় মতিয়ার সাহেবের। বছরান্তে চার-পাঁচটা গবেষণা প্রবন্ধ জমা হয় সিভিতে। আর সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা তো রয়েছেই। হুটহাট করে এদিক সেদিক বেড়াতে যান। মাঝে মধ্যেই অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন, কীভাবে তিনি এতকিছু করেন! পৃথিবীর সব আলো জ্বলে মতিয়ারের চিন্তাকে কেন্দ্র করে, এই আত্মমুগ্ধতা তাকে তাড়িত করে সর্বদা। মতিয়ারের একটা অদ্ভুত স্বভাব, তিনি আয়নার দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন। নিজের সৌন্দর্য, কৌশলী মনোভাব, জ্ঞান-গরিমা কিংবা পরিশ্রমের কাছে পৃথিবীর যাবতীয় মানুষকে তুচ্ছ, বোকা আর অলস মনে হয় তার। আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে মাঝেমধ্যেই মাথা দুলিয়ে হেসে ওঠেন মতিয়ার। এত নিখুঁত তিনি! তবে এতো নিখুঁত হওয়ার যন্ত্রণাটাও অনেক। নিজের স্তরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সহসা কোনো মানুষ খুঁজে পান না। বন্ধু মহলে যারা আছেন, মতিয়ারের তাদের সকলের সাথে প্রাণের বন্ধুত্ব। কিন্তু নিজের কাছে নিজের বোঝাপড়ার সময় তিনি নিজেই নিজেকে বড় অপমান করেন এসব উজ‌্‌বুকদের সাথে বন্ধুত্ব রাখার দায়ে! তবুও মনকে বোঝান, 'প্রয়োজন'। প্রয়োজনে এদের সাথে মিশতে হবে। অবশ্য বন্ধুমহল, পরিবার কিংবা সহকর্মীদের নিয়ে তার এই 'প্রকৃত' বোঝাপড়াটা কেবল যে স্বগতোক্তিতে হয়, তা কিন্তু না! খুব কাছের কারো কারো সাথেও তিনি মাঝেমধ্যেই তার প্রিয় বন্ধু ও সুহৃদমহল সম্পর্কে বলে ফেলেন অনেককিছু। তবে সে বলাটাও খুব সন্তর্পণে, সাবধানে!


শহরের কেন্দ্রে একটা পুরনো বাড়িতে মতিয়ার থাকেন। বাড়িটা তার বাবার, যিনি এককালে স্থানীয় রাজনীতির ছোটখাটো নেতা ছিলেন। বাড়ির ছাদে একটা ঘর ছিলো, মতিয়ার সেটাকে বলেন তার 'আত্মচর্চা-কেন্দ্র'। সেখানে মতিয়ার রাত জেগে লেখেন, পড়েন আর ভাবেন—কীভাবে তার কলম সমাজের শিরায় বিপ্লবের রক্ত ঢুকিয়ে দেবে। কীভাবে তার গবেষণাকর্মগুলি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলবে। তবে একটা সূক্ষ্ম সমস্যা আছে মতিয়ারের। গবেষণা কিংবা সাংবাদিকতায় মতিয়ারের নিজস্ব মৌলিক চিন্তা খুবই কম। তিনি নিজে একটি বিষয় চিন্তা করে বের করবেন, এই সক্ষমতা তার শূন্যের কোঠায়। মতিয়ার তার চারপাশে এতো বন্ধু-বান্ধব তৈরি করে রেখেছেন, তার মূল কারণটুকু এই 'প্রয়োজন'। জীবনের যে পর্যায়ে যখন যা প্রয়োজন মতিয়ার এই পাতানো বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে তখন তা নিয়েছেন। নিয়েছেন নির্দ্বিধায়, অকুণ্ঠচিত্তে, অঢেলভাবে। কিন্তু খুব নীরবে, সন্তর্পণে। ভুলেও কখনো কাউকে বলেননি৷ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেননি। এমনভাবে তিনি নিজের ব্যক্তিত্বকে জাহির করেছেন যে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বরংচ একধরণের ঋণপ্রচার হয়ে যাবে। যারা মতিয়ারকে সাহায্য করেন, তাদের একেকজনের কাছে মতিয়ারের ব্যক্তিত্ব সময় ও প্রয়োজনানুযায়ী পরিবর্তিত হয়।

প্রয়োজন অনুযায়ী মতিয়ার কারো কাছে শক্ত, কারো কাছে অসহায়, কারো কাছে বুদ্ধিমান, কারো কাছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কারো কাছে বোহেমিয়ান, কারো কাছে বোকা কিংবা কারো কাছে ধূর্ত! তবে মতিয়ারের লেফাফাদুরস্ত ধূর্ত রূপটি যে ধরতে পারবে, তার রক্ষে নেই। মতিয়ার তার অবয়বটুকু সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে দূর করে দিবেন। সততা - অসততা, নিষ্ঠা - লেফাফাদুরস্ত এসব কিছু মতিয়ারের কাছে বিষয় নয়। মতিয়ারের লক্ষ্য একটা জগৎসংসারের কাছে নিপুণ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা। জিতে যাওয়া। দ্য অন এন্ড অনলি মতিয়ার। শিক্ষার্থী থাকাকালীন বা চাকরি জীবনের শুরুতে মতিয়ারের প্রায় সব লেখাগুলিই কপি বা নকলযুক্ত। কে দেখতে যাবে? মতিয়ারের কাছে নীতি নৈতিকতার থেকে ঢের বেশি প্রয়োজন সফলতা। সফলতার কাছে সফল হবার কৌশলটি ম্লান হয়ে যায়। অন্তত মতিয়ার তাই বলে থাকেন। সততা, অসততা, ব্যক্তিত্ববোধ, দায়বদ্ধতা এসব নিয়ে মতিয়ারের মোটেই মাথা ব্যথা নেই। অবশ্য দুনিয়ার কাছে মতিয়ার আপোষহীন! মতিয়ার শুধু নিজের প্রশংসা শুনতে অভ্যস্থ। তার চরিত্রের শতরূপা দিকটি সম্পর্কে কারো জেনে যাওয়া মানে তার অস্তিত্ত্ব সংকটের সম্ভাবনা। শিক্ষাজীবনে প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষাগুলিতে হরহামেশাই অকৃতকার্য হওয়া মতিয়ার আজ মেধাবী ও নিষ্ঠাবান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। চরিত্রের বহুমাত্রিক সঞ্চালনে মতিয়ারের কাছে জীবনের অর্থ হলো 'জিতে যাওয়া'। তা সে জয়ী হওয়ার প্রক্রিয়াটি সৎ বা অসৎ হোক, তার কিছুই যায় আসে না তাতে। জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেবে মতিয়ারের নিজেকে নিয়ে গর্বে বুকটা হরহামেশাই দেড়-দুই হাত লম্বা হয়ে যায়। 


মতিয়ারের জীবনটা খুব নির্ঝঞ্ঝাটেই চলছিলো। শান্ত জলের মতো প্রবাহমান। অফিসে তার একচেটিয়া প্রাধান্য। মতিয়ারের সাফল্যের চাবিকাঠি হলো অন্যের ব্যর্থতা। অফিসে কিংবা বন্ধুমহলে মতিয়ারের পছন্দের তালিকায় যারা আছেন, তাদের সকলেরই একটি স্বভাব মিলে যায়, 'শোষণমূলক আচরণ' কিংবা অন্যকে ছোট করার মানসিকতা। বিভিন্ন ধরণের শোষণমূলক আচরণের মধ্য দিয়ে তারা তাদের জীবনে থাকা মানুষগুলোর আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দিয়ে একধরণের পৈশাচিক আনন্দ পান। এসব নিয়ে মতিয়ারের অবশ্য আক্ষেপ নেই। তিনি তার জীবনে সফল। স্বদেশচিন্তায় বিভোর মতিয়ার! কিন্তু তিনি দেশের জন্য কিছু করছেন কিনা, নাকি গালভরা বুলিতে শুধু নিজেকে জাহিরের প্রতিচ্ছবিই দেখেছেন, এই প্রশ্ন বরাবরই এড়িয়ে যেতেন তিনি।


মতিয়ার সাহেবের জীবনে ঝড় এলো মৃদুলার মাধ্যমে। মৃদুলা মতিয়ার সাহেবের অফিসের নতুন কর্মী। তরুণতুর্কি আগুনমুখো রাজনৈতিক কর্মী। মৃদুলা একটি নতুন দলের সদস্য, যারা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলো। মৃদুলা মতিয়ারের লেখার ভক্ত ছিলেন। একদিন মৃদুলা এসে হাজির হলেন মতিয়ার সাহেবের ডেস্কে । "স্যার, আপনার লেখা আমাদের আন্দোলনের জ্বালানি। কিন্তু কেন আপনি শুধু লেখেন? কেন রাস্তায় নামেন না? আজ বিকেলে প্রেসক্লাবের সামনে আমাদের সমাবেশ আছে, চলুন।" মতিয়ার হেসে উড়িয়ে দিলেন। "আমার কলমই আমার অস্ত্র। আমি আমার লেখায় তোমাদের সাথেই আছি।" কিন্তু মৃদুলার চোখে অবিশ্বাস দেখে মতিয়ারের মনের ভেতরটা কেমন যেন খচ্‌খচ্ করতে থাকলো।


মতিয়ারের নার্সিসিস্টিক মন তাকে বলতো, তিনি একাই যথেষ্ট। তার সম্পাদকীয় পড়ে মানুষ জেগে উঠবে, রাষ্ট্র কাঁপবে। কিন্তু শহরে আন্দোলন তীব্র হচ্ছিলো। শ্রমিকরা রাস্তায়, ছাত্ররা ব্যারিকেডে মেতেছে। মতিয়ারের লেখা পড়া হচ্ছিলো, কিন্তু তার নাম আর আগের মতো গর্জন তুলছিলো না। নামকে ছাপিকে সৃষ্টিকর্ম প্রধান হয়ে ওঠা নিঃসন্দেহে যে কোনো লেখকের পরম প্রাপ্তি। কিন্তু মতিয়ারের কাছে সৃষ্টিকর্ম-টর্ম এসব ভাবালুতার চাইতে তার নাম ও পরিচিতি অধিক জরুরি৷


মতিয়ার সাহেব এক অদ্ভুত পন্থা অবলম্বন করলেন, সবসময়ই করে থাকেন- যতো পরিচিত মানুষ, বয়সে ছোটো সহকর্মী তাদের কাছে টকশোর ক্লিপগুলি মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে নামসহ ফেসবুকের পাতায় শেয়ার করতে বললেন। বক্তৃতা থাকবে, নাম থাকবে, ছবি থাকবে- তবেই না লোকে চিনবে। এবং এসবের সবকিছু তিনি করলেন সন্তপর্ণে। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টকশোর ভিডিয়োটি পর্যন্ত পোস্ট করলেন না। অথচ তার লেখা সকলের টাইমলাইনে ঘুরছে। নিজের বুদ্ধির ওপর মতিয়ার সাহেবের আস্থা ষোলআনা। এবার সে সম্পর্কে তার আত্মবিশ্বাসের পারদ এক লাফে আকাশচুম্বী হয়ে গেলো।  


এক ভর সন্ধ্যায় মৃদুলা আবার এলো। তার শাড়িতে রক্তের দাগ, চোখে আগুন। "স্যার, আজ পুলিশ আমাদের ওপর গুলি চালিয়েছে। দুজন মারা গিয়েছে। আপনি কি লিখবেন এটা নিয়ে? নাকি আমরা শেষ হয়ে যাবার পর আমাদের নির্যাতিত হবার গল্প মহিমান্বিত করে বিক্রি করবেন?" মতিয়ারের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। তিনি বললেন, "আমি লিখবো। আমি সবসময় লিখি। এখন পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন বুঝতে পারছো না?" মৃদুলা হাসলো। তাচ্ছিল্যের সে হাসি! মৃদুলা চলে গেলো একবারও পেছন ফিরে না তাকিয়ে।


সেই রাতে মতিয়ার তার সেই 'আত্ম-চর্চা' কেন্দ্রে বসলেন। কলম হাতে নিলেন, কিন্তু কিছুই লিখতে পারলেন না। তার মনে হলো, তিনি যেন নিজের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে লড়াই করছেন। তিনি কি সত্যিই বিপ্লবের জন্য লিখছেন এতোদিন, নাকি নিজের নামের জন্য? মার্কসবাদী সাহিত্যের কথা তার মনে পড়লো—শ্রেণিসংগ্রাম, ঐক্য, বিপ্লব। কিন্তু তার জীবনের সংগ্রাম কি শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?


পরদিন সকালে শহরে বিক্ষোভ আরও তীব্র হলো। মতিউর ছাদে দাঁড়িয়ে দেখলেন, রাস্তায় মানুষের ঢল। তার চোখে জল এলো, কিন্তু তিনি অনুভব করতে পারলেন না সেটা দুঃখের নাকি নিজের অক্ষমতার। জীবনানন্দের 'অন্ধকার' কবিতার কয়েকটা পঙ্‌ক্তি তার মনে পড়লো-

"মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য

আমাকে নির্দেশ দিয়েছে;

আমার সমস্ত হৃদয় ঘৃণায়— বেদনায়— আক্রোশে ভ’রে গিয়েছে;

সূর্যের রৌদ্রে আক্রান্ত এই পৃথিবী যেন কোটি-কোটি শূয়োরের আর্তনাদে

উৎসব শুরু করেছে।"

ঐ শূয়োরদের উৎসবে মতিয়ার নিজেও আছেন বলে ভ্রম হলো তার। সে উৎসব আত্মমোহের উৎসব। যেকোনো প্রকারে, যেকোনো উপায়ে নিজেকে আত্মবিক্রি করে নাম-যশ-খ্যাতি কেনার উৎসব। এবং সে আত্মবিক্রয়ের জন্য যদি ভস্মে ঘি ঢেলে সবকিছু পুড়িয়ে দিতে হয়, তাও পারেন মতিয়ার। মতিয়ারের মনে হতে লাগলো আত্মবিশ্লেষণের অন্ধকারে কোনো এক গভীর কূপে ক্রমশই কোনো এক জলরাক্ষস তাকে টেনে চলেছে। ঐ জলরাক্ষসটা আসলে তিনি নিজেই। তার প্রকৃত সত্তা। উপরে উঠতে গিয়ে তিনি ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছেন নিচে। তার নিজের হৃদয়ের কাছাকাছি কি শান্তি আছে? নাকি তিনি শুধু নিজের ছায়ার পেছনে ছুটছেন, যেখানে কোনো বিপ্লব নেই, শুধু রয়েছে একটা ফাঁকা গল্প। 

Post a Comment

0 Comments