চান্নিপশর রাইতের লৌড়
চান্নিপশর রাইত, লিলুয়া বাতাস। সুমসাম
আন্ধা গল্লির চাইর পাশ আচানক ফকফকা
শাদা
চাক্কা-নাই-রিকশা-এক
রাইতে একা হইছে মাতেলা
যেমুন, জোয়ান লৌড়ের টাট্টু!
রিকশার গতরে খালি ফাল্ পাড়ে আলগা মর্দামি
দুই চউখে সুরমা দিয়া বুড়া চৌকিদার
কালা মিয়া
পাহারা শিকায় তুইলা
নবাবের হুমুন্দির লাহান
চৌকিতে পুটকি উঁচায়া ঘুম যায়
গল্লির ঘাউড়া কুত্তা, হে-ও ভি ঘুমায়
এই মওকা লা-জওয়াব!
গ্যারেজের খিড়কি দিয়া সরু হয়া, সরু হয়া-হয়া
চিকনে সে আইছে পলায়া
বাবরিচুল, আ-বিয়াইত্তা, চানখাঁরপুলের কেরামত;
হালায় এক আজিব মিস্তিরি!
মহল্লার হগলে ওরে ‘আর্টিস্ট সাহেব’
কয়া ডাকে।
রিকশার পাছায় একদিন খুবসুরত ছবি
একখান
বড় মহব্বতে আঁইকা দিছে খানদানি
হাতে
আসলে হালায় এক আউলা-চান্দি। ইস্কুরুপ ঢিলা। মাগার খাসদিল্
ওর ওই ফাগলাগা দিলে নানান রঙের তেলেসমাতি
মখলুকাতের বেবাক সুন্দর পিনিস
জিন্দেগিভর ওর দিলের জমিনে ভি আঁকা
কেরামত বহুত যতনে আঁকে আজগুবি ছবি
বেশুমার
ছবির জমিন জুইড়া গাছপালা নাও-নদী
পশুপঙ্খি, লায়লা-মজনু, শিরি-ফরহাদ,
ভাল্লুক-উল্লুক সব, বান্দর-উন্দর হনুমান
ডানাঅলা বোররাক, পঙ্খিরাজ, ঘোড়া, জিনপরি
ছিনেমার নায়িকা মৌছুমী আর
পপি-ছাবনুর
ফুল-পাতা, আসমানের চান ও সিতারা
মনে অয়, ওরা সব বোবার লাহান
চায়া-চায়া দেইখা যায়
দুনিয়া ও আসমানের আন্ধাউন্ধা তামাম
খেইল
মনে অয়, রাইতের লিলুয়া বাতাস
তারে--- রিকশারে
উড়ায়া লিবার চায় দূরে
হীরা-পান্না সোনাদানা, মায়, জহরতের পিদিম
জ্বলে তার দিল-পিঞ্জিরায়
আর ওই তারার-জেওরে-ভরা আসমানের নীল
সিংহাসনে
বেহুদা বইসা এক আকেলা সুলতান
খালি খালি ভাব লয়, গাইল পাড়ে, দুনিয়ারে দিমাগ দেখায়
আউলা কেরামতের লাহান ওই হালারও ভি
ছিলা চান্দির তলে দুই-একখান ইস্কুরুপ
ঢিলা মনে অয়
চান্নি-পশর রাইতে লাখে-লাখে গুলবদন পরি
রিকশার গতরে খালি খুশবু ছিটায়, আর
চউখ মাইরা ডাকে ইশারায়
রাইত এক সমুন্দর
আলিশান ঢেউ তার দিলের কপাট চাবি
ছাড়া খুইলা দিয়া যায়;
দেখায় তেলেসমাতি
গতরের পানসি তার সেই ঢেউয়ে খালি লৌড় পাড়ে
লৌড় পাড়ে না উইড়া চলে?
ঠাহর মেলে না ওর মালেটাল, বেচইন দিলে
আর্মানিটোলার রাস্তা, ডাইলপট্টি, ডুরি-আঙুল লেন, নবাবপুর, সুরিটোলার
গতরে জোনাক জ্বলে, আর, দিলখোশ চান্দের পিদিম
ভি লড়েচড়ে
মোরজ্বালা!
এইটা খোয়াব না খোয়াবের মাঞ্জামারা
আজগুবি ঘুড্ডি একখান
জানে কোন্ হউরের পুতে?
চিপা গল্লির ভিতর থিকা, ইবলিসের চেলা যেমুন,
দল বাইন্ধা আতকা-আচানক ঘাউড়া
কুত্তা ভি আহে
খামাখা চিক্কুর পাড়ে
পিছে পিছে খালি লৌড় পাড়ে
মান্দির পোলারা এলা লৌড় পাড়ে ক্যালা?
দিওয়ানা জিকির
১
আমারে পড়ব মনে, জানি তুমি, ডাকবা আমায়
খাড়া-সোজা-উপ্তা হয়া দিওয়ানা জিকিরে অবিরাম;
বাঁশের ঝিংলা দিয়া, জালিবেত-সুন্ধিবেত দিয়া
কানমলা দিয়া মোরে আর কত করবা
প্রহার।
আমি এর প্রতিশোধ নিব ঠিক।
খাল-বিল-নদীনালা বাইদ
পার হয়া চলে যাব একশো ক্রোশ দূরে
একদিন; যেন
কনফুসিয়াসের স্বপ্নে বিভোর কোনো চীনা
সারাদিন একা একা খালেবিলে কিস্তি
ভাসায়
২
ডাকবা আমারে তুমি লুকায়া লুকায়া
একদিন!
যেন এক ভেকশিশু, হাইঞ্জাকালে কচুর বাগানে
ডর পায়া, চিল্লায়া, মায়েরে একলা তার ডাকে।
৩
যেমতি বাদলা দিনে পাইতা মোরে
হাকালুকি হাওরে হাওরে
সাড়া তবু পাইবা না। যেন বোবা
কালেঙ্গা পাহাড়
চুপ মাইরা বইসা রব; আর দেখব তোমার জিল্লতি
যতো জোরে ডাক পাড়ো কোনোদিন পাবা না
আমায়
লক্ষ ক্রোশ দূরে গিয়া তোমা হতে
থাকব স্বাধীন;
------খেলব, খেলার ছলে একা বসে তাস সারাদিন!
৪
আমারে খুঁজবা তুমি হবিগঞ্জে, তে-কোনা পুকুরপাড়ে
মিরাশির মাঠে আর উমেদনগরে
করবা তালাস চুপে পুরান মুন্সেফি আর বগলা বাজারে
দুই হাত উঁচা কইরা হাঁক দিবা যেন
ক্যানভাসার :
চিফ রেইট, দুই টেকা, হলুদি ব্যাটাটা!
৫
বেফিকির উড়াধুড়া আমি এক ফকিন্নির
পোলা
আন্ধা-কানা ঘুইরা মরি লালনীল
স্মৃতির বাগানে
চান্নি-পশর রাইতে জারুলের নিচে বেশুমার,
আবালের সর্দি যেন সাদা-নীল ফুল ঝরে
পড়ে
৬
মগরা নদীতে আর লাফুনিয়া-কইজুরি
বিলে
তোমার নাকের মতো বেঁকা ঘোলা জলে
নাও লয়া
মনভরা গোস্বা লয়া, পেটভরা ভুক লয়া আমি
অলম্ভূত কালা বাইদে ভাইসা রবো একলা
স্বাধীন!
৭
যেন আমি বাচ্চা এক উদ
খিদা লাগলে উপ্তা ডুবে আচানক
কালবাউস ধরে
কুশার-খেতের ভিত্রে বইসা খাব
ফুর্তি লয়া মনে
৬.
আসমানে লেঞ্জাহাঁস উইড়া চলে
হাজারে-বিজারে
চিতলের পেটি যেন কলকলাবে সামনে
ধনুগাঙ;
তার বুকে ঝাঁপ দিব, করবো আমি সেখানে সিনান
৮.
আমারে না পায়া যদি নিজের জাগ্না
চউখে মাখো তুমি নিদ্রাকুসুম
আমি তবে পুটকিছিলা বান্দরের মতো
বসে রবো
চুপচাপ
বদ্যিরাজ
গাছের
আগায় !!
কান্ধে পাত্থর লইয়া
এই অখাদ্য লোকের লগে
কিভাবে যে ঘর করো, সই!
হামানদিস্তার ভিত্রে সে তোমারে
ছাতু করে ফালায়া-ফালায়া
সে তোমারে সস্তা দরে কিইন্না দিয়া
তারার জেওর
দেখায় ফুটানি। আর আমি দেইখা যাই
চুপ
আর তুমি অল্পতেই গইলা পড়ো তার
সস্তা সহজ পীরিতে
হায় সখী, আন্ধারে তোমার মোম
গলে তার বে-আগুন নিঃশ্বাসের ঝড়ে!
----(আমিও দেইখা লমু একদিন তারে!)
তুমি ক্যান সহজ পীরিতে তার
মইজা গেলা মোমের লাহান
তুমি ক্যান আমাতে পাষাণ?
যে তোমারে হামানদিস্তার ভিত্রে
ছাতু করে ফালায়া-ফালায়া
আমারে ঠকায়া তার টাকে তুমি
সারাদিনমান
কোমল বাসনাসহ যত্নসহ মাইখা দেও তেল
তাহলে আমি কি কুনু ভেড়া?
উঞ্চা উঞ্চা পাহাড়ে ওঠাই শাস্তি!
আর তুমি রঙিন পুষ্পের মতো ঝরে পড়বা
তাহার বাগানে?
উঞ্চা পথ, উঞ্চা কষ্ট
কান্ধে পাত্থর লইয়া উঠিতেছি আমি
সিসিফাস!
কিন ব্রিজ দেখবার স্মৃতি
দুই কিংবা তিন সাল আগে আমি শ্রীহট্টতে গিয়া
শ্রীহট্টরে ফিরা পাই
নাই
-----------কিনব্রিজে গিয়া দেখি
কিনব্র্রিজ নাই
শুধু একটা জংধরা, জীর্ণ লাল লোহার ধনুক
সুরমা নদীর উপ্রে উপ্তা হয়া আছে
তাহার বুগলে একটা আলিশান ঘড়ি, যারে
চাবি মাইরা রাইখা গেছে আলি আমজাদ
তবে এর দীর্ঘ পেন্ডুলাম
আজ আর লড়ে না, চড়ে না...
যেন সে আসঙ্গবঞ্চিত কোনো অভিশপ্ত মৃত দানবের
নতমুখ প্রকাণ্ড, নিঃসাড় লিঙ্গ
আইজকা তাহারে
ঘিরিয়া ঘিরিয়া শুধু
বেশুমার চামচিকা ওড়ে
খোমা
শরৎকাইল্যা নানান দিগদারির মইধ্যে
কুলফি বরফের লাহান
ছিঁড়া মেঘ আর ছিঁড়া ছাত্তির তলে
ম্যান-পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের মতো
আমার খোমার দিকে হাঁইটা আসতেছে
তোমার অফিস-ফেরত ক্লান্ত খোমা
আমি ভি দুই চউক্ষে সুর্মা দিয়া
জাফরান-রঙ পিরান-গায়ে
ফেকু ওস্তাগার লেইনতক হাঁইটা গিয়া
তুমারে বরণ করমু ভাবি
চান্দিছিলা ছল্লুকের টং-দোকানে
কড়া লিকারে আলগা-পাত্তির
এক-কাপ চা আর বাটাভরা পান দোক্তা দিয়া
রাইতের নীল ডহরে
(শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্য)
আমারে তুইলা নায়ে রাইতে কারা লয়া যায় বিলে?
তেনাদের খোমাটোমা কিছু নাই। চউখ-মুখ নাই;
মুখের বদলে দেখি, শাদা কাপড়ের তিনখান ত্যানা
লড়েচড়ে আলগা বাতাসে। আর, আজগুবি নাও
নীল ডহরের জলে চেলচেলায়া-কলকলায়া চলে
খাগড়ার আড়ালে এক কুড়া পাখি লেঞ্জা উঁচায়া কারে ডাকে?
ছর্রা গুলির লাহান বেবাক মাছেরা দেখি,
লাফায়া-ছিটকায়া যায় দূরে
পশ্চিমে জাঙ্গাল আর দক্ষিণে গোপাট;
বুগলে বাইদের জলে গোপনে সিনান করে
লেংটা চান্দের গোল খুবসুরত খোমা
এইসব তেলেসমাতি দেইখা ভাবি
আমি ক্যান এইখানে আইজ
হুমুন্দির পোলারা ক্যান মাঝ রাইতে
তুইলা আনল এই নীল ডহরে আমারে!
পথভুলাইন্যা কানাঅলা পরিটরি নাকি এরা পেরতের দল?
শইল্যে হাতায় কেডা
অজাগায়-বেজাগায় লড়ে কার হাত আর খবিস আঙুল?
ডর পায়া বোবা হয়া মিচকা মাইরা থাকি আমি চুপ!
আখেরে মালুম হয়: এইটা হৈল রাইতের লিলুয়া বাতাস;
এই চান্নি রাইত, এই ফুরফুরা মিহিন বাতাসে কতশত
কাঁইপা ওঠে সরালির-মরালীর ছতরের উদলা পশম
জলের কৈতরগুলা পাঙ্খা নাড়ে বৈতলের মতো
পাঙ্খার আওয়াজে তারা ভইরা তোলে সাত-আসমান
কী কারণে কালবাউস তিতপুঁটি খইলসা কৈ উগোল মাগুর
পানি থিকা ফাল মারে। মিইশ্যা যায় পানিতে আবার!
শরতের চান্নি রাইতে মাছগুলা কী কারণে হৈল বেচইন?
মাছ দেইখা আহে উদ, আহে গুই গাতুম-গাতুম
আহে ফেউ একলা, আর, দল বাইন্ধা খাটাশের দল
গর্ত থিকা হুক্কা-হুয়া খেঁকশিয়াল লাঙ্গুল উঁচায়া খেমটা নাচে
ঘুরায়া-বেঁকায়া ঘাড় পেঁচা চায়া দ্যাখে
কড়ুই গাছের উপ্রে বইসা এক ভেটেরান চিল
মাথার ভিত্রে তার আঁকতেছে
প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইকের ভয়ানক ছক
যেন তারা অন্য কোনো মহাভারতের
যুদ্ধের ভিতর থিকা জন্ম লইতে থাকে ধীরে ধীরে
জন্ম লইতে লইতে নিজেগোর
বেশুমার আগামী যুদ্ধের ভিত্রে
বইসা ধীরে নিশানা সাজায়
অর্জুনের তীর হয়া, অব্য̈র্থ আয়ুধ হয়া, কিরাতের বাঁকনল হয়া
শানদার ঠোঁটে-নখে কখন যে নাইমা আসবে তারা
ফাল-পাড়া মাছেদের ঝাঁকে আচানক
অহনে অনেক রাইত
একলা আমি তেনাদের লগে নাও-ভাসা হয়া চলি
কই যাই কোন দিকে কিছুই জানি না!
জানি এই আজিব রাইতের ভিত্রে আছে আরো রাইত;
আমার ভিত্রে আরো কত-কত আমি
বাইদের ভিত্রে আরো কতশত বাইদ রয়া যায়!
নাই শুরু নাই শেষ
এক আলাহিদা শুরু ও শেষের ভিত্রে আমি;
একা আর শত শত আমি
শত শত বিলে-বাইদে
শতশত হাওরে-সায়রে আমি শতশত ‘আমি’ হয়া ভাসি
সেইসব নায়ে মাঝি নাই। শুধু
আমি আর আমার বুগলে তিনজন
তেনাদের খোমাটোমা কিছু নাই। চউখ-মুখ নাই
মুখের বদলে দেখি, শাদা কাপড়ের
তিনখান ত্যানা খালি লড়েচড়ে আলগা বাতাসে!
--------------------------------------------------------











0 Comments